আরও বেড়েছে এসআইবিএল-এর খেলাপি ঋণ

ফন্ট সাইজ:

ব্যাংকের আর্থিক ভিত শক্ত করে মার্জারের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যেই সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)-এ প্রশাসক বসিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এর পরই ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার আরও দ্রুত অবনতি হয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮০.০৭ শতাংশে। শনিবার ছুটির দিনে ব্যাংকটির প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন এবং খেলাপির এই হিসাব চূড়ান্ত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তথ্য বলছে, গত বছরের নভেম্বরে ৫ই তারিখে ব্যাংকটিতে যেদিন প্রশাসক বসানো হয় ওইদিন খেলাপি ছিল ৭৫ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরের হিসাবে খেলাপি ছিল ৬২ শতাংশ। গেল মাসগুলোতে খেলাপি বাড়ার পাশাপাশি নগদ ঋণ আদায় কার্যত ভেঙে পড়েছে- মার্চ মাসে এক টাকাও আদায় হয়নি।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি বিশ্লেষণ করে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অবনতির পেছনে শুধু দুর্বল ঋণপোর্টফোলিও নয় বরং নীতি প্রয়োগের একটি স্পষ্ট বিচ্যুতিও কাজ করছে। খেলাপি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-সহায়তা কাজে লাগানোর বদলে তা বিশেষ কারণে আটকে রাখা হয়েছে। এতে বড় খেলাপি গ্রাহকদের পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট থেমে গেছে আর নগদ প্রবাহও কমেছে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি কমাতে ২০২৫ সালের ৭ই অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে পড়া বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিতে নির্দেশ দেয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া যাবে- আবেদনের সময় ১ শতাংশ এবং বাকি ১ শতাংশ ছয় মাসের মধ্যে জমা দিয়ে এক বছর গ্রেস পিরিয়ড সহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখতে পারবে ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত এসআইবিএল সহ সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।
এর এক মাস পর ৫ই নভেম্বর ২০২৫-এ এসআইবিএলে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়, লক্ষ্য ছিল ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল করা এবং একীভূত ব্যাংকের অংশ হিসেবে পুনর্গঠনের উপযোগী করে তোলা। কিন্তু সেই সময় থেকেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। একই মাসের প্রথম চার দিনে খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায় হয়েছিল প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। অথচ প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর বাকি ২৬ দিনে আদায় নেমে আসে মাত্র ৩৭ কোটিতে। এরপর জানুয়ারিতে ১০৩ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা আদায় হলেও মার্চে তা শূন্যে নেমে আসে।

এই ধারাবাহিক পতন এমন সময়ে ঘটেছে, যখন নীতি-সহায়তার মাধ্যমে অন্তত কিছু ঋণ নিয়মিত করা এবং নগদ প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তবে সেই সুযোগ প্রয়োগ করা হয়নি। বরং অনেক গ্রাহককে পুনঃতফসিল বা এককালীন এক্সিটের সুযোগ না দিয়ে পুরো ঋণ শোধ বা অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের শর্ত দেয়া হয়েছে।

জয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের একটি চিঠি এই অভিযোগের স্পষ্ট উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ঋণের ৫ শতাংশ হিসেবে দেড় কোটি টাকা ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে এককালীন এক্সিটের আবেদন করেছিল। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেছে, তাদের ব্যবসা “২০১৬ সালে সম্পূর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যায়” এবং পরে ২০১৮ সালে তাদের সম্মতি ছাড়াই ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, যার ফলে “প্রিন্সিপাল ১১.৮২ কোটি থেকে ১৫.৮০ কোটি টাকা” হয়ে দাঁড়ায়। তারা আরও দাবি করেছে, ব্যাংকের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে প্রিন্সিপাল পরিশোধের ভিত্তিতে এককালীন এক্সিটের বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল এবং সেটি ছিল “একটি নিস্পত্তিকৃত বিষয়”। কিন্তু সর্বশেষ আবেদন করার চার মাস পরও প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়। এতে তাদের রপ্তানিমুখী ব্যবসাও বন্ধ হওয়ার পথে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেয়া হয়নি।
এক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি পুরো টাকা দিতে পারতাম, তাহলে তো এই নীতি সহায়তার দরকারই হতো না। এখন উল্টো আরও চাপে পড়ছি।”

তথ্য অনুযায়ী, নীতি-সহায়তা কার্যকর না হওয়ায় অন্তত ১,৭৭৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ হারিয়েছে এসআইবিএল। ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এই ঋণের ফাইল প্রস্তুত করে প্রশাসকের কাছে পাঠানো হলেও তা এগোয়নি। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে এসেছে নগদ প্রবাহের দিক থেকে। যেখানে কাগজে পুনঃতফসিল বা এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে খেলাপি কমানোর সুযোগ ছিল, সেখানে বাস্তবে নগদ আদায় শূন্যে নেমে গেছে। এতে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাংক চাইলে গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বল্প ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে পারবে।