রাডার ফাঁকি দেওয়া মার্কিন এফ-৩৫ যেভাবে ধরাশায়ী করল ইরান

রাডার ফাঁকি দেওয়া মার্কিন এফ-৩৫ যেভাবে ধরাশায়ী করল ইরান

ফন্ট সাইজ:

অবশেষে ভেঙে পড়ল মার্কিন বিমান বাহিনীর অপরাজেয় থাকার অহংকার। যে এফ-৩৫ লাইটনিং-২ বিমানটিকে বলা হতো ‘আকাশের অদৃশ্য শিকারি’, ইরানের আকাশসীমায় তা কেবল দৃশ্যমানই হয়নি, বরং সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, স্টিলথ প্রযুক্তি বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার কৌশল আর নিশ্ছিদ্র নয়। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিগত ১৯ মার্চ ২০২৬ তারিখের গভীর রাতে ঘটে এই ঐতিহাসিক ঘটনা। স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ২টা ৫০ মিনিটে ইরানের কেন্দ্রীয় আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করার সময় বিমানটি আক্রান্ত হয়। ঘটনার সত্যতা মেলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এবং পেন্টাগনের বিবৃতিতে। তারা ঘটনা পুরোপুরি স্বীকার না করলেও জানায়, একটি মার্কিন এফ-৩৫ লাইটনিং-২ বিমান ইরানি আকাশসীমায় গোয়েন্দা মিশনে থাকাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরবর্তীতে সামরিক ম্যাগাজিন এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস নিশ্চিত করে, বিমানটি বিধ্বস্ত না হলেও এর বডি এবং উইং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করে, পাইলট শার্পনেল মিসাইলের খণ্ডাংশের আঘাতে আহত হয়েছেন। অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় বিমানটিকে নিকটস্থ একটি মিত্র ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করতে হয়। একই ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি। সেখানে দেখা যায়, একটি মার্কিন এফ-৩৫-কে টার্গেট করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান।

আমেরিকার এই ‘অদৃশ্য শিকারি’ এফ-৩৫ মূলত তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা রাডার তরঙ্গ শোষণ ও বিচ্ছুরণ করে নিজেকে আড়াল রাখে। এটি বেশ আধুনিক প্রযুক্তি। তবে বিশ্বজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা বা ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অন্যতম আরেক প্রযুক্তি হিট সিকিং। এর মাধ্যমে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা জেট ফাইটার আকাশে থাকাকালীন সময়ে এর ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ বা তাপচিহ্নকে টার্গেট করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়। এটি বেশ পুরোনো একটি পদ্ধতি। তবে রাডার ফাঁকি দেওয়া স্টিলথ প্রযুক্তির এফ-৩৫-কে ঘায়েল করতে সেই হিট সিকিং ক্ষেপণাস্ত্রই ব্যবহার করেছে ইরান। এমনটাই বলছে ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট।

একটি বিমান রাডার তরঙ্গ থেকে নিজেকে লুকাতে পারলেও তার শক্তিশালী ইঞ্জিন থেকে নির্গত ২০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ বা অবলোহিত বিকিরণ মহাকাশ থেকেও লুকানো অসম্ভব। ইরান তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘বাভার-৩৭৩’ এবং ‘মাজিদ’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত প্যাসিভ ইনফ্রারেড সার্চ অ্যান্ড ট্র্যাক সেন্সর ব্যবহার করেছে। এই সেন্সরটি রাডারের মতো কোনো তরঙ্গ পাঠায় না, বরং আকাশের কোথাও সামান্যতম তাপীয় পরিবর্তন ঘটলে তা শনাক্ত করে। ফলে এফ-৩৫-এর পাইলট টেরও পাননি যে, তাকে কেউ নীরবে লক্ষ্য করছে।

এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের কপালে ফেলেছে চিন্তার ভাঁজ। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জনক এবং বিখ্যাত ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ড. উজি রুবিন গত ২২ মার্চ ২০২৬ তারিখে দ্য জেরুজালেম পোস্ট-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন:
"আমরা দীর্ঘকাল ধরে স্টিলথ প্রযুক্তির ওপর অন্ধবিশ্বাস রেখেছিলাম। কিন্তু ইরান প্রমাণ করেছে যে, প্যাসিভ সেন্সর এবং মাল্টি-স্ট্যাটিক রাডার নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানকেও ধরাশায়ী করা সম্ভব। এটি পশ্চিমা সামরিক আধিপত্যের জন্য একটি বিশাল সতর্কবার্তা।"

একইভাবে মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এবং বর্তমান প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্ক ওয়েলশ পেন্টাগনের এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের পর সিএনএন-কে বলেছেন:
"ইরান আমাদের রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতাকে নয়, বরং আমাদের ইঞ্জিনের তাপীয় চিহ্নকে টার্গেট করেছে। প্রযুক্তির এই দুর্বলতাটি তারা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করেছে, যা আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল।"

ইরানের এই সফলতা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে দামী অস্ত্রই শেষ কথা নয়; বরং কৌশলী প্রয়োগই আসল। আমেরিকা এতদিন যে "এক মেরু" বিশ্ব শাসনের দম্ভ দেখাত, তার মূলে ছিল তাদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু ইরানের এই পাল্টা আঘাত সেই শ্রেষ্ঠত্বের দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, যদি এফ-৩৫-এর মতো বিমানই নিরাপদ না থাকে, তবে আগামী দিনের যুদ্ধে আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন