সিঙ্গাপুরে কালিদাস রবীন্দ্রনাথ সম্মিলন

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

সিঙ্গাপুরে কালিদাস রবীন্দ্রনাথ সম্মিলন

ফন্ট সাইজ:

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে সিঙ্গাপুর কি আপনার সেকেন্ড হোম? নিঃসন্দেহে উত্তরটা হবে হ্যাঁ বাচক। কারণ নিজ দেশ ছাড়া দ্বিতীয় আর যে দেশটি সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বেশি জানি সে দেশটি কিন্তু সিঙ্গাপুর। ডাক্তার হওয়ার আগে আমি কখনো বিদেশের মাটিতে পা রাখিনি। উনিশশ’ বিরানব্বইতে লেখাপড়ার জন্য আমি যেদিন সিঙ্গাপুর যাই ওটিই ছিলো আমার বিদেশের মাটিতে প্রথম পা রাখা। প্রথমবার ছিলাম টানা আড়াই বছর। তারপর থেকে আমি যতবার এই দেশটিতে নানা কারণে গেছি তার চেয়ে অর্ধেকবারও বোধহয় আমি পাশের দেশ ইন্ডিয়াতেও যাইনি। এই দেশটিতে হয়তো এমন কোনো রাস্তা নেই যে রাস্তায় অন্তত একবার আমি যাইনি। তাই হয়তো আমি সিঙ্গাপুর নামের দেশটির আদ্যপান্ত সবই জানি। আর জানবই না কেন, যে দেশটির অবস্থান মানচিত্রে দেখানো যায় না, অর্থাৎ ম্যাপে একটা বিন্দু বসালেও ওই বিন্দুর আয়তন স্কেলমাইলের হিসেবে সিঙ্গাপুরের মূল আয়তন থেকে বেশি হয়ে যায়, তাকে জানতে চিনতে আর কতোদিন লাগতে পারে ? ভাবা যায় কত ছোট এই দেশটি, সাকুল্যে সাতশ’ চুয়াল্লিশ বর্গ কিলোমিটার! আমাদের ঢাকা জেলার আয়তন প্রায় পনেরশ’ বর্গ কিলোমিটার অর্থাৎ একটি দেশের মোট আয়তন আমাদের দেশের একটা জেলার অর্ধেক। ক্ষেত্রমিতির নিরিখে এই দেশটি এত ক্ষুদ্র বলে ভূচিত্র জরিপকারীরা এই দেশটিকে বলে- খরঃঃষব জবফ উড়ঃ্থ অর্থাৎ ‘ছোট্ট লাল বিন্দু’। কার্যত একেবারেই ভূগোলশূন্য একটি দেশ হলো সিঙ্গাপুর। পূর্ব থেকে পশ্চিম, মাত্র একত্রিশ মাইল দীর্ঘ এই দেশটি এদিক থেকে অন্যদিকে গাড়ি চালিয়ে পার হতে গেলে, সময় লাগে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট। ম্যাপে জায়গা না হলেও এই দেশটি কিন্তু পৃথিবীর সব ভালো কিছুতে জায়গা করে নিয়েছে অনেক আগে থেকেই। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী কোন দেশের পাসপোর্ট সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী সে বিবেচনায় সিঙ্গাপুরের স্থান পৃথিবীতে প্রথম। দ্বিতীয় স্থানে জাপান আর তৃতীয় সুইজারল্যান্ড। ওই একই সূচকে খাতা কলমে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত আর নীলরক্তের দেশ ইংল্যান্ডের স্থান সপ্তমে আর সবচেয়ে দর্পী দেশ আমেরিকার স্থান দশমে। এই ‘ছোট্ট লাল বিন্দু’র দেশের মানুষরা বিনা ভিসায় পৃথিবীর একশ’ পঁচানব্বইটি দেশে যেতে পারে। আর পৃথিবীতে মোট দেশের সংখ্যাও ওই একশ’ পঁচানব্বই। তাই বিশ্বজুড়েই পাতা হয়েছে সিঙ্গাপুরিয়ানদের আসন। যখন তখন যেখানে খুশি সেখানেই উড়ে যাওয়া যায়। শুধু দু হাজার ছাব্বিশ সালই না, পর পর তিন বছর সিঙ্গাপুরিয়ানরা ডিপ্লোমেটিক স্ট্যান্ডিং-এ পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের অধিবাসী হিসেবে বিবেচিত। মানচিত্রে যারা ব্রাত্য, কৌলীন্যে তারা সর্বোত্তম। উনিশশ’ বিরানব্বই সালে কলম্বো প্ল্যানের স্কলারশিপ পেয়ে এই দেশটিতে আমার হয়েছিল প্রথম বিদেশ যাত্রা। ওইদিনই ইমিগ্রেশন করে বাইরে এসে দেখলাম আমার নাম লেখা একটা প্ল্যাকার্ড হাতে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে একেবারে মূল গেটের পাশে। ওই লোকটি যখন জানতে পারল যে, সে যার জন্য অপেক্ষা করছে ওই মানুষটি আমি, তখন সে সরাসরি আমাকে নিয়ে উঠিয়ে দিলো একটা কালো চকচকে লিমুজিন গাড়িতে। এমন বিলাসবহুল দীর্ঘায়িত মোটরগাড়ি এর আগে আমি কস্মিনকালেও দেখিনি। সময়টা উনিশশ’ বিরানব্বই, ঢাকার রাস্তায় তখনো লিমুজিন নামেনি, তাই আগে দেখার প্রশ্নই উঠে না। আমি এমন একজন মানুষ, যে নাকি প্রতি সপ্তাহে অন্তত দু’তিনবার গুলিস্তান-বালুঘাট লাইনের মুড়িরটিন বাসে এদিক ঠেলা ওদিক ঠেলা সামলিয়ে গোটা দশেক মানুষের গায়ের ঘামকে নিজের ঘামের সাথে মিশিয়ে, রীতিমতো ঘামের ককটেল বানিয়ে আসা-যাওয়া করি। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আমার তখনো প্রাইভেটকারে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বড়ই সীমিত। এমনই সামাজিক রেটিংয়ের একজন মানুষকে হোটেলে পৌঁছে দেয়ার জন্যে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে লিমুজিন! অবাক তো আমার হওয়ারই কথা। যে লোকটি আমাদের নেয়ার জন্য এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই মানুষটিই মুহূর্তে হয়ে গেল লিমুজিনের ড্রাইভার। হোটেলের নাম আমি আগে থেকেই জানতাম। এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের লায়ন সিটি হোটেলে আসতে সময় লাগলো মাত্র মিনিটি বিশেকের মতন। শুধু হোটেলটির নামটিই জানতাম কিন্তু ওই হোটেল দেখতে কেমন এবং স্টার রেটিং এর মানদণ্ডে এটি কোন গোত্রীয় তা আমার জানা ছিলো না, কারণ ওই যুগে ই-মেইল কিংবা ইন্টারনেটের প্রচলন ছিলো না। ড্রাাইভারটি আমাদেরকে হোটেলের মূল গেটে নামিয়ে দিয়ে শুধু বললো, এটাই নাকি আমাদের হোটেল। লোকটি এরচেয়ে বেশি একটা কথাও খরচ করল না, পেছনে চেয়ে দেখি লোকটা ফুড়ুৎ। ড্রাইভারটির আবির্ভাব আর তিরোধান দুটোই ছিলো অতি ঝটিতি। সে গাড়িতে বসে আমাদের সাথে একটা কথাও বলেনি, হাবভাব ছিল একেবারে রোবোটের মতন। পরে বুঝেছি শুধু ওই ড্রাইভারটিই নয়, অধিকাংশ চাইনিজদেরই ধরন-ধারণ প্রায় রোবোটের মতো। এদের কৌশলই একটা ‘কথা বলবো মেপে কাজ করবো ঝেঁপে’। এরপর শুরু আমার একের পর এক অবাক হওয়ার পালা। যেদিন আমি প্রথম লায়ন সিটি হোটেলে এলাম তখনো হোটেলে কী কী থাকলে কোন হোটেল থ্রি স্টার, কোন হোটেল ফোর স্টার আর কোন হোটেল ফাইভ স্টার হয় তার চৌহদ্দি নির্ধারণ করা আমার অজানা। যেটুকু সীমিত অভিজ্ঞতা আছে তা শুধুই নো-স্টার হোটেল সম্পর্কে। আদতে ওই সময়ে হোটেল সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিলো একেবারেই গন্ডিবদ্ধ। চারপাশে হোটেলের জাঁকালো ভাবসাব দেখে ভাবলাম বিদেশি অতিথি বলে দু একদিনের জন্য আমাদের হয়তো এই জেঁকো হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, নিশ্চয়ই দু একদিন পরে আমাদেরকে হাসপাতালের কাছাকাছি কোনো ডরমেটরি কিংবা ভাড়া করা কোনো ফ্ল্যাটে সরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু অবাক হওয়ার পালা আমার আর যেন শেষ হয় না। হোটেলের রিসেপসনিস্ট যখন ব্রিফ করার সময় আমাকে বললো যে, সিঙ্গাপুর ফরেন মিনিস্ট্রি আমার জন্য এই হোটেলের একটা ডিলাক্স রুম দু বছরের জন্য ভাড়া করেছে এবং শনিবার আর রোববার ফ্রিতে ব্রেকফাস্ট দেয়া হবে, তখন আমি মূকাভিনেতা হয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকলাম আর আমার চোখ দু’টি তখন ছানাবড়া। ওই মুহূর্তে কেউ যদি আমার চোখ দুটির ছবি তুলে রাখতো, তবে ওই ফটোগ্রাফ দেখে অন্যরা হয়তো বলতো, মানুষের চোখও কী অত বড় হয় কখনো! এয়ারপোর্ট থেকে এ পর্যন্ত এসে যা কিছু দেখছি তা-ই নতুন ঠেকছে। ঘরের চাবি হয় লোহা কিংবা পিতলের, একি কাণ্ড, অভ্যর্থনাকারিণী মেয়েটি আমার হাতে নেম কার্ডের মত দেখতে দু’টি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল, ও দুটোই নাকি আমার রুমের চাবি! দরজায় কার্ড ঠেকালে ঘরের তালা খুলে যায়, ওটাই আমার জীবনে প্রথম। রুমের দরজা খুলেই আমি যারপরনাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই, আক্ষরিক অর্থেই কাষ্ঠবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। চকে চকে বিছানাটার দিকে তাকাই আর ভাবি এই রাজপালঙ্কে ঘুমাতে গেলে আমার চোখে ঘুম নামবে তো, না আমাকে শয্যাজ্বলুনি রোগে ধরবে। ওয়াশরুমে ঢুকে দেখি ওখানে আছে আমাদের দেশের বড়োলোক বাড়ির ড্রয়িং রুমের মতো বাহুল্য। বাথরুম অত সুন্দর হতে পারে সে পূর্বঅভিজ্ঞতা তো আমার নেই। অভিজ্ঞতা যেখানে সীমিত, আশ্চর্য হওয়া তত সহজ। আমারও বোধকরি তা-ই হলো। ওয়াশরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবি ওই চকচকে ঝিকমিকে রাজসিক কমোডে মলত্যাগ করতে গেলে, সেই মল নিম্নগামী হবে, না তা অন্তরীক্ষের দিকে ধেয়ে উঠবে তা-ই বা কে জানে? কমপ্লিমেনটারি ভারিভুরি ডিনার খেয়ে যখন বিছানায় গেলাম, শুরু হলো নতুন বিভ্রাট। এত পুরু জাজিমে আগে কখনো ঘুমানোর অভিজ্ঞতা আমার নেই, শুতে যেয়েই দেখি আমার আস্ত শরীরটাই প্রায় জাজিমের মধ্যে লুকিয়ে যায়। মোটা খটখটে তোশকে যার ঘুমিয়ে অভ্যাস তার জন্য কী ওই তুলতুলে জাজিম মানায়? শিথানে আরেক উটকো ঝঞ্ঝাট, বালিশ শুধু মাথার নিচ থেকে পিছলে এদিক ওদিক সরে যায়। বালিশে মাথা থাকতেই চায় না, কী ফ্যাঁকড়া! হাত দিয়ে বালিশ টেপাটেপি করে কী দিয়ে এই বালিশ তৈরি করা হয়েছে তা অনুমান করার চেষ্টা করি, তবে বুঝতে পারলাম নিঃসন্দেহে এই বালিশ তুলোর বালিশ না, হয় এগুলো হাওয়াবালিশ না হয়তো কুশন বা ফোম বালিশ। ওই বালিশ মাথার নিচে বশে থাকতে চায়না। বিপত্তি দেখে বালিশ কে খাটের শেষপ্রান্তে ঠেস দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু অত কসরত করে কী আর চোখে ঘুম আসে ? আমি চলে যাই দূর অতীতে। আমার স্মৃতিশক্তি অতটা তীক্ষ্ম না, তবে তা পাখির মতো অত হ্রস্বও না। সময়টা ঊনিশশ’ বিরাশি কিংবা তিরাশি। আমার এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে কিন্তু তখনো রেজাল্ট বের হয়নি। ঠিক ওই সময়ই বার্মা (মিয়ানমার) থেকে সম্ভবত রোহিঙ্গারা অনেক বেশি সংখ্যায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। তখন যদিও আমরা ডাক্তার হই নি তবুও বাংলাদেশ রেডক্রস (বাংলাদেশ রেডক্রস নাম পরিবর্তন করে রেড ক্রিসেন্ট হয় ১৯৮৮ সালে)। যারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি তাদের নিয়ে একটা মেডিক্যাল টিম করে আমাদের পাঠিয়ে দেয় কক্সবাজার থেকেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যতোদূর স্মৃতি যায় জায়গাটার নাম ছিল হিৃলা, একেবারে পাহাড়ি এলাকা। একদিন শুক্রবার আমরা তিন বন্ধু মিলে রওনা হলাম টেকনাফ। আমাদের কারুর টেকনাফ ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না। সন্ধ্যা সাতটার পর যে টেকনাফ-কক্সবাজার রুটের বাস বন্ধ হয়ে যায় তা আমাদের জানা ছিল না। রাত আটটায় বাসস্ট্যান্ড এসে দেখি চারপাশ একেবারে নিঃশব্দ শুনশান। সকাল ছাড়া বাস নাই। কী বিপদ। টেকনাফে তখন হোটেলের সংখ্যা খুব একটা বেশি নেই। যে হোটেলেই যাই, ভাড়ার টাকায় কুলোনো যায় না। এই বন জঙ্গলের দেশে রাস্তায় থাকাও বিপজ্জনক। রাত দশটার দিকে একটা হোটেলের খোঁজ পাওয়া গেল, ভাড়া আমাদের সাধ্যের মধ্যে, কিন্তু হোটেলে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নাই। তাতে কী, আমরা কী এখানে শাস্ত্র অধ্যয়ন কিংবা টেলিভিশন দেখতে এসেছি নাকি? নেহায়েত বাঘ-ভল্লুকের ডিনার হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য হোটেলে উঠেছি। ওই হোটেলের রাতটা ছিল বড়োই শঙ্কিল। ও কথা মনে পড়লে এখনো আমার পাঁজরের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। হোটেলে দুইজন কর্মচারী ছিল, রাত এগারোটার দিকে তারা এসে বলল ওই হোটেলে ওই রাতে শুধু আমরা তিনজনই গেস্ট। এর সাথে যে বাক্যটি তারা যোগ করলো তা ছিল রীতিমতো বুকের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। লোকদু’টি বললো তারা রাতে কেউ হোটেলে থাকে না। বাইরে থেকে গেট বন্ধ করে দিয়ে প্রতিদিন তারা বাড়ি চলে যায়। তবে তারা অভয় দিয়ে বলল সকাল সাতটা নাগাদ তারা অবশ্যই হোটেলে ফিরে আসবে। আমার তো তখন দুর্গানাম জপ করার মতো অবস্থা। অর্থাভাবে এমন এক হোটেলে উঠেছি যেখানে রাতে কোনো হোটেল কর্মচারী থাকে না! আমাদের তখন সব কিছু মেনে নেয়া ছাড়া আর বেশিকিছু করার ছিলো না। লোক দু’টি বের হয়েই গিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ দেখলাম একটা লোক ফিরে এসে বলল, আমরা যেন সকালে জুতা পায়ে দেয়ার আগে সে গুলোর ভিতরটা পরীক্ষা করে নেই। কারণ এই এলাকায় নাকি সাপের উৎপাত আছে। ছোটো ছোটো বিষধর সাপ গুলি নাকি চামড়ার জুতা পেলেই ওতে যেয়ে লুকিয়ে থাকে। গত বছর নাকি জুতা পায়ে দিতে গিয়ে দু’তিনজন গেস্টের সাপের কামড় খেয়ে হাসপাতাল অব্দি দৌড়াতে হয়েছে। কী সর্বনাশা কথা রে বাবা। পেটের ভিতর হাত-পা সিঁধানো আতঙ্ক নিয়ে সারা রাত জেগে রইলাম আমরা তিন বন্ধু। আজ মনে মনে ভাবি সময় কী করে বদলে যায়। যে মানুষটা টাকার অভাবে একটা সাধারণ মানের হোটেলে রাত কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই মানুষটাই আজ সিঙ্গাপুরের অভিজাত লায়ন সিটি হোটেলের পালঙ্কে শুয়ে আছে। সেদিনের সাথে বর্তমান একেবারেই মিলে না। মিল শুধু এক জায়গায় আর সেটি হলো ‘ঘুম আসে না’। টেকনাফের হোটেলে চোখে ঘুম আসেনি, ঘুমাতে পারিনি সাপের ভয়ে আর অন্ত্যজ শ্রেণির হোটেলের আজব আচরণ ও কাজকারবারের জন্য আর ওইদিন সিঙ্গাপুরের হোটেলে রাতে ঘুম আসছিল না প্রথম দেখা অতি উচ্চমার্গীয় আভিজাত্যের বিষয়-আশয় দেখে। টেকনাফের ওই পোড়োবাড়ির মতো হোটেলে (হোটেলের নামটি এখন আর স্মৃতির জানালায় ধরা দেয় না, নাম ভুলে গেছি) থাকা মানুষটির লায়ন সিটি হোটেলের বিছানায় ঘুমানোটা অনেকটা হেজে-মজে যাওয়া পুকুরে ডুব দেয়া মানুষটির জন্য অমৃতের সাগরে অবগাহন করার মতো অনুভূতি। বিষয়টা একেবারে অজ্ঞাতকুলশীল চালচুলোহীন প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের রাজপ্রাসাদ দর্শনের মতো। দিন বদলায় সব কিছু বদলে যায়। আমিও বদলে গেছি এতটুকু না সবটুকু। ছাব্বিশ সালে এসে ওই লায়ন সিটি হোটেলের মানের হোটেলেও ইদানীং আমার রুচে না, অনেকটা অপাঙ্‌ক্তেয় বলে অনুমান হয়। রুচবেই বা কেন, ইতোমধ্যেই যে হায়াত, তাজ, ফোর সিজন্স, মেরিয়ট আর সাংগেরিলা হোটেলের বিছানায় ঘুমানোর আয়েশ পেয়ে গেছি একাধিক বার।
পাঠকের অবগতির জন্য বলে রাখা ভালো যে, যদিও ওই হোটেলটি আমার জন্য দু বছরের জন্য বুকিং করা হয়েছিল কিন্তু আমি ওখানে দু সপ্তাহের বেশি থাকিনি। প্রথমদিন সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে যেয়েই বুঝেছিলাম ওই স্টার রেটেড হোটেলে থেকে আয়েশ করে চর্ব্য-চূষ্য-লেহ্য-পেয় সব কিছু খাওয়া হবে ঠিকই কিন্তু জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য পড়ে রবে। আয়েশী জীবনে আর সব হয়, শুধু লেখাপড়া ছাড়া। সোনার কলম দিয়ে যেমন পৃথিবীর কোনো সেরা মাস্টারপিস গ্রন্থ রচিত হয়নি, ঠিক তেমনি জাঁকালো পরিবেশে থাকলে মা সরস্বতী জানালা দিয়ে পালাবে। সিঙ্গাপুরের ফরেন মিনিস্ট্রি যখন জানলো যে আমি হোটেলে থাকতে চাই না এবং আমার জন্য হাসপাতাল সংলগ্ন ডরমেটরিই যথেষ্ট তখন তারা বেশ অবাক হয়েছিল। যে মানুষটি আমাদের স্কলারশিপের বিষয় গুলো দেখভাল করতো সে একদিন আমাকে হেসে বলল, তারা নাকি আমাকে বেতন (বৃত্তি) দিবে মাসে এক হাজার ডলার আর হোটেল ভাড়া বাবদ তাদেরকে ওই হোটেলকে দিতে হতো প্রতিমাসে বারোশ’ ডলার (এই হিসাব তিন দশকেরও বেশি সময় আগের কথা। এখন লায়ন সিটি হোটেলের একদিনের ভাড়া দেড়শ’ দুশ’ ডলার)। কষ্ট না করলে বিদ্যা শিক্ষা করা যায় না, তাই একদিন হোটেল ছেড়ে উঠে গেলাম হাসপাতালের ডরমেটরিতে যেখানে হাসপাতালের অন্যান্য রেসিডেন্ট ডাক্তাররা থাকতো। বিদেশে কেউ ডাক্তারি শিখতে গেলে কাজ শিখতে হবে রাতে, যখন খুব বেশি কনসালটেন্ট হাসপাতালে থাকে না। অফিস টাইমে কেউ কোনো কিছু ধরতে দিতে চায় না। সব দেশে একই নিয়ম, কাজ শিখতে হয় অফ টাইমে।
প্রথম দিকে সিঙ্গাপুরে আমার তেমন কোনো চাইনিজ বন্ধু ছিলো না। হোস্টেলে এসে পেলাম ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহর থেকে আসা কার্ডিওলজিস্ট ডা.গুনাওয়ান কে। সে তখনই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। পেশার বাইরে চাইনিজ ডাক্তারদের সাথে তেমন একটা কথা বলি না, কারণ তাদের ইংরেজি উচ্চারণ বোঝা তখনো রপ্ত করে উঠতে পারিনি। মনে সদা হীনস্মন্যতা, ওরা কিছু বললো আর আমি তা বুঝলাম না, এই হীনচিত্ত মনোভাবটা আমার অবয়বে সব সময় সেঁটে থাকতো। নবিশদের জন্য চাইনিজদের ইংরেজি বোঝা কিন্তু খুব একটা সহজসাধ্য কম্ম না, কারণ এদের ইংরেজি বলার ঢং হলো অর্ধেক ঠোঁটে আর বাকি অর্ধেক অঙ্গভঙ্গিতে। কিছু কিছু বিষয় অনুমানেই বুঝে নিতে হয়।
সিঙ্গাপুরে যেয়ে লাগেজ খুলেই দেখলাম আমার দু তিনটা স্টেথোস্কোপ মালপত্রের চাপে প্রায় অকেজো হতে বসেছে। ও নিয়ে আমি প্রথম দিন থেকেই ঈষৎ মনমরা। পাঠকের হয়তো মনে হতে পারে এক ডাক্তারের এতগুলো স্টেথোস্কোপ থাকবে কেন? একটা হলেই তো চলে। কিন্তু আমার স্টেথোস্কোপ গলায় দিয়ে হাসপাতলে যাওয়া আমার শখ। আমার বন্ধু-বান্ধবীরা সবাই তা জানে। শুধু এটাই না, আমার আরো কিছু অদ্ভুত আর রকমারি কিংবা বিচিত্র সখ আছে। যেমন এক জামা পরে কিংবা এক ঘড়ি হাতে দিয়ে পরপর দুদিন হাসপাতালে যেতে আমার ভালো লাগে না। গলার টাই কিংবা ব্লেজারের বেলায় ঠিক একই অবস্থা। অনেকে বলে আমার ঘরে যতোগুলো বিদেশি নানা ব্র্যান্ডের পারফিউম আছে অত ভ্যারাইটি একটা পারফিউমের দোকানেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর । যখন সিঙ্গাপুর ছিলাম তখনো আমার ঘড়ি কালেকশনের সাধ ছিল। ওই সময়ও দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি কেনার সাধ ছিলো ঠিকই কিন্তু সাধ্য ছিলো অতি সীমিত। তিন দশক আগে আমার কালেকশনের সবচেয়ে উচ্চমার্গীয় ঘড়ির ব্র্যান্ড ছিলো সিকো ফাইভ কিন্তু দিন বদলের সাথে সাথে হাওয়া বদলে গেছে। ইদানীং কিছু অর্থাগম হওয়াতে আমার ঘড়ির সরেস ব্র্যান্ডে পাটেক ফিলিপও জায়গা করে নিয়েছে। আমার এসব শখ (বাতিক) দেখে অনেকে রগড় করে বলে যে, শুধুমাত্র একজন সতীসাধ্বী বৌ ছাড়া আমার সবকিছুই একাধিক কিংবা অগুনতি। যার শখ এত বিচিত্র তার কাছে সাত আটটা স্টেথোস্কোপ থাকা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় না। সিঙ্গাপুরে যেয়েই বুঝলাম প্লেনে আসার সময় লাগেজের চাপে আমার অন্তত তিনটি স্টেথোস্কোপের কোনোটার ডায়াফ্রাম, কোনোটার বেল আবার কোনোটার টিউবে বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সব গুলো স্টেথোস্কোপই থ্রি-এম কোম্পানির। কোথায় যেয়ে আমার এই স্টেথোস্কোপ গুলো সারাবো, কোথায় থ্রি-এম কোম্পানির অফিস সে সম্পর্কে কিছুই জানি না। একদিন একজন কার্ডিয়াক টেকনেশিয়ান আমাকে বললো এই শহরের সেরাঙ্গুন এলাকায় মোস্তাফা সেন্টার নামে একটা আজব শপিং মল আছে, সেখানে নাকি সুই থেকে শুরু করে কফিন পর্যন্ত সব কিছু পাওয়া যায় এবং ওই শপিং মল নাকি চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। রাতে গেলাম মোস্তাফা সেন্টারে কিন্তু কাজ হলো না। সেখানে নানা রকমের স্টেথোস্কোপ আছে ঠিকই কিন্তু স্টেথোস্কোপ মেরামতের ব্যবস্থা নেই। এখন কী করি, ওই সময়টা তো আর ইন্টারনেটের যুগ ছিলো না যে, গুগল মাস্টারের কাছে যা জানতে চাইবো সে তা-ই ঠিক ঠিক বলে দিবে নিমেষে। এরপর একদিন আমার ইন্দোনেশিয়ান বন্ধু গুনাওয়ানের কানে আমার স্টেথোস্কোপের দুর্দশার বিষয়টা তুললাম। গুনাওয়ান আমার থেকেও এক বছর আগে এখানে ট্রেনিং করতে এসেছে, আর তা ছাড়া ছোটো বেলা থেকে ও কতবার এই দেশে এসেছে আর থেকেছে, তা ও নিজেই মনে করতে পারে না। কথা ঠিক। মালয়েশিয়ান আর ইন্দোনেশিয়ানদের জন্য সিঙ্গাপুর দেশটি অনেকটা ধানমণ্ডি গুলশান ভ্রমণের মতো। ও আমাকে বলল এই শহরের আপার থমসন রোডে থ্রি-এম কোম্পানির একটা সার্ভিস সেন্টার আছে। ওখানে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমার তখনো সিঙ্গাপুরের রাস্তাঘাট জানা চেনা তেমন একটা রপ্ত হয়ে ওঠেনি, গুনাওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে এক বিকেলে রওনা হলাম থ্রি-এম সার্ভিস সেন্টারের দিকে, অর্থাৎ আপার থমসন রোড। তবে বাসে করে কিংবা কারে করে যাইনি। গিয়েছিলাম এম আর টি (মাস্‌ র‌্যাপিড ট্রানজিট) করে, অর্থাৎ লন্ডনের পাতাল রেলওয়ে সদৃশ বাহনে। ছোট্ট একটা দেশ কিন্তু মাটির নিচে একশ’ চল্লিশটি রেলস্টেশন! তবে এমআরটি মূলত পাতাল রেলওয়ে হলেও সব সময় পাতালে থাকে না, কিছু জায়গায় মাটিতেও ছোটে। মে ফ্লাওয়ার রেল স্টেশনে নেমে হেঁটে সার্ভিস সেন্টারে। একটা অত্যুচ্চ গগনচুম্বী অট্টালিকার একটা ফ্লোরে ছিল এই সেন্টার। আমার বন্ধু আমাকে সাহায্য না করলে আমার পক্ষে এই সেন্টারের হদিস পাওয়া কঠিন হতো। পাঁচ মিনিটে কাজ শেষ। ওরা বলে দিল তারা দুদিনের ভেতর আমার তিনটা স্টেথোস্কোপই সারিয়ে দিবে। দু’দিন পর আবার আপার থমসন রোড। সেদিন ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ছিলো। আমরা দু’জনই হেঁটে যাচ্ছিলাম রেল স্টেশনের দিকে। রাস্তায় কিছু একটা কেনার জন্য গুনাওয়ান যেয়ে ঢুকলো একটা শপিং মলে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একটা চৌরাস্তার মোড়ে, একটা বাসস্টপেজের শেডের নিচে। হঠাৎ করেই আমার চোখ যায় আমার মাথার ঠিক উপরে একটা অ্যাভিনিউ’র নামফলকের দিকে এবং ওখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে- ্তুঞধমড়ৎব আবহঁব্থ (টেগোর অ্যাভিনিউ)। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামকরণে যে এই অ্যাভিনিউ’র নাম রাখা হয়েছে তা সহসা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথের নামে কেন চাইনিজ অধ্যুষিত একটি দেশ একটি ব্যস্ত অ্যাভিনিউ’র নাম রাখবে, আমার কাছে তা যেন সহজে বোধগম্য হতে চাইছিল না। খটকা লেগে গেল। পৃথিবীতে ‘টেগোর’ ওই একজনই আছেন, যিনি আমাদের সবার গুরুদেব। তাঁর নামে আমেরিকা ইউরোপের নানান দেশে ভাস্কর্য, পার্ক, একাডেমিক ভবন, সরণি সহ নানা কিছু আছে, যা আমি চাক্ষুষ দেখেছি, তবে তা সিঙ্গাপুর যাওয়ার অনেক পরে, আগে নয়। বর্তমান কালের আমি হলে ‘টেগোর অ্যাভিনিউ’ দেখে আমি মোটেই অবাক হতাম না, কারণ দেশে বিদেশে ডজন ডজন রবীন্দ্র স্মারক দেখে আমার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। আর পূর্ব অভিজ্ঞতা সর্বদাই মানুষের অবাক হওয়ার ভাবাবেগকে ভোঁতা করে দেয়। আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নাই, তাই একটু হলেও ধন্দে পড়ে গেলাম ওইদিন। মনে মনে ভাবি চাইনিজরা অতি যান্ত্রিক ঘরানার মানুষ। আমার এখনো মনে আছে, সেদিন ছিলো ফুটবলের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল খেলা কিন্তু আমার বন্ধুদের কাউকেই খেলা সম্পর্কে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস কিংবা স্থির হয়ে টেলিভিশনের সামনে বেশিক্ষণ বসতে দেখলাম না। সিঙ্গাপুরিয়ানদেরকে দেখেই আমার প্রথম মনে হলো যাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়) মহাশয় বোধ হয় চাইনিজদের দেখেই তাঁর কিংবদন্তি সৃষ্টি ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থে লিখে গেছেন ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। সিঙ্গাপুর এসেই আমার মনে হয়েছিল অতি যান্ত্রিকতার কারণে এই দেশটির মানুষের ভেতর থেকে আবেগ অনুভূতি আর যতির (বিরতি) আনন্দ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এমনি শুষ্কহৃদয়ের দেশের মানুষরা একজন বাঙালি কবির নামে দেশের একটা প্রধান কমার্শিয়াল এরিয়ার নামকরণ করবে খটকাতো লাগতেই পারে। তবে পরে অবশ্য আমার এ ভুল ভেঙে গেছিল। কিছুক্ষণ পরে গুনাওয়ান আমার কাছে ফিরে এলো। আমি জানি এই দেশটি সম্পর্কে সে অনেক কিছুই জানে। ও কাছে আসার সাথে সাথেই আমি এই অ্যাভিনিউটির নাম কেন ‘টেগোর অ্যাভিনিউ’ সে সম্পর্কে ও কিছু জানে কিনা তা জানতে চাইলাম। উত্তর পেতে দেরি হলো না। গুনাওয়ান আমাকে বললো ইন্ডিয়াতে একজন বিশ্ব বিখ্যাত কবি আছেন যার নাম রবীন্দ্রনাথ টেগোর এবং তিনি একজন নোবেল লরিয়েট। ইন্দোনেশিয়ান হলেও আমার এই বন্ধুটি জীবনের বেশিরভাগ সময় লেখাপড়া করেছে লন্ডনে। সে জেনে গেছে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সে শুধু জানে না এইমাত্র যে কবির নাম সে উচ্চারণ করল, তাঁর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী! আর জানে না বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়ার ভৌগোলিক দূরত্ব কতটুকু। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম গুনাওয়ানের মুখের দিকে, যখন ও আমাকে টেগোরের লেখা ‘সং ওফারিংস’ (গীতাঞ্জলি) সম্পর্কে একটু-আধটু জ্ঞান দিতে থাকলো। ইন্দোনেশিয়ান এক ডাক্তার এক বাঙালি ডাক্তারকে টেগোরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, এর চেয়ে চমকদার বিষয় আর কী হতে পারে! দু’ ঠোঁট সেলাই করে দিলে মানুষ যেমন নির্বাক হয়ে যায়, আমার অবস্থা তখন ঠিক তেমনি। আমি গুনাওয়ানকে মুখে কিছুই বললাম না, কিন্তু মনে মনে খুশি হলাম এই ভেবে যে, ইন্দোনেশিয়ার এই ডাক্তারটি রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হলেও জানে। গুনাওয়ান তো আর জানে না যে আমি পেশায় ডাক্তার হলেও নেশায় লেখক। সংবাদ, ইত্তেফাক আর সাপ্তাহিক রোববার’-এ এক যুগ চাকরি করে তবে আমি ডাক্তারি শিখতে সিঙ্গাপুর গেছি। রবীন্দ্রনাথ বরাবরই আমার লেখাজোখার একটা প্রধান বিষয়। সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগেই রোববার, বিচিত্রা আর সচিত্র সন্ধানীতে রবীন্দ্রনাথের উপর আমি অন্তত দু’ডজন নিবন্ধ লিখে ফেলেছি। কিন্তু আমি এ কথা গুলো গুনাওয়ানকে বললাম না। একজন বিদেশি ছেলে আমাকে ‘টেগোর অ্যাভিনিউ’র টেগোরেকে চেনালো এটা কী আমার দুর্ভাগ্য? মোটেই না। বরং আমি সাতিশয় আনন্দিত এই ভেবে যে, দুনিয়ার মানুষ আমাদের গুরুদেবকে চেনে জানে।
ট্রেনে চড়ে যখন টেগোর অ্যাভিনিউ থেকে আমার ডরমিটরি, হাউজম্যান কোয়ার্টার্সে ফিরছিলাম তখন এই ভেবে হাসি পাচ্ছিল যে, আমি না হয় স্টেথোস্কোপ সার্ভিসিং করতে এই অ্যাভিনিউতে এসেছিলাম কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কী কখনো তাঁর স্টেথোস্কোপ সারাতে এই এলাকায় এসেছিলেন !! তিনি ডাক্তারি করার সময় কী কখনো স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করেছেন! পাঠক হয়তো ভাববেন তিনি ছিলেন লেখক কবি তিনি কেন ডাক্তারি করতে যাবেন? আদতে কিন্তু তিনি প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ডাক্তারি করতেন। এবং তাঁর একটা ডিসপেন্সারিও ছিল। অ্যালোপ্যাথিতে তাঁর বিরাগ ছিল, তিনি প্র্যাকটিস করতেন হোমিওপ্যাথি। রবীন্দ্র-জীবনী পাঠকরা জানবেন, ডাক্তারি করা তাঁর এক ধরনের বাতিক ছিল। বোলপুর অর্থাৎ শান্তিনিকেতনের আশপাশে সাঁওতাল গ্রাম আছে এবং এরা রবীন্দ্রনাথকে লেখক হিসেবে যতনা চিনতো তার চেয়ে বেশি চিনতো ডাক্তার হিসেবে। শুধু তিনি নন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), এমন কী মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) ও অ্যালোপ্যাথিতে আস্থা রাখেননি।১ বিদ্যাসাগর প্রতিদিন বিনা ফিতে রোগী দেখতেন।২ ১৯৩৬ সালের ৩রা আগস্ট গান্ধীজি তো বলেই ফেলেছেন ্তুঐড়সবড়ঢ়ধঃযু পঁৎবং ধ মৎবধঃবৎ ঢ়বৎপবহঃধমব ড়ভ পধংবং ঃযধহ ধহু ড়ঃযবৎ সবঃযড়ফ ড়ভ ঃৎবধঃসবহঃ. ঐড়সবড়ঢ়ধঃযু রং ঃযব ষধঃবংঃ ধহফ ৎবভরহবফ সবঃযড়ফ ড়ভ ঃৎবধঃরহম ঢ়ধঃরবহঃং বপড়হড়সরপধষষু ধহফ হড়হ-ারড়ষবহঃষু্থ.৩ এই নন ভায়োলেন্ট শব্দটি নিয়ে অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তাররা আপত্তি তুলতেই পারেন। তবে কী অ্যালোপ্যাথি ডাক্তাররা ভায়োলেন্ট অর্থাৎ হিংস্রভাবে/কঠোরভাবে/ভীষণভাবে কিংবা প্রচণ্ডভাবে রোগীর চিকিৎসা করে? আর হোমিওপ্যাথির ডাক্তাররা অহিংস/হিংসামুক্ত কিংবা শান্তিপূর্ণ ভাবে চিকিৎসা করে? গান্ধীজির এই হোমিওপ্যাথি বন্দনাতেও তাঁর অহিংস নীতির ছোঁয়া আছে। রবীন্দ্রনাথও কিন্তু অ্যালোপ্যাথি পদ্ধতির চিকিৎসার ব্যাপারে গান্ধীজি থেকে এক কাঠি সরেস। রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন ব্যারিস্টার হতে কিন্তু সেই লেখাপড়া সূচনাতেই শেষ। হয়েছেন কবি। কিন্তু তর্কের খাতিরে বলাই যায় রবীন্দ্রনাথ যদি লেখক না হতেন তবে তিনি কী হতে চাইতেন। হয়তো তিনি ডাক্তারই হতে চাইতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায়ই বলতেন, পীড়িতের সেবা করতে গেলে ডাক্তার না হয়ে উপায় নেই। তিনি নিজেই তাঁর মনের কথাটি খুলে বলেছেন ‘এক এক সময় আমার মনে হয় আমি যদি ইচ্ছে করতুম তাহলে ভাল ডাক্তার হতে পারতুম’।৪ গুরুদেবের এ কথাটাতেই বোঝা যায় ডাক্তারি পেশার দিকে তাঁর একটা সুপ্ত ঝোঁক ছিল। তবে তা অ্যালোপ্যাথিতে না, হোমিওপ্যাথিতে। রবীন্দ্রনাথ একবার লেখালেখির জন্য গিয়েছিলেন রামগড় পাহাড়ি এলাকায়। আমরা জানি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি দিয়েছিল, তাই রামগড়ের ঠিকানায় যে চিঠিই যেত তাতে লিখা থাকতো ‘ডক্টর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। রামগড়ের পোস্টমাস্টার ‘ডাক্তার’ আর ‘ডক্টর’ এর পার্থক্য বুঝে উঠতে পারেনি। তিনি রটিয়ে দেন রামগড়ে কলকাতা থেকে এক বিখ্যাত ডাক্তার এসেছেন। আর যায় কোথায়! রবীন্দ্রনাথের পাহাড়ি বাড়ি ‘হৈমন্তী’তে রোগী সামলাতে শুরু হয়ে গেল হুটোপাটি। রোগীর ভিড় সামলাতে খোলা হলো ডিসপেন্সারি। এমন কী অ্যালোপ্যাথ ডা. পশুপতি ভট্টাচার্য মহাশয়ও তার স্ত্রী’র পেটব্যথা সারাতে ধন্না দিলেন ডক্টর রবীন্দ্রনাথ সকাশে।৪ তবে অ্যালোপ্যাথিতে রবীন্দ্রনাথের কোনো বিশ্বাস ছিলো না। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার মহার্ঘতা সম্পর্কে কবি নিজেই লিখেছেন ‘একে তো অভিজ্ঞ ডাক্তার বহুমূল্য, তার উপরে তারা প্রায়ই অভিজ্ঞ শুশ্রূষার দাবী করেন। ব্যয় সম্বন্ধে একে বলা যায় ডাবল-ব্যারেল বন্দুক। রোগীরা এই রাস্তা দিয়ে কখনো ধনে কখনো ধনে-প্রাণে মরে’।৪ এই উপমহাদেশের একেবারে নমস্য ডাক্তার স্যার নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) কে সবাই চেনে। শুধু ডাক্তার নন, তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে কলকাতার বিখ্যাত নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। একবার রবীন্দ্রনাথের জ্বর হয়েছিল কিন্তু পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী কবিকে হোমিওপ্যাথি না খাওয়িয়ে স্যার নীলরতন সরকারকে ডেকে এনে শ্বশুরের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু একদিন প্রতিমা দেবী দেখলেন ওষুধের শিশি আগে যেমনটি ছিল তেমনটিই রয়ে গেছে অর্থাৎ তাঁর শ্বশুর এক দাগ ওষুধ খেয়েই অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রতিমা দেবী এটা দেখে যারপরনাই ক্ষুব্ধ। হাসতে হাসতে কবি বললেন ‘ যে ওষুধ নীলরতনবাবু রোগীদের খেতে দেন তা তো আর নিজে খেয়ে দেখেন না। এত বিস্বাদ ওষুধ মানুষ খেতে পারে’।৪
সিঙ্গাপুর মালয় উপদ্বীপের একটা ছোট্ট দেশ, যেখানেই বাসে কিংবা ট্যাক্সি ক্যাবে করে যাইনা কেন, ওই একই রাস্তা, একই ভবন আর অ্যাভিনিউ গুলো চোখের সামনে একে একে ভাসতে থাকে। সিঙ্গাপুরে ছুটি মানে ছুটিই, কেউ কাজ করে না। সবাই ঘুরে বেড়ায় আর বেশির ভাগ চলে যায় মালয়য়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়া। এই শহর থেকে মালয়েশিয়ার জহুরবারু যেতে লাগে বাসে কিংবা প্রাইভেট কারে কুড়ি পঁচিশ মিনিট আর এখান থেকে ইন্দোনেশিয়ার এক ভূস্বর্গ বাতাম দ্বীপে যেতে সময় লাগে সী ক্রুইজারে আধাঘন্টার মতো। দু’টিই ছুটি কাটানোর মোক্ষম জায়গা। একটি খাবার-দাবারের জন্য বিখ্যাত দ্বিতীয়টি অনুপম প্রকৃতি চিত্রিত দৃশ্যপটের জন্যে। দু’টি জায়গাই সাগরকন্যা, একেবারে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা শহর। শুরুতে ভিসা জটিলতার জন্যে আমি আমার সিঙ্গাপুরিয়ান বন্ধুদের সাথে পাশের দেশগুলোতে যেতে পারিনি, কিন্তু দু’মাস না যেতেই ভিসা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। তারপরও শহরে থাকলেই ছুটির দিনে একেবারে পাড়া বেড়ানো চঞ্চলা কিশোরীর মতো বাউণ্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি রাস্তায় কিংবা নানান শপিং মলে। যাকে বলে একেবারে বেকারের ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো, কখনো একা, আবার কখনো দু’জন। ছুটির দিনে সিঙ্গাপুরে আমার অবস্থাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। প্রায় এক বছর আমি সিঙ্গাপুরে একা ছিলাম, চন্দনা অর্থাৎ আমার বৌ সে দেশে গেল পাক্কা এক বছর পর, সাথে আমার তিন বছরের ছেলে সুদি। আমার মেয়ে অনির তখনো জন্মই হয়নি। আসতে যেতে বারবার আমার চোখে পড়েছে সেই টেগোর অ্যাভিনিউ কিন্তু আমার স্টেথোস্কোপও আর বিকল হয়নি আর টেগোর অ্যাভিনিউতে থামাও হয়নি। চন্দনা সিঙ্গাপুর এলো কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো সুদিকে নিয়ে। কথা বলতে শিখেছে অবধি সে শুধু তার মামা দেবাশীষকেই চেনে। ও কোনো পুরুষ মানুষ দেখলেই বলে ‘মামা’। ওই মামা ডাক আমাকেও ছাড়লো না। ঘরে বাইরে কোনো জায়গায় সুদি আমাকে ‘বাবা’ বলে না, সারাক্ষণ বলে ‘মামা’। ওই ‘মামা’ ডাকের হাত থেকে নিস্কৃতি পেতে চন্দনাকে প্রায় মাসখানেক নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির করতে হয়েছিল। অর্থাৎ ‘মামা’কে ‘বাবা’তে নামাতে চন্দনাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল বৈকি।
ভাবলাম একদিন চন্দনা আর সুদিকে নিয়ে টেগোর অ্যাভিনিউতে যাবো। গেলামও। তিনটি পাতাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে সহজেই টেগোর অ্যাভিনিউতে পৌঁছানো যায়।ইউ চু ক্যাং,লেনটর আর মেফ্লাওয়ার-এই তিনটি স্টেশনই টেগোর অ্যাভিনিউ লাগোয়া। খোদ সিঙ্গাপুরে রবীন্দ্রনাথের নামে অ্যাভিনিউ দেখে ছায়ানটের রবীন্দ্রসংগীতের ছাত্রী চন্দনা আপ্লুত, যেমনটা প্রথম দেখায় আমি হয়েছিলাম, ও তারচেয়েও ঢের বেশি। সিঙ্গাপুরের ছাব্বিশতম ডিস্ট্রিক্টের নামই টেগোর অ্যাভিনিউ। এই দেশটিতে আছে মোট আটাশটি জেলা। ঊনিশ’শ ষাট সাল থেকে এই সরণির নাম টেগোর অ্যাভিনিউ। এটি একটি কমার্শিয়াল এরিয়া হলেও এর পাশেই পশ আবাসিক এলাকা টিচার্স হাউজিং এস্টেট। সিঙ্গাপুরে এসেই বুঝেছিলাম এ দেশের মানুষ রোবটের মতো সারাদিন কাজ করলেও বর্ণ গোত্র ভেদে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে কোনো প্রতিভাধর জগদ্‌বরেণ্য মনীষীর নামে তারা একটা কিছু স্মারক গড়ে রাখে, যা দেখে তাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা বড়ো হওয়ার ইচ্ছায় উজ্জীবিত হতে পারে। আপনি যদি কিছুদিনও এই দেশটিতে থেকে যান তবে দেখবেন, যে মানুষটি কোনোদিনও এই দেশটিতে আসেনি কিন্তু তারা তাঁকে স্মরণ করে প্রতিদিন। এ ক্ষেত্রে তারা ওই মনীষীর জাতি-ধর্ম-বর্ণ কোনো কিছুই বিবেচনায় আনে না। আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি হলেন ঝরৎ ঞযড়সধং ঝঃধসভড়ৎফ জধভভষবং (স্যার থমাস স্টাম্পফোর্ড র‌্যাফেলস, ১৭৮১-১৮২৬), তিনি সিঙ্গাপুরের কেউ নন, তিনি এই সমুদ্রঘেরা ভূমিতে এসেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চাকুরি নিয়ে, এই অঞ্চলের গভর্নর হয়ে। তিনিই এই দেশটিকে গড়ে তুলেছেন আধুনিক সিঙ্গাপুর হিসেবে। এই দেশটিতে তাঁর নামে যত স্থাপনা আছে তার আশপাশে কেউ নেই। এই মানুষটি একটি জেলে পাড়াকে পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ নগরীতে রূপান্তরিত করে গেছেন। ১৮১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি স্টাম্পফোর্ড র‌্যাফেলস এই দেশটির যেখানটায় এসে প্রথম পা ফেলেছিলেন সেই জায়গাটিকে স্মরণীয় করতে তারা শুধু ভাস্কর্য নয়, সেখানে পার্কও বানিয়ে রেখেছে। এই দেশে তাঁর প্রথম পা ফেলার দিনটি রাষ্ট্রীয় ভাবে পালন করা হয়। যেদিন আমি টেগোর অ্যাভিনিউ দ্বিতীয়বার দেখতে গেলাম সেদিন ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। সাথে সুদি তাই অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল একটা শেডের নিচে।
সিঙ্গাপুরিয়ানরা কখন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছাকাছি এসেছিল তা জানা যায় সহজে। গুরুদেব ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই গ্লোব ট্রটার। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনীর তৃতীয় খণ্ড থেকে জানা যায়- ১৯২৭ সালের ১৪ জুলাই মাদ্রাজ হইতে ফরাসী জাহাজ আঁবোয়াজ-এ কবি ও তাঁহার সঙ্গীরা সিঙ্গাপুর রওনা হইলেন।.... আঁবোয়াজ জাহাজ ছয়দিন পরে সিঙ্গাপুর ভিড়িল (২০ জুলাই)- ঘাটে মি. আরিয়াম কবিকে স্বাগত করিলেন (শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক আরিয়াম উইলিয়মস ইতিপূর্বেই মালয় যাত্রা করিয়া গিয়াছিলেন)।৫ আরিয়াম জাহাজে আসিয়া কবিকে জানাইলেন যে, মালয় উপদ্বীপের ব্রিটিশ গবর্নর সার্‌ হিউ ক্লিফোর্ড-এর ইচ্ছা কবি যেন মালয়বাসের প্রথম তিন দিন তাঁহার অতিথি হইয়া লাটপ্রাসাদে থাকেন। সুনীতিকুমার লিখিতেছেন, ‘লাটবাড়ির মর্যাদার মধ্যে থাকবেন-কবিকে কিন্তু এতে খুশী-খুশী ভাব দেখাল না’।৫ সিঙ্গাপুর পৌঁছানোর পরদিন অর্থাৎ ২১ জুলাই গার্ডেন ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় কবি-সংবর্ধনা পার্টি। ২২ জুলাই ভিক্টোরিয়া থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তৃতা পর্ব অনুষ্ঠিত হয় এবং ওই অনুষ্ঠানে গভর্নর হিউ ক্লিফোর্ড নিজে উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতার বিষয় ছিল ্তুটহরঃু ড়ভ গধহ্থ. সিঙ্গাপুরে রবীন্দ্রনাথ মোট সাতদিন ছিলেন। প্রতিদিনই কবির বক্তৃতা পর্ব লেগেই ছিল। ২৬ জুলাই তিনি এই দেশ থেকে মালাক্কা যাত্রা করেন। ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথের সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সাথে আজকের শান্তিনিকেতনের ‘চীনা ভবন’ এর একটা যোগসূত্র আছে। গুরুদেব যখন সিঙ্গাপুরে তখন একদিন ঞধহ ণঁহ-ঝযধহ (তান-য়ুন শান, ১৮৯৮-১৯৮৩) নামের ছাব্বিশ বছর বয়সের এক চীনা যুবক কবির সাথে দেখা করতে আসে। সিঙ্গাপুরে তান-য়ুন শানের সাথে রবীন্দ্রনাথের নানা বিষয়ে কথা হয়। বিশ্বকবির ইচ্ছা পৃথিবীর বহু ভাষা-সংস্কৃতির মিলনায়তন হয়ে উঠবে বিশ্বভারতী, এক নীড়ে বহু বৈচিত্র্যকে আশ্রয় দেবেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ চীনা যুবক তানকে বিশ্বভারতীতে চীনা ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। অপ্রত্যাশিত এই প্রস্তাবে রাজি হন তান-য়ুন শান এবং এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯২৮ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি আর দেশে ফিরে যান নি, হয়ে উঠেন মনে প্রাণে ভারতী। এক সময় তাঁর পুরো পরিবারই শান্তিনিকেতনে চলে আসে। রবীন্দ্রনাথের কাছে চিন ছিল পরম আগ্রহের হীরকখণ্ড। তাঁর আন্তরিক এষণা ভারত ও চিন, দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নিবিড় সেতুবন্ধনের সূচনা করেছিল। কবির এই কাজে তাঁর সহযোগী ছিলেন তান-য়ুন শান।৬ আর ভাষা-সংস্কৃতির চর্চার কেন্দ্র হিসেবে শান্তিনিকেতনে ‘চীনা ভবন’ স্থাপনা ছিল রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায়। রবীন্দ্র জীবনকালেই ১৯৩৭ সালের ১৪ এপ্রিল শান্তিনিকেতনে ‘চীনা ভবন’ এর উদ্বোধন হয়। এবং এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন তান-য়ুন শান।৬ এই চিনা মানুষটি আর কখনো নিজ দেশে ফিরে যেতে চাননি এবং ১৯৮৩ সালে ভারতের বিহারের বুদ্ধ গয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। সিঙ্গাপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তান-য়ুন শানের দেখা না হলে শান্তিনিকেতনে কখনো ‘চীনা ভবন’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতো কিনা সে বিষয়ে কিন্তু একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকেই যায়।
১৯২৭ সালের ২৬ জুলাই যেদিন রবীন্দ্রনাথ সিঙ্গাপুর ছেড়ে যান সেদিন তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটা চিঠি লিখেছিলেন- সিঙ্গাপুরের পালা আজ শেষ হলো। আজ বিকেলে জাহাজে করে মালাক্কা বলে আর এক জায়গায় যেতে হবে। প্রথম যে দু-তিনদিন গবর্নরের বাড়ি ছিলুম অনেকটা নিরিবিলি কেটেছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে অবধি প্রাণ বেরোবার জো হলো। বক্তৃতার তো অন্ত নেই- তার উপর পার্টি। একটুও বিশ্রাম করতে পারছি নে। যার তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাওয়াটা আমার পক্ষে সব চেয়ে কষ্টকর হয়েছে।.... আমার প্রথম লেকচারে গবর্র্নর সভাপতি হয়েছিলেন- সে লেকচারটা এদের বিশেষ ভালো লেগেছিল। কিন্তু এখানকার খবরের কাগজগুলো লক্ষ্মীছাড়া- কোনোটাতেই ঠিক রিপোর্ট নিতে পারেনি। গবর্র্নর বারবার আক্ষেপ করে বলেছেন- ঞযবু যধাব সধফব ধ সবংং ড়ভ ুড়ঁৎ ষবপঃঁৎব.৭
ওই চিঠিতেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রীতির কথা উল্লেখ করতে ভোলেন নি। সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সময় তাঁর পিঠ ব্যথা বেড়ে গেছিল। তাই তিনি ওই চিঠিতে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছেন- এখানে এসে দেখছি- কধষর চযড়ং ৬ী
ওষুধটা একদিনও বন্ধ রাখলে আমার চলে না। ক্লান্তিতে পিঠের দাঁড়া ভেঙে পড়ে। ঐ ওষুধ একটা বড়ো বোতল আমাকে পাঠিয়ে দিস- নইলে শেষ পর্যন্ত কুলোবে না।৭ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এতই অনুরাগ ছিলো যে কবি বিশ্বাস করতেন লিভারের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ছাড়া অন্য কোনো গতি নেই। এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে ১৯১২ সালে তাঁর কন্যা মীরাদেবী (অতসীলতা) কে লেখা এক চিঠিতে। নাতির লিভারের অসুখ হয়েছে জেনে রবীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে তাঁর মেয়ের কাছে এই চিঠি লিখেছিলেন (চিঠি নং-১২২)। চিঠিতে তিনি লিখেছেন- মীরু, ডাক্তার চাটুয্যে বল্‌ছেন তোর খোকার একটু লিভারের মত হয়েছে- শুনে আমি উদ্বিগ্ন হলুম। যদিও চাটুয্যে ঠিক ধরেছেন কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। যাই হোক্‌ ছেলেদের লিভারের চিকিৎসা একমাত্র হোমিয়োপ্যাথিমতে চল্‌তে পারে।৮ সুতরাং হোমিওপ্যাথির প্রতি কবির ঝোঁক ছিলো আজীবন।
এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার অনেক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের হয়ে গেছে কিন্তু তারপরও আমার বৌ চন্দনা কোনো দেশে গেলেই ওই দেশটিকে সিঙ্গাপুরের নিরিখে বিচার করে। বিদেশে গেলে ওই নতুন দেশটির খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সব কিছুকে আমরা সিঙ্গাপুরের মাপকাঠিতে নির্ধারণ করি। বিষয়টা অনেকটা ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী আমেরিকান লিজেন্ড ঊৎহবংঃ ঐবসরহমধিু (আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ১৮৯৯-১৯৬১) এর লেখা ্তুঅ গড়াবধনষব ঋবধংঃ’ (এ মুভ্যাবল ফিস্ট, ১৯৬৪) শিরোনামের গ্রন্থে লেখা একটি উদ্ধৃতির মতো। বইটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল হেমিংওয়ের মৃত্যুর তিন বছর পরে। ওই গ্রন্থে হেমিংওয়ে প্যারিস শহর সম্পর্কে লিখেছেন- ্তুওভ ুড়ঁ ধৎব ষঁপশু বহড়ঁময ঃড় যধাব ষরাবফ রহ চধৎরং ধং ধ ুড়ঁহম সধহ, ঃযবহ যিবৎবাবৎ ুড়ঁ মড় ভড়ৎ ঃযব ৎবংঃ ড়ভ ুড়ঁৎ ষরভব, রঃ ংঃধুং রিঃয ুড়ঁ, ভড়ৎ চধৎরং রং ধ সড়াবধনষব ভবধংঃ.্থ অর্থাৎ কেউ যদি কখনো যৌবনে প্যারিসে বাস করে থাকে, তবে ওই মানুষটি এরপর যে দেশেই যাক না কেন, প্যারিস নামের শহরটি কিন্তু তার সাথে সাথেই যাবে, প্যারিস হলো চলনশীল ভুরিভোজের নাম। আমরা কখনো যৌবনে প্যারিসে থাকি নি কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকেছি। ওই হেমিংওয়ের মতো আমরা যেখানেই যাই না কেন, সিঙ্গাপুর নামের শহরটি কিন্তু আমাদের সাথে সাথেই যায়।
সিঙ্গাপুরে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে এসেছি সে-ই ঊনিশশ’ চুরানব্বই সালে। কিন্তু সিঙ্গাপুর কখনোই আমাদের ছেড়ে যায়নি। বার বার ওই দেশটি আমাদের টেনেছে। প্রথম যখন সিঙ্গাপুরের টেগোর অ্যাভিনিউ দেখতে গেছিলাম তখন আমার মেয়ে অনির জন্মই হয়নি। এরমধ্যে অনি ডাক্তার হয়ে লন্ডন রয়েল কলেজের প্রাইমারি পরীক্ষাও শেষ করে ফেলেছে। সময়টা দু’হাজার তেইশ। হঠাৎই একদিন সেরাঙ্গুন রোডের নভোটেল হোটেলে ব্রেকফাস্ট করার সময় অনি বলে বসল ওইদিন বিকেলে ও রবীন্দ্রনাথের উপর যা যা ওই অ্যাভিনিউতে আছে তা দেখতে যাবে। এরপর দুপুরে নিরামিষ রেস্টুরেন্ট আনন্দভবনে লাঞ্চ খেয়ে আধা ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম টেগোর অ্যাভিনিউ। ওখানকার সব কিছুই আমাদের আগেই দেখা। আমার আর চন্দনার ওখানে নতুন করে দেখার কিছুই ছিলো না। সুদি এখন আমেরিকাতে পুরাদস্তুর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছে, তাই ও সেদিন আমাদের সাথে ছিলো না। আমি আর চন্দনা এদিক সেদিক ঘুরঘুর করছিলাম, যাকে সাদাসিধা বাংলায় বলা যাযাবরবৃত্তি। বলা যায় অনর্থক পাড়া বেড়ানো। হঠাৎ একসময় চেয়ে দেখি অনি আমাদের সাথে নেই। নেই তো নে-ই। আমরা ঘাবড়ে যাই না। এই দেশের যাবতীয় পথঘাট অনেক আগে থেকেই আমার মেয়ের নখদর্পণে। অনি কখনো এক জায়গায় বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকার মানুষ না। আমার মেয়ের ভাবসাব চড়াই পাখির মতো, কথায় কথায় ফুড়ুৎ। অবশ্য নিন্দুকেরা বলে অনি এই অভ্যাসটা নাকি তার বাপের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, দুজনের স্নায়ুকোষে হয়তো ছিটেফোঁটা চড়াই পাখির জিন রয়েছে। মিনিট পনের পরে অনি এসে আমাদের একটা আজব খবর শোনালো। ও বলল- বাবা, এখানে রবীন্দ্রনাথের নামেই শুধু অ্যাভিনিউ নাই, পাশে কবি কালিদাসের নামে ‘কালিদাসা অ্যাভিনিউ’ও আছে। বিষয়টা আমার কাছে অবাক লাগলো। সংস্কৃত সাহিত্যের কিংবদন্তি মহাকবি কালিদাসকে চাইনিজরা মনে রাখতে যাবে কেন, কেনইবা তাঁর নামে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গার নামকরণ করতে যাবে। সত্যি কথা বলতে কী, আমি বাংলাদেশে তো নয়ই, কলকাতাতেও কালিদাসের নামে কোনো বড়োসড়ো প্রতিষ্ঠান আছে তা চোখে পড়েনি। হয়তো আছে যা আমি জানি না। কিন্তু মহারাষ্ট্র আর মধ্যপ্রদেশে আছে তা জানি। কিন্তু এই কালিদাস সিঙ্গাপুরের মতো একটা আধুনিক দেশে আছে, আমি তা শুনে অবাক। ‘টেগোর অ্যাভিনিউ’ থেকে কালিদাস অ্যাভিনিউতে যেতে সময় লাগে মাত্র মিনিট পাঁচেক। এতদিন আমরা ওই দিকেই যাইনি কখনো। একটু এগুতেই দেখি চোখের সামনে স্পষ্ট লেখা আছে ্তুকধষরফধংধ আবহঁব্থ (কালিদাসা অ্যাভিনিউ)। অবাক কাণ্ড! সংস্কৃত ভাষার কবিকুলশিরোমণি কালিদাসকে কেন সিঙ্গাপুরের মতো চাইনিজ অধ্যুষিত দেশ মনে রাখবে তা আমার শুরুতে তেমন বোধগম্য হলো না। রবীন্দ্রনাথ নোবেল লরিয়েট, তাকে এই ভূলোকে সবাই জানে এবং চেনে কিন্তু কালিদাস এখানে এলো কোত্থেকে? শুধু কালিদাস নয়, আশপাশের এলাকায় সিঙ্গাপুরিয়ানরা পৃথিবীর অনেক ভাষার কবিভূষণদের নামে সরণি,অ্যাভিনিউ কিংবা একাডেমিক ইনস্টিটিউশন করে রেখেছে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য। এই এলাকার আশপাশে রয়েছে পার্সিয়ান সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ ও দার্শনিক ঙসধৎ কযধুুধস ( ওমর খৈয়াম, ১০৪৮-১১৩১), মালয়েশিয়ার বিখ্যাত কবি গঁহংযর অনফঁষষধয (মুন্সী আবদুল্লাহ, ১৭৯৬-১৮৫৪), পাকিস্তানের মহাকবি ঝরৎ গঁযধসসধফ ওয়নধষ (স্যার মোহাম্মদ ইকবাল, ১৮৭৭-১৯৩৮) সহ আরো অনেক বিশ্ববিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের নামে অ্যাভিনিউ কিংবা স্থাপনা। এখানে এসেই মনে হবে চাইনিজরা গুণীর আদর জানে।
আমরা তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম কালিদাস অ্যাভিনিউতে। কালিদাস হলেন সর্বকালের সেরাদের একজন, এই লেখকই এই উপমহাদেশের সাহিত্যকে পাশ্চাত্য সমাজের কাছে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এটা সত্য যে, এই উপমহাদেশের অনেকেই এই ধু্রপদি লেখকের লেখার সাথে পরিচিত নয়। কালিদাস ছিলেন সংস্কৃত ভাষার মহাকবি। ধারণা করা হয় কালিদাস খ্রিস্টিয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকের মধ্যে কোনো এক সময় বিক্রমাদিত্য নামে পরিচিত গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভাকবি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তবে তাঁর সময়কাল নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে, অনেকের মতে কালিদাস খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের কবি ছিলেন। তবে বেশিরভাগ বোদ্ধারা তাকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভাকবি হিসেবে মত দিয়ে থাকেন। কালিদাসের যাপিত জীবন সম্পর্কে বেশকিছু প্রহেলিকাময় কথা প্রচলিত আছে। পুরাকথা অনুযায়ী কালিদাস প্রথম জীবনে মূর্খ ছিলেন এবং বিদ্যাবতী নামের এক বিদুষী রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামী গণ্ডমূর্খ জেনে রাজকন্যা তাঁকে ভীষণভাবে অপমান করে। এতে মনের দুঃখে তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যান এবং সে সময় তাঁর আরাধ্য দেবী সরস্বতী তাঁকে রক্ষা করেন এবং দেবীর বরে তিনি কবিত্বশক্তি অর্জন করে পরে বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভায় স্থান পান। ইতিহাসবেত্তাদের মতে জীবদ্দশায় কালিদাস বিশাল সাহিত্যরাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন কিন্তু তাঁর সব সাহিত্যকর্ম আর বেঁচে নেই। যা এখনো রয়ে গেছে তা একেবারেই অল্পবিস্তর। কালিদাস সৃষ্ট কাব্য গুলোর মধ্যে আছে মেঘদূতম্‌, কুমারসম্ভবম্‌, রঘুবংশম্‌, ঋতুসংহার, শৃঙ্গাররসাষ্টক, শৃঙ্গারতিলক ও পুষ্পবাণবিলাস। তাঁর রচিত তিনটি অমর নাটক হলো অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌, বিক্রমোর্বশীয়ম ও মালবিকাগ্নিমিত্রম্‌। তাঁর অভিজ্ঞানশকুন্তলমের (শকুন্তলা) অনুবাদের মাধ্যমেই উপমহাদেশের সাহিত্যের সাথে ইউরোপের প্রথম পরিচয় ঘটে। কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ পৃথিবীর সর্বকালের সেরা নাটক গুলোর একটি।
পুরো পৃথিবী নিরিখে কালিদাস কতো বড় কবি? উত্তর খুব একটা কঠিন না। ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন আমেরিকার সিয়াটল শহরে আসেন তখন ওয়াশিংটন স্টেইটের প্রভাবশালী পত্রিকা ্তুঞযব ঝবধঃঃষব চড়ংঃ-ওহঃবষষরমবহপবৎ্থ(দ্য সিয়াটল পোস্ট ইনটেলিজেন্সার) গুরুদেবের আগমনকে উল্লেখ করে লিখেছিল ্তুঞযব ঝযধশবংঢ়বধৎব ড়ভ ওহফরধ রহ ঝবধঃঃষব্থ অর্থাৎ ‘ইন্ডিয়ার শেক্সপিয়র এখন সিয়াটলে’। সিয়াটল পোস্টের ওই শিরোনাম দেখে পেনসেলভিনিয়া ইউনির্ভাসিটির পলেটিক্যাল সায়েন্স ও ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর অধ্যাপক ঘড়ৎসধহ উ চধষসবৎ (নরম্যান ডি পামার) বলেছিলেন সিয়াটল পোস্টের ওই শিরোনাম টি সঠিক হয়নি। রবীন্দ্রনাথকে ্তুঞযব ঝযধশবংঢ়বধৎব ড়ভ ওহফরধ্থ না বলে বরং শেক্সপিয়রকে ্তুঞযব কধষরফধং ড়ভ ঊহমষধহফ্থ (কালিদাস অফ ইংল্যান্ড) বলা অধিক যুক্তি যুক্ত।৯ শুধু প্রেেফসর নরম্যান ডি পামার নন, পৃথিবীর অনেক ক্ষেত্রজ্ঞ বোদ্ধারা কলিদাসকে বারবার শেক্সপিয়রের সাথে তুলনা করেছেন এবং আজো করছেন। সংস্কৃত সাহিত্যের এই মহান শিল্পীর সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্য বিশ্ব প্রথম জানতে পারে কলিদাসের ‘শকুন্তলা’ ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পর। ঝরৎ ডরষষরধস ঔড়হবং (স্যার উইলিয়াম জোনস, ১৭৪৬-১৭৯৪) নামের একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ১৭৮৯ সালে ‘শকুন্তলা’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সে-ই থেকে ‘শকুন্তলা’ ইউরোপে মাস্টারপিস। স্যার জোনস আটটি ভাষা বলতে পারতেন এবং লিখতে পারতেন। তিনি প্রথমে কালিদাসের এই নাটকটিকে ল্যাটিন ভাষায় এবং পরে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। স্যার উইলিয়াম জোনস ‘শকুন্তলা’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করে গ্রন্থের নামকরণ করেছিলেন ্তুঞযব ঋধঃধষ জরহম্থ অর্থাৎ ‘একটি বৈনাশিক অঙ্গুরী’। শকুন্তলা নাটকের সবচেয়ে ট্র্যাজিক পর্বটির আঙ্গিক গড়ে ওঠে একটি হারিয়ে যাওয়া আংটিকে ঘিরে, তাই স্যার জোনস নাটকের নায়িকার পরিবর্তে তাঁর অনুবাদ গ্রন্থের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘একটি বৈনাশিক অঙ্গুরী’ অর্থাৎ একটি সর্বনাশা আংটি। স্যার জোনসের পরে অক্সফোর্ড ইউনির্ভাসিটির সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ঐড়ৎধপব ঐধুসধহ ডরষংড়হ বাংলা (হোরেস হেম্যান উইলসন, ১৭৮৬-১৮৬০) কালিদাসের ‘মেঘদূত’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। বাংলা ভাষায় অনুবাদের আগেই ‘শকুন্তলা’ ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে গিয়েছিল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌’ নাটক বাংলায় অনুবাদ করেন ১৮৫৪ সালে।১০ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬) রবীন্দ্রনাথের জন্মের এক বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৮৬০ সালে বাংলা ভাষায় পদ্যে অনুবাদ করেন ‘মেঘদূত’। রবীন্দ্রনাথের আরেক বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌’, ‘বিক্রমোর্বশীয়ম’ ও মালবিকাগ্নিমিত্রম্‌’-এই তিনটি নাটকই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন।১০ শেক্সপিয়রের লেখার সাথে এই উপমহাদেশের মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে। আর বাংলা সাহিত্যে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই শুরু হয়ে যায় কালিদাসের সাথে শেক্সপিয়রের নাটকের তুলনা।১১ তবে জার্মানি কালিদাসকে বরণ করে মহান লেখক হিসেবে। জার্মানির বিখ্যাত লেখক এবড়ৎম ঋড়ৎংঃবৎ (জর্জ ফর্স্টার, ১৭৫৪-১৭৯৪) ১৭৯১ সালে জার্মান ভাষায় ‘শকুন্তলা’ অনুবাদ করেন। এরপরই কালিদাসের সমস্ত সৃষ্টি জার্মানিতে ধ্রুপদি সাহিত্যের মর্যাদা পায়। বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের সেরাদের একজন জার্মান কিংবদন্তি ঔড়যধহহ ডড়ষভমধহম াড়হ এড়বঃযব (ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যেটে, ১৭৪৯-১৮৩২) ‘শকুন্তলার’ জার্মান অনুবাদ পড়ে এতই আপ্লুত হন যে তিনি ওই নাটকে সম্মোহিত হয়ে থেকেছেন আমৃত্যু। বিশ্ববিশ্রুত জার্মান দার্শনিক ঔড়যধহহ এড়ঃঃভৎরবফ াড়হ ঐবৎফবৎ (ইয়োহান গটফ্রিড ভন হেরডার, ১৭৪৪-১৮০৩) ‘শকুন্তলা’ পড়ে এতই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন যে তিনি নিজেই প্রাণিত হয়ে এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা লেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং লিখেন। গ্যেটে কালিদাসের নায়িকা শকুন্তলাকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন-
্তুঅ ংঃধৎ ঃযধঃ সধশবং ঃযব হরমযঃ সড়ৎব ধমৎববধনষব ঃযধহ ঃযব ফধু্থ অর্থাৎ শকুন্তলা আকাশের এমন একটি তারকা যে নাকি রোদঝলমলে দিবস থেকেও রাতকে অধিক পুলকী-প্রমোদী করে তোলে। বোদ্ধারা বলেন শকুন্তলা পড়ার পর বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে গ্যেটের ধারণাই বদলে যায়। গ্যেটে ‘শকুন্তলা’ নাটকের উপর একটি এপিগ্রাম অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত কবিতা লিখেন যা পরে নানা ভাষায় অনুবাদিত হয়।
্তুডরষষ রপয ফরব ইষঁসবহ ফবং ভৎহৃযবহ, ফরব ঋৎহৃপযঃব ফবং ংঢ়ব্ধঃবৎবহ ঔধযৎবং,
ডরষষ রপয, ধিং ৎবরুঃ ঁহফ বহঃুহৃপশঃ, রিষষ রপয, ধিং ংব্ধঃঃরমঃ ঁহফ হব্ধযৎঃ,
ডরষষ রপয ফবহ ঐরসসবষ, ফরব ঊৎফব সরঃ বরহবস ঘধসবহ নবমৎবরভবহ,
ঘবহহ্থ রপয, ঝধশড়হঃধষধ, ফরপয, ঁহফ ংড় রংঃ ধষষবং মবংধমঃ্থ.
(মূল জার্মান ভাষায় লেখা কবিতা)
্তুডড়ঁষফংঃ ঃযড়ঁ ঃযব ুড়ঁহম ুবধৎ্থং নষড়ংংড়সং ধহফ ঃযব ভৎঁরঃং ড়ভ রঃং ফবপষরহব,
অহফ ধষষ নু যিরপয ঃযব ংড়ঁষ রং পযধৎসবফ, বহৎধঢ়ঃঁৎবফ, ভবধংঃবফ, ভবফ,
ডড়ঁষফংঃ ঃযড়ঁ ঃযব ঊধৎঃয ধহফ ঐবধাবহ রঃংবষভ রহ ড়হব ংড়ষব হধসব পড়সনরহব,
ও হধসব ঃযবব, ঙ ঝধশড়হঃধষধ, ধহফ ধষষ ধঃ ড়হপব রং ংধরফ্থ.গ্যেটের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ)
‘তুমি নতুন বছরের প্রস্ফুটিত ফুল
এবং বৎসরান্তের রূপান্তরিত ফল
যা অন্তরকে মুগ্ধ, মোহিত ও আবিষ্ট করে
তুমি স্বর্গ ও মর্তের এক অভিন্ন নাম,
যৌবন আর পরিপূর্ণতার স্মারক
আমি তোমাকে ‘শকুন্তলা’ নামেই ডাকলাম
এবং সেটাই শেষ কথা’।
(গ্যেটের কবিতার বাংলা অনুবাদ)
কালিদাসের ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্‌’ গ্রন্থটি বার বার জার্মান ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। কালিদাসের মেঘদূতের প্রভাবে জগদ্‌বরেণ্য জার্মান নাট্যকার,কবি এবং দার্শনিক ঋৎরবফৎরপয ঝপযরষষবৎ (ফ্রেডরিক শিলার, ১৭৫৯-১৮০৫) তাঁর ক্লাসিক্যাল প্লে ্তুগধৎু ঝঃঁধৎঃ (মেরি স্টুয়ার্ট, ১৮০১) রচনা করেছিলেন। ১৮৩৭ সালে জার্মান লেখক সিজিএ হফার, ১৮৩৮ সালে বি.হার্জেল এবং ১৮৬১ সালে ই.লোবড্যাঞ্জ ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্‌’ অনুবাদ করেছেন। জার্মান সাহিত্যে কালিদাস যুগ এখনো শেষ হয়নি, এখনো কালিদাসের রচনার নতুন নতুন সংস্করণ প্রকাশ হয় জার্মানিতে।
সিঙ্গাপুরে কালিদাস অ্যাভিনিউ আর রবীন্দ্র অ্যাভিনিউ একেবারে লাগোয়া অবস্থানে। এই কালিদাস অ্যাভিনিউ দীর্ঘকাল আমার চোখের নজরের আয়ত্তের বাইরে ছিলো। কারণ আমি জানতামই না যে এই আধুনিক দেশটিতে কালিদাসের নামে কোনো সরণি থাকতে পারে। এই এলাকায় কালিদাস আর টেগোর যেন একেবারে হাতে হাত রেখে দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের মানুষ কী জানে যে সাহিত্য ক্ষেত্রে কালিদাস আর রবীন্দ্রনাথ কতোটা ঘনিষ্ঠ কিংবা অচ্ছেদ্য। এই দেশে উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত মনীষীদের নামে স্মারক আছে কিন্তু কলিদাস আর রবীন্দ্রনাথ এত কাছাকাছি কেন? সিঙ্গাপুরিয়ানরা কী জানে যে এই দু’জন দীর্ঘদর্শী মানুষের জন্মের দূরত্ব দেড় হাজার বছরের বেশি হলেও তাঁদের সৃষ্টি জগতের নৈকট্য আছে অনেক বিষয়ে। এ দুজনের নামে কাছাকাছি অ্যাভিনিউ স্থাপনের বিষয়টা সিঙ্গাপুরিয়ানরা কী তাঁদের সৃষ্টির সন্নিধির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই করেছে, না বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয় তা আমার বোধের বাইরে। কিন্তু ইতিহাস বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁর প্রতিভার ছোঁয়ায় আধুনিক বাংলা ভাষা কেবল সমৃদ্ধই হয়নি, বিশ্ব সাহিত্যের অংশ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে, তিনিও কালিদাসে মগ্ন থেকেছেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনায়, চিঠিপত্রে, প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে কালিদাসের ব্যাপক উপস্থিতি দেখতে পাই যা আমাদের কাছে অতি বিস্ময়ের বিষয় না হয়ে পারে না। রবীন্দ্রনাথের কবি মানসে এককভাবে কবি হিসেবে কালিদাস এবং কাব্য হিসেবে মেঘদূত, কুমারসম্ভব, শকুন্তলা ও রঘুবংশের প্রভাব সবচাইতে বেশি বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না।১০ কার্যত কিশোর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য জগতে প্রবেশের সময় শুরুতেই যাঁর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তিনি কবি কালিদাস ছাড়া অন্য কেউ নন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’র ‘ঘরের পড়া’ পর্বে নিজেই লিখেছেন- আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশের পুত্র জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় বাড়িতে আমাদের শিক্ষক ছিলেন। ইস্কুলের পড়ায় যখন তিনি কোনোমতেই আমাকে বাঁধিতে পারিলেন না, তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া অন্য পথ ধরিলেন। আমাকে বাংলায় অর্থ করিয়া কুমারসম্ভব পড়াইতে লাগিলেন।১২ ওই একই পর্বে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- রামসর্বস্ব পণ্ডিতমহাশয়ের প্রতি আমাদের সংস্কৃত অধ্যাপনার ভার ছিল। অনিচ্ছুক ছাত্রকে ব্যাকরণ শিখাইবার দুঃসাধ্য চেষ্টায় ভঙ্গ দিয়া তিনি আমাকে অর্থ করিয়া করিয়া শকুন্তলা পড়াইতেন।১২ রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যে, গানে, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে কালিদাসের মেঘদূত, কুমারসম্ভব প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে শব্দ,উপমা,বাক্যাংশ, ভাব, ভাবনা, চিত্রকল্প ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন।১০ ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ এই বাক্যটি কালিদাস রচিত ‘মেঘদূতম্‌’ কাব্যের দ্বিতীয় শ্লোকের একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি। মূল বাক্যটি হলো
‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণত গজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ।’
যার বাংলা অর্থ হলো- আষাঢ় মাসের প্রথম দিবসে (অভিশপ্ত যক্ষ প্রিয়তমা বিরহে) রামগিরি পর্বতের গাত্রে ক্রীড়ারত প্রমত্ত হস্তীর ন্যায় রমণীয় মেঘখণ্ডকে অবলোকন করিতেছিলেন।
কালিদাসের এই ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ এই লাইনটি রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন। ১২৯৯ সনের ২ আষাঢ়, বুধবার শিলাইদহ থেকে ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা একটি চিঠিতে কাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন- কাল আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বর্ষার নব রাজ্যাভিষেক বেশ রীতিমত আড়ম্বরের সঙ্গে সম্পন্ন হয়ে গেছে।১৩ এই আষাঢ়ের প্রথম দিনটির কথা উল্লেখ আছে তাঁর মানসী (১২৯৭) কাব্যেও। এই গ্রন্থে ‘মেঘদূত’ শিরোনামের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত। মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক
রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে
সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত করে।
সেদিন সে উজ্জয়িনী প্রাসাদশিখরে
কী না জানি ঘনঘটা, বিদ্যুৎ-উৎসব,
উদ্দামপবনবেগ, গুরুগুরু রব।
১৮৯০ সালে শান্তিনিকেতনে বসে কোনো এক ঘনবর্ষার অপরাহ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিদাসের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছিলেন এই ‘মেঘদূত’ রচনার মাধ্যমে। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এতই আপ্লুত ছিলেন যে বর্ষা ঋতুর আবহে রচিত ‘মেঘদূত’ কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ‘নববর্ষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন - মেঘদূত ছাড়া নববর্ষার কাব্য কোন সাহিত্যে কোথাও নাই। ইহাতে বর্ষার সমস্ত অন্তর্বেদনা নিত্যকালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে। প্রকৃতির সাংবৎসরিক মেঘোৎসবের অনির্বচনীয় কবিত্বগাথা মানবের ভাষায় বাঁধা পড়িয়াছে (১৩৯৩)। ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ লাইনটি এই উপমহাদেশে এত পরিচিত যে সাহিত্য বোদ্ধারা আষাঢ় মাসের প্রথম দিনটিকে বলে থাকেন মহাকবি কালিদাসের স্মৃতি দিবস।
রবীন্দ্রনাথের ‘কল্পনা’ (বৈশাখ ১৩০৭) কাব্যের ‘স্বপ্ন’ কবিতায় কালিদাসের লেখার বেশ কিছু নাম এবং উপমা ব্যবহার করেছেন।
‘দূরে বহুদূরে
স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে
খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীপারে
মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।
মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি,কুরুবক মাথে,
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা আধা।
বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।’
(বোলপুর, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৪)
এই ‘স্বপ্ন’ কবিতায় উজ্জয়িনী, শিপ্রা, লীলাপদ্ম, কুন্দকলি, কুরুবেক ইত্যাদির উল্লেখ কালিদাস এবং তাঁর কাব্যের নায়িকা যক্ষপ্রীয়ার কথাই পাঠককে মনে করিয়ে দিবে।১০ কালিদাসের মেঘদূতের উত্তরভাগে একই চিত্র দেখা যায়।
‘হস্তে লীলাকমলমলকে বালকুন্দানুবিদ্ধং নীতা লোধ্রপ্রসবরজসা পাণ্ডুতামাননে শ্রীঃ।
চূড়াপাশে নবকুরুবকং চারু কর্ণে শিরীষং সীমন্তে চ ত্বদুপগজং যত্র নীপং বধূনাম্‌’।
(মেঘদূত, শ্লোক-২)
রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বজন্মের প্রিয়তমাকে মানসরথে খুঁজে ফেরেন উজ্জয়িনীপুরে এবং কালিদাসের নায়িকা যে প্রসাধন, যে বেশভূষা ব্যবহার করতেন তাই দিয়ে তিনিও তাঁর প্রিয়তমাকে সজ্জিত করে তুলেছেন ‘স্বপ্ন’ কবিতায়। অর্থাৎ তিনি যেন বলতে চান, সেকালের কালিদাস একালে রবীন্দ্রনাথ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে।১০
রবীন্দ্রনাথ ‘পুনশ্চ’ (আশ্বিন ১৩৩৯) কাব্যের ‘বিচ্ছেদ’ কবিতায় লিখেছেন-
‘আজ এই বাদলার দিন,
এ মেঘদূতের দিন নয়।
এ দিন অচলতায় বাঁধা।
মেঘ চলছে না, চলছে না হাওয়া,
টিপিটিপি বৃষ্টি
ঘোমটার মতো পড়ে আছে
দিনের মুখের উপর।....
তার বিচ্ছেদের যাত্রাপথে
আনন্দের নব নব পর্যায়।
পরিপূর্ণ অপেক্ষা করছে স্থির হয়ে
নিত্যপুষ্প, নিত্যচন্দ্রালোক
নিত্যই সে একা- সেই তো একান্ত বিরহী।
(বিচ্ছেদ,৭ ভাদ্র ১৩৩৯)
রবীন্দ্রনাথের ‘বিচ্ছেদ’ কবিতার এই বর্ণনার সঙ্গে কালিদাসের উত্তরমেঘের অলকাপুরীর বর্ণনার সাদৃশ্য আছে।
‘যত্রোন্মওভ্রমরমুখরাঃ পাদপা নিত্যপুষ্পা....
নিত্যজ্যোৎস্নাঃ পতিহততমোবৃত্তিরম্যাঃ প্রদোষাঃ’
শুধু কাব্যে নয় রবীন্দ্রনাথের গদ্যেও কালিদাসকে কখনো কখনো খুঁজে পাওয়া যায়। জার্মানির বিখ্যাত ইনডোলজিস্ট (ভারততত্ত্ববিদ) ডধষঃবৎ জঁনবহ (ওয়াল্টার রুবেন, ১৮৯৯-১৯৮২) তাঁর ্তুকধষরফধংধ: ঞযব যঁসধহ সবধহরহম ড়ভ যরং ড়িৎশং্থ শিরোনামের গ্রন্থে ব্যাখ্যা করে বলতে চেয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ (১৯০৬) উপন্যাসের কমলা আর রমেশ চরিত্র দুটি কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ (ঞযব ইরৎঃয ড়ভ ঃযব ডধৎ এড়ফ) রচনার মুখ্য চরিত্রদ্বয় শিব আর পার্বতী দ্বারা প্রভাবিত।১৪
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিদাসের সাহিত্যের উপর আলোচনাও করেছেন একাধিকবার। তিনি কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ আর শেক্সপিয়রের ্তুঞযব ঞবসঢ়বংঃ্থ (দ্য টেম্পেস্ট, ১৬১০), এই দুই নাটকের দুই নায়িকা শকুন্তলা আর মিরান্দার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আর তাদের মিল-অমিল নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁর লেখা ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থে।১৫ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেম্পেস্ট’এ নির্জনলালিতা মিরান্দার সহিত রাজকুমার ফার্দিনান্দের প্রণয় তাপসকুমারী শকুন্তলার সহিত দুষ্মন্তের প্রণয়ের অনুরূপ। ঘটনাস্থলটিরও সাদৃশ্য আছে; এক পক্ষে সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপ, অপর পক্ষে তপোবন। বন্ধন ও অবন্ধনের সংগমস্থলে স্থাপিত হইয়াই শকুন্তলা নাটকটি একটি বিশেষ অপরূপত্ব লাভ করিয়াছে। তাহার সুখদুঃখ-মিলনবিচ্ছেদ সমস্তই এই উভয়ের ঘাতপ্রতিঘাতে।.... টেম্পেস্টে এ ভাবটি নাই।.... টেম্পেস্টে শক্তি, শকুন্তলায় শান্তি। টেম্পেস্টে বলের দ্বারা জয়, শকুন্তলায় মঙ্গলের দ্বারা সিদ্ধি। টেম্পেস্টে অর্ধপথে ছেদ, শকুন্তলায় সম্পূর্ণতায় অবসান।১৫ ‘শকুন্তলা’ আর ‘টেম্পেস্ট’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমতটি হলো, কালিদাস ও শেক্সপিয়রের দুটি কাহিনীর আখ্যানমূলে ঐক্য থাকলেও এ দুটির কাব্যরসের স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শেক্সপিয়র জীবৎকালে কখনো কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ পড়েন নি। আর পড়বেনইবা কী করে। শেক্সপিয়র মারা গেছেন ১৬১৬ সালে আর কালিদাসের রচনা প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদিত হয়েছে ১৭৮৯ সালে, তাই শেক্সপিয়রের কালিদাস পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু দু’জনের লেখার মিল তো হয়ে গেছে, পৃথিবীর তাবৎ বোদ্ধারা কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ আর শেক্সপিয়রের ‘মিরান্দা’-এই দুই চরিত্রের মধ্যে মিল খুঁজে পান।
এখন সমালোচকরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন যে সত্যি কী রবীন্দ্রনাথ কালিদাস দ্বারা প্রভাবিত? কালিদাসের প্রভাবের কথা উঠলে শুধু রবীন্দ্রনাথের নামই বা আসবে কেন? তবে তো ইউরোপিয়ানরাও কালিদাস কর্তৃক প্রভাবিত। সর্বকালের সেরাদের দুজন হলেন জার্মান গ্রেট ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যেটে ও ফ্রেডরিক শিলার। শিলার তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মেরি স্টুয়ার্ট’ লিখেছেন কালিদাসের ‘মেঘদূত’ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। গ্যেটের মহাকাব্যিক সৃষ্টি ্তুঋধঁংঃ্থ (ফাউস্ট, ১৮০৮) এর নাম কে না জানে। কিন্তু সাহিত্য সমালোচকরা জানেন গ্যেটে তাঁর ‘ফাউস্ট’ এর ্তুচৎড়ষড়মঁব রহ ঃযব ঞযবধঃৎব্থ পর্বটি কালিদাসের শকুন্তলা থেকে প্রভাবিত হয়ে লিখেছিলেন।১৬
সত্যিই কী রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে কিংবা শিলার কালিদাসকে অনুকরণ করেছিলেন। মোটেই না। প্রভাব আর অনুকরণ এক বিষয় নয়। বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব সাহিত্যিকদের একটি বিশাল অংশ পদ্যে ফরাসি কিংবদন্তি ঈযধৎষবং ইধঁফবষধরৎব (চার্লস বোদলেয়ার, ১৮২১-১৮৬৭) আর গদ্যে চেক গ্রেট ঋৎধহু কধভশধ (ফ্রানৎস কাফ্‌কা, ১৮৮৩-১৯২৪) কর্তৃক প্রভাবিত এবং এঁদের অনেকেই ইতোমধ্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। কিন্তু কেউ তাঁরা সরাসরি বোদলেয়ার কিংবা কাফ্‌কাকে অনুকরণ করেন নি। ছায়ানুসারী হওয়া আর তোতাবৃত্তি এক কথা নয়। গ্যেটে, শিলার কিংবা রবীন্দ্রনাথ, তাঁদের লেখায় কোথাও কোথাও কালিদাসের লেখার ছায়া আছে ঠিকই কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিতে সরাসরি কালিদাস আসে নি। রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত সাহিত্যের মহাকবি কালিদাসের সৃষ্টিকে তদ্‌গতচিত্তে আত্মস্থ করেছিলেন এবং তা একেবারে নিজের ছাঁচে ঢেলে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। যা আক্ষরিক অর্থেই নতুন সৃষ্টি। এখন কেউ যদি আমায় প্রশ্ন করেন কালিদাস, গ্যেটে আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বড় কে? এ প্রশ্নের সদুত্তর কী আছে কারুর কাছে? অতিমানব না হলে কী এই দুরূহ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব! ওই অতিমানুষিক কম্ম আমার নয়।
সূত্র:
১. ঝধিঢ়হরষ এধফযধাব, এরৎরংয ঞরষষঁ.অ ঢ়ষঁৎধষরংঃরপ যবধষঃয ংুংঃবস হববফং যড়সড়বড়ঢ়ধঃযরপ সবফরপরহব. ঞযব খধহপবঃ (জবমরড়হধষ ঐবধষঃয ু ঝড়ঁঃযবধংঃ অংরধ). ২০২৩;১২: ১০০১৮৯,চঁনষরংযবফ ঙহষরহব ১৪ অঢ়ৎরষ ২০২৩,যঃঃঢ়ং://ফড়র.ড়ৎম/১০.১০১৬/ল.ষধহংবধ.২০২৩.১০০১৮৯
২. চধহফরঃ ওংযধিৎপযধহফৎধ ঠরফুধংধমধৎ্থং চরড়হববৎরহম জড়ষব রহ চড়ঢ়ঁষধৎরংরহম ঐড়সবড়ঢ়ধঃযু.যঃঃঢ়ং://িি.িঢ়নযৎভরহফরধ.ড়ৎম/নষড়ম/২৬৯-ঢ়ধহফরঃ-রংযধিৎপযধহফৎধ-ারফুধংধমধৎ-ং-ঢ়রড়হববৎরহম-ৎড়ষব-রহ-ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎরংরহম-যড়সবড়ঢ়ধঃযু.যঃসষ
৩. গধযধঃসধ এধহফযর ু ঃযড়ঁমযঃং ধনড়ঁঃ ঐড়সবড়ঢ়ধঃযু. যঃঃঢ়ং://ড়পযস.পধ/সধযধঃসধ-মধহফযর-ঃযড়ঁমযঃং-ধনড়ঁঃ-যড়সবড়ঢ়ধঃযু.
৪. সুভাষ সিংহ রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিকিৎসা-ভাবনা।অনন্যা,প্রথম প্রকাশ, আগস্ট ২০১৮।
৫. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রজীবনী,বিশ্বভারতী, তৃতীয় খণ্ড (চতুর্থ সংস্করণ):পৃ৩১২-৩২২।
৬. স্বপন কুমার ঘোষ। চীন-ভারতের সেতু বেঁধেছিলেন কবি। আনন্দবাজার.কম।
যঃঃঢ়ং://িি.িধহধহফধনধুধৎ.পড়স/ৎধনরনধংযড়ৎরুড়/ঃধহ-ুঁহ-ংযধহ-যিড়-বংঃধনষরংযবফ-পযববহধ-নযধাধহধ-রহ-ারংাধ-নযধৎধঃর-১.৭৮৩৩৩৩.
৭. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা চিঠি। চিঠি নং-৮০। রবীন্দ্র সমগ্র,খণ্ড ২২.পৃ-১১৪,প্রকাশক- পাঠক সমাবেশ,২০২০.
৮. মীরাদেবী দেবী (অতসীলতা) কে লেখা চিঠি। চিঠি নং-১২২.রবীন্দ্র সমগ্র,খণ্ড ২২.পৃ-৪১২-৪১৩, প্রকাশক- পাঠক সমাবেশ, ২০২০.
৯. এধঁঃধস ঝবহএঁঢ়ঃধ. ঞধমড়ৎব রহ অসবৎরপধ. যঃঃঢ়ং://িি.িংপৎরনফ.পড়স/ফড়পঁসবহঃ/৮৬৮৫২৪৮২/ঞধমড়ৎব-রহ-অসবৎরপধ.
১০. চিন্ময় হাওলাদার। মহাকবি কালিদাস এবং বাংলা সাহিত্য। প্রাচ্যবিদ্যা পত্রিকা, ত্রয়োদশ সংখ্যা, ২০২৩;৬:৪৩-৬২।
১১. ঝঁশধহঃধ ঈযধঁফযঁৎর.গঁষঃরপঁষঃঁৎধষ ঝযধশবংঢ়বধৎব ঞৎধহংষধঃরড়হ অঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃরড়হ ধহফ চবৎভড়ৎসধহপব ২০২৩;২৭(৪২):৩১-৪৬.উঙও:১০.১৮৭৭৮/২০৮৩-৮৫৩০.২৭.০৩.
১২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবনস্মৃতি (ঘরের পড়া)। প্রকাশক শ্রীপুলিনবিহারী সেন, বিশ্বভারতী। তৃতীয় সংস্করণ, শ্রাবণ- পৌষ ১৩৬৬,পৃ ৬১-৬২।
১৩. ইন্দিরাদেবীকে লেখা চিঠি। ছিন্নপত্র, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে ২০১৬। পত্র নং-৫২, পৃ-১০০-১০২।
১৪. ডধষঃবৎ জঁনবহ. কধষরফধংধ: ঞযব যঁসধহ সবধহরহম ড়ভ যরং ড়িৎশং. চঁনষরংযবৎ ? : ? উব এৎুঁঃবৎ, ? ঔধহঁধৎু ১৪, ১৯৫৮.
১৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রাচীন সাহিত্য। আশ্বিন,১৩০৯। প্রথম প্রকাশ ১৩১৪। বিশ্বভারতী। প্রকাশক অমৃত সেন। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ।
১৬. ঊশবৎঃ ঋধধং. ঋধঁংঃ ধহফ ঝধপড়হঃধষধ. ঈড়সঢ়ধৎধঃরাব খরঃবৎধঃঁৎব.১৯৭৯;৩১(৪):৩৬৭-৩৯১.চঁনষরংযবফ নু উঁশব টহরাবৎংরঃু চৎবংং.
[এই রচনায় মূল লেখকের বানান রীতি অটুট রাখা হয়েছে। তাই পাঠকের মনে কখনো এ নিয়ে সংশয় জাগতে পারে। একই শব্দের বানান কখনো কখনো দু তিন রকমেরও হয়ে গেছে। যেমন ‘গভর্নর’ কে ‘গবর্নর’ অথবা ‘গবর্ণর’, ‘স্যার’কে ‘সার্‌’ ‘সিঙ্গাপুর’কে ‘সিঙাপুর’, ‘মালাক্কা’ কে ‘মলক্কা’ লেখা হয়েছে। এগুলো প্রমাদ নয়, মূল লেখকের বানান রীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে মাত্র।]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন