রিসেট

দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন পাইলট তৌকির

প্রকাশিত: ২২ জুলাই (মঙ্গলবার), ২০২৫ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

প্রথমবারের মতো একা প্রশিক্ষণ বিমান চালাবেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগর। যার উচ্ছ্বাস ছিল রাজশাহী উপশহরের ২নং সেক্টরের বাড়িতেও। নিয়তি তাকে সফলকাম করেনি। উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় বিধ্বস্ত তার পরিচালিত বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান। যান্ত্রিক ত্রুটি বুঝতে পেরে জনবহুল এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নেয়ার চেষ্টা করেন বিমানটিকে। কিন্তু চীনের তৈরি এফ-৭ বিজিআই মডেলের বিমানটি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস রুমের সামনে বিধ্বস্ত হয়। যেখানে ক্লাস শেষে কোচিং করছিল প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। হতাহত শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ প্রায় দু’শতাধিক। মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো দেশ। গতকাল ছিল তৌকির ইসলাম সাগরের সলো ফ্লাইট ট্রেনিং। আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গতকাল দুপুর ১টা ৬ মিনিটে কুর্মিটোলাস্থ বিমান বাহিনীর এ কে খন্দকার ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিমানের বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজের দোতালা একটি ভবনে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়। 

ফাইটার জেট অপারেট করার জন্য একজন পাইলট যে হাই স্কিল্ড, সেটি’ই প্রমাণিত হয় সলো ফ্লাইটের মাধ্যমে। ট্রেনিং-এর এ পর্যায়ে পাইলটকে নেভিগেটর বা কো-পাইলট বা কোনো প্রকার ইন্সট্রাক্টর ব্যতীত একাই ফ্লাইট অপারেট করতে হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির সে রকমই একটি ট্রেনিং ফ্লাইট অপারেট করছিলেন। যেকোনো প্রকার ট্রেনিং ফ্লাইট সিভিলিয়ান এরিয়া থেকে দূরেই হয়ে থাকে, তবে সলো ফ্লাইট সাধারণত আর্বান এরিয়াতেই হয়ে থাকে। আর আর্বান এরিয়াতে এ ধরনের সেন্সিটিভ ফ্লাইট অপারেট করার জন্য পাইলটকে যথেষ্ট কোয়ালিফাইড হতে হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির তেমনই একজন পাইলট। এদিকে, উড্ডয়নের পর উত্তরা, দিয়াবাড়ি, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরার আকাশ জুড়ে তিনি উড়তে থাকেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বিমানে কিছু সমস্যা আঁচ করেন। কন্ট্রোল রুমে রিপোর্ট করে জানান, তার বিমান আকাশে ভাসছে না, মনে হচ্ছে বিমান নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে। কন্ট্রোল রুম থেকে ইন্সট্যান্ট রেসপন্স করে ইজেক্ট করার জন্য জানানো হয়। কিন্তু ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির শেষ মুহূর্ত অবধি চেষ্টা করেছেন বিমান বাঁচানোর জন্য। তিনি বিমানটির সর্বোচ্চ ম্যাক স্পিড তুলে বেসের দিকে ছুটতে থাকেন। এরমধ্যেই কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার ঠিক এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যেই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুলে বিধ্বস্ত হয়।

এদিকে, তৌকির ইসলাম সাগরের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর শোকের ছায়া নেমে আসে তার রাজশাহী নগরের উপশহর এলাকার বাড়িতে। যেখানে তার বাবা-মা ও বোন থাকতেন। যদিও তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে। ছয় মাস আগে বিয়ে করেছিলেন তৌকির ইসলাম। সোমবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়। পরে বিকাল ৫টার দিকে সাগরের বাবা তোহরুল ইসলাম, মা সালেহা খাতুন ও ছোট বোন বৃষ্টিকে বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেয়া হয়। সাগরের চাচা মতিউর রহমান বলেন, আমরা বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তার (পাইলট) মৃত্যুর খবর পাই। তিনি জানান, সাগর ছয় মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। সম্প্রতি তিনি রাজশাহী এসেছিলেন। তিনি আরও বলেন, ছোট ভাই ঢাকায় গিয়ে মরদেহ নিয়ে আসার পর পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে- সাগরের দাফন রাজশাহীতে না চাঁপাইনবাবগঞ্জ হবে। জানা গেছে, সাগর রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে পাবনা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। তারা এক ভাই এক বোন। তার বোন সৃষ্টি বর্তমানে বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমবিবিএস-এর শিক্ষার্থী। তৌকিরের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের কানসাট এলাকায়। পরিবার নিয়ে রাজশাহী নগরীর উপশহরের তিন নম্বর সেক্টরের আশ্রয় নামের একটি বাড়ির তিন তলায় ভাড়া থাকেন। নিহত তৌকিরের বাবা তোহরুল ইসলাম। তিনি পেশায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ব্যবসায়ী। আর মা সালেহা খাতুন গৃহিণী।