‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ ২০২৫ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে জাতীয় সংসদে। বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্যে উত্তপ্ত ছিল জাতীয় সংসদ অধিবেশন। আলোচনায় অংশ নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তাদের শর্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হলো, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে-সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে। এই শর্তের বিরোধিতা করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তার ভাষ্য, ২১৯ জন এমপির প্রতিনিধিরা ৫০% আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা ৫০% পাবেন-এটা বৈষম্য। বেলা সাড়ে ৩টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব:
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)’ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই কমিটির মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন ও পাসের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক বিষয়ে নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালন করি। সেজন্য আমি আজকে এই মহান জাতীয় সংসদে প্রস্তাব রাখছি অন বিহাফ অফ আওয়ার লিডার অফ দি হাউস। জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দলের এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন এবং উক্ত কমিটিতে আমরা সকলে মিলে আলাপ-আলোচনা করে সমঝোতার মাধ্যমে জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করি এবং সেটা সমঝোতার মাধ্যমে আমরা গ্রহণ করি।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজকে যে নোটিশটি বিরোধীদলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিষদের অধিবেশন কেন রাষ্ট্রপতি আহ্বান করলেন না? এই আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল।
গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, সারা জাতির মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। এই সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আমরা ধারণ করি। কিন্তু যে আদেশটি (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ) নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, সেটি আমরা মানছি না কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সাথে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সাথে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কোনো আইনি বিধান ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই। তাই আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।
পরে সংসদে যেকোনো বিশেষ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য রাখার জোর দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হলে সেখানে বিরোধী দলের মতামতের কোনো মূল্যায়ন হবে না এবং শেষ পর্যন্ত তা ‘যে লাউ সেই কদু’-তেই আটকে যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তার শর্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা শুধু এক লাইনে চলতে থাকলাম, এটার সমাধান কীভাবে হবে তা আমরা সবাই বুঝি। আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হলো, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।
সংসদ ও সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দেশ এবং জাতির জন্য সংবিধান এবং এই সংসদ। আমরা কে সরকারি বেঞ্চে আর কে বিরোধী বেঞ্চে, এটা কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যারা একসময় ওখানে বসতেন, আজ তারা কোথাও নেই। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি।
পার্লামেন্টে নিজেকে ‘চার দিনের শিশু’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, আইন বা সংবিধান মানুষের জন্য, জনগণের জন্য; মানুষ বা জনগণ আইন কিংবা সংবিধানের জন্য নয়।
এ সময় সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই মহান সংসদে ওই বিষয়ে সময় নষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না। মহৎ লক্ষ্যে কাজ করতে গেলে এমন সংকট নিরসন করা সরকারেরই দায়িত্ব ছিল।
সরকারকে গঠনমূলক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা প্রথম দিনই বলেছিলাম, আমরা একটি গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। বিরোধিতার খাতিরে কোনো বিরোধিতা নয়; বরং যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা করব এবং জাতির অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে বিরোধিতা করব।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জনগণের বৃহত্তর রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার এড়িয়ে সংসদে যেকোনো ইস্যুতে একটি সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছাতে তিনি স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশ্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আপনারা বলছেন ৭২-এর সংবিধান মানেন না, অথচ এই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন ওই সংবিধানের আলোকেই। জুলাই আদেশের ১২ ধারাতেই বলা আছে জুলাই সনদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা। তার মানে ৭২-এর সংবিধানই আমাদের বেসিস। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই আমরা যাবতীয় সংশোধনী আনতে পারব।
তিনি আরও বলেন, আমরা যারা বিএনপি করি, আমরা জুলাই বিপ্লবীদের মতো আবেগী এবং জন-আকাঙ্ক্ষার কথা চিন্তা করি। জুলাই সনদের ২২ অনুচ্ছেদে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর কথা বলা আছে। বিএনপি তা পালন করেছে, কিন্তু আপনারা জুলাই সনদের কথা মুখে বললেও নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেননি। এমনকি সনদের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপনাদের ডেপুটি স্পিকার পদের অফার দেওয়া হলেও আপনারা তা গ্রহণ করেননি।
‘জুলাই আদেশ’ কেন আইন নয় তার ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট অনুযায়ী কোনো অর্ডারের আইনি ব্যাকিং থাকতে হয়। এই আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি একটি কালারেবল লেজিসলেশন। সংবিধানে যে পাওয়ার দেওয়া নাই, সেই পাওয়ার এখানে এক্সারসাইজ করা হয়েছে। চতুর্থ তফসিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন আইনমন্ত্রী।
সরকারি দলকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি: পার্থ
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’কে (এবহ-ত) ‘জামায়াত জেনারেশন’ না হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। একইসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিকরা ‘জুলাই সনদের’ বিরুদ্ধে নয়, বরং সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক বিষয়ে নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তরুণদের উদ্দেশে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আপনারা জেন-জিকে রিপ্রেজেন্ট করেন। দয়া করে ‘জামায়াত জেনারেশন’ হয়ে যাইয়েন না।
জামায়াতের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সারাজীবন ভারতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে এখন ভারতের সঙ্গে মিটিং করছেন। আবার সারাজীবন ইসলামের নামে রাজনীতি করে ভোটের জন্য শেষে এসে বলছেন আমরা শরিয়া আইন চাই না। প্রবলেম কী? আমার কথাগুলো একটু ম্যানুভার করেন। আপনারা পজিটিভ পলিটিক্স নিয়ে আসেন।
সংবিধান বাতিল বা ছুড়ে ফেলার চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন বিজেপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আমাদের সমস্যা জুলাই নিয়ে নয়, সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার গঠন করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকার গঠন করে, পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাইছেন এটা হয় না।
সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এতে এত গাত্রদাহ কেন? আমরা চাইলে তো পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারি। এর জন্য ছুড়ে ফেলার তো দরকার নেই।
কেউ যৌক্তিক কথা বললেই তাকে ‘জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি’ বানানোর চেষ্টার সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি বলেন, কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্রিকেটীয় ভাষায় পার্থ বলেন, শুনেন, আপনারা ছয় বলে ১২ রান করেছেন, কিন্তু এর আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি। সুতরাং আপনারা এমন কথা বলবেন না যাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়, যেন জুলাইয়ে আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশনই নাই! যেদিন আবু সাঈদ শহীদ হয়েছিল, সেদিন চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামও কিন্তু শহীদ হয়েছে। অবদান কারও কম নয়।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষে পার্থ বলেন, সংবিধানের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে, একইসঙ্গে জুলাইয়ের স্পিরিটকেও তুলে ধরতে হবে। আমরা সবাই মিলে বসি, আলোচনা করি। কিন্তু কোনো সদস্যের বক্তব্যে যেন জুলাইকে আন্ডারমাইন করা না হয়। আসুন আমরা পজিটিভ কিছু নিয়ে আসি।
ক্ষমতায় গিয়ে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় ভুলে গেছে সরকার:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্য হয়েছিল ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার তা ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি দলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। একইসঙ্গে জনগণের ম্যান্ডেট বা গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা অসাংবিধানিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। ওই সময় কোন সংবিধানের বলে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়েছিল, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ৬ তারিখে সংসদ ভেঙে দেয়ারও কোনো সাংবিধানিক ফর্মুলা ছিল না। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জনগণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে।
সরকারি দলের মন্ত্রীদের অতীত অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় এই এমপি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সেখানে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল দিনের পর দিন আলোচনা করেছে। আজকে সরকারি দলের বেঞ্চে বসে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, জুনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুররা সেই ঐক্যমত্য কমিশনে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সবার মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। অথচ আজকে সংসদে এসে তারা সেই কথা কীভাবে ভুলে গেলেন?
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫ অক্টোবর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, গণভোটে জনগণের তরফ থেকে যে রায় আসবে, সংসদের প্রত্যেক সদস্যকে তা মানতে হবে। আজ তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে গেছেন কেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩০ জানুয়ারি রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন। তাহলে আজ কেন আপনারা সেই গণভোটের রায় মানতে চাইছেন না?
ছাত্ররা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য রক্ত দেয়নি, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য দিয়েছে:
জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ফ্যামিলি কার্ড বা রাস্তা সংস্কারের জন্য রক্ত দেয়নি, তারা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত সরকারের মতোই উন্নয়নের কথা বলে জুলাইয়ের সেই আকাঙ্ক্ষা ও ‘জুলাই সনদ’ ভুলিয়ে দিতে বসেছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের দলীয় সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
সরকার মূল কাজ থেকে সরে গেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, গত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখন আমরা দেখছি আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার ‘জুলাই সনদ’টাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি। আমাদের সন্তানেরা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি প্লাকার্ডে লিখেছিল যে, আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দাঁড়িয়েছি? তারা লিখেছিল্ত ‘রাস্তা সংস্কারের কাজ নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’।
সংস্কারের পরিবর্তে সরকার সংশোধনীর পথে হাঁটছে জানিয়ে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনীর দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনীর জন্য আমাদের তরুণ-যুবকেরা, আমাদের জনতা কাজ করেনি। সংশোধনীর জন্য তো শেখ হাসিনাও সেদিন বলেছিলেন ২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে। কিন্তু ছাত্র-জনতা সেই সংশোধন মেনে নেয়নি, তারা সংস্কার চেয়েছিল। অথচ আমরা আজ সংস্কারটা মাথায় নিতে পারছি না।
৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার করার কথা থাকলেও সরকার খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের ‘সবাই মিলে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১১টা সিটি কর্পোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক বদল হয়েছে। সবাই মিলে বাংলাদেশ হলে, সরকারি দলের বাইরে একজনও যোগ্য ও সৎ মানুষ কি খুঁজে পাওয়া গেল না? স্থানীয় সরকারে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজ দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা কি সবাই মিলে বাংলাদেশ?
‘তন্ত্র-মন্ত্র’ দিয়ে তালিকায় আসা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা শিগগিরই:
‘তন্ত্র-মন্ত্র’ দিয়ে বা জালিয়াতির মাধ্যমে যারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন এবং অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন তাদেরকে চিহ্নিত করে খুব শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। একইসঙ্গে বিগত সরকারের আমলে বাদ পড়া ও হয়রানির শিকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। অধিবেশনে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন ফারুক ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের করা সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
সংসদে মুক্তিযুদ্ধামন্ত্রী বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছি। আশা করি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ধরনের অমুক্তিযোদ্ধা, যারা ‘তন্ত্র-মন্ত্র’ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, তাদের সন্তানদের চাকরি দিয়েছেন এবং নিজেরাও বিভিন্নভাবে অবৈধভাবে লাভবান হয়েছেন-আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি।
শিগগিরই এর একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আশা করে, অল্প দিনের মধ্যেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমরা বলতে পারব এবং জাতির সামনে তা উপস্থাপন করতে পারব।
জলবায়ু ট্রাস্টের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে:
জলবায়ু ট্রাস্টের কার্যক্রমে এবং ট্রাস্ট ফান্ড হতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। অধিবেশনে সংসদ সদস্য এ. এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান।
কৃষক কার্ডে আড়াই হাজার টাকার সার-বীজ পাবেন প্রান্তিক কৃষকরা:
দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণির কৃষকদের জনপ্রতি দুই হাজার ৫০০ টাকার সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ দেয়া হবে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে ‘কৃষক কার্ডের’ মাধ্যমে এই প্রণোদনা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কৃষিকাজে সহায়তা করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে কেবলমাত্র ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণির কৃষকদের জনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের জন্য প্রণোদনা হিসেবে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে:
অবৈধ দখল হওয়া সরকারি জায়গা উদ্ধার এবং উদ্ধার হওয়া খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনাসহ মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। একইসঙ্গে জমি দখলমুক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। অধিবেশনে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এ. এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান।
স্বাস্থ্য খাতে বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়েছে:
স্বাস্থ্য খাতে বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়েছে এবং অনেক জায়গায় ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে স্বাস্থ্যখাত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাবোয়াত হোসেন বকুল। সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসানের ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের উপর আলোচনার সময় এ কথা বলেন।

BAD MOUTH
২ মাস আগেবাহাত্তুরের সংবিধান বাতিল করে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। বাহাত্তুরের সংবিধান থাকলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করবে।