তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ অর্থনীতি: যা বললেন বিশ্লেষকরা

তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ অর্থনীতি: যা বললেন বিশ্লেষকরা

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং আমদানি নির্ভর জ্বালানি কাঠামো দেশের মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাব-যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি-রপ্তানি খাতে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনটি উপাদান একত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি “ত্রিমুখী চাপ” তৈরি করছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “যুদ্ধ অর্থনীতির এই প্রভাব শুধু জ্বালানি বা পণ্যমূল্যে সীমাবদ্ধ নয়- এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা কী ভাবছেন এবং সংকট উত্তরণে কী পরামর্শ দিচ্ছেন- তা তুলে ধরা হলো। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জ্বালানি আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমাদের আমদানি বিল বেড়ে যায়, এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছি। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎস উন্নয়ন ও এলএনজি নির্ভরতা কমানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আমদানি পণ্যের দাম দ্রুত ওঠানামা করছে। এতে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা করতে পারছেন না। আর ভোক্তাদের ওপরও চাপ বাড়ছে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প আমদানি উৎস খুঁজে বের করা, আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বাজার তদারকি জোরদার করে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে হবে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে আমাদের রপ্তানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা জরুরি।

ব্যবসায়ী নেতা, ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক ইকোনমিক রিসার্চ-(সিএসইআর) বাংলাদেশের চেয়ারপার্সন সাকিফ শামীম বলেন, যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাবে শুধু শিল্প নয়, সেবা খাতও চাপে রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসহ জরুরি খাতে কর-রেয়াত ও সহজ আমদানি সুবিধা দেয়া উচিত। তবে সঙ্কটের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জ্বালানি বৈচিত্র্য ছাড়া সম্ভব নয়। সৌর শক্তি, এলএনজি উৎসের বহুমুখীকরণ, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং গণপরিবহনভিত্তিক জ্বালানি দক্ষতা- এসব আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য উপাদান।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনিশ্চয়তা। জ্বালানির দাম, ডলারের রেট, আমদানি খরচ, সবকিছুতেই অস্থিরতা থাকলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, নীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।

ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নীতি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত এলসি অনুমোদন এবং লজিস্টিকস খরচ কমানো গেলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পাবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম একসঙ্গে বাড়লে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, টার্গেটেড ভর্তুকি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান সংকট শুধু সাময়িক নয়, এটি কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। আমাদের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করতে হবে, বিশেষ করে রপ্তানি খাতকে তৈরি পোশাকের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

অর্থনীতিবিদ ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নীতি সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং যুদ্ধ অর্থনীতির সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশ একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, আর দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজে বের করা।

সাকিফ শামীম উল্লেখ করেন, বিশ্ব অর্থনীতি আবারও এক অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেলের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নতা-এই তিনের সম্মিলিত অভিঘাত এখন বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা ঢাকার বাজারে, কৃষকের সেচ ব্যয়ে, শিল্পের উৎপাদন খরচে এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে প্রতিদিন অনুভূত হচ্ছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানির ওপর উচ্চ নির্ভরতা। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সম্মুখীন করাবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য তেলের দাম বৃদ্ধির প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। জ্বালানি শুধু পরিবহন খরচ বাড়ায় না: এটি কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ-সবকিছুর ব্যয়কে একসঙ্গে উপরের দিকে ঠেলে দেয়। ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়লে ট্রাক ভাড়া বাড়ে, ফলে চাল, ডাল, সবজি, মাছ-সবকিছুর বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে আইএমএফ বাংলাদেশের ২০২৬ সালের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৭শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। বাস্তবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হয়, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও পরিবহনে ব্যয় হয়।

কিন্তু এই সংকট কেবল মূল্যস্ফীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরও গভীর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, সিরামিক, ওষুধ এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।

সাকিফ শামীম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে, বিশেষত যখন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি বা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সুবিধা ব্যবহার করতে সক্ষম।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ অর্থনীতির বৈশ্বিক প্রভাব। যুদ্ধ শুধু তেল নয়, সার, গম, ভোজ্য তেল এবং অন্যান্য কাঁচামালের দামও বাড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়লে শিপিং খরচ ও বীমা প্রিমিয়ামও বেড়ে যায়।

অর্থাৎ বাংলাদেশ একই পণ্যের জন্য শুধু বেশি দামই দিচ্ছে না, বরং তা দেশে আনতেও বেশি ব্যয় করছে। এই দ্বৈত চাপ বর্তমান হিসাব ঘাটতি এবং বিনিময় হারকে আরও দুর্বল করতে পারে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে নীতিগত দ্বন্দ্ব। একদিকে সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে ভর্তুকি কমাতে হবে-বিশেষত আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে। জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট ঘাটতি বাড়বে, আর দাম বাড়ালে জনগণের ওপর চাপ বাড়বে। এই নীতিগত টানাপোড়েন আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।

তবে সংকটের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট: বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জ্বালানি বৈচিত্র্য ছাড়া সম্ভব নয়। সৌরশক্তি, এলএনজি উৎসের বহুমুখীকরণ, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং গণপরিবহনভিত্তিক জ্বালানি দক্ষতা-এসব আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য উপাদান। অর্থনীতির ভাষায়, যুদ্ধ আমাদের সীমান্তে না হলেও তার ব্যয় আমাদের ঘরে পৌঁছে যায়। তেলের বাজারে প্রতিটি ডলারের উল্লম্ফন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, শিল্পের প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক ঝড়কে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে সামলাবে, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেবে।