আবারো রক্তাক্ত হলো টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার ময়দান। দুই পক্ষের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন উভয় পক্ষের কয়েকশ’ জন। এ নিয়ে দিনভর উত্তেজনার পর বিকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইজতেমা ময়দানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় দুই পক্ষের সমর্থকদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে সভা- সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। মোতায়েন করা হয় বিজিবি। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা চালান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাকরাইল মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তাবলীগ জামাতের জুবায়েরপন্থিরা। ইজতেমা মাঠে হতাহতের ঘটনার পর সংঘাত এড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে দুই পক্ষকেই মাঠ ছেড়ে দিতে বলা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। হামলা ও হত্যার অভিযোগ তুলে সাদপন্থিদের কাকরাইল মসজিদ ও ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন মাওলানা জুবায়েরপন্থিরা। তারা এককভাবে ইজতেমা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে ইজতেমা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে তাবলীগের মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। হামলা ও সংঘর্ষে চার জনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন- কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার এগারসিন্দু এলাকার বাচ্চু মিয়া (৭০) ও ঢাকার দক্ষিণখানের বেরাইদ এলাকার বেলাল হোসেন (৫৫), বগুড়ার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (৬৫)। নিহত অন্য একজনের পরিচয় জানা যায়নি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হক চার জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জোড় ইজতেমা উপলক্ষে ময়দানে মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা অবস্থান করছিলেন। মাঠে জোড় ইজতেমা আয়োজনের চেষ্টা করছিলেন সাদ অনুসারীরা। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার বিকাল থেকে তুরাগ নদের পশ্চিম পাড়ে ও টঙ্গীর আশপাশে মসজিদগুলোতে সাদ অনুসারীরা জড়ো হতে থাকেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাত থেকে ইজতেমা ময়দানের প্রায় সকল প্রবেশ পথগুলো পাহারা দিতে শুরু করে জুবায়েরপন্থিরা। মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে মাওলানা সাদ অনুসারীরা তুরাগ নদের পশ্চিম তীর থেকে কামারপাড়া ব্রিজসহ বিভিন্ন রাস্তায় জড়ো হন। অন্যদিকে সাদ সমর্থিত সচেতন ছাত্র সমাজের দেয়া প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি এড়াতে রাত ২টায় টঙ্গীর কাকরাইলে আলোচনায় বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সংগঠনটির আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মাহফুজুল হক ও মাওলানা মামুনুল হকসহ অন্য আলেমরা। সেখানে উপস্থিত সাদপন্থি একজন মুফতি ফেসবুকে পোস্ট করেন- তাদেরকে জোড় ইজতেমা করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে ভোররাত ৩টার দিকে সাদপন্থি সমর্থকরা ইজতেমা ময়দানে ঢোকার চেষ্টা করেন। ওই সময়ে ময়দানের ভেতরে কিছু জুবায়েরপন্থিরা পাহারা দিচ্ছিলেন। ময়দানের বাইরে বড় জমায়েত দেখে ভেতর থেকে জুবায়ের অনুসারীদের একটি পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। এসময় সাদপন্থিরা হামলা চালান। এক পর্যায়ে সাদপন্থিরা ইজতেমার ময়দানে প্রবেশ করেন। তারা ময়দানের ফরেন গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। দুই পক্ষের কাছে থাকা রান্নার জন্য বঁটি, চাকু ও বাঁশ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। সংঘর্ষের একপর্যায়ে জুবায়েরপন্থিদের ইজতেমা ময়দান থেকে বের করে দেয়া হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে যান। হতাহতদের টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে নেয়া হয়। গতকাল দুপুর ২টা থেকে রাজধানীর কামারপাড়া, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা সেক্টর-১০ এবং তৎসংলগ্ন তুরাগ নদের দক্ষিণ, পশ্চিম এলাকায় যেকোনো প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ ইত্যাদি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। দুই পক্ষকে মাঠ ছেড়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়ার পর দুই পক্ষই সেখান থেকে চলে যান।
সাদপন্থিদের মিডিয়ার সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সায়েম মানবজমিনকে জানান, ২৯শে নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত জোড় ইজতেমা পালন করে জুবায়েরপন্থি অনুসারী মুসল্লি। দ্বিতীয় পর্বে আমাদের (সাদপন্থি) ২০শে ডিসেম্বর থেকে ২৪শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনের অনুমতি চাওয়া হয় জোড় ইজতেমা করার জন্য। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে দ্বিতীয় পর্বের জোড় ইজতেমার অনুমতি দেয়া হয়নি মাওলানা সাদ অনুসারীদের।
মাওলানা জুবায়ের অনুসারী ইজতেমা আয়োজক কমিটির মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, ইজতেমা ময়দানে আমাদের ঘুমন্ত সাথী ভাইদের ওপর হামলা করে সাদপন্থিরা। এ সময় ঘটনাস্থলে ২ জন নিহত হয়। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আঘাত করে আহত করে শতাধিক সাথী ভাইদেরকে।
ঢাকা মেডিকেলে ৪০ জনের চিকিৎসা, একজনের মৃত্যু: এদিকে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জুবায়ের ও সাদপন্থিদের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত অন্তত ৪০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে ছুরিকাঘাতে মো. বেলাল (৬০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল আটটার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢামেকের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মো. বেলালের ছেলে আবদুল্লাহ-আল জুবায়ের বলেন, তার বাবা তাবলীগ জামাতের মূল ধারার। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর সদর কুঠিবাড়ি কমলাপুরে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বাড্ডা বেরাইদ এলাকায় নিজ বাড়িতে থাকেন। তার পিতা পেশায় একজন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ছিলেন। আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে গাজীপুরের হাসপাতালে নেয়া হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। মেডিকেলে আনার পর বুধবার সকাল ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
