দাম একই, ওজন কম- সাবান বাজারে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’, ভোক্তারা অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত

দাম একই, ওজন কম- সাবান বাজারে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’, ভোক্তারা অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত

ফন্ট সাইজ:

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের চাপের মধ্যেই নতুন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, দাম অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের ওজন কমিয়ে দেয়া, যা অর্থনীতিতে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি সাবান বাজারে এমন চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি কোম্পানি নতুন প্যাকেজিংয়ে সাবান বাজারজাত করছে, যেখানে আগের তুলনায় ওজন কমানো হয়েছে। তবে দাম অপরিবর্তিত থাকায় সাধারণ ভোক্তারা বিষয়টি সহজে বুঝতে পারছেন না। প্রচারণা বা স্পষ্ট ঘোষণা না থাকায় ক্রেতারা একই দামে কম ওজনের পণ্য কিনছেন।

পূর্ব রামপুরার বাসিন্দা বেসরকারি চাকুরিজীবী রেহেনা আক্তার তেমনই একটি ঘটনার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়মিত ভাবেই আমি বিউটি সোপ ব্যবহার করি। তবে এবার লাক্স সাবান কিনে আনার পর ব্যবহারের পর প্যাকেট ফেলে দেয়ার সময় হঠাৎ খেয়াল করি সাবানের ওজন লেখা ৯০ গ্রাম। তবে দাম আগেরটাই রয়েছে। বড় কোন ঘোষণা ছাড়াই দাম একই রেখে ওজন কমিয়ে দিয়ে আসলে আমাদের ঠকানো হচ্ছে। বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের জারি করা এসআরও নং ৩১৮-আইন-এর ২০২১-এর পণ্য মোড়কজাত বিধিমালার সংশোধন অনুযায়ী, ১৫০ গ্রামের বেশি ওজনের সাবান প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ধাপে অন্তত ২৫ গ্রাম করে বৃদ্ধি রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এর আগে সেটি ছিল ৫০ গ্রামের বেশি সাবানের ক্ষেত্রে। সে হিসেবে ৫০ গ্রামের পর ৭৫ গ্রাম, ১০০ গ্রাম, এভাবে ধাপে ধাপে ওজন নির্ধারণের নিয়ম ছিল। ২০২৫ সালে এই বিধিমালার সংশোধনী আনার পর অন্য কোন ব্র্যান্ড ওজন নিয়ে কম-বেশি না করলেও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ব্র্যান্ডগুলো দাম একই রেখে সাবানপ্রতি ১০ গ্রাম করে কমিয়ে দিয়েছে। তবে প্যাকেজিংয়ে আলাদা কোন পরিবর্তন ও বিশেষ ঘোষণা না থাকায় ক্রেতারা ১০ গ্রামের হেরফের তেমনভাবে বুঝতে পারছে না। তাই কৌশলে ক্রেতার পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা বের করে নেয়ার বিষয়টি আইনত সিদ্ধ হলেও নৈতিকভাবে কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া বাজারের সবচাইতে বেশি বিক্রিত সাবানের ব্র্যান্ডের মধ্যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ব্র্যান্ডগুলোই বেশি।

এদিকে শ্রিঙ্কফ্লেশন-এর মতো এই কৌশলের কারণে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুজাতিক ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো কৌশলে ওজন কমিয়ে একই দামে পণ্য বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছে। এতে প্রতিযোগিতায় থাকা দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো চাপের মুখে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আগের ওজন বজায় রাখতে গিয়ে তারা ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ বলেন, একটি একটি প্রতারণা। ভোক্তাকে না জানিয়ে চুপি চুপি শুধু প্যাকেজিং বদলে পণ্যের ওজন কমিয়ে দেয়া একটি অপরাধ। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে গ্রাহক ঠকানোর এই পন্থা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত এমন সব কাণ্ডে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে বহুজাতিক কোম্পানি বিভিন্ন উপায়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা ছোট ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোর জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি করছে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি পণ্যের সমস্যা নয়, বরং দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য একটি নতুন হুমকি। তাদের মতে, এই ধরনের কৌশল যদি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভোক্তারা অজান্তেই ক্ষতির মুখে পড়বে, আর অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেবে। তারা জানান, পণ্যের ওজন বা পরিমাণে যেকোনো পরিবর্তন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং তা ভোক্তাদের জানানো বাধ্যতামূলক করা উচিত। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে বাজারের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির কারণে কিছু কোম্পানি এখনও আগের ওজন বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানা গেছে। দাম না বাড়িয়েও ওজন কমানোর এই প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক পণ্যে একই কৌশল অনুসরণ করা হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার পকেটে এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হবে।