ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইস্যুতে কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবে সরকার। সেই সঙ্গে ইসকনসহ সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের বিষয়েও সরকারের অবস্থান খোলাসা করা হবে। ইসকন পুরোহিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানো হবে। এ নিয়ে আজ এক জরুরি কূটনৈতিক ব্রিফিং আহ্বান করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের তরফে ঢাকাস্থ সব কূটনৈতিক মিশনে চিঠি পাঠিয়ে ব্রিফিংয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ব্রিফিংটি ফ্লেক্সিবল রাখা হয়েছে, যাতে কেবল রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বা মিশন প্রধানই নন, যেকোনো ডিপ্লোমেট ব্রিফিংয়ে অংশ নিতে পারেন। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্র রাতে মানবজমিনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানিয়েছে, সব কূটনৈতিক মিশনই আমন্ত্রণ পেয়েছে। তবে ডিপ্লোমেটিক মিশন নয় এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংগঠনের প্রতিনিধিদের এবার দাওয়াতের বাইরে রাখা হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন কূটনীতিকদের ব্রিফ করবেন। তার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ হামিদুল্লাহ, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার অনুবিভাগের প্রধান তৌফিক হাসান, রাষ্ট্রাচার প্রধান খন্দকার মাসুদ-উল আলমসহ মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় অনুবিভাগগুলোর মহাপরিচালকরা থাকছেন বলে জানা গেছে।
ব্রিফিংয়ে সরকারের প্রতিনিধিরা যা বলবেন বলে ধারণা মিলেছে: সাম্প্রতিক সময়ে ইসকনসহ সংখ্যালঘু ইস্যুতে চাপে সরকার। এ নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে নানা রকম খবর ছাপা হচ্ছে। যার অনেকটাই অসত্য বলে দাবি পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের। সেগুনবাগিচা বলছে সরকারের দাবির পক্ষে দালিলিক প্রমাণ হাজির করা হবে কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে। ইসকন পুরোহিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানানো হবে। সেই সঙ্গে আদালতে নেয়ার সময় তার অনুসারীদের বর্বর আক্রমণে রাষ্ট্রীয় আইনজীবী সাইফুল ইসলামের হত্যা এবং দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হলেও কোনো পাল্টা আক্রমণের ঘটনা না ঘটার বিষয়টি ফ্ল্যাগ করা হবে। সেই সঙ্গে সব ধর্ম-বিশ্বাসের লোকজনের নিরাপত্তায় সরকার যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরা হবে। সেখানে মোটা দাগে যে সব বিষয় স্থান পাবে তা হলো- ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হামলা করা হচ্ছে মর্মে ভারতীয় গণমাধ্যম অরকেস্ট্রেইটেড ওয়েতে যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই। বরং যেসব ঘটনা ঘটেছে তা কো-ইনসিডেন্ট, ব্যক্তিস্বার্থ, পুরনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা প্রতিহিংসা থেকে। ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে রং লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করছে পতিত সরকারের প্রতি ভালোবাসা ছিল এমন মিডিয়া। যার মধ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণা উল্লেখযোগ্য। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ক’দিন ধরে খোলামেলাভাবেই এ নিয়ে কথা বলেছেন জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, উপদেষ্টা তার সর্বশেষ বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তার ভাষ্যটি এমন ‘ভারতীয় মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে খুশি নয়। তারা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি খুবই আনফেয়ার।’ ওই কর্মকর্তাসহ অন্যরা ধারণা দিয়েছেন এই ক’দিনে বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে সরকারের প্রতিনিধিরা যা বলেছেন তারই সারাংশ তুলে ধরা হবে ব্রিফিংয়ে। ৫ই আগস্টের আগের এবং পরের বাংলাদেশ যে এক নয় সেটি স্পষ্ট করবেন উপদেষ্টা। এই বাস্তবতা মেনে অর্থাৎ বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ ও মর্যাদা বজায় রেখেই যে দুনিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী তা তিনি ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরবেন। উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট করা হবে যে, ধর্মীয় পরিচয়-নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বদ্ধপরিকর। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার তার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু ৫ই আগস্টের পরাজিতরা তাদের দেশি- বিদেশি বন্ধুদের নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নানা যড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা সংখ্যালঘু নির্যাতন বা অন্য ইস্যু তৈরি করতে মরিয়া। তাদের টার্গেট দেশকে অস্থিতিশীল আর বিদেশে বাংলাদেশের আপৎকালীন সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। উপদেষ্টা এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে পেশাদার কূটনীতিকদের সহায়তা চাইবেন বলেও জানা গেছে। সেগুনবাগিচা এটা নিশ্চিত করেছে যে, ব্রিফিং শেষে উপদেষ্টা গণমাধ্যমের সঙ্গেও খোলাখুলি কথা বলবেন।
