রিসেট

অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ালেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি রয়ে গেছে

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট (সোমবার), ২০২৫ Archive 2022Source: অর্থনৈতিক রিপোর্টার

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্নআয় শ্রেণির মানুষ এখনো চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। 

রোববার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপে এসব মন্তব্য করেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি।

সিপিডি’র বিশেষ ফেলো প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সহ বিভিন্ন দলের নেতা ও ব্যবসায়ীরা। 

সিপিডি জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, প্রবৃদ্ধি মন্থর, এবং বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। এই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো বহু সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। সিপিডি একটি ৩৮ সূচকের স্কোরকার্ড প্রকাশ করেছে, যেখানে সবুজ, হলুদ ও লাল রঙে চিহ্নিত করে মূল্যায়ন করা হয়েছে সরকার কতোটা অগ্রগতি অর্জন করেছে। ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, এতে মাত্র ৯টি সূচক সবুজ রঙে রয়েছে, যা সামান্য অগ্রগতিরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য যে শ্বেতপত্র ও টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল, তাদের সুপারিশগুলো এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন কোনো বড় সংস্কার প্যাকেজ হাতে নেয়ার সম্ভাবনা কম বলেও মন্তব্য করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইতিমধ্যে অর্জিত সাফল্যগুলো ধরে রাখা এবং অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা মোকাবিলা করা।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে সংস্কারসহ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ রপ্তানি খাতকে ভালো অবস্থায় রেখেছে ও বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। কিন্তু দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। এগুলো উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধার ছিল সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এই ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সফলতা আসছে এবং ঝুঁকি কমছে-এটিই বড় অর্জন। তবে নাগরিকরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করার ব্যাপারে অনেক প্রত্যাশা করেছিলেন। নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার শ্বেতপত্র ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনঃনির্ধারণে টাস্কফোর্স গঠন করলেও তাদের সুপারিশের বাস্তবায়ন দেখছি না। “শ্রম খাত, গণমাধ্যম, নারী ও স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখছি না। আর শিক্ষায় তো কমিশন হয়নি।” শ্বেতপত্রের সুপারিশের কিছুটা প্রভাব ব্যাংক খাত, বৈদেশিক খাত ও মূল্যস্ফীতিতে দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিপিডি। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ, রাজস্ব আহরণ, এডিপি বাস্তবায়নে নেতিবাচক ধারা থাকার তথ্য তুলে ধরেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, “উন্নতি দেখতে পেয়েছি- মূল্যস্ফীতিতে; যেটা দেখেছি ১০ বা তার বেশি, এখন তা কমছে। 

সিপিডি জানিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাত এখন গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে। এই সংকটের সমাধান না হলে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যাপ্ত নয়। হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোর ঘাটতি, কর্মী সংকট আর সুলভ ওষুধের অভাব এখনো প্রকট। শিক্ষাখাতেও উন্নতি নেই- শিক্ষক সংকট, শিখনের নিম্ন মান, শহর-গ্রামের বৈষম্য চলমান। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকটাই পিছিয়ে, ঘাটতি রয়ে গেছে সরকারি ক্রয়ে সুশাসনের ক্ষেত্রে। ব্যাংকিং, জ্বালানি ও ভূমি খাতের সংস্কার হচ্ছে ধীরগতিতে। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

সংলাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, প্রতিবছর টাকা ছাপানো, পরিবহন ও বণ্টনে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ হয়। তিনি বলেন, টাকা ছাপানো, সংরক্ষণ, সারা দেশে পরিবহন ও বণ্টনে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। রাষ্ট্রের এ বিপুল খরচ বাঁচাতে হলে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে হবে। ক্যাশলেস বা নগদ অর্থ ছাড়াই লেনদেন বাড়াতে হবে। এ খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করতে নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে। এর ফলে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা-সবার জন্য লেনদেন হবে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ। ক্যাশের ব্যবহার কমলে রাষ্ট্রীয় খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। গভর্নর বলেন, আর্থিকখাতে কেবল স্থিতিশীলতা এসেছে। রাজনৈতিকখাতে তো আসেনি। সিকিউরিটি সিচ্যুয়েশন তো এখনো আনস্টেবল। সবকিছু মিলিয়ে এখনই কেউ বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়বে এই প্রত্যাশা যদি কারও থাকে, আমি বলবো সেটা কাল্পনিক। আমাকে বাস্তবসম্মত হতে হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ সমপ্রতি ঢাকার একটি কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, শিক্ষার্থীরা মোবাইলে এআই ব্যবহার করে পরীক্ষা দিচ্ছে। আর প্রিন্সিপাল চুপচাপ বসে চা খাচ্ছেন। এমন ভয়াবহ অবস্থা চলছে, দায়িত্বশীল শিক্ষক খুঁজে পাওয়া কঠিন। 

সিপিডি’র বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন শাসনভার গ্রহণ করলেন গত বছরের ৮ই আগস্ট, তখন আমাদের অর্থনীতি বেশ বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন হচ্ছিল। টাকার বিনিময় হারের অবনমন হচ্ছিল খুব দ্রুত। সামষ্টিক অর্থনীতি অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে যাচ্ছিল। উচ্চমূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ছিল, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমছিল। 
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া। অর্থনীতি স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে এই সময় অনেক কাজ হয়েছে। বড় বিষয় হচ্ছে মানিলন্ডারিং বন্ধ হয়ে গেছে। যারা লন্ডারিং করতো তারা তো পালিয়ে গেছে। যারা দেশে আছে তাদের হাতে টাকা নেই। মানিলন্ডারিং বন্ধ হওয়ার কারণে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের উচিত ছিল স্বৈরাচারের বাজেট চালিয়ে না যাওয়া। ওই বাজেট বাদ দিয়ে সামাজিক বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে নতুন বাজেট দিতে পারতাম। আমি মনে করি এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি বলেন, একটা রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিতে ১৯টি জায়গার অনুমতি লাগে। এদেশে বিনিয়োগ করবে কে? সিরিয়াস ডিরেগুলেশন না করলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। অর্থনীতি ঠিক হবে না। এই সরকারের আমলে বিনিয়োগ আসেনি মন্তব্য করে বিএনপি’র এই নেতা বলেন, এতে তাদের দোষ নেই। বিনিয়োগে বাংলাদেশ অনেক নিচে। সিরিয়াস ডিরেগুলেশন ও সিরিয়াস লিবারেলিজম ছাড়া দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া যাবে না। সরকারের অনেক দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ট্রেড বডিগুলোর হাতে অনেক কার্যক্রম তুলে দিয়ে সরকারকে নির্ভার হতে হবে। ফিজিক্যাল কন্ট্রাক্ট না কমালে দুর্নীতি কমানো যাবে না। তিনি বলেন, দেশে যত নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেশন) থাকবে, তত দুর্নীতি বাড়বে। অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করতে হবে, এতে সবার অংশগ্রহণ লাগবে।

শ্রম ও নৌ-উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্যর্থ মালিকদের কয়েকটি কারখানা বর্তমানে শ্রম মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়েছে। এগুলো বিক্রির চেষ্টা চলছে। কারণ শ্রম কল্যাণ তহবিল থেকে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে ঋণ নেয়ার পর মালিকরা বিদেশে চলে গেছেন। শ্রম ও নৌ-উপদেষ্টা বলেন, ‘আগের সরকার পুরো স্ট্রাকচার ভেঙে ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিভিল প্রশাসন, এমনকি সেনাবাহিনীও। প্রত্যেক জায়গায় ফ্যাসিবাদ ঢুকে পড়েছিল। রাষ্ট্রের কোথাও ফাঁকা জায়গা ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি নতুন কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, যাতে পরবর্তী সরকার কাজ এগিয়ে নিতে পারে।’ সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ‘উন্নয়ন শুধু মেট্রোরেল বা এক্সপ্রেসওয়েতে নয়, বরং যেখানে মানুষ বঞ্চিত, সেখানেই উন্নয়ন প্রয়োজন। ব্যর্থতা থাকলে সেটা শুধু আমার নয়, জনগণেরও আছে। আপনারা সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি।’

অর্থপাচারে গভর্নরদের দায় দিয়ে তিনি বলেন, ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জনতা ব্যাংক থেকেই ২৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। কোথাও শুনেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পালিয়ে যান? তিনজন গভর্নরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি গরিবের গভর্নরও পালিয়ে গেছেন। এমন অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে বলে জানান তিনি। শ্রম উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা এক বছরে হয়তো কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু দেখেন এখন তো কাউকে গুম করা হচ্ছে না। সর্বোচ্চ বলা হয় ফ্যাসিবাদের দোসর। এটা কি পরিবর্তন না’, প্রশ্ন রাখেন তিনি। ব্যর্থতার দায় সবার জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হলে, এই ব্যর্থতা শুধু সরকারের একার নয়; এই ব্যর্থতা সবার। যেসব গভর্নর টাকা পাচারসহ নানা অপকর্মে জড়িত, তাদের বিচার আমরা করতে পারলাম না। নির্বাচিত সরকার কি বিচার করতে পারবে? আমি জানি না।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টেক্সটাইল খাতে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। ফিনিশড প্রোডাক্ট আসবে শুল্ক ছাড়া কিন্তু কাঁচামাল তুলায় ২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তার ওপর চাঁদাবাজ তো আছেই। গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেই। গত ৩৬৫ দিনে ম্যাজিক্যাল আমি কিছু দেখতে পাইনি। 

অনুষ্ঠানে জ্বালানি সংকট, চাঁদাবাজি ও আর্থিক খাতে লুটপাট নিয়ে ক্ষোভ জানান ব্যবসায়ীরা। উঠে আসে ৫ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বলতাকে দায়ী করেন ব্যাংকাররা।