রিসেট

জেনারেটরে খরচ বেশি, পুড়ছে বাড়তি ডিজেল

প্রকাশিত: ২২ জুলাই (শুক্রবার), ২০২২ Archive 2022Source: স্টাফ রিপোর্টার

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বন্ধ করা হয়েছে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সারা দেশে ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিদিন এলাকাভিত্তিক ১ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় থাকছে না বিদ্যুৎ। গত মঙ্গলবার থেকে এ শিডিউল শুরু হলেও রাজধানীসহ নগর ও শহর এলাকার বাসাবাড়ি, অফিস, হাসপাতাল ও মার্কেটগুলোতে জেনারেটর চলছে পুরোদমে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ডিজেলচালিত এসব জেনারেটর চালু করা হচ্ছে। বড় বড় শপিংমল ও হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় শক্তিশালী জেনারেটর   দিয়ে। এতে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি। সেই সঙ্গে বেড়েছে খরচের পরিমাণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের চেয়ে জেনারেটরে কয়েকগুণ বেশি খরচ হচ্ছে।  বুধবার রাত ৯টায় মালিবাগ ডাক্তার গলিতে লোডশেডিং শুরু হয়। মুহূর্তেই গলিতে ১৫ থেকে ২০টি বাসার জেনারেটর চালু হয়। পুরো ১ ঘণ্টা ধরে চলে জেলারেটরগুলো। ডাক্তার গলির মসজিদ সংলগ্ন একটি ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার রাশেদুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে হয়। ভবনে ৪৫ কিলোওয়াটের ২টি জেনারেটরে ১ ঘণ্টায় প্রায় ১৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এতে খচর প্রায় ১২০০ টাকা। 

তিনি বলেন, ১ ঘণ্টায় ১২০০ টাকা খরচ হয়। এই সময়ে পুরো ফ্ল্যাটে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হয়। ১ ঘণ্টা জেনারেটর চালু থাকলে বিদ্যুতের চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি খরচ হয়। মগবাজারের একটি শপিংমলে রয়েছে ৫০০ কিলোওয়াটের জেনারেটর। বিদ্যুৎ চলে গেলে সংয়ক্রিয়ভাবে চালু হয় সেটি। জেনারেটর চলাকালে বন্ধ থাকে লিফট। মার্কেটের টেকনিশিয়ান মিথুন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চলে। ৫০০ কিলোওয়াটের জেনারেটরে জ্বালানি হিসেবে প্রতি ১ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। প্রায় ৬ হাজার টাকার জ্বালানি লাগে। যা পুরো মার্কেটের ২-৩ দিনের বিদ্যুৎ বিলের সমান।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ছোট বড় শপিংমল ও মার্কেটগুলোতে রয়েছে শক্তিশালী জেনারেটর। এছাড়া বহুতল ভবন ও আবাসিক ভবনগুলোতে রয়েছে মধ্যমসারির জেনারেটর। বিদ্যুুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা সরবরাহ বন্ধ থাকলে এসব জেনারেটর চালু করা হয়। এ জন্য জ্বালানি হিসেবে প্রয়োজন হয় ডিজেল। মার্কেট ও শপিংমলের জেনারেটগুলো বড় হওয়ায় জ্বালানি লাগে বেশি। কোনো কোনো জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৩৫ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়।

 এতে একদিকে যেমন জ্বালানি তেলের পরিমাণ বেশি লাগছে, তেমনি খরচের পরিমাণও বাড়ছে। তবে ঢাকায় কি পরিমাণ জেনারেটর আছে তার হিসাব নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীসহ সারা দেশের বড় বড় শপিংমলগুলোতে বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর রাখা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকার প্রতিটি ভবনে এক বা একাধিক জেনারটের রয়েছে।  রাজধানীর খিলগাঁও টেলিফোন ভবনটি (বিটিসিএল) ৪তলা বিশিষ্ট। এতে ৫০-৫৫টি কক্ষ রয়েছে। বিটিসিএল সূত্র জানায়, প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বাবদ বিল আসে ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। জুন মাসেও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। সে হিসাবে দৈনিক ৭ হাজার ৩০০ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল আসে প্রতিষ্ঠানটির। আর ঘণ্টার হিসাবে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ টাকা। লোডশেডিং এর জন্য জেনারেটরও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। 

তবে তখন তাদের ঘণ্টাপ্রতি খরচ বেড়ে যায় প্রায় ৪ গুণ। প্রতিষ্ঠানটির চাহিদা অনুযায়ী এক ঘণ্টা জেনারেটর চালানো হলে প্রায় ১৫ লিটার ডিজেল খরচ হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৮০ টাকা। এতে এক ঘণ্টা জেনারেটর চালানোয় খরচ হয় ১২০০ টাকা।  বাসাবোয় ১০ তলাবিশিষ্ট ভবন মক্কা হাসেম টাওয়ার। এতে ফ্ল্যাট রয়েছে ১৮টি। পুরো ভবনে মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। দৈনিক হিসাবে তা দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। আর এক ঘণ্টার হিসাবে প্রায় ৭০-৮০ টাকা। লোডশেডিংয়ে পুরো ভবনের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নিজস্ব জেনারেটর রয়েছে তাদের। পুরো ভবনের জন্য এক ঘণ্টা জেনারেটর চালানো হলে মেশিনে ৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এতে বিদ্যুতের চেয়ে তিনগুণ বেশি অর্থাৎ ২৪০ টাকা ব্যয় হয়। ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা আবুল হাসেম বলেন, আগে মাসে ২-৩ বার কারেন্ট যেতো। জেনারেটর তেমন ব্যবহার হতো না। কিন্তু এখন প্রতিদিন কারেন্ট চলে যাচ্ছে। তাই প্রতিদিনই জেনারেটর চালানো হয়। বুধবার দুপুর ৩টা। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন শ্যামলী স্কয়ার। এই মার্কেটের ব্যাংকসহ প্রতিটি দোকানে বিদ্যুৎ সাপ্লাইয়ের জন্য রয়েছে ৪টি জেনারেটর।

 একটি জেনারেটর দিয়ে মার্কেটের প্রতিটি দোকানের বাতিগুলো জ্বলছে। শ্যামলী স্কয়ারের প্রধান টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ ইউনুস মানবজমিনকে বলেন, জেনারেটর চালাতে ১২ ভোল্টের ব্যাটারি লাগে। এটা অটো চার্জ হয়, যা জেনারেটর স্টার্ট করার জন্য দরকার হয়। একবার ফুল চার্জ দিলে ৫ থেকে ৭ বার জেনারেটর চলে। এর জন্য বেশি পরিমাণে বিদ্যুতের দরকার হয় না। এই জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ৮ লিটার ডিজেলের দরকার হয়। প্রতি লিটার ডিজেলের জন্য গুনতে হয় ৮০ টাকা। গতকাল দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ গিয়েছিল, ১২ লিটার ডিজেলের দরকার হয়েছে। এতে মোট ৯৬০ টাকা খরচ হয়েছে। পুরাতন জেনারেটর বলে তেলের পরিমাণ বেশি লাগে। ফার্মগেটে একটি পোশাকের দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. আল মামুন। তিনি বলেন, আমার একসঙ্গে দু’টি দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকানের জন্য আমাকে প্রায় ১৫শ’ টাকা করে বিদ্যুৎ বিল গুনতে হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে সর্বমোট ৩ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। এছাড়া জেনারেটরের জন্য মাসপ্রতি দোকান বাবদ ৯শ’ টাকা দেই।

 দু’টি দোকানের জন্য আমাকে মোট ১৮শ’ টাকা দিতে হয়। হিসাব করে দেখা যায়, প্রতিদিনে মামুনের বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় ১০০ টাকা, জেনারেটরের জন্য সার্ভিস চার্জ দিতে হয় ৬০ টাকা। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এখন ডিজেলের দাম বেশি। বাসা-বাড়ির জেনারেটরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রায় ৪০ টাকার উপরে খরচ হয়। অথচ এখানে সরকারি গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলে ১০-১১ টাকা খরচ হতো। অর্থাৎ জেনারেটর ব্যবহার করার ফলে প্রায় ৪ গুণ খরচ বেড়ে যায়। সরকার যতটুকু জিজেল সাশ্রয়ের কথা ভাবছে জেনারেটর চলার ফলে তার থেকে ২০ শতাংশ কম সাশ্রয় করতে পারবে। কেউ যদি পাম্প থেকে ডিজেল কিনে নেয় সে ক্ষেত্রে পাম্পে তো কমে যাবে। তাই লোডশেডিং হলে জেনারেটর ব্যবহার না করলে জিজেল সাশ্রয় করতে পারবে। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, লোডশেডিং কালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী জেনারেটরগুলো চলছে। বিত্তবানরা জেনারেটর ব্যবহার করে এসি, রেফ্রিজারেটর ও লাইট চালু রাখছে। এতে অনেক বেশি ডিজেল খরচ হচ্ছে। সরকার যে উদ্দেশ্যে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এভাবে জেনারেটর চালু থাকলে কোনো সুফল মিলবে না। যখন যে এলাকায় লোডশেডিং থাকবে, সেই সময়ে ওইসব এলাকার জেনারেটরগুলোও বন্ধ রাখতে হবে। সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিনিয়ত লোডশেডিং এলাকা তদারকি করতে হবে।