শ্রমিকের সংজ্ঞায় শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ

শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ

শ্রমিকের সংজ্ঞায় শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ

ফন্ট সাইজ:

সংশোধিত শ্রম আইন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম। তিনি বলেছেন, শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৫ এ শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তা-কর্মচারী শব্দ যুক্ত করে শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা করা হয়েছে, যা মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে চিরস্থায়ী বিভেদ তৈরি করবে। তার মতে, অধ্যাদেশের কিছু ধারা খাতটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আইন পরিবর্তন করা হয়েছে অভিযোগ করে তাঁরা দাবি করেছেন, শ্রমিকের চাকরি অবসানের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণে সময়সীমায় অস্পষ্টতা রয়েছে অধ্যাদেশে।

রোববার বিকেএমইএ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমল পোদ্দার ও সহসভাপতি শামীম আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১৭ নভেম্বর সংশোধিত শ্রম আইন অধ্যাদেশ জারি করে। বিকেএমইএ নেতাদের দাবি, সংসদে ওঠার আগে এই অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে পর্যালোচনা করা হোক।

বিকেএমইএয়ের সভাপতি বলেন, মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষয়ী বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আইন পরিবর্তন করা হয়েছে দাবি করে বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, শ্রমিকের চাকরি অবসানের ক্ষতিপূরণে সময়সীমায় অস্পষ্টতা রয়েছে।

এছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রেও আইনটি পরিষ্কার নয়। এছাড়া শ্রমিকের ভবিষ্যৎ তহবিলের সংজ্ঞা সংশোধন, মাতৃকালীন মজুরিসহ ৮টি সংস্কার করে আইন পাস করার দাবি জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রেও অধ্যাদেশটি পরিষ্কার নয়। শ্রমিকের ভবিষ্য তহবিলের সংজ্ঞা সংশোধন, মাতৃকালীন মজুরিসহ আটটি সংস্কার করে আইন পাস করার দাবি জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সংশোধিত অধিকাংশ ধারা গ্রহণযোগ্য হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাস্তবায়নের আগে জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। সংশোধন প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। শুরুতে ৩০০টির বেশি প্রস্তাব থেকে তা কমিয়ে ১০১টিতে আনা হয় এবং পরে কারিগরি কমিটির পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। তার মতে, ৭৯টি ধারা সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্ত হয় এবং ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পরিষদ (টিসিসি)- যেখানে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি রয়েছেন- এর বৈঠকে আরও কিছু প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। তবে বিকেএমইএ সভাপতি অভিযোগ করেন, শেষ পর্যায়ে পূর্ব সম্মতি ছাড়াই কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘শ্রমিক’ শব্দটির সংজ্ঞা। তিনি বলেন, আগের আইনে প্রশাসনিক, তদারকি বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মীরা এই সংজ্ঞার বাইরে ছিলেন।

কিন্তু সংশোধিত ধারায় বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি দাবি করেন, এটি টিসিসির সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নয়।

চাকরির সুবিধা বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, স্থায়ী শ্রমিকেরা তিন বছর পর্যন্ত প্রতি বছরের জন্য ৭ দিনের মজুরি, তিন থেকে ১০ বছরের জন্য ১৫ দিনের মজুরি এবং ১০ বছরের বেশি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মজুরি পাবেন। টিসিসিতে তিন থেকে পাঁচ বছরের কম সময়ের জন্য ৭ দিনের মজুরি এবং পাঁচ থেকে ১০ বছরের কম সময়ের জন্য ১৫ দিনের মজুরির কথা বলা ছিল। বিকেএমইএ সভাপতি সংশোধিত সময়সীমাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেন।

সমষ্টিগত দর কষাকষির প্রতিনিধি (সিবিএ) সংক্রান্ত ধারা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি কারখানায় একটি ট্রেড ইউনিয়নকেই দর কষাকষির প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যাবে। তিনি বলেন, কোনো ইউনিয়নকে সিবিএ হতে হলে নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তত ৫১ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন পেতে হবে। এ ছাড়া গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানি মোকাবিলায় কমিটি গঠনের ধারা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেন বিকেএমইএ সভাপতি।

তিনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বৈঠকের কার্যবিবরণী অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘১২৪টি সংশোধিত ধারার মধ্যে মাত্র চার-পাঁচটি বিষয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। বাকি অধিকাংশ ধারা শ্রমিকবান্ধব হিসেবে আমরা সমর্থন করি।’

এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত, তবে শিল্পের ক্ষতি হতে পারে- এমন কোনো ধারা এড়ানো প্রয়োজন।