ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

স্থল হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত ইরান

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া ১৫ দফা প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইরান। সোমবার ওই প্রস্তাবকে অবাস্তব বলে আখ্যা দিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্থল হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, স্থল অভিযানে আসলে মার্কিন সৈন্যদের পুড়িয়ে হত্যা করা হবে। এদিকে গতকাল ইসরাইলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরনগরী হাইফাতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে শহরটির গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার বাজান। শুধু ইরান নয়, ইয়েমেনের হুতিরাও ইসরাইলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গতকাল একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে তেল আবিব।

এর আগে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে হুতিরা। এদিকে এখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি উন্মুক্ত না করলে ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ সিসি ট্রাম্পকে যুদ্ধ বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছেন। সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ না হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে যুক্তরাজ্য যোগ দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। এই যুদ্ধ তাদের নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করে হামলা করতে দেবে না বলে জানিয়েছে স্পেন। দিন দিন যুদ্ধ ভয়াবহতার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করেছেন, ইরানে স্থল হামলা হলে যুদ্ধ আরও কয়েক মাস দীর্ঘ হতে পারে। এতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার। যা কাটিয়ে উঠতেও অনেক সময় লাগতে পারে।

অনড় ইরান: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব হাতে পেয়েছে। গত রোববার ইসলামাবাদে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার আলোচনার পর এই বার্তা দিয়েছেন তিনি। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের প্রস্তাবগুলোর কড়া সমালোচনা করেন বাঘাই। বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা সামরিক আগ্রাসনের শিকার। তাই আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা এবং শক্তি নিজেদের রক্ষায় নিয়োজিত। বাঘাই আরও জানান, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে ইরানের পার্লামেন্ট। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রাপ্তি থেকে বিরত রাখাই তার লক্ষ্য। তবে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। গত রোববার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে বৈঠক করছে। তবে একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সৈন্য পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে ইরান তার অবস্থানে অনড় থেকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ বজায় রেখেছে। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, অনেক উন্নতি হয়েছে কিন্তু যদি কোনো কারণে দ্রুত কোনো চুক্তি না হয় এবং হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত না হয়, তাহলে আমরা ইরানের সকল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেলকূপ এবং খার্গ দ্বীপ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আমাদের ইরান সফর শেষ করবো।

যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা: মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই এখন রণক্ষেত্র। এই সংঘাতে ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। এই সংঘাতের সময় ইরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পক্ষের যোদ্ধারাও সক্রিয় হয়ে পড়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ’র সঙ্গেও প্রবল সংঘাতে জড়িয়েছে ইসরাইল। রোববার দক্ষিণ লেবাননে একটি অবস্থানে হামলায় ইন্দোনেশিয়ার একজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত এবং অন্য একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইসরাইলের এক সৈন্য নিহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে আইডিএফ। চতুর্মুখী এই সংঘাত আরও কয়েক মাস দীর্ঘ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হচ্ছে। ট্রাম্প কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, তিনি ইরানের তেল চান। এ লক্ষ্যেই তিনি খার্গ দ্বীপে সৈন্য নামাতে পারেন। যদি সম্ভাব্য এই স্থল অভিযান শুরু হয় তাহলে সেটি হবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, স্থল অভিযান কয়েক সপ্তাহের কোনো বিষয় নয়। কেননা, সেখানে সৈন্যদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই তারা দ্বীপাঞ্চলে কয়েক মাস ধরে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে।

তেলের বাজারে আগুন: সোমবার আন্তর্জাতিক সময় সকাল সোয়া ১১টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ২.৪২ ডলার বা ২.২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১৬ ডলারে দাঁড়ায়। যা চলতি মাসে সর্বোচ্চ। মূলত যুদ্ধে হুতিরা যোগ দেয়ার ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কেননা, তারা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব এল মান্দেব প্রণালিতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তেল-বাজার সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভান্দা ইনসাইটস’-এর বন্দনা হারি বলেন, তেলের বাজার যুদ্ধের আলোচনার মাধ্যমে সমাপ্তির বিষয়টি প্রায় নাকচ করে দিয়েছে এবং সামরিক সংঘাতের তীব্র বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত রোববার ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা এবং যুদ্ধে নিহত ইরানি নেতাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া ব্যক্তিদের যৌক্তিক বলে মন্তব্য করলেও বন্দনা হারি এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ইসরাইলি হামলা: ইরান সোমবার আইআরজিসি’র নৌ-কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তিনি ইরানের নিহত নেতাদের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তবে এই হত্যাকাণ্ড এবং চার সপ্তাহ ধরে চলা মার্কিন-ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। কুয়েত সোমবার জানিয়েছে, দেশটির একটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে ইরানের হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পরবর্তীতে এই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। ইসরাইলের ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফাতে ইসরাইলি নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটির কাছে একটি শিল্প ভবন এবং জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে আঘাত হেনেছে হিজবুল্লাহ’র ক্ষেপণাস্ত্র। তাদের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধে জড়ানোর পর ইসরাইল জানিয়েছে, তারা একটি বাফার জোন বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির জন্য দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশ দখল করবে। এটি লেবাননের নাগরিকদের মধ্যে ইসরাইলি সামরিক দখলের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে, যা দেশটিতে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং আরও বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৫৫০ জন বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ১২৪০ জন নিহত হয়েছে। রয়টার্সকে দেয়া তথ্যে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২রা মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে, তবে সরকারি মৃত্যু তালিকায় এই যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া ইরাকে অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছে এবং ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছে।

লিমা

২ মাস আগে

ট্রাম্পের প্রস্তাব মুনাফিক মুসলমান ছাড়া আর কেউ মানবে না।তার সাথে আলোচনার প্রশ্নই আসে না।

মন্তব্য করুন