রিসেট

কুমারখালী, শুধু একটি নাম নয়

প্রকাশিত: ৭ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), ২০২২ Archive 2018Source: মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন
বাংলাদেশের ইতিহাসে কুমারখালীর স্থান উল্লেখ না থাকলে দেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। কুমারখালী গড়াই নদীর উপরে স্থাপিত। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে শহর অথবা রাজধানীর সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে ভিত্তি করে। পাবনা ও কুষ্টিয়ার মধ্যে ইস্টিমার চলাচল করতো প্রাচীনকালে। কুমারখালী মিলনস্থান ছিল পদ্মা ও গড়াই নদীর। পদ্মা ও গড়াই নদী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্র্রনাথকে। সেই গড়াই নদী প্রায় এখন অবলুপ্ত।

কুমারখালীর ইতিহাস অতি পুরাতন। ১৮৭১ সাল পর্যন্ত কুমারখালী পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলো এবং ১৮৭২ সালে কুমারখালী নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৯১ সালে কুমারখালী কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ৬.৯১ বর্গমাইল বিস্তৃত কুমারখালী মিউনিসিপ্যালিটি। বৃহত্তম কুষ্টিয়া জেলার দ্বিতীয় পুরাতন মিউনিসিপ্যালিটি কুমারখালী। মেহেরপুর মিউনিসিপ্যালিটি অতি পুরাতন।
কুমারখালীকে ঐতিহ্যবাহী শহর বললে মোটেও অরঞ্জিত হবে না। বহু মনিষীর জন্ম কুমারখালী এলাকায়। আবার বহু মনিষীর আগমন হয়েছে এখানে। এখন এসব ইতিহাস। শুধু কুমারখালী পৌরসভা কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৬৯ সালে কুমারখালী মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠা হয়।


হিমালয় ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা রায় বাহাদুর জলধর সেন উনি ৩৯টি বইয়ের লেখক এবং বঙ্গবাসী পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ও বসুমতি সাপ্তাহিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন এবং ১৯১৪ সাল থেকে ২৬ বছর ভারতবর্ষ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রয়, বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম সম্পাদক প্রফুল্ল কুমার, গ্রামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন তার জন্ম ১৮৩৩ সালে কুমারখালীতে। তিনি গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন। প্রথমে কলকাতা থেকে প্রকাশ হতো, পরবর্তীকালে কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হয়। গরীবদের দুঃখ-দুর্দশা এবং বৃটিশদের অত্যাচার তুলে ধরার এবং জমিদারের অত্যাচারের কাহিনী এই পত্রিকা প্রকাশ করতো। পরবর্তী সময় কুমারখালী থেকে প্রকাশ হয়। হরিনাথ মজুমদার তাঁর দিনলিপিতে জমিদারের বিরুদ্ধে কিছু অপ্রিয় বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতেন। কবি রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন। হরিনাথ মজুমদার পাঁচটি বই প্রকাশ করেন। ফকির চাঁদ নামে ইমমর্টাল গান প্রকাশ করেন।

মথুরানাথ মজুমদার প্রিন্টিং প্রেস উপহার দেন কাঙাল হরিনাথকে। মথুরানাথ মিত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান ছিলেন। ১৮৫৬ সালে কুমারখালীর J.N হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। চারণ কবি লালন শাহ, গগন হরকরা (ডাক পিয়ন) এবং কাজী মোতাহার হোসেন, প্রখ্যাত স্ট্যাটিসটিয়ান ও দাবাড়ু ও সৈয়দ আলতাফ হোসেন (প্রথিতযশা সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ) প্রমুখ মণীষী আমাদের নমস্য। মীর মশাররফ ১৮৪৭ সালে কুমারখালীর লাহিড়ীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যে জমিদার দর্পণ ও বসন্ত কুমারী উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
অন্যদিকে, বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে মুরাদ কাজী সিপাহি বিপ্লবের অন্যতম নেতা ছিলেন ভারতবর্ষ থেকে, মিয়াজান কাজী ও বাঘা যতীনের নাম মনে পড়ে। মুরাদ কাজী ও মিয়াজান কাজী উভয় বৃটিশ সরকারের ফাঁসির কাষ্ঠে মারা যান। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন মীরাট শহরে শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। বাঙালি, মুসলিম, হিন্দু ও শিখ সিপাইরা এই বিদ্রোহীর সাথে জড়িত ছিলো। মিয়াজান কাজী ওহাবি আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। বাংলায় ওহাবি আন্দোলনের হোতা ছিলেন রায়বেরিলির সায়ীদ আহমদ ও নিসার হুসাইন। উভয়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন বেঙ্গল থেকে।
মুরাদ কাজীর বড় মেয়ের সঙ্গে আমার দাদার বিয়ে হয় অর্থাৎ আমার দাদি।
আমার প্রপিতামহ মুন্সী মেহেরুল্লাহ অত্যন্ত প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি ছিলেন। আমাদের আমবাগানে চামড়ার আড়তের মালিক ছিলেন।  কথিত আছে যে মুন্সী মেহেরুল্লা পায়ে হেঁটে বোম্বাই যান এবং সেখান থেকে জাহাজে মদিনা পৌঁছান এবং হজব্রত পালন করেছিলেন। আমার এক চাচা ইউসুফ অর্থাৎ মুন্সী মেহেরুল্লাহর অন্য ছেলের ছেলে আমাকে বলেছিলেন মুন্সী মেহেরুল্লাহ মোহর বিলি করতেন গরীবদের জন্য। মক্কায় মক্তব স্থাপন করেছিলেন। আমার চাচা ওয়াহিদ হোসেনের জীবনী থেকে জানতে পারলাম যে, আমার চাচার দাদা মুন্সী মেহেরুল্লাহ পায়ে হেঁটে হজব্রত পালন করেন। একদিন তিনজন পুলিশ অফিসার আমাদের বাড়িতে এসে আমার চাচাকে প্রশ্ন করেছিলো- কাজীদের কোনো উত্তরাধিকার আছে কিনা? চাচার উত্তর ছিলো- আপনারা ভুল করছেন এটা কাজীদের বাড়ি না। চাচার আব্বা অর্থাৎ আমার দাদা পুলিশদের প্রশ্ন করলেন- আপনারা কোন কাজীর বংশধর খুচ্ছেন? উত্তর, কাজী মুরাদের বংশধর। আমার দাদার উত্তর ছিলো- আমি তাঁর বড় জামাই এবং আমার তিন ছেলে।
আমাদের আম বাগানে ইসলামিক জলসা হতো। এখানে টিকিট ঘরের আমগাছ ছিলো। অর্থাৎ এই আম গাছের সংলগ্ন টিকিট ঘর ছিলো। এই জলসার টিকিট এখানে বিক্রি হতো। এই জলসা আয়োজন করতেন আঞ্জুমান ইত্তেফাক ইসলাম-এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আব্দুল কুদ্দুস রুমি। বৃটিশ প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য স্যার আজিজুল হক ও মাওলানা আকরাম খাঁ এই ইসলামিক জলসায় যোগদান করতেন।

পণ্ডিত শিব চন্দ্র বিদ্যার্ণব ১৮৬০ সালে কুমারখালীতে জন্ম গ্রহণ করেন। উনি তান্ত্রিক বিষয় জ্ঞান আহরণ করেন এবং তাঁর তন্ত্র শাস্ত্র বিদেশে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করে। জাস্টিস জন উডরফ বিচারপতি কলকাতা হাইকোর্ট, কবি মুকুন্দ দাস, জার্মান কবি মুলার এবং কলকাতা আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল ইভি হাভেল প্রমুখ কুমারখালী এসেছিলেন শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের সাথে দেখা করতে। শিব চন্দ্র ১৯১১ সালে এবং ১৯১৩ সালে লন্ডনে যান এবং সেখানে তন্ত্র শাস্ত্র সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। ১৯১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
লালন শাহ ফকির কুমারখালী ছেউড়িয়া বাউল সঙ্গীতের রাজা হিসেবে আভির্ভূত হন। ১৮৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৮৯ সালে লালন শাহর স্কেচ এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই স্কেচ এখনো আছে। ছেউড়িয়ায় লালন যাদুঘর করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লালনের চিন্তাধারা ও গানের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ করে বাংলা ক্যালেন্ডার ছেপেছিলেন ১৩৩২ সালে।
গগন চন্দ্র নামে কুমারখালীর একজন ডাকপিয়ন ছিলেন। তিনি গ্রাম্য কবি। কুমারখালী ও শিলাইদহের মধ্যে চিঠি বিলি করতেন গান গাইতে গাইতে। তাঁর গানগুলো সংগ্রহ করে হারমনিতে লিপিবদ্ধ করে প্রবাসীতে ছেপেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ।
ডক্টর প্রতাব চন্দ্র কুমারখালীর চাপড়গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর অনেক প্রবন্ধ ও বক্তৃতা ইউরোপে সমাদৃত হয়েছে। প্রতাব চন্দ্র সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায়নি।
ডক্টর মোতাহার হোসেন ১৮১৭ সালে কুমারখালীর লক্ষীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু মোতাহার হোসেন পরিসংখ্যান সম্বন্ধে সঞ্চরণ প্রকাশ করে প্রথিতযশা অধ্যাপকদের অবাক করেছিলেন। মোতাহার হোসেন স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেথড খ্যাত হোসাইন চেইন রুল প্রকাশ করে বিখ্যাত হলেন এবং পাকিস্তান সরকার সিতারে ইমতিয়াজ খেতাবে ভূষিত করেন এবং ১৯৭৯ সালে ডক্টর মোতাহার হোসেনকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার এবং ১৯৫০ সালে D .S .C award প্রদান করা হয়  ফর রিসার্চ অফ ডিসাইন অফ এক্সপ্রিমেন্টস ইনের জন্য। এছাড়া স্ট্যাটিস্টিয়ান স্যার রোনাল্ড ফিশার অত্যন্ত প্রশংসা করেছিলেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের থিসিস-এর জন্য।
ডক্টর মোতাহার হোসেন ১৯২১ সাল থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত ইউনাইটেড বেঙ্গল ও ইস্ট পাকিস্তানে chessplayer চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ডক্টর মোতাহার হোসেন বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ডক্টর মোতাহার হোসেনকে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করা হয়। নজরুল কাব্য পরিচিতি উৎসর্গ করেছেন অধ্যাপক প্রশান্ত চন্দ্রকে। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত প্রশংসা করেছেন তার essays conspicious language এবং ভাষার বলিষ্ঠতার জন্য।
১৯৮১ সালের অক্টোবরে ডক্টর মোতাহার হোসেন মৃত্যুবরণ করেন।
ইন্ডিয়ায় আলী ব্রাদার্স নামে খ্যাত কুমারখালীর আহমেদ ব্রাদার্স অর্থাৎ মৌলভী আফসার উদ্দিন ও মৌলভী শামসুদ্দিন আহমদ রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ও ল পাশ করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতির পাশাপাশি কংগ্রেস রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। মৌলভী শামসুদ্দিন খেলাফত ও গান্দীজীর অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। মৌলভী শামসুদ্দিন আহমেদ বঙ্গীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর। বাংলার খেলাফত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেসের টিকিটে ১৯২৭ সালে বঙ্গীয় সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন। বিবাহের পূর্বে ফরিদপুরে হাজি শরীতুল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাসের আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য বঙ্গীয় পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৩৮ সালে এ.কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন। মৌলভী শামসুদ্দিন মতবিরোধের ফলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন। অত্যন্ত নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। মৌলভী শামসুদ্দিন কুমারখালী কয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৮৯ সালে। নির্যাতিত কৃষকদের কল্যাণ ও জমিদারি প্রথা বিলোপ করার জন্য মৌলভী শামসুদ্দিন আহমদের অবদান অনস্বীকার্য।
খোন্দকার মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম কুমারখালীর বালিয়াকান্দি গ্রামে ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল ইন্সপেক্টর হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর কন্যা জোবেদা খানম এমএ পাস করেন এবং ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশনের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ছিলেন। বেশ কয়েকটি উপন্যাস উপহার দিয়েছেন। জোবেদা খানম শিশু একাডেমির প্রথম ডিরেক্টর। আরো একজন উপন্যাসিক আকবর হোসেনের জন্ম হয়েছিলো কুমারখালীর কয়া গ্রামে ১৯১৭ সালে। আকবর হোসেন কিপায়নি, অবাঞ্ছিতা ও দুদিনের খেলা ঘর উপন্যাসের লেখক। আকবর হোসেন নবযুগ, সন্ধানী ও আজাদ পত্রিকায় লিখতেন। তিনি ১৯৮১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কুমারখালী দুর্গাপুর আমার বড় চাচা মমতাজ হোসেন প্রথম গ্রাজুয়েট পাবনা জেলায় এবং তিনি বৃটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। মমতাজ হোসেন যক্ষা রোগে মাদ্রাজে মৃত্যুবরণ করেন।
কুমারখালী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সময়। এই সময় বৃটিশ নীলকরদের চারণভূমি ছিলো কুমারখালী। কুমারখালী রেলস্টেশনের পাশে ১২ জন নীলকরদের কবর ছিলো। কবর ধ্বংস করে এখন ওখানে ফুল চাষ করা হয়। একটা পুরাতন ইতিহাসকে ধ্বংস করা হয়েছে।

কুমারখালীর বাটিকামারা দ্বিজাতি সন্ন্যাসী আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ ছিলেন। বাটিকামারা আশ্রমে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই আশ্রমে সোনাবন্ধু ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। কথিত আছে যে, সোনাবন্ধু ফকির মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। পরবর্তীকালে সোনাবন্ধু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সোনাবন্ধু হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছিলেন। সোনাবন্ধুর মাজার বাজারের মধ্যে বাঁধানো রয়েছে। কুমারখালী হিন্দু অধ্যুষিত শহর হিসেবে গড়ে উঠেছিলো । বহুযুগ আগে কুমারখালী হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকদের বসবাস ছিলো। শহরের পাশে ভগ্ন প্যাগোডা তার লক্ষণ।
হজরত শাহ মূলক খোরশেদ ফকিরের নামানুসারে খোরশেদপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা হয়। খোরশেদপুর কুমারখালী থানার অন্তর্গত। হজরত শাহ মূলক ফকিরের অনেক অলৌকিক কাহিনীর জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি আধ্যাতিক জগতের মানুষ ছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খোরশেদ ফকিরের মাজার বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।
বাঘা যতীন নামে পরিচিত ছিলেন। আসল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। উনি কুমারখালী কয়া গ্রামে ১৮৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আলীপুর কন্সপিরাসি কেস অকৃতকার্য হলে বাঘা যতীনের সাহায্যে যুগান্তর দল বৃটিশ বিরোধীদল হিসাবে আবির্ভূত হয়। বালাশ’র যুদ্ধ বাঘা যতীনের দল ও বৃটিশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ ঐতিহাসিক ঘটনা। বাঘা যতীন বুলেটের আঘাত পান। কিন্তু বৃটিশের সাহায্য গ্রহণ করেননি। বারাবতী গার্লস স্কুলে প্রাথমিক চিকিৎসা পান এবং পরে ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে চিকৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ১৯১৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর। ২০২১ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বারাবতী গার্লস স্কুলে বাঘা যতীনের ওপর শ্রদ্ধা জানানো হয়। বাঘা যতীনের নাতি ধীরেন্দ্রনাথ এখন ফ্রান্স এর প্যারিসে বসবাস করছেন।
খোরশেদপুরের শশী ভূষণ অধিকারী খুব উঁচুমানের বেহালা বাদক ছিলেন। তদানীন্তনকালে একটি যাত্রা পার্টি গঠনের পুরোধা ছিলেন। কুমারখালীর মোহিনী মোহন চক্রবর্তী কুষ্টিয়াতে প্রথম কাপড়ের মিল স্থাপন করেন ১৯০৬ সালে ৩৩ একর জমির উপর। বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে মিল বন্ধ হয়।
১৮৮৪ সালে কুমারখালীর মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচন শুরু হয়। ১০ জন কমিশনার নির্বাচিত হতেন ১৫ জন কমিশনারদের মধ্যে। এই নির্বাচন পদ্ধতি বৃটিশ ইন্ডিয়া ভাগ করা পর্যন্ত প্রচলিত ছিলো। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও কমিশনার নির্বাচন হতেন। পাকিস্তান আমলে চিকিৎসক রেবতী মোহন সাহা প্রথম চেয়ারম্যান এবং ১৯৫২ সালে চিকিৎসক মুজাফ্ফর আহমদ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আকবর হোসেন (লেখকের পিতা), ভাইস চেয়ারম্যান পোস্ট দুই বছর পর অবলুপ্ত করা হয়। মোহাম্মদ আকবর হোসেন রেঙ্গুন বৃটিশ একাউন্টেন্ট জেনারেল অফিস থেকে ১৯৫০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বার্মা জাপান দখল করলে আকবর হোসেন এলাহাবাদে বদলি হয়েছিলেন গ্রীষ্মকালে এবং এক বছর সিমলায় কাটান শীতকালে। এলাহাবাদ ও সিমলার আবহাওয়া সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। এলাহাবাদে প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া এবং সিমলায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এবং পাকিস্তানে কুষ্টিয়া ডিস্ট্রিক্ট একোয়ার্ড এস্টেট হেড ক্লার্ক নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে।
অবসরকালে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে কুমারখালী জেএন স্কুলকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করেন। এবং কুমারখালী গার্লস হাইস্কুলের উন্নতির জন্য কাজ করেন। দুই স্কুলের অবৈতনিক সেক্রেটারি ছিলেন মরহুম আকবর হোসেন। এই স্কুলে গরিব ও মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আমি আকবর হোসেন ছাত্র বৃত্তি খুলেছি। সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যাংকে জমা আছে।
আমার ছোট চাচা তেজগাঁও সেন্ট্রাল স্টেশনারী প্রিন্টিং প্রেসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কন্ট্রোলার ছিলেন। তিনি ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। যাদুকর সামাদের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন।
সৈয়দ আলতাফ হোসেন সম্বন্ধে না লিখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আলতাফ হোসেন কুমারখালীর বিশুনুদিয়া গ্রামে ১৯২৩ সালের ১৬ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ও ল পাস করেন। ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান জন ওয়েল মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। কলকাতায় জন হল ওয়েএরপর মূর্তি ভেঙে ফেলার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই আন্দোলনের হোতা ছিলেন সুভাষ চন্দ্র বোস। এই মিথ্যা প্রচারকে বৃটিশ লোকেরা ব্ল্যাক হোল বলে প্রচার করেছিলো। আধুনিক ইতিহাসবিদরা একে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন।


আলতাফ হোসেন ডিগ্রি পাস করার পর কলকাতা মর্নিং নিউজে যোগদান করেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকা মর্নিং নিউজে কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যে পাকিস্তান অবজারভার নিউজ ডিপার্টমেন্ট ১৯৪৯ সালে কাজ করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগে ১৯৪৯ সালে যোগদান করেন। মাওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করলে আলতাফ হোসেন ন্যাপে যোগদান করেন। আলতাফ হোসেন ১৯৫৬ সালে নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। সৈয়দ আলতাফ হোসেন ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগদান করেছিলেন এবং রেলওয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। দুঃখজনক হলো তিনি খোন্দকার মোশতাক কেবিনেট, জেনারেল এরশাদের কেবিনেটে যোগদান করেছিলেন। সৈয়দ আলতাফ হোসেন ১৯৯২ সালের ১২ই নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এক কন্যা রেখে যান তিনি।


(মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন
বাংলাদেশের প্রাক্তন কূটনীতিক এবং আমেরিকার নোভা ইন্টারন্যাশনাল টোস্ট মাস্টার ক্লাবের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, লিখেছেন ফলস চার্চ, ভার্জিনিয়া থেকে)