রিসেট

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় জামায়াত, সরকারকে দিবে যৌক্তিক সময়

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট (বুধবার), ২০২৪ Archive 2022Source: বিশেষ প্রতিনিধি

ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায় জামায়াত? তা খোলাসা করলেন দলটির সর্বোচ্চ নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সেই সঙ্গে ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রয়োজনীয় সংস্কারকর্ম সেরে নির্বাচনের পথে যেতে কতোটা সময় দিবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী? তা-ও স্পষ্ট করলেন দলটির আমীর। মঙ্গলবার ভারতীয় মিডিয়ার ঢাকাস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে ডা. শফিক বলেন, নতুন সরকারের বয়স মাত্র ১৯ দিন। এই সময়ে আমরা তাদের মেয়াদকে কোনো টাইমফ্রেমে বেঁধে দিতে পারি না। তবে অবশ্যই আমরা আশা করি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারকর্ম সম্পন্ন করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হবেন। এই সময়টি বেশ দীর্ঘ হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। 

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা পরস্পর প্রতিবেশী। চাইলেই প্রতিবেশী বদল করা যায় না। এটা আমরা তো বটেই কেউ তা অস্বীকার করতে পারবে না। অতীতে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সুসম্পর্ক ছিল দাবি করে দলটির আমীর বলেন, শেখ হাসিনার গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার শাসনামলে এটি শীতল ছিল। সম্পর্ক যে একেবারে ছিল না তা কিন্তু নয়। তবে আমাদের প্রত্যাশা এখন সম্পর্ক বাড়বে। এ ক্ষেত্রে আমরা উদার, আশা করি ভারতও ইতিবাচক থাকবে। ইন্ডিয়ান মিডিয়া করেসপন্ডেন্টস এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইমক্যাব)-এর নেতৃবৃন্দ, সংগঠনের সদস্য, ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদদাতারা ছাড়াও কলকাতা থেকে আগত পিটিআই'র একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিক বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হতে হবে সৎ প্রতিবেশীসুলভ। যেখানে কোনো দাদাগিরি থাকবে না। থাকবে পরস্পরের প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান। বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা প্রশ্নে তিনি বলেন, যেকোনো সম্পর্কে সমালোচনা থাকে কিন্তু অগ্রাধিকার পায় সহযোগিতা। এটাই কাম্য। জামায়াত উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারত বা কারও সমালোচনা করে না দাবি করে তিনি বলেন, ভারত কষ্ট পাক এমন কিছু আমরা করিনি, করতেও চাই না। ভারত তার স্বার্থের প্রশ্নে সরব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সরকারগুলোকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকতে হবে। এসবের ব্যত্যয় ঘটলে আমরা সমালোচনা করি। রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সমালোচনামুখর হওয়াটা আমাদের দায়িত্ব। কারণ আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। এটাকে ভারত বিরোধিতা বা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। জামায়াতের আমীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল, আর জামায়াত অন্য দেশের’ এমন কথা অনেকে বলেন। কিন্তু কাউকেই 'দালাল' বলে ট্যাগ দেয়ার রাজনীতি আমি অন্তত করি না। কাউকে দালাল বলার ফতোয়া দেয়ার আমি বা আমরা কে? 
জামায়াত-শিবির মানেই আতঙ্ক, ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’- উদ্দেশ্যমূলক এমন প্রচারণা দেশীয় ও বিদেশি মিডিয়ায় চালানো হয় অভিযোগ করে দলটির শীর্ষ নেতা বলেন, জামায়াত কখনো ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত ছিল না, এখনো নেই। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, যদি কোথাও প্রমাণিত হয় যে, আমাদের একজন কর্মী সন্ত্রাস করেছে, তা হলে আমরা জাতির কাছে ক্ষমা চাইবো এবং নিজেরা নিজেদের আইনের হাতে সোপর্দ করবো।

৫ই আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণে জামায়াতের সম্পৃক্ততা নাকচ করে দিয়ে আমীর বলেন, বরং জামায়াতের লোকজন মন্দির, হিন্দু বাড়ি-ঘর পাহারা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু- এই বিভাজন মানি না। সবাই বাংলাদেশি, নাগরিক হিসেবে সবার মর্যাদা সমান।
বর্তমান সরকারের কাছে এই মুহূর্তে জামায়াতের প্রত্যাশা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাই দেশে দ্রুত শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসুক। দেশের সংবিধান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার হওয়া দরকার। দল বা ধর্মের ভিত্তিতে আর কোনো বিভাজন নয়। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। দল হিসেবে জামায়াত সকলের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি বলেন, আমরা অসত্য বা বানোয়াট অভিযোগ দিয়ে কাউকে হয়রানি করা পছন্দ করি না। জামায়াত কখনো কোনো হয়রানিমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না, এখনো নেই। মতবিনিময় সভায় ইমক্যাবের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক মাছুম বিল্লাহ, প্রবীণ সাংবাদিক বাসুদেব ধর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি রাজীব খান, কোষাধ্যক্ষ আবু আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, নির্বাহী কমিটির সদস্য সিয়াম সরোয়ার জামিল, জাকির হোসেন, কাউসার আযম, তারিকুল ইসলাম, শাহীন পারভেজ, মো. মনির হোসেন প্রমুখ। অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ফরিদ হোসেন, সাংবাদিক মিজানুর রহমান ও রাশেদুল ইসলাম এবং পিটিআই কলকাতা ব্যুরো চিফ প্রদীপ্ত নারায়ণ। জামায়াতের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রাক্তন এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ। 

অন্যান্য প্রসঙ্গ
এক প্রশ্নের জবাবে আমীরে জামায়াত বলেন, বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। দেশে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন সিস্টেম বলতে কিছু নেই। পুলিশ বাহিনী জনগণের বন্ধু না হয়ে শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই মুহূর্তে জামায়াতের প্রধান কাজ হলো ছাত্র-জনতার বিপ্লবে নিহত, আহত ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। কিন্তু তারা তাদের অর্জন ধরে রাখতে পারেনি। জনগণ আওয়ামী লীগকে কীভাবে দেখে, তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে কীভাবে দেখে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান সম্পর্কিত প্রশ্নে জামায়াতের আমীর বলেন, সাড়ে পনেরো বছর দেশ শাসন করে  লক্ষণ সেনের মতো দেশ ত্যাগ করা উনার (শেখ হাসিনা) জন্য মানানসই হয়নি। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে জামায়াতের ওপর ক্র্যাকডাউন চলেছে। কিন্তু আমাদের কোনো নেতা কখনো দেশ ত্যাগ করেননি বরং দেশে থেকে পরিস্থিতি আইন এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের নেতৃবৃন্দ জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। বিদেশ থেকে বরং দেশে ফিরেছেন। কিন্তু কখনো দেশ ত্যাগ করার চিন্তা করেননি।