জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আহতদের অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল)। আহতদের অধিকাংশকেই স্টিলের রডের রিং লাগিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনায় বিনা খরচে চিকিৎসা চললেও আহতদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পরিবার। অনেকদিন যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন অনেক শিক্ষার্থীরা। চিকিৎসকরা বলছেন- সম্পূর্ণ সুস্থ হতে তাদের প্রায় ২ বছর সময় লাগতে পারে। সরজমিন গত শনিবার হাসপাতালটির ৪ তলায় অবস্থিত ওয়ার্ড ‘এ’ ও ৩ তলায় অবস্থিত ওয়ার্ড ‘বি’ তে এমন চিত্র দেখা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের মধ্যে হাসপাতালটিতে ভর্তি আছেন ৮৪ জন। এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে আন্দোলনে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৫৫৪ জন।
আমাদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে: আব্দুল্লাহ’র বাবা
পঙ্গু হাসপাতালের ৩য় তলায় অবস্থিত মডেল ‘বি’ ওয়ার্ডের ৪১ নম্বর বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন আব্দুল্লাহ আহমদ। ৪ঠা আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বরে গোলচত্বরে হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিতে যাওয়ার সময়ে পুলিশ তার পায়ের উপরে গাড়ি তুলে দেয়। এতে তার ডান পায়ের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত হাড়ের অধিকাংশ ভেঙে যায়। এখন তার পায়ের ভাঙা ঠিক করতে স্টিলের রডের রিং লাগিয়ে রাখা হয়েছে। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে আব্দুল্লাহ বলেন, ওইদিন কলেজের ফ্রেন্ডরা মিলে ইসিবি চত্বরে ছিলাম। যখন ওইখানের পরিবেশ শান্ত হয়ে যায় আমরা মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাচ্ছিলাম। মিরপুর ১৩ ক্রস করে যখন আগাই তখন পুলিশের গাড়ি রিভার্সে আসছিল। সবাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। তখন পুলিশ আমার পায়ের উপরে গাড়ি তুলে দেয়। আমার পায়ের হাঁটু থেকে নিচ পর্যন্ত ভেঙে যায়। হাঁটুর যে বাটি আছে প্যাটেলা সেটা ভেঙে গেছে। ডাক্তার বলেছেন, আব্দুল্লাহ কখনো হাঁটু ভাঁজ করতে পারবেন না। পায়ের রিং পরানো অবস্থায় থাকবে প্রায় দেড় বছর। প্যাটেলা পরিবর্তন করার জন্য আবারো অপারেশন করানো লাগবে। এরপর ফিজিওথেরাপি দিতে হবে।
ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্টে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ুয়া আব্দুল্লাহ’র স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যাওয়ার। আন্দোলনে পা ভেঙে যাওয়ায় তার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ’র বাবা শাহাদাত হোসেন মুন্না বলেন, ওর ক্যারিয়ার অনেক পিছিয়ে গেল। কবে নাগাদ পুরোপুরি ট্রিটমেন্ট হবে সেটাও আমাদের অজানা। ডাক্তার বলেছেন, দেড় বছর সময় লাগবে। এখন দেড় বছর পরে আদৌও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবে কিনা সেটা অনিশ্চিত। ওর হাইট ৬ ফিট ২ ইঞ্চি, ওর সেকশনে ও ফার্স্ট বয়। স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যাবে। এখন তো সেটা আর সম্ভব না। ওকে নিয়ে আমাদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। দেশের স্বার্থে আমাদের ছেলেরা আন্দোলন করছে। এখানে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। দীর্ঘদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে আর খেলার মাঠে না যেতে পেরে ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পঙ্গু হাসপাতালে আব্দুল্লাহ’র চিকিৎসা ঠিকমতো হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবারটি।
অপারেশন করে বুলেট বের করতে চাইলে আমার মৃত্যু ঝুঁকি আছে: সাইফুল ইসলাম
১৯শে নভেম্বর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন সাইফুল ইসলাম। একাধিক অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করার পর তার পায়ে স্টিলের রডের রিং লাগিয়ে দেয়া হয়। তবে সম্প্রতি সেটি খুলে দেয়া হয়েছে। এখন তার পা পর্যবেক্ষণের জন্য ‘বি’ ওয়ার্ডের ৪০ নম্বর বেডে রাখা হয়েছে। পায়ের বর্তমান অবস্থার বর্ণনায় সাইফুল বলেন, আমার গায়ে টোটাল ৯ রাউন্ড বুলেট লেগেছে। পায়ে লাগছে ৮টা বুলেট। সবগুলো বের করা হয়েছে। তবে পায়ের নার্ভ ছিঁড়ে গেছে। সে কারণে পায়ের পাতা উপরে আসে না। অন্য বুলেটটা পেটে লেগেছে। এতদিন বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছি। পায়ের অপারেশনের জন্য এখানে ভর্তি হই। তবে অপারেশন করলে পা অচল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।
৪ঠা আগস্ট সকালে ফেনীর মহিপালে ছাত্র জনতার আন্দোলনে যুক্ত হন সাইফুল। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, দুপুর দেড়টায় আমাদের ওপরে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়। আহত অবস্থায় রোডে পড়ে থাকি। তখন আমাকে ছাত্র ভাইরা ধরে ফেনী হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ওইদিন রাতেই আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ওইখানে আমাকে স্যালাইন দিয়ে রাখে, অপারেশন করে না। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরে রাত ৮টার দিকে আমার অপারেশন করা হয়।
পুলিশের একটি বুলেট সাইফুলের পাকস্থলী দিয়ে ঢুকে বাম পাশের কিডনির পাশে গিয়ে আটকে যায়। ওইখানে ইনফেকশন ঝুঁকিতে থাকায় লিভারের একটা অংশ কেটে পাকস্থলীর ছিঁড়ে যাওয়া নালীগুলো সেলাই করে দেয় চিকিৎসক। তবে তার ওই বুলেটটি আর বের করা সম্ভব হয়নি। এমন অবস্থায় বুলেটটি অপারেশন করে বের করতে গেলে তার মৃত্যুর ঝুঁকি আছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। সাইফুল বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২৪ দিন পরে আমাকে নিউরোসায়েন্সে পাঠিয়ে দেয়। কিডনির পাশে বুলেট দেখে সেখান থেকে আমাকে রেফার্ড করে সিএমএইচ হাসপাতালে। ওইখানে ৮ থেকে ৯ দিন তাদের তত্ত্বাবধানে রেখে ডাক্তাররা বলেন- অপারেশন করা যাবে না। করতে গেলে হয় কিডনি ফেলে দিতে হবে নয়তো পাকস্থলী কাটা পড়বে। প্রাণের ঝুঁকি আছে বিধায় আর অপারেশন করেনি। কিছু ডাক্তার বলেছেন- কোনো সমস্যা হবে না। আবার অনেকে বলেছেন, পরে ইনফেকশন হতে পারে।
আমার পুরোপুরি সুস্থ হতে দেড় থেকে দুই বছর লাগবে: সাদ আব্দুল্লাহ
৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পরে বিজয় মিছিল নিয়ে মিরপুর মডেল থানার সামনে আসলে গুলিবিদ্ধ হন সাদ আব্দুল্লাহ। তার উরুর মধ্যে গুলি ঢুকে হাঁটুর ভেতর দিয়ে বের হয়ে যায়। প্রথমে প্রাইভেট একটি মেডিকেলে নেয়া হয় তাকে। এরপর ৭ই আগস্ট পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তিনি এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাদ আব্দুল্লাহকে রাখা হয়েছে ‘বি’ ওয়ার্ডের ৪২ নম্বর বেডে। তার বাসা তুরাগ থানার উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিনের ঘটনা উল্লেখ করে সাদ বলেন, বিজয় মিছিলের সময়ে আমি মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে মিরপুর-২ নম্বর পর্যন্ত এসে দেখি, অনেকে মিরপুর মডেল থানা ঘেরাও করেছে। আমরা তখন ওভারব্রিজের উপরে ছিলাম। তখন আমাদের দিকে লক্ষ্য করে গুলি করে। প্রথম গুলিটা আমার পায়ে লাগে, আমি পড়ে যাই। ভেবেছিলাম পুলিশ গুলি করছে, পরে গুলি পর্যবেক্ষণ করে ডাক্তার বলেছে- গুলিটা উপর থেকে করা হয়েছে। গুলিটি উরুতে ঢুকে পায়ের মধ্যদিয়ে বের হয়ে যায়। দেড় থেকে দুই বছর লাগবে আমার পুরোপুরি সুস্থ হতে। আবার ইনফেকশন হতে পারে।
