ঈদ উৎসবের অর্থনীতি এবং বৈষম্য

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

ঈদ উৎসবের অর্থনীতি এবং বৈষম্য

ফন্ট সাইজ:

আমাদের একটা বড় ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসব হচ্ছে ঈদ উৎসব। প্রতি বছর দু’টো ঈদ উৎসব পালিত হয় ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। সাদামাটা কথায় বললে- রোজার ঈদ এবং কোরবানির ঈদ। রোজার ঈদ আসে রমজান মাসে একমাস রোজা রাখার পরে এবং কোরবানির ঈদে কোরবানি দেয়া হয়। তবে এই তফাৎ নির্বিশেষে দু’টো ঈদই আনন্দের এবং উৎসবের। দু’টো ঈদই ভ্রাতৃত্বের, সৌহার্দ্যের, মিলনের। সেইসঙ্গে দু’টো ঈদের সঙ্গে নানান রকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা জন্ম দিয়েছে একটি ঈদের অর্থনীতির। ঈদের অর্থনীতির কিছু কিছু মাত্রিকতা দু’টো ঈদে অভিন্ন, আবার সে অর্থনীতির কোন কোন দিকের পার্থক্য রয়েছে দু’টো ঈদে। ঈদ উৎসব অর্থনীতির একটি সুস্পষ্ট মাত্রিকতা হচ্ছে অসমতা এবং বৈষম্য। রোজার ঈদের সময়ে মূল্যস্ফীতির মূল শিকার হন দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষেরা। সেহেরি এবং ইফতারের সময়ে তাদের আহারও থাকে ন্যূনতম এবং বৈচিত্র্যবিহীন। কোরবানির ঈদের সময়ে কোরবানির মাংসের জন্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভর করতে হয় ধনী গৃহাস্থলীর বদান্যতার ওপরে। ঈদের সময়ে কাপড় থেকে অন্যান্য কেনা-কাটার সময়েও বিশাল বৈষম্য এবং অসমতা চোখে পড়ে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে।
রোজার ঈদ দিয়েই শুরু করা যাক। সে ঈদের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকে মাসব্যাপী রোজা। এবং রোজার অর্থনীতির একটা মাত্রিকতাই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। রোজা শুরু হওয়ার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যায়- বিশেষত: যে সব জিনিস রোজার সময়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এই যেমন, ডাল, ছোলা পিঁয়াজ, তেল ইত্যাদি। দ্রব্যসামগ্রীর জোগানে সংকট থাকুক আর নাই থাকুক, রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতাটি মানসিক এবং ঐতিহ্যগত। মূল্যস্ফীতির সংস্কৃতিটি বাংলাদেশে রোজার মাসে যতটা প্রকট, অন্য কোনো সময়েই এরকমটা নয়। রোজার মাসে গৃহাস্থলীর ব্যয়ও বেড়ে যায়। রোজার সময়ে প্রত্যেক পরিবারই সেহেরি এবং ইফতারের সময়ে এটা-সেটা ভালো-মন্দ খেতে চায় এবং অন্যদেরও আপ্যায়ন করতে চায়। ফলে রোজার মাসে পরিবারের খাবার খরচ বৃদ্ধি পায়।
দু’টো ঈদ উৎসবেরই অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে কেনা-কাটা। ঈদ উৎসব উপলক্ষে সব পরিবারই তাদের সাধ্যমতো নতুন জামা-কাপড় কেনে। বিপণি কেন্দ্রগুলোর আয় এবং মুনাফা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে গত রোজার ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। পরিবারের কেনা-কাটা কোরবানির ঈদেও হয়ে থাকে। ঈদের সময়ে বাজারের বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্যে বিপণি কেন্দ্রগুলোতে নতুন লোক নিয়োগ করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় ঈদের সময়ে অস্থায়ী কর্মনিয়োজন বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ঈদের সময়ে শহরের বিরাট এক অংশের মানুষ ঈদ উদ্‌যাপন করতে শহর থেকে গ্রামে যান। এক কোটি থেকে দেড় কোটি মানুষ শহর থেকে গ্রামে ছুটি কাটাতে রওয়ানা হন। এই বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যাত্রীদের টিকিট ক্রয়, বর্ধিত পরিবহন ব্যবস্থা, আয় এবং মুনাফা। এ সব প্রক্রিয়া সে সময়ে অর্থনীতিকে বেগবান করে।
ঈদ উৎসব অর্থনীতির বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ঈদের কেনাকাটায়। ধনীরা যান প্রচণ্ডরকমের আলোকিত, সুসজ্জিত বিপণিবিতানগুলোতে তাদের ঈদের বাজার করতে। অর্থ সেখানে ব্যয়ের সীমারেখা টানে না। তিনটে প্রত্যক্ষ ঘটনার কথা বলি। এক ঈদের কেনাকাটার সময়ে একটি বিপণিতে এক ভদ্রলোক দোকানিকে বললেন, ‘এক লাখ টাকার ওপরে যদি কোনো লেহেঙ্গা থাকে, তাহলে দেখান। তার কমের কিছু দেখানোর দরকার নেই’। কন্যার জন্যে কেনাকাটা করছিলেন তিনি। অন্য এক ঘটনায়, একটি সম্ভ্রান্ত বিপণি কেন্দ্রের আরও সম্ভ্রান্ততর একটি বিপণি থেকে লক্ষাধিক টাকার পোশাক-আশাক কেনার পরে এক ভদ্র মহিলা আর একটি দোকানে গিয়েছিলেন, তার বাড়ির গৃহকর্মীর জন্যে কাপড় কিনতে। দোকানি ৬০০ টাকার একটি পোশাক দেখাতে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন, ‘এত দাম! ফতুর হয়ে যাবো যে।’ ‘আচ্ছা, ২০০ টাকার মধ্যে ঝি-চাকরদের দেয়ার মতো কিছু নেই আপনাদের দোকানে?’, জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তৃতীয় ঘটনাটির কথা বলি। একটি দোকানে এক কিশোরী ঈদের দিনের জন্যে তিন প্রস্থ পোশাক কিনেছিল- সকালবেলার জন্যে এক প্রস্থ, সেটা বদলিয়ে দুপুরে পরার জন্যে আরেক প্রস্থ, রাতের জন্যে আরেক প্রস্থ। তার ব্যাগ বহন করার জন্যে তার পাশে মলিনমুখে ময়লা কাপড় পরে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সমবয়সী আরেকটি কিশোরী। অনুমান করি ঐ বাড়ির গৃহপরিচারিকা।
অন্যদিকে ঢাকা শহরে দরিদ্র মানুষেরা ঈদের কাপড় কেনেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে, নানান সেতুর ওপরে-নিচে, ফুটপাথের ওপরে বসা অস্থায়ী দোকানগুলোতে। সেখানে পুরনো-নতুন কাপড় বিক্রি, দরদামের হাঁকাহাঁকি চলে, কি কিনতে চাই আর পকেটের রেস্ত কি, তা নিয়ে নীরব যুদ্ধ চলে। অনেক সময়ে ছেলেমেয়ের পোশাক কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। নিজেদের জন্যে কিছুই কেনা হয় না। বহু দরিদ্র পরিবারে অতীত ঈদের কাপড় দিয়ে বর্তমান ঈদ কাটানো হয়। ঈদের কেনাকাটার এও এক বাস্তবতা। সে বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয় ঈদের দিনের খাবারেও। একটুখানি সেমাই রান্না হলেই দরিদ্র পরিবারে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। একটা রঙ্গিন ফিতা, কিংবা আধ ডজন কাঁচের চুড়ি চোখে জল এনে দেয় কোনো দরিদ্র পরিবারের কিশোরীর।
কোরবানির ঈদের অন্যতম ব্যয় হচ্ছে কোরবানির পশু ক্রয়। এটি ঐ ঈদের একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল দিক। এবং সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যে কোরবানির অন্তর্নিহিত মর্মার্থ না বুঝে অনেক মানুষই উচ্চমূল্যে পশু ক্রয়ের একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন। ফলে বাজারে পশুর মূল্য চড়-চড় করে বাড়তে থাকে। উচ্চতম মূল্যে পশু ক্রয়ের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যারা নামেন, তারা ভুলে যান যে, অসমতার কত বিরাট নগ্ন প্রকাশে তারা নেমেছেন। এর সূত্র ধরেই দেখা যায় যে, বাজারে কেউ কেউ কোটি টাকার গরু কিনছেন, আবার কাউকে কাউকে গরুর ভাগ কিংবা একটি খাসি কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে, আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকার কারণে বহু মানুষ বাজারে পশুর হাটে প্রবেশাধিকার পায় না। অসমতার সেই প্রকাশ শুধুমাত্র পশুক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রদর্শনীর মধ্যেও ব্যপ্ত হয়। পাড়ায় বা মহল্লায় প্রতিবেশীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় কার ক্রীত কোরবানির পশু কতো ভালো এবং দামি। এই ব্যাপারটি একপর্যায়ে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই তুলনামূলক বিচারকালে বহু শিশুর ছোট হয়ে যাওয়া মুখ দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। একটি বৈষম্যের ধারণা তখনই শিশুমনে প্রোথিত হয়ে যায়।
কোরবানির পশু ক্রয়ের আরেকটি দিক হচ্ছে বাজারে পশুর জোগান। এই জোগানের একটি অংশ দেশের সীমান্তের বাইরে থেকে আসে- সুতরাং সেখানে একটি আমদানি প্রক্রিয়ার অর্থনীতি এবং তার গতিময়তা জড়িয়ে থাকে। বাজারে পশু জোগানের আর একটি উৎস হচ্ছে দেশজ। এবং এই জোগানের পেছনে একটি বিনিয়োগ এবং বছরব্যাপী পরিচর্যার প্রক্রিয়া কাজ করে। যেমন, গ্রামীণ কৃষকবধূরা স্বল্পমূল্যে একটি পশুশাবক কেনে- কখনো নিজের জমানো অর্থ দিয়ে, কখনো ঋণ করে। তারপর এক বছর বধূটি এই শাবকটিকে খাওয়ায়-দাওয়ায়, আদর-যত্ন করে, লালন-পালন করে। একবছর পরে যখন পশুটি যখন বড়-সড় হয়, তখন সেটা উচ্চমূল্যে বিক্রীত হয়। কোরবানির পশু জোগানের এই ব্যষ্টিক প্রেক্ষিতটি গ্রামীণ অর্থনীতি এবং গ্রামের বহু পরিবারের কুশল বর্ধনের পেছনে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বহু বেসরকারি সাহায্য সংস্থার এ জাতীয় কর্মসূচি রয়েছে। কোরবানির সময়ে কসাইদের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে পেশাজীবী নিয়মিত কসাইরা রয়েছেন, এবং অস্থায়ী অনিয়মিত কসাইরাও রয়েছেন। কসাইদের মজুরিভিত্তিক এই আয়-অর্থনীতিও ব্যাপ্ত। তবে তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে যে, অনিয়মিত ঋতুভিত্তিক কসাইদের অনভিজ্ঞতার কারণে বহু চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে কি এ সব অনিয়মিত কসাইদের জন্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়?
কোরবানির ঈদের সময়ে কোরবানির মাংসের জন্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভর করতে হয় ধনী গৃহাস্থলীর বদান্যতার ওপরে। বহু দুস্থ পরিবারে সারা বছরে ঐ একটা সময়েই মাংস খাওয়ার সুযোগ আসে। তবে কোরবানির মাংস পাওয়াটাও এক বিরাট যুদ্ধ। বিত্তবান এলাকার বাড়ির সামনে সকাল থেকেই বহু দুস্থ দরিদ্র মানুষের ভিড় জমে যায়। তারপর কোরবানির গোশত বিতরণের সময়ে কখনো কখনো কাড়াকাড়ি পড়ে যায়, মারামারি হয়- পুরো ব্যাপারটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। অসময় মাংস-প্রার্থীরা কখনো কখনো হতাহতও হন। তাই, বিত্তবানদের বাড়ির ভেতরে কোরবানির মাংস দিয়ে যখন পোলাও খাওয়া হচ্ছে, তখন সে বাড়ির ফটকের বাইরে ক’টুকরো গোশতের জন্য নিরন্ন মানুষের জনযুদ্ধ চলছে। বৈষম্যের এক বীভৎস চিত্র। ঈদের পরের দিন বহু বুভুক্ষু মানুষকে রাস্তার পাশের আবর্জনা ফেলার টিন ঘেঁটে বিত্তবানদের ফেলে দেয়া খাদ্যের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতেও দেখা যায়। সেইসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে মাংস সংগ্রহই তো বড় কথা নয়, তা রান্না করার আনুষঙ্গিক তেল-মসলার খরচও অনেকে জোটাতে পারেন না। বৈষম্যের এও এক দৃশ্যমান গল্প।
সুতরাং, যতই বলি না কেন যে, কেরবানির ঈদ ভ্রাতৃত্বের, সৌহার্দ্যের, মিলনের, দেয়ার চূড়ান্ত বিচারে, আমাদের সমাজ বাস্তবতায়, আমাদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে কোরবানির ঈদের অর্থনীতির মধ্যে অসাম্যের এবং সামাজিক বৈষম্যের বীজ লুকিয়ে আছে। এই বৈষমের সবকিছু আমরা দূর করতে পারবো না, কিন্তু এর নগ্ন বহিঃপ্রকাশের দিকগুলোতো আমরা দূর করতে পারি আমাদের সংবেদনশীলতার মাধ্যমে? কাজটা সেখান থেকেই শুরু হোক না কেন? 


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন