বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের পরেই যে শিল্পটি সবচেয়ে বেশি আশার আলো দেখাচ্ছে, তা হলো ওষুধ শিল্প। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে বর্তমানে এই খাতের পণ্য বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে এই রপ্তানি বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা যায়।
তবে ২০২৬ সালের শেষার্ধে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এই খাতের সামনে নতুন সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের ফার্মা শিল্প মূলত 'রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং' বা জেনেরিক নির্ভর। অর্থাৎ, অন্য দেশের আবিষ্কৃত ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করা হয়। বর্তমানে ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব বা পেটেন্ট ছাড় পাচ্ছে। ২০২৬ সালের পর এই সুবিধা সংকুচিত হবে। পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে তা হবে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে বিশেজ্ঞরা কিছু কৌশলের কথা বলছেন। তাদের মতে, জেনেরিক নির্ভরতা বজায় থাকলে অনেক অত্যাধুনিক ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা আইনিভাবে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এজন্য নিজস্ব মলিকিউল উদ্ভাবন না করলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। নতুন রোগ ও ভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলায় নিজস্ব ল্যাবরেটরি ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সুবিধা থাকা এখন বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। এজন্য গবেষণায় জোর দেয়া, দেশের পেটেন্ট আইনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মানদণ্ডে উন্নীত করা, বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে উৎপাদন শুরু করা, জনস্বার্থ রক্ষায় বিশেষ ক্ষেত্রে পেটেন্ট থাকা সত্ত্বেও ওষুধ তৈরির আইনি সুযোগ কাজে লাগানো এবং এপিআই (API) পার্কের দ্রুত বাস্তবায়ন এ শিল্পের কাঁচামাল সংকট দূর করার উদ্যোগ নেয়ায় ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাজিক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ-বাংলাদেশ (সিএসইআর) এর চেয়ারপারসন সাকিফ শামীম ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (BAPI) সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির। তারা বলছেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তবে সেই পথে রয়েছে পেটেন্ট জটিলতা ও কাঁচামাল আমদানির বাধা। আগামী কয়েক বছর হবে এই শিল্পের জন্য 'প্রস্তুতি কাল'। সরকারের নীতি সহায়তা, দ্রুত এপিআই পার্ক বাস্তবায়ন এবং কোম্পানিগুলোর গবেষণামুখী মনোভাবই পারে এই শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে এক নম্বর অবস্থানে নিয়ে যেতে।
মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার বলেন, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি কারখানার উৎপাদন মান তদারকি করা হচ্ছে। ডব্লিউএইচও (WHO) এবং আন্তর্জাতিক অন্যান্য মানদণ্ড অর্জনে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করছে সরকার। এলডিসি পরবর্তী সময়ে পেটেন্ট ইস্যুতে আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছি যাতে সাধারণ মানুষের ওষুধের দাম নাগালের বাইরে না যায়। তিনি বলেন, সরকার ওষুধ শিল্পের বিকাশে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছে। বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গবেষণায় উৎসাহ দিতে অধিদপ্তর সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে। ওষুধের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই কাঁচামাল উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সাকিফ শামীম বলেন, ওষুধ শিল্প এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। ইরান- ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে একদিকে ডলার সংকট, অন্যদিকে সব ধরনের জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের ওষুধের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বাড়ছে। আমাদের উচিত হবে ক্যান্সার বা বায়োটেক ওষুধের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়া। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) কর ছাড় এবং জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে এই খাতটি পোশাক শিল্পের মতো বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হবে। তিনি বলেন, দেশের ফার্মা খাতের মূলভিত্তি জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন। বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের গবেষকরা উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন।
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণ আমাদের জন্য একই সাথে ভীতি ও সম্ভাবনার। আমাদের এখন কোয়ালিটি কমপ্লায়েন্সে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি এপিআই পার্কে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করে, তবে আমরা বিশ্ববাজারে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক দামে ওষুধ দিতে পারব। তিনি জানান, ইরান- ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এখন জ্বালানি সঙ্কট শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় নানামুখী চাপে ওষুধ শিল্পখাত। চাহিদা মতো জ্বালানি না মিললে উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটবে। এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওষুধ শিল্পে জ্বালানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ওষুধ শিল্পে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের বিনিয়োগ হলেও অনেক কোম্পানি আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং বড় কোম্পানিগুলোর সাথে 'নলেজ শেয়ারিং' বা জ্ঞান বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ওষুধ শিল্পের মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) সংক্রান্ত যে চ্যালেঞ্জ আসবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই সময়টাতে যদি আমরা নিজেদের কাঁচামাল (API) উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারি, তবে ওষুধের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে আমরা প্রায়ই একটি সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরি। দেশীয় কোম্পানিগুলো আজ দেশের ওষুধের চাহিদার প্রায় সম্পূর্ণটাই পূরণ করছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের শিল্পায়নের একটি বড় অর্জন। তবে এই সাফল্যের ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে- আমরা কি দীর্ঘমেয়াদে একটি জেনেরিক-নির্ভর শিল্প কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছি যা ভবিষ্যতে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে?
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ফার্মা খাতের মূল ভিত্তি জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন। স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট ব্যবস্থায় পাওয়া বিশেষ সুবিধার কারণে আমরা কম খরচে ওষুধ উৎপাদন করতে পারছি, যা দেশের জনগণের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে। এই মডেল আমাদের শিল্পকে দ্রুত প্রসারিত করেছে কিন্তু একইসাথে এটি একটি "স্বাচ্ছন্দ্য নির্ভরতা" তৈরি করেছে-যেখানে গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। আমার দৃষ্টিতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
সাকিফ শামীম বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ফার্মা কোম্পানিগুলোর দিকে তাকালে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র দেখতে পাই। Pfizer, Novartis কিংবা Roche-তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কার। তারা তাদের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, যা তাদেরকে উচ্চমূল্যের পেটেন্টেড ওষুধ বাজারে আনতে সক্ষম করে। এমনকি ভারতও, যাকে আমরা জেনেরিক উৎপাদনের জন্য পরিচিত বলে জানি, এখন ধীরে ধীরে গবেষণাভিত্তিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে- Sun Pharma এবং Dr. Reddy's Laboratories এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তারই উদাহরণ।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। LDC থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক পেটেন্ট সুরক্ষা আরও কঠোর হয়ে উঠবে, যার ফলে জেনেরিক উৎপাদনের সুযোগ সীমিত হতে পারে। তখন যদি আমাদের গবেষণাভিত্তিক সক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমরা শুধু রপ্তানি বাজারেই নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বো। এর প্রভাব সরাসরি অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্প খাতের ওপর পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আমার মতে, এখনই সময় একটি কৌশলগত রূপান্তরের। জেনেরিক উৎপাদনের শক্তিকে ধরে রেখেই ধীরে ধীরে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
একইসাথে সরকারকে এমন একটি নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে গবেষণায় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবনকে টেকসই করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একইসাথে সবচেয়ে জটিল ধাপ হলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল-বিশেষ করে therapeutic trial-যেখানে একটি নতুন ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা বাস্তব রোগীর উপর যাচাই করা হয়। এই ধাপটি শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, বরং অর্থনৈতিক এবং নীতিগতভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ একটি ওষুধ বাজারে আসার আগে এই পর্যায়েই সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় এবং সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে সফল হওয়া অনেক সম্ভাবনাময় অণুও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপে এসে বাদ পড়ে যায়-যা বিনিয়োগকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তিনি বলেন, এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং এবং advanced data analytics-এর দিকে ঝুঁকছে। AI-এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ clinical data, genomic information এবং patient behavior pattern বিশ্লেষণ করে এমন insight বের করা সম্ভব, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে সময়সাপেক্ষ কিংবা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে patient selection বা recruitment পর্যায়ে AI একটি বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে-যেখানে সঠিক রোগী নির্বাচন করা গেলে trial-এর সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সময় কমে আসে। একইসাথে predictive modelling-এর মাধ্যমে একটি নতুন ওষুধ শরীরে কীভাবে কাজ করবে, তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে এবং কোন ক্ষেত্রে adverse effect দেখা দিতে পারে-তা অনেকটাই আগেভাগেই অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। এতে করে trial design আরও পরিশীলিত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও ঝুঁকি কমে যায়। Adaptive clinical trial design-এর মাধ্যমে real-time data analysis ব্যবহার করে চলমান গবেষণার মধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যাচ্ছে, যা প্রচলিত rigid trial structure-এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং সময়োপযোগী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে AI-নির্ভর গবেষণার একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে-বিশেষ করে আমাদের বৃহৎ patient base এবং রোগের বৈচিত্র্যের কারণে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে একটি বড় বাধা অতিক্রম করতে হবে-তা হলো structured এবং standardized data ecosystem-এর অভাব। বর্তমানে হাসপাতালভিত্তিক ডেটা অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন, অসম্পূর্ণ এবং ডিজিটালভাবে একীভূত নয়। AI কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হলে প্রয়োজন clean, interoperable এবং longitudinal data-যা ছাড়া উন্নতমানের গবেষণা সম্ভব নয়। Cancer, Cardiovascular Disease এবং Stroke-এর মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগগুলো এখন শুধু চিকিৎসা নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই রোগগুলোর প্রকৃতি এমন যে এগুলো একক কোনো কারণ দ্বারা নির্ধারিত নয়; বরং জেনেটিক, পরিবেশগত, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট-সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করে। ফলে এই ধরনের রোগের জন্য স্বল্পমেয়াদী বা বিচ্ছিন্ন গবেষণা কাঠামো যথেষ্ট নয়।
সাকিফ শামীম বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এই ধরনের রোগের ক্ষেত্রে longitudinal study, real-world evidence (RWE) এবং precision medicine approach-এর ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। Longitudinal study-তে দীর্ঘ সময় ধরে একই রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা রোগের progression এবং treatment response বোঝার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। অন্যদিকে real-world evidence clinical trial-এর বাইরের বাস্তব চিকিৎসা পরিস্থিতির তথ্য ব্যবহার করে, যা policy making এবং treatment guideline তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের জন্য এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ আমাদের জনগোষ্ঠীর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রা উন্নত বিশ্বের তুলনায় ভিন্ন। তাই বিদেশি ডেটার ওপর নির্ভর করে তৈরি করা চিকিৎসা নির্দেশিকা সবসময় আমাদের জন্য সর্বোত্তম ফল দেয় না। এখানেই স্থানীয় গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে hospital-based research model একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। বড় হাসপাতালগুলোতে যদি dedicated Clinical Research Unit (CRU) গড়ে তোলা যায়, যেখানে চিকিৎসক, গবেষক এবং ডেটা বিশ্লেষকরা একসাথে কাজ করবে, তাহলে দৈনন্দিন চিকিৎসা কার্যক্রম থেকেই গবেষণার জন্য মূল্যবান ডেটা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। Electronic Medical Record (EMR) system এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারে। একটি সুসংগঠিত EMR শুধু রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণ করে না, বরং একটি বিশাল ডেটাবেইস তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়। একইসাথে physician-led research culture গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-কারণ চিকিৎসকরাই বাস্তব সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে চিহ্নিত করতে পারেন। তবে তাদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হলে প্রশিক্ষণ, সময় এবং প্রণোদনার বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে গবেষণার অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো একটি সমন্বিত এবং দক্ষ নীতিগত কাঠামোর অভাব। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া, নৈতিক পর্যালোচনা (ethical review), ডেটা অ্যাক্সেস-সবকিছুই অনেক ক্ষেত্রে জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। এর ফলে গবেষণার গতি কমে যায় এবং অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি centralized digital research platform বা single-window system অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্মে গবেষণার প্রস্তাব জমা দেওয়া থেকে শুরু করে অনুমোদন, পর্যবেক্ষণ এবং রিপোর্টিং সবকিছু একসাথে করা গেলে সময় কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। একইসাথে ফার্মেসি, হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়-এই তিনটি স্তরের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা জরুরি। এই triple-helix model-এর মাধ্যমে গবেষণার একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র তৈরি করা সম্ভব, যেখানে জ্ঞান, ডেটা এবং বিনিয়োগ একসাথে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার তাত্ত্বিক ভিত্তি ও দক্ষ জনবল সরবরাহ করবে, হাসপাতাল দেবে বাস্তব তথ্য ও ক্লিনিক্যাল পরিবেশ, এবং ইন্ডাস্ট্রি দেবে অর্থায়ন ও বাজারজাতকরণের সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের গবেষকরা উন্নত প্রযুক্তি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন। একইসাথে এটি দেশের ফার্মা শিল্পকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে সহায়তা করবে। পরিশেষে, একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন-গবেষণাকে খরচ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। কারণ গবেষণার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও, এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যখাত, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে।
