কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতুর জন্য মৌলভীবাজারের রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জের লাখো মানুষ দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন। সেতু না থাকায় মৌলভীবাজারের রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জের লাখো মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। জনস্বার্থে কুশিয়ারা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। সেতু হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি ফেরি চালু হলে কিছুটা হলেও জনদুর্ভোগ লাঘব হবে। সিলেট বিভাগের দু’টি উপজেলা- রাজনগর ও বালাগঞ্জ। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে এই দু’টি উপজেলার মানুষের। দুই উপজেলার লাখো মানুষের আত্মীয়তা সিলেটে যাতায়াত সহ যোগাযোগের জন্য দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানানোর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের দেয়া প্রতিশ্রুতিতে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতুর। দুই উপজেলাসহ এই সড়কে চলাচলকারী লাখো মানুষের মাঝে এই প্রশ্ন। কবে পূূরণ হবে এই স্বপ্ন? রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু দু’টি উপজেলার লাখো মানুষের প্রাণের দাবি। একটি সেতুর অভাবে যুগের পর যুগ ধরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরম অবহেলিত কুশিয়ারা তীরবর্তী রাজনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের প্রায় দশ লাখ মানুষ। অবহেলিত এ এলাকায় কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূচিত হবে এক সম্ভাবনাময় যুগের। এই এলাকার মানুষের দাবি বিবেচনা করে ২০১৪ সালে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মহসিন আলী সেতুর ব্যবস্থা হওয়ার আগ পর্যন্ত ফেরি চলাচলের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত ফেরি চালু বা সেতু বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি। তৎকালীন বৃটিশ আমলে জকিগঞ্জ থেকে ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুশিয়ারা নদী দিয়ে বড় বড় নৌযান চলাচল করতো। বাংলাদেশের নৌবন্দর ও নৌঘাটগুলোর অন্যতম ছিল কুশিয়ারা তীরবর্তী সিলেটের জকিগঞ্জ বাজার, কালীঘাট, শেওলা, বালাগঞ্জ বাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওর তীরবর্তী রাজনগর-বালাগঞ্জের মধ্যবর্তী বিলবাড়ি। এসব স্থানে পণ্যবাহী নৌযানে করে ব্যবসায়ীরা মালামাল পরিবহন করতেন। বৃহত্তর সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল এসব নৌবন্দরের খ্যাতি রয়েছে দেশে-বিদেশে। দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের পদচারণায় দিন-রাত মুখরিত থাকতো এ অঞ্চল। সে সময় রাস্তাঘাট ততটা উন্নত ছিল না- তাই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথে লঞ্চ, স্টিমার ও বড় বড় নৌকা। তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা কুশিয়ারা নদী তীরের এসব বন্দর থেকে বিভিন্ন দ্রব্য সংগ্রহ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। সে সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পণ্য সংগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রই ছিল কুশিয়ারা-কাউয়াদীঘি হাওর তীরবর্তী রাজনগর-বালাগঞ্জ মধ্যবর্তী বিলবাড়ি অঞ্চল। কালের বিবর্তনে এবং দেশের স্থলপথের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর চরম অবহেলিত এ অঞ্চলের হাজার হাজার পেশাজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নৌকাযোগে কুশিয়ারা পার হয়ে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন। রাজনগরের কুশিয়ারা তীরবর্তী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দূরবর্তী হওয়ায় স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কুশিয়ারা নদী পার হয়ে বালাগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করছে। বিভিন্ন সময় নৌকাডুবির মতো মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটছে। তাই, অবহেলিত এ অঞ্চলের লোকজনের দাবি কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতুর। সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু রাজনগর-বালাগঞ্জ নয়, পার্শ্ববর্তী ফেঞ্চুগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার মানুষও উপকৃত হবেন। সেই সঙ্গে সিলেট-সুলতানপুর-বালাগঞ্জ সড়ক দিয়ে রাজনগর-মৌলভীবাজার হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হবে। সময়ও বাঁচবে। একটি মাত্র সেতু নির্মাণের ফলে সিলেট-মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনায় মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদের প্রচেষ্টায় এই সেতুটি বাস্তবায়নের পৃষ্ঠা ৮ কলাম ৪
আশা করছেন দুই উপজেলার মানুষ। রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দা দক্ষিণ সুরমার সিলাম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. মুক্তাদির একাডেমির অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ বুলবুল জানিয়েছেন- কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ পারে তোলাপুর খেয়াঘাট থেকে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে বালাগঞ্জ বাজারে আসতে হয়। কুশিয়ারা নদীতে সেতু না থাকায় যুগ যুগ ধরে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। নদী পার হয়ে বালাগঞ্জ থেকে তাজপুর হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট যেতে হয়। তবে বালাগঞ্জ ডাকবাংলোর কাছে বড়ভাগা নদীর উপর সেতু হলে সিলেট-সুলতানপুর সড়ক দিয়ে কম সময়ে সিলেট যাতায়াত সম্ভব। তিনি বর্তমান সরকারের আমলে সারা দেশে সেতু এবং সড়ক নির্মাণ হলেও এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি কুশিয়ারা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিক হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উভয় তীরের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে বিগত ২০১৩ সালের প্রথমদিকে কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী বিলবাড়ি অঞ্চলে একটি ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরিদর্শনে এসেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের প্রকৌশলী অধ্যাপক সুজিত কুমার বালা ও অধ্যাপক তারেকুল ইসলাম। তারা ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কুশিয়ারা তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে তাদের পরিদর্শন রিপোর্টটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেন। পরিদর্শনের সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী, মৌলভীবাজার-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর প্রতিনিধি সৈয়দ মোস্তাক আলী, বালাগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুর, রাজনগর উপজেলার তৎকালীন প্রকৌশলী রুবাইয়াত জামান, বালাগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ উভয় এলাকার নেতৃবৃন্দ। তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী মন্ত্রী হওয়ার পর বিগত ২০১৪ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি রাজনগরে তাকে দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এলাকার মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন তিন মাসের মধ্যে রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীর উপর ফেরির ব্যবস্থা করা হবে এবং তিন বছরের মধ্যে সেতুর ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু ঘোষণার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীতে ফেরি অথবা সেতুর ব্যবস্থা করা হয়নি। এ ছাড়াও বিগত ২০১৫ সালের ২৫শে মে রাজনগরে এক অনুষ্ঠানে কুশিয়ারা সেতুর নির্মাণকাজ শিগগিরই শুরু হবে বলে তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী পুনরায় ঘোষণা দিলেও তার অকাল মৃত্যুতে সেতুটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে এলাকাবাসী মনে করছেন। সৈয়দ মহসিন আলী বেঁচে থাকলে হয়তো রাজনগর-বালাগঞ্জবাসীর এই স্বপ্ন এতদিনে তিনি পূরণ করতেন। এই সময় সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারে রাজনগর উপজেলার সাবেক প্রকৌশলী রুবাইয়াত জামান জানিয়েছিলেন, রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা সেতুর জরিপ কাজ শেষে ৪২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং এই সময়ে তা একনেকের সভার এজেন্ডাভুক্ত ছিল। একনেকে প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদনসাপেক্ষে যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে রাজনগর এলজিইডি বিভাগের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুর জানান, রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীর উপর সেতু নির্মাণের জন্য আমি নিজেও কাজ করেছি। কুশিয়ারা নদীর উপর শুধুমাত্র একটি সেতুর জন্য অবহেলিত এ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে। তিনি বলেন, অবহেলিত এ জনপদের মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে যত সম্ভব কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন। রাজনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাজাহান খান বলেন- গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকায় দু’টি উপজেলা পাশাপাশি। কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু বদলে দিতে পারে উভয় এলাকার কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতিকে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই সেতুটি বাস্তবায়ন প্রয়োজন। মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ জানিয়েছেন, রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কে কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু নির্মাণ অতি প্রয়োজন। এর প্রক্রিয়াটি কোন্ পর্যায়ে রয়েছে তা জেনে দুটি উপজেলার লাখো মানুষের স্বপ্ন পূরণে আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
