বাংলাদেশের আরও পাঁচটি পোশাক কারখানাকে সবুজ কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। এ নিয়ে দেশে সবুজ কারখানার সনদ পাওয়া মোট পোশাক কারখানার সংখ্যা দাঁড়াল ২৮০টিতে। এর মধ্যে প্লাটিনাম মানের কারখানা ১১৮টি ও গোল্ড মানের ১৪৩টি। অর্থাৎ বাংলাদেশের এই কারখানাগুলো সর্বোচ্চ মানের পরিবেশবান্ধব কারখানার শর্ত পূরণ করতে পারছে। বাকি ১৯টি কারখানার মধ্যে সিলভার সনদপ্রাপ্ত কারখানা ১৫টি এবং সার্টিফায়েড সনদপ্রাপ্ত কারখানা ৪টি।
আর বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত সবুজ কারখানার মধ্যে বাংলাদেশেরই ৫২টি। এটা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য গৌরব বলে জানিয়েছে পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
তিনি বলেন, “পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে বিশ্বসেরা হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্প অনুশীলনের প্রতি দেশটির দৃঢ় অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।” “এই অর্জন তৈরি পোশাক খাতে সবুজ প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশগতভাবে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রমাণ। বর্তমানে সবুজ পোশাক কারখানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।”
পরিবেশবান্ধব সনদ পাওয়া নতুন কারখানাগুলো হচ্ছে— নারায়ণগঞ্জের এপিক গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কোং লিমিটেড ইউনিট-৭, ঢাকার সুরমা গার্মেন্টস, ধামরাইয়ের নাফা অ্যাপারেলস ইউনিট-২, সাভারের উইন্টার এবং চট্টগ্রামের মেহের গার্মেন্টস লিমিটেড।
এপিক গার্মেন্টস ৬৭ পয়েন্ট পেয়ে লিড বিডি+সি: নিউ কনস্ট্রাকশন ভি৪ এর অধীনে গোল্ড সনদ অর্জন করেছে। অন্যদিকে সুরমা গার্মেন্টস লিমিটেড ৭১ পয়েন্ট পেয়ে লিড ও+এম: এক্সিসটিং বিল্ডিং ভি৪- এর অধীনে গোল্ড সনদ অর্জন করেছে।
নাফা অ্যাপারেলস ৬৫ পয়েন্ট পেয়ে লিড বিডি+সি: নিউ কনস্ট্রাকশন ভি৪ এর অধীনে গোল্ড সনদ পেয়েছে। উইন্টার ড্রেস লিমিটেড ৮৫ পয়েন্ট পেয়ে লিড ও+এম: এক্সজিসটিং বিল্ডিং ভি৪ -এর অধীনে প্ল্যাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। আর মেহের গার্মেন্টস লিমিটেড ৮৯ পয়েন্ট পেয়ে প্ল্যাটিনাম সনদ অর্জন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) থেকে এই পরিবেশবান্ধব সনদ পেয়েছে এই পাঁচটি পোশাক কারখানা। এ সনদ পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত পরিপালন করতে হয়। মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে কোনও কারখানা ৮০-এর বেশি পেলে ‘লিড প্লাটিনাম’, ৬০-৭৯ পেলে ‘লিড গোল্ড’, ৫০-৫৯ নম্বর পেলে ‘লিড সিলভার’ ও ৪০-৪৯ নম্বর পেলে ‘লিড সার্টিফায়েড’ সনদ দেওয়া হয়।
বিশ্বের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউএসজিবিসি যে সনদ দেয়, তার নাম ‘লিড’।
লিডের পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন। এ সনদ পেতে প্রতিটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মান রক্ষা করতে হয়।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা সাজ্জাদুর রহমান মৃধার হাত ধরে ২০১২ সালে প্রথম পরিবেশবান্ধব কারখানার যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশে। পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেডে তিনি স্থাপন করেন ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও। তার দেখানো পথ ধরেই দেশে একটার পর একটা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা গড়ে উঠছে। উজ্জ্বল হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। ২০১৪ সালে সবুজ কারখানা স্থাপন করা হয় ৩টি। ২০১৫ সালে হয় ১১টি। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে স্থাপন করা হয় যথাক্রমে ১৬, ১৮ ও ২৪টি।
২০১৯ সালে আরও ২৮টি সবুজ পোশাক কারখানা স্থাপন করেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। ২০২০ ও ২০২১ সালে ২৪টি করে আরও ৪৮টি কারখানা গড়ে উঠেছে দেশে।
২০২২ সালে আরও ৩০টি সবুজ পোশাক কারখানা স্থাপন করেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। ২০২৩ সালে ২৪টি ‘গ্রিন’ কারখানা গড়ে উঠে দেশে। ২০২৪ সালে আরও ২৬টি সবুজ পোশাক কারখানা স্থাপন করেন উদ্যোক্তারা। আর এভাবেই সব মিলিয়ে দেশে মোট পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানার সংখ্যা এখন ২৮০টিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ৫০০টি পোশাক কারখানা পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার সনদ পেতে ইউএসজিবিসির অধীনে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ।
সনদটি পেতে একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়। ভবন নির্মাণ শেষ হলে কিংবা পুরনো ভবন সংস্কার করেও আবেদন করা যায়।
লিড সনদের জন্য মোট ১১০ পয়েন্ট আছে। এর মধ্যে ৮০ পয়েন্টের ওপরে হলে ‘লিড প্লাটিনাম’, ৬০-৭৯ হলে ‘লিড গোল্ড’, ৫০-৫৯ হলে ‘লিড সিলভার’ এবং ৪০-৪৯ হলে ‘লিড সার্টিফায়েড’ সনদ মেলে।
সাধারণত অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় ৫-২০ শতাংশ খরচ বেশি হয়। তবে বাড়তি খরচ করলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায়।
ইউএসজিবিসি লিড সনদ পেতে স্থাপনা নির্মাণে ৯টি শর্ত পরিপালন করতে হয়।
তার মধ্যে আছে এমন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে হয়, যাতে কার্বন নিঃসরণ কম হয়। এ জন্য পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি ইট, সিমেন্ট ও ইস্পাত লাগে। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সূর্যের আলো, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাতি ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি পানি সাশ্রয়ী কল ও ব্যবহৃত পানি প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে হয়।
এছাড়া স্থাপনায় পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। সব মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় ২৪-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ, ৩৩-৩৯ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ এবং ৪০ শতাংশ পানি ব্যবহার কমানো সম্ভব। তার মানে দেশে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সংখ্যা যত বেশি হবে, ততই তা পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে।
দেশে পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা এখন ২৮০টি
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
৫ মাস আগে
৩১ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৮ঃ৪৩ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
