অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম, হার্ট অ্যাটাকে সময়ই জীবন

সাক্ষাৎকার

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম, হার্ট অ্যাটাকে সময়ই জীবন

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাকজনিত অকাল মৃত্যু কমাতে হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দেশ জুড়ে প্রাইমারি পিসিআই সেবা বিস্তৃত করা জরুরি বলে মনে করেন দেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. একেএম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম। তিনি বলেন, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইমারি পিসিআই সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষকে করতে হবে সচেতন। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
সম্প্রতি রাজধানীর পপুলার কার্ডিয়াক সেন্টার, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-এ মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম বর্তমানে পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-এর কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সরকার যে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে তার মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকসহ জরুরি সকল চিকিৎসা সেবা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক সহজলভ্য করা যাবে।
তার মতে, এই স্বাস্থ্য কার্ডের আওতায় হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ও ট্রমা সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশে অকাল মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা না গেলে হার্টের পেশি ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। তিনি জানান, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম দুই ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হার্টের পেশির বড় ক্ষতি হওয়া থেকে রোগীকে রক্ষা করা সম্ভব।

প্রাইমারি পিসিআই কী? জানতে চাইলে এই অধ্যাপক জানান, প্রাইমারি পিসিআই হলো হার্ট অ্যাটাকের সময় জরুরি ভিত্তিতে করা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ ক্যাথেটার রক্তনালীর মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ব্লক হওয়া ধমনিতে প্রবেশ করানো হয়। এরপর একটি বেলুনের মাধ্যমে ব্লক খুলে সেখানে স্টেন্ট বসানো হয়, যাতে ধমনির ভেতরে জমে থাকা বাধা দূর হয়ে রক্ত চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়। এই চিকিৎসা দ্রুত করা গেলে হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ডোর টু বেলুন সময় ৯০ মিনিট: অধ্যাপক মাসুম বলেন, যেখানে ক্যাথল্যাবসহ পিসিআই সেন্টার রয়েছে, সেখানে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর থেকে ব্লক খুলে স্টেন্ট বসানো পর্যন্ত সময়কে ‘ডোর টু বেলুন টাইম’ বলা হয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই সময়সীমা ৯০ মিনিট। তিনি বলেন, ক্যাথল্যাব থাকা হাসপাতালে ডোর টু বেলুন টাইম ৯০ মিনিটের মধ্যে রাখতে পারলে প্রাইমারি পিসিআইয়ের সফলতার হার অত্যন্ত বেশি হয়। ক্যাথল্যাব না থাকলে কী করতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব হাসপাতালে ক্যাথল্যাব না থাকায় অনেক সময় রোগীরা দ্রুত পিসিআই সেবা পান না। এই ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক মাসুম বলেন, যেসব হাসপাতালে ক্যাথল্যাব নেই, তারা রোগীকে প্রাথমিক

চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত পিসিআই 

সেন্টারে রেফার করবে। তিনি বলেন, রোগীকে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে পিসিআই সেন্টারে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি দুই ঘণ্টার মধ্যে পিসিআই সেন্টারে পাঠানো সম্ভব না হয়, তাহলে জরুরিভিত্তিতে থ্রোম্বোলাইটিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। এই ক্ষেত্রে টেনেকটিপ্লেজ বা স্ট্রেপ্টোকাইনেজ দিয়ে থ্রোম্বোলাইসিস করার পর রোগীকে দ্রুত পিসিআই সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া উচিত।

প্রতিটি জেলা পর্যায়ে এধরনের সেন্টার স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে এই চিকিৎসক বলেন, সরকার করতে পারে এসব সেন্টার। জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়ন করা আছে। জনবল নিয়োগ দিলেই চলে।
বাসা থেকেই চিকিৎসা শুরু করার ব্যবস্থা দরকার: অধ্যাপক মাসুম মনে করেন, হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলেই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশে ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস (ঊগঝ) বাসা থেকেই চিকিৎসা শুরু করে দেয়। বাংলাদেশেও ৯৯৯ জরুরি সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ কার্ডিয়াক রেসপন্স টিম চালু করা যেতে পারে। তার মতে, এতে রোগী বাসা থেকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হবে। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মাসুম। তিনি বলেন, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। সময় নষ্ট মানেই হার্টের পেশি নষ্ট হওয়া।

স্বাস্থ্য কার্ডে জরুরি চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত: অধ্যাপক মাসুম মনে করেন, সরকার যে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে জরুরি চিকিৎসা সেবাগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এই কার্ডের আওতায় হার্ট অ্যাটাক, সব ধরনের কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সি, স্ট্রোক, ক্রিটিক্যাল কেয়ার এবং ট্রমা কেয়ার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তার মতে, এই সেবাগুলো সহজলভ্য করা গেলে দেশের হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আরও পড়ুন:
Measles (হাম)

পপুলার কার্ডিয়াক সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা সেবা: অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া জানান, পপুলার কার্ডিয়াক সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা ক্যাথল্যাব সার্ভিস চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত এখানে প্রায় ১৫০টি প্রাইমারি পিসিআই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং রোগীদের কাছ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তার নিজের তত্ত্বাবধানে আরও ১৬১২টি হৃদরোগের ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা হয়েছে হাসপাতালটিতে। যার সফলতা হার ৯৮ ভাগেরও বেশি। রুটিন কেসে ক্যাজুয়ালিটি নেই বললেই চলে। অধ্যাপক মাসুম বলেন, দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ক্যাথল্যাবসহ জরুরি কার্ডিয়াক সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু করা গেলে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। সরকারি যেসব হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সেবা রয়েছে সেখানে ২৪ ঘণ্টা খোলে রেখে উল্লিখিত সেবাটি দেয়া যেতে পারে। তার মতে, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ জুড়ে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

হৃদরোগের ওষুধের দাম এখনো অনেক বেশি উল্লেখ করে অধ্যাপক মাসুম বলেন, এসব ওষুধের দাম কমানো উচিত। এটা খুবই জরুরি। আমি মনে করি এটা ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট করা সম্ভব। এক্ষেত্রে রোগীর কথা চিন্তা করা উচিত কোম্পানিগুলোর।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন