মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ঔষধের কাঁচামাল বা অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) আমদানিতে চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খোঁজার জন্য জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে ঔষধ শিল্পের ক্ষেত্রে এমন আগাম প্রস্তুতি দেখালেও কৃষি খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, বিশেষ করে কৃষি রাসায়নিক পণ্য তথা বালাইনাশকের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এখনো কোনো বিশেষ ছাড় বা বিকল্প পরিকল্পনা করা তো দুরের কথা বরং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ খাত সংশ্লিষ্টদের। অথচ কৃষকের মুখে হাসি না ফুটলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন পূর্ণতা পাবে না, এই দর্শন থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। বলেছেন, কৃষিই হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
তথ্য-উপাত্তের নতি-পত্র ঘেটে দেখা গেছে, বালাইনাশক আইন ২০১৮ এবং সবশেষ বিধিমালায় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের যেসব সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। তার মধ্যে যেমন; বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে তাদের নির্দিষ্ট কাঁচামাল আমদানি করার অধিকার দেয়া হয়েছে উৎপাদনকারীদের। যেটা কৃষি, আইন ও বাণিজ্যমন্ত্রণায় যৌথভাবে উৎপাদনকারীদের পক্ষে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেকে নিদের্শনা প্রদান করেছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আমদানিকারকদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অধিদপ্তর। ফলে খুব সহজে কোনো বিনিয়োগ ও দক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়াই ড্রামে করে নিম্নমানের বিদেশি কীটনাশক দেশে এনে ছোট বোতলে বিক্রি করে শত কোটি টাকা মুনাফা করছে আমদানিকারকরা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজার হাজার কৃষক। তবে আগের মতোই কৃষি মন্ত্রণালয় নিরব-নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। আর এই সিন্ডিকেটের কৃষি অধিদপ্তরের একটি চক্র আমদানিকারকদের পক্ষ অবলম্বন করছে বলেও অভিযোগ উৎপাদনকারীদের।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার সাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত ২৪ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ঔষধের উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো উৎস বা অঞ্চলের ওপর (চীন ও ভারত) নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প দেশ বা উৎস অনুসন্ধানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আমদানিনীতি শিথিল করে বিকল্প দেশ থেকে দ্রুত কাঁচামাল আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৈশ্বিক এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষাকারী ঔষধের সরবরাহ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যেই এই আগাম প্রস্তুতি নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি কৃষি খাত নিয়ে কোনো পরিকল্পানাই নেই। চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কৃষি রাসায়নিক পণ্য ও বিশেষ করে বালাইনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যবসায়ীরা এখনো নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ শুল্ক হারে আটকে আছেন। কৃষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যদি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে কৃষি উপকরণের দাম আরও বেড়ে যাবে। অথচ এই খাতে কাঁচামাল আমদানিতে কোনো বিশেষ সরকারি সুবিধা বা ছাড়ের ঘোষণা এখন পর্যন্ত আসেনি। বরং এর প্রসারে শুল্ক বা অশুল্ক বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্মাসিউটিক্যালের মতো অ্যাগ্রাকেমিক্যাও একটি অপরিহার্য খাত। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষিতে। এই অবস্থায় কৃষির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার না দিলে আগামী মৌসুমে ধান ও সবজি উৎপাদন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির এক নেতা বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। বিকল্প উৎস না খুঁজলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এদিকে কৃষি রসায়ন খাতের এক উৎপাদনকারী আক্ষেপ করে বলেন, ঔষধের জন্য ছাড় দেয়া হলেও কৃষি রসায়ন কাঁচামাল আমদানির আমরা এখনো কঠোর নিয়মের মধ্যে আছি, যা আইন ও বিধির পরিপন্থে। অথচ খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকার ঔষধের মতো কৃষি রসায়ন খাতের কাঁচামাল আমদানিতেও সমমর্যাদা ও ছাড় প্রদান করবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তিনি আরও বলেন, সরকার ফার্মাসিউটিক্যালকে সহয়াতা দেবার জন্য এপিআই কেনার জন্য বহুমুখী উৎসকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কিন্তু অ্যাগ্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদনের জন্য বালাইনাশক কমিটি পেস্টিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (পিটাক) ও কৃষি মন্ত্রণালয় একক দেশ ও একক উৎস নির্ধারণ করেছে। এটা কার স্বার্থে? অর্থাৎ তারা সুকৌশলে দেশের কৃষি ও কৃষককে এবং আমাদের অর্থনীতিকে একটা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি করে রেখেছে। অথচ মন্ত্রী এবং সচিবদের সভাপতিত্বে আন্ত:মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তে কীটনাশক শিল্প এগ্রোকেমিক্যালকে হুবহু ঔষধ শিল্পের মতো সুবিধা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। শুধু গুটি কয়েক লোকের সুবিধা দেয়ার জন্য দেড় কোটি কৃষককে জিম্মি করেছে একটি সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটকে পুশে রেখেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যারা নিম্নমানের কীটনাশক দেশে এনে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কৃষি অধিদপ্তরের একটি চক্র আমদানিকারকদের সঙ্গে মিটিং করে তাদের পক্ষ অবলম্বন করে বলে উৎপাদনকারীরা অভিযোগ করেছেন।
সম্প্রতি ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে কৃষি, খাদ্য, মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতর মূল বুনিয়াদ কৃষি। সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসুচির মাধ্যমে কৃষকের মাঝে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। এরই মধ্যে দেশে খাল খনন কর্মসুচি চালু হয়েছে। কৃষিকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি করতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৃষি খাতকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি-ভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা আগামীর দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কৃষি ও খাদ্য বিভাগের সকলকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলকে দক্ষতার পাশাপাশি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ করবে। বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে দেশকে সবুজায়ন করতে হবে। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের এ আন্দোলন সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি ও ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুদ্ধাবস্থায় কৃষির রাসায়নিক পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে ঔষধের মতো সরকারের নির্দেশনা দেয়া দরকার। পৃথিবীর যেকোন দেশ থেকে কাঁচামাল ক্রয়ে যাতে কোন বাধা না হয়।
যুদ্ধের ক্ষতি মোকাবিলায় ঔষধের কাঁচামাল আমদানিতে তৎপর, নিষ্ক্রিয় কৃষি রাসায়ানিক খাতে
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
৩ মাস আগে
২৭ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬, ৮ঃ৪৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
