সামিয়া আফরান প্রীতি। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। ছিলেন মেধাবী, চঞ্চল ও পরিশ্রমী। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার। টানাপড়েনের সংসারে পড়াশোনায় বেগ পেতে হয়েছে বার বার। বাবাকে সাহায্য করতে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। কলেজে ভর্তির পর রেস্টুরেন্ট, সুপারশপসহ বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করে নিজের খরচ জোগানোর পাশাপাশি বাবাকেও সহযোগিতা করতেন। পহেলা এপ্রিলে নতুন একটি চাকরিতে যুক্ত হওয়ার কথাও ছিল তার। দুই ভাই-বোনের মধ্যে প্রীতি ছিলেন বড়। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে একমাত্র অবলম্বন ছিলেন প্রীতি। ছোট ভাইকে নিয়েও দেখতেন স্বপ্ন। কিন্তু সংগ্রামী প্রীতির স্বপ্নগুলো দুর্বৃত্তের গুলিতে মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছে।
এদিকে প্রীতিকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবার। পশ্চিম শান্তিবাগের ২১৮ নম্বর ভাড়া বাসায় মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন রাজধানীর বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফরান প্রীতি (২২)। গত বৃহস্পতিবার রাতে শাহজাহানপুরের আমতলী এলাকার সড়কে দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হন টিপু। ওই সময় গাড়ির কাছেই রিকশায় থাকা প্রীতিও গুলিতে নিহত হন।
প্রীতির বাবা মো. জামাল উদ্দিন মিরপুরে একটি কারখানায় প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, সন্তান ছাড়া বাবা-মা কীভাবে থাকে। বুকে একটি বড় পাথর বেঁধে আছি। মনে হচ্ছে পাথরটি অনেক ভারী। মেয়ের লাশের বোঝা বহন করা আরও যন্ত্রণার। দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রীতি বড় ছিল। ১৭ বছরের একমাত্র ছেলে সোহায়েদ জামাল সামি এই বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। প্রীতিকে দাফন করা হয়েছে শাহজাহানপুর কবরস্থানে। ২২ বছরের মেয়েটি আমার অন্ধকারে একা একা শুয়ে আছে। পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় সে এখন থেকে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলো। আমার একার ইনকাম দিয়ে পরিবার চালানো কষ্টকর। পড়াশোনার পাশাপাশি মেয়েটি একটি চাকরি করে মাঝে মাঝে সহযোগিতা করতো। নতুন চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় সিভিও জমা দিচ্ছিলো। কম্পিউটার কোর্সও করতে ছিল। এখন আমার হাল ধরার কেউ নেই।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পরের দিন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, কাউন্সিলরসহ এমপি রাশেদ খান মেনন এসেছিলেন। গত রোববার সকালে প্রীতির কলেজ থেকে স্যার-ম্যাডামরা এসেছিলেন। তারা এসে শুধু সান্ত্বনা দিয়েছেন। সবাইকে আমার পরিবারের দিকে সুদৃষ্টি দেয়ার জন্য বলেছি। এখন আর কাউকে দেখছি না খোঁজ নিতে।
তিনি বলেন, এই রকম দুর্ঘটনা কোনো বাবা-মা চায় না। আমিও চাই না। এটা আসা করি সরকার তদন্ত করে সঠিক বিচার করবেন। বিচার দিয়ে রেখেছি আল্লাহর কাছে। শুধু লিখিতভাবে দিচ্ছি না। মামলা করা নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মামলা না করার একটি কারণ হলো আর্থিক দিক থেকে অসচ্ছল। তাছাড়া মামলার কাজে সময় দিতে পারবো না। এসব ঝামেলার জন্য সংসার চালানো আরও ক্ষতি হবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রীতির বাবা বলেন, কয়েকদিন আগেও প্রীতি বলেছে বাবা আমি ডাক্তারি পড়বো। আমিও চেয়েছিলাম মেয়েকে ডাক্তার বানিয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু আর্থিক দিকের কথা চিন্তা করে ঠিকমতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। এখন ছেলেটিকে নিয়ে চিন্তায় আছি। প্রীতি থাকলে ছেলেটির পড়াশোনায় আর্থিকভাবে অনেক সাপোর্ট পেতাম। বাসা ভাড়া ও লেখাপড়ার খরচ বেশি চলে যায়। আমি একা সামলাতে পারছিলাম না এজন্য প্রীতির দেখে কষ্ট লাগতো। সে আমার বড় অবলম্বন ছিল। আমি সরকারের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে দাবি করি তিনি যেন এই বিষয়ে একটি সুষ্ঠু বিচার করেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এইভাবে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোলের সন্তানকে না হারাতে হয়। মেয়ে তো আর ফিরে পাবো না যেন ছেলেটিকে মানুষ করতে পারি। মেয়ের শোক তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবে। এই বুকের ব্যথা তো আর কমবে না কোনো দিন।
প্রীতির খালা নিশাত আরা বলেন, খুব আদরের ছিল প্রীতি। আমাদের চার ভাই-বোনের সবার বড় সন্তান সে। বাবার একার বেতনে সংসার চালানো কষ্ট হতো এটা দেখে ও নিজে চাকরি করতো। আমাদের বুক খালি করে নিঃস্ব করে রেখে গেছে। এমন নিরীহ মানুষদের যেন এভাবে মরতে না হয়। তিনি আরও বলেন, প্রীতির মা মালিবাগের একটি কারখানায় চাকরি নিয়েছিলো চার-পাঁচমাস আগে। কিন্তু মেয়ের পছন্দ ছিল না তার মা চাকরি করুক। বলতো যা বেতন পাও সে টাকা আমি চাকরি করে তোমাকে দিবো। ওর কথা শুনে ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে দুই মাস প্রীতি নামাজ পড়তো, রান্না শিখতো দেখে খুব ভালো লাগতো। খুব চঞ্চল, অস্থির প্রকৃতির ছিল কিন্তু কোনো জিদ ছিল না। বাবা-মাকে কখনো কোনো কিছুর জন্য জোর করতো না। পরিবারের সমস্যাগুলো খুব বুঝতো। বাবার কষ্ট দেখে সচ্ছল হওয়ার চেষ্টা করতো। রেস্টুরেন্ট, সুপারশপসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে। এক দেড় মাস কাজ করেছে। ২০১৬ তে এসএসসি পরীক্ষার দিয়েছে। ২০২১-এ এইচএসসি। অভাবের কারণে ঠিকমতো পড়তেও পারতো না। গত একমাস ধরে খিলগাঁওয়ে কম্পিউটার ক্লাস করছে। এই সুবাদে খিলগাঁও যাওয়া-আসা ছিল তার। চাকরি করলেও খুব বেশি বেতন পেতো না। তিন-চার হাজার টাকা দিতো পরিবারে। সবসময় কিছু না কিছু করতো। হেল্প হতো পরিবারের। ১লা এপ্রিলে একটি প্রতিষ্ঠিত গ্রুপে চাকরিতে যোগ দেয়ার কথা ছিল। পাশের রুমে থাকা সালমা আক্তারের সঙ্গে প্রীতির ছিল বান্ধবীর মতো সু-সম্পর্ক। তিনি বলেন, ঘরে অভাব থাকলেও খুব হাসিখুশি থাকতো প্রীতি। বাইরে থেকে আসলে কখনো খালি হাতে আসতো না। তার ছোট ভাইয়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। ও অপেক্ষায় থাকতো কখন তার বোন বাসায় আসবে।
