লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জের নির্জনতায় কয়েকদিন

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জের নির্জনতায় কয়েকদিন

ফন্ট সাইজ:

যন্ত্র-বিহঙ্গে চলেছি স্বপ্নের দেশে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্বপ্ন দেখছিলাম আরব সাগরের নীল জলরাশির মাঝে ভেসে থাকা স্বপ্নের দেশে যাওয়ার। যন্ত্র-বিহঙ্গের ডানায় থাকা পাখার জোরে আমরা নীল আকাশের বুক চিরে চলেছি। কখনো মেঘের ভেলায় চড়ে, আবার কখনো মেঘ বিছানো চাদরের উপর দিয়ে। আবার কখনো মেঘের ছাতাকে সঙ্গী করে। মেঘের সঙ্গে খেলতে খেলতে এগিয়ে চলেছে মাত্র আশি আসনের ছোট্ট এয়ারবাস বিমানটি। দুই ঘণ্টায় গতি ডানায় ভর করে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল সেই স্বপ্নের দেশে। উপর থেকে বিমানের জানালা দিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠলো সমুদ্রের বুকে এদিক সেদিক ছড়ানো বেশ কয়েকটি সবুজ দ্বীপ সূর্যের আলোয় ঝকমক করছে। আর তারপরেই বিমানটি নেমে পড়লো আগাত্তি দ্বীপের ছোট্ট বিমানবন্দরে। লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জে আসার প্রবেশ পথ এই একটিই। বিমানবন্দরটির অবস্থান লম্বাকৃতি দ্বীপের দক্ষিণ দিকের শেষের অংশে। মাত্র ১.২ কি.মি লম্বা এর রানওয়ে। বিমান থেকে নামার পর সে এক মনোরম দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। বিমানবন্দরের সীমানার তিনধারে সমুদ্রের নীল জলরাশি। মেঘমুক্ত আকাশের রঙও নীল। দূরে নারকেল গাছের সারি। বিমানবন্দর থেকে বের হবার মুখেই আগাত্তি লেখা নামফলক।
শহুরে কোলাহল মুক্ত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর নারকেল গাছে আচ্ছাদিত প্রায় নির্জন দ্বীপভূমিতে নেমেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। কবির কল্পনার ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ এই দ্বীপভূমিকে পরের কয়েকদিনে নানাভাবে অনুভব করেছি। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক রাজধানী কাভারাত্তি। আগাত্তি থেকে সমুদ্র পথে জাহাজে দু’ঘণ্টার যাত্রা। আগাত্তির মতো কাভারাত্তিও একটি প্রবাল দ্বীপ। লাক্ষাদ্বীপের জলের নীল রঙ এমন মুগ্ধতার আবেশে যে জড়াতে পারে তা আগে কখনো ভাবিনি। আমাদের নিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে জেটির দিকে। অসাধারণ এক দৃশ্যময়তা জড়িয়ে ধরেছে। সারিবদ্ধ নারকেল গাছ। আর তার ফাঁক দিয়ে তৈরি কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে মাত্র দশ মিনিটেই পৌঁছে গিয়েছিলাম জেটিতে। তবে জাহাজে উঠতে চাপতে হয়েছিল ছোট্ট বোটে। বেশ কষ্ট করেই উঠতে হয়েছিল বয়স্ক মানুষদের।


সমুদের নীল জলরাশির বুক চিরে দু’ঘণ্টার দুলুনি যাত্রা শেষে এসে অবশেষে পা রাখলাম কাভারাত্তিতে। সমুদ্রের দু’শ মিটারের মধ্যেই আমাদের হোটেল সি ভিউ। সামনেই বাতিঘর বা লাইট হাউস। সন্ধ্যা হওয়ার আগে থেকেই রাতভর আলোর সংকেত দিয়ে নাবিকদের দিশা দেখিয়ে চলেছে। ১৮৫টি সিঁড়ির সেই বাতিঘরে ওঠার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ১৬০টি সিঁড়ি ওঠার পর আর সাহস করিনি। তবে সিঁড়ির ফাঁক দিয়ে দেখা দ্বীপের আশপাশের বিহঙ্গম দৃশ্য ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। আর তার পাশেই জেটির লম্বা পথ পৌঁছে গিয়েছে সমুদ্রের কয়েক শ’ মিটার গভীরে। সমুদ্রের জলের রঙ আশ্চর্য রকমের ঘন নীল। একটি সাদা রঙের জাহাজ জেটির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার এক সঙ্গী জানালেন, এটি গুডস শিপ জেটি। এখান থেকে কেরালার বিভিন্ন বন্দরে এই সব জাহাজের যাতায়াত। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাদ্যদ্রব্য এই দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে আসে। সেদিনের মতো সারাদিনের ধকলে বিশ্রাম ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আসলে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালুরুর পথে রওনা হয়েছিলাম ভোর পাঁচটায়। স্বাভাবিক ভাবেই বিমান যাত্রার নিয়ম অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থাৎ মাঝ রাতেই সকলে পৌঁছে গিয়েছিলাম কলকাতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আমাদের দলটি বেশ বড়ই ছিল। নিয়ম মতো একটি দলে ২০ জনের বেশি লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জে পা রাখতে দেয় না। নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বেশ কড়াকড়ি। আসলে প্রশাসন এবং স্থানীয়রা দ্বীপের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য সদা সতর্ক। ফলে লাক্ষাদ্বীপে পা রাখতে হলে দরকার সরকারি পারমিট। লাক্ষাদ্বীপ প্রশাসনের সেই পারমিট আগেভাগেই সংগ্রহ করতে হয়েছে প্রত্যেককে। অবশ্য সেই কাজটি করে রেখেছিল আমাদের এই ভ্রমণের অভিভাবক নন্দিনী ও সোমনাথের যৌথ প্রয়াস দ্য কান্ট্রি রোডস। এই পারমিট দেখিয়েই ব্যাঙ্গালুরুর থেকে লাক্ষাদ্বীপের বিমানে উঠতে হয়েছে। এরপর প্রতি পদে পদে দেখাতে হয়েছে সেই পারমিট। আমাদের দলে ওরা দু’জন ছাড়া ছিলেন আরও ১৯ জন। আর এই ১৯ জনের সকলের বয়স ৬০ থেকে ৯০-এর মধ্যে। বয়োজ্যেষ্ঠরা যিনি তার বয়স ৮৮। কিন্তু মনের দিক থেকে তারুণ্যের ঝলকানি। সকলের মধ্যে ভ্রমণের উৎসাহ এতটাই যে, কাউকে বিশ্রামের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায়নি। আর তাই এই প্রবাল দ্বীপপুঞ্জে টেনে এনেছে অজানা দেশ দেখার কৌতূহলে।
আরব সাগরের বুকে ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে ২০০-৪৪০ কি.মি. দূরত্বে এই প্রান্তিক ভূখণ্ড লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জ। ভারতের পশ্চিমে শেষ সীমানা। এটি আসলে বেশ কয়েকটি প্রবাল দ্বীপের সমষ্টি। রৌদ্র কিরণ বিধৌত শুভ্র সৈকত, স্ফটিক-স্বচ্ছ জল, প্রবাল প্রাচীরের উপস্থিতি ও উপ হ্রদ নিয়েই এর আশ্চর্য জগৎ। এক বিদেশি পর্যটক এই দ্বীপপুঞ্জকে ‘শেষ স্বর্গ’ বলে বর্ণনা করেছেন। জলের রঙ কোথাও ঘন নীল, কোথাও বা সেই নীলে হালকা সবুজের ছোঁয়া। প্রবাল দ্বীপের সাদা ঝকঝকে তটভূমি। সমুদ্র মন্থনে মৃত প্রবালের ভঙ্গুর গুঁড়োতে তৈরি বলেই এই অঞ্চলের দ্বীপের সব সৈকতে শুভ্রতার চোখ জুড়ানো দৃশ্য।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, হাজার বছর ধরে মৃত প্রবালের দেহাবশেষ জমে জমে তৈরি এই দ্বীপপুঞ্জ। উন্মুক্ত সমুদ্রতল পর্বতমালা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয় এই দ্বীপপুঞ্জকে।
লাক্ষাদ্বীপ নামকরণ নিয়ে সকলেরই অপার কৌতূহল। আমারও ছিল। তবে তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, দ্বীপপুঞ্জ বলতে মালায়ালাম এবং সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় “এক লক্ষ দ্বীপ”। মালায়ালাম ভাষায় ‘লক্ষ’ শব্দটি হলো ‘লাকষা’। সেই থেকেই লোকমুখে দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ হয় ‘লাকষাদ্বীপ’ বা ‘লাক্ষাদ্বীপ’। অনেকে বলেন, খুব সম্ভবত আদি সংস্কৃত ভাষার অনুকরণে কয়েকশ’ বছর আগে সমুদ্র পথে আসা-যাওয়া করা নাবিক ও পর্যটকরা কল্পনায় এই দ্বীপপুঞ্জকে বলতো লক্ষদ্বীপ। সেটাই মুখে মুখে এখন লাক্ষাদ্বীপ।
অথচ মাত্র ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে এই দ্বীপপুঞ্জ। এটি তিনটি দ্বীপপুঞ্জে বিভক্ত। সেগুলো হলো আমিনদিভি, ল্যাক্কাডিভ ও মিনিকয় দ্বীপপুঞ্জ। তবে মাত্র ১০টি দ্বীপে জনবসতি রয়েছে। রাজধানী কাভারাত্তি ছাড়া অন্য দ্বীপগুলোতে বসতি রয়েছে সেগুলো হলো, আগাত্তি, মিনিকয়, বিত্রা, চেটলাত, কিল্টান, কদমত, আমিনী, অ্যান্ড্রট, কালপেনি ও মিনিকয়। এই দ্বীপপুঞ্জের বসতিপূর্ণ দ্বীপগুলোর মোট আয়তন মাত্র ৩২ বর্গ কিলোমিটার। দ্বীপপুঞ্জের মোট জনসংখ্যা সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী মাত্র ৬৪ হাজার ৪৭৩। যার মধ্যে ৫১.৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৮.৭ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বেশি মানুষের বসতি রয়েছে কাভারাত্তি, মিনিকয় ও অ্যান্ড্রট দ্বীপে। প্রতিটি দ্বীপ খুবই ছোট্ট।
জনবসতিপূর্ণ দ্বীপগুলোর মধ্যে মাত্র চার পাঁচটিতেই পর্যটকদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। আমাদের ভ্রমণ সূচিতে ছিল শুধুমাত্র কাভারাত্তি ও আগাত্তি। তবে কিছুদিন আগেই জনবসতিহীন বাঙ্গারাম দ্বীপকে দীর্ঘমেয়াদি লিজে নিয়ে টাটা গোষ্ঠীর তাজ হোটেল অত্যাধুনিক রিসোর্ট তৈরি করেছে। তাদের অতিথেয়তা নিলেই সেই দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হয়।
কাভারাত্তিতে এসে যেন পৌঁছে গিয়েছিলাম অন্য জগতে। চারপাশের রহস্যময় নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে এক মায়াময় পরিবেশ। শহুরে কোলাহল তো দূরের কথা, শব্দদূষণ প্রায় নেই বললেই চলে। বড় কোনো গাড়ি চলাচল চোখে পড়েনি। অধিকাংশই এসইউভি। যেদিকে তাকাই সেদিকেই নারকেল গাছের সুশৃঙ্খল সারি। অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য গাছ তো নেই-ই, নেই কোনো বন। ছোট্ট এই দ্বীপে আমাদের বড় একটি গাঁয়ের মতো লোকসংখ্যা। স্থানীয়দের কাছে জেনেছিলাম, সাকুল্যে কাভারাত্তিতে সাড়ে ১১ হাজার মানুষ থাকেন। লম্বায় এই দ্বীপটি ৫.৮ কিলোমিটার আর চওড়া ৩. ৬ কিলোমিটার। আয়তন ৪.২২ বর্গ কিলোমিটার। কলকাতার জানুয়ারির ঠাণ্ডা থেকে এসে লাক্ষাদ্বীপে বেশ গরম আবহাওয়ার মধ্যেই পড়েছিলাম। ফলে একটা অস্বস্তি ছিল প্রথম থেকেই।
কাভারাত্তির জনজীবন ও সমাজচিত্র জানার আগ্রহে অতি সহজেই ভাব জমিয়ে ফেলেছিলাম আমাদের ভ্রমণের স্থানীয় কো-অর্ডিনেটর আরশাদ হাসানের সঙ্গে। কাভারত্তিতে আমাদের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দেখভালের সার্বিক দায়িত্বে ছিল সে। আসলে মিনিকয়ের ছেলে। কোচি ও ব্যাঙ্গালুরু থেকে পড়াশোনা শেষ করে পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। নিজের পর্যটন সংস্থাও রয়েছে। যার অফিস মালয়েশিয়া, কোচি ও লাক্ষাদ্বীপে। এমবিএ পাস এই যুবক জানালেন, লাক্ষাদ্বীপের ৯৮ শতাংশ মানুষ সুন্নি ইসলাম ধর্মাবলম্বী। বাকি সামান্য হিন্দু ও খ্রিষ্টান। আর শিক্ষিতের হার ভারতের মধ্যে দ্বিতীয়। সব বসতিপূর্ণ দ্বীপে রয়েছে স্কুল। একটি দু’টি কলেজও। এখানকার ছাত্ররা নেভিগেশন, মাছ ধরার কৌশল এবং প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণ সম্পর্কেও পড়াশোনা করে। অনেক তরুণ এখন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান এবং পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা অর্জন করছে।
আরশাদই জানালেন, ভারতের মূল ভূখণ্ডের বেশ কিছুটা দূরে আরব সাগরের বুকে এতদিন প্রায় উপেক্ষিত হয়ে পড়ে ছিল এই দ্বীপপুঞ্জ। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে। এটিকে একটি আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। তবে কোচির উপর নির্ভর করে চলতে হয় এখানকার মানুষকে। সেখান থেকেই আসে নানা নিত্যপ্রয়েজনীয় সামগ্রী ও অন্যান্য অপরিহার্য জিনিসপত্র। দ্বীপের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েকটি সুপার মার্কেটের দেখা পেয়েছি ঠিকই, আমাদের হোটেলের নিচেও ছিল একটি। তবে সেগুলোতে মুদি দোকানের সামগ্রী ও প্যাকেজড খাবার দাবার ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। শুনলে আশ্চর্য মনে হবে, একটি কোমরের বেল্ট কেনার জন্য এক সন্ধ্যায় আরশাদ ভাইয়ের মোটরসাইকেলে সওয়ার হয়ে গোটা কাবারাত্তি ঢুঁ মেরে অবশেষে একটি দোকানে পেয়েছিলাম সেটি। আরশাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তোমাদের পোশাক ও অন্য সখের সামগ্রী কোথা থেকে পাও। সে জানালো, কিছু কিছু পাওয়া যায় দু’চারটে দোকানে। তবে ভালো কিছু কেনার জন্য ছুটে যেতে হয় কোচিতে। এক রাতের সমুদ্র যাত্রা। আর বিনোদনের জন্য কোনো সিনেমা হল বা অন্য কিছু কি রয়েছে? সে জানালো, মোবাইলই এখানকার মানুষের অন্যতম বিনোদন। আর সন্ধ্যার আড্ডা।
কথায় কথায় জনজীবনের যে ছবিটি তিনি তুলে ধরেছিলেন তাও বেশ আকর্ষণীয়। এখানকার নারী-পুরুষ উভয়েই কর্মঠ। ঐতিহ্যগতভাবে পরিবার এবং সম্প্রদায়ের শক্তিশালী স্তম্ভ নারীরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নারীরা পেশাদার ভূমিকায় প্রবেশ করছে। নার্স, শিক্ষক, প্রশাসক এবং উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে। যৌথ পরিবারের উপস্থিতি এখনো রয়েছে এই সব দ্বীপগুলোতে। সে-ই জানালো তার দেশ মিনিকয়ে সর্বত্র যৌথ পরিবার। তাদেরই ৩৪ জনের একান্নবর্তী সংসার। নারকেল ছোবড়া থেকে নারকেল তন্তু তৈরি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণের কাজটি করে প্রধানত নারীরা। আর পুরুষদের অধিকাংশই মৎস্যজীবী। তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার শখও রয়েছে। আমাদের হোটেলের সামনের জেটিতে এক ভোরে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার পাশপাশি দেখেছিলাম অনেক যুবকের আধুনিক ছিপ দিয়ে মাছ ধরার অনন্ত প্রতীক্ষা। ধরা পড়ে প্রধানত টুনা মাছ। অনেকের মতে, এই মাছ ধরার উপরই নির্ভর করে সেদিনের খাবার। ভাত ও টুনা মাছ এবং নারকেলের কিছু অংশ ও নারকেল তেল এখানকার অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ধারণের উপকরণ। দ্বীপে শাকসবজির কোনো চাষ নেই। যা আসে কোচি থেকেই।
কাভারাত্তিতে বেশ কিছু মসজিদ রয়েছে। যেগুলোর স্থাপত্য শৈলীতে আরবের প্রভাব। এক পথচলতি প্রবীণ মানুষের কাছেই জেনেছিলাম, লাক্ষাদ্বীপের প্রাচীনতম মসজিদটি রয়েছে কাভারাত্তিতে। ১৬৬৬ সালে নির্মিত এই উজরা মসজিদ ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে আরশাদ ভাই সন্ধান দিয়েছিল, এই মুসলিম প্রধান দ্বীপে একটি মন্দিরও রয়েছে। আর ধর্মান্ধতার কোনো স্থান নেই এই দ্বীপে। খবর পেয়ে আমাদের ফেরার দিন সকালে আমরা কয়েকজন ছুটে গিয়েছিলাম মন্দিরে। ছিমছাম সাজানো মন্দির। দেবী দুর্গা প্রধান আরাধ্যা। তবে আরও নানা দেবদেবীর প্রতিকৃতি রয়েছে। রয়েছে হনুমানের মূর্তিও। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশের টানেই কিছুক্ষণ কাটাতে ইচ্ছে করলেও সময়ের জন্য সেটা হয়নি।
অবশ্য এই মন্দিরে যাবার সময় এখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থতার প্রমাণ পেয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা সিএনজি (এখানে সবাই অটোই বলে) স্ট্যান্ডে কোনো সিএনজি না পেয়ে হাঁটা লাগিয়েছিলাম। কিন্তু অল্প সময়ে যাবো কি করে তাই নিয়ে ছিলাম চিন্তিত। সঙ্গী নন্দিনী একটি বাড়ির সামনে স্কুটার থেকে এক ভদ্রলোককে নামতে দেখে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো, সিএনজি কি পাওয়া যাবে? ভদ্রলোক বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সিএনজির জন্য সমানে ফোন করতে লাগলেন। না পেয়ে উপায়ান্তর খুঁজছিলেন। এমন সময় পাশের বাড়ির এক মধ্যবয়সী মহিলা বেরিয়ে এলেন। নিজেদের ভাষায় ভদ্রলোককে বললেন তিনি হাসপাতালে যাচ্ছেন চেক আপ করাতে। তাকে নিতে একটি সিএনজি আসছে। শোনামাত্র ভদ্রলোক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের বললেন, আপনারা উনার জন্য যে সিএনজি আসছে তাতে উঠে চলে যান। আমি উনাকে আমার স্কুটারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। সিএনজি এলে তার তরুণ চালককে সব বুঝিয়ে ভাড়া ঠিক করে আমাদের তুলে দিয়েছিলেন পরম যত্নে। বলে দিয়েছিলেন অপেক্ষা করে আমাদের হোটেলে ফিরিয়ে দিতে। আমাদের ভালোবাসার শহরে এমন আন্তরিক আতিথেয়তা সচরাচর চোখে পড়ে না। অথচ দূর দ্বীপে এসে হাবিব ভাইয়ের (নামটা পরে জেনেছিলাম সিএনজি চালকের কাছ থেকে) এই নিঃস্বার্থ সহায়তায় আমরা মুগ্ধ, আপ্লুত, অভিভূত। পরে জেনেছিলাম এখানকার সব মানুষই অসম্ভব অতিথিপরায়ণ ও বন্ধু বৎসল।
মনে পড়ে গেল আর একটি ঘটনার কথা। আমাদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। তবুও সমুদ্রকে আবার দেখার জন্য রাস্তায় উঠে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এমন সময় লুঙ্গি পরিহিত শ্মশ্রু সংবলিত এক প্রৌঢ় এগিয়ে এসে করমর্দন করে কুশল জিজ্ঞেস করলেন সহোদরের মতো। জড়িয়েও ধরলেন। আমি তো অবাক এক ভিনদেশি মানুষের ভালোবাসা পেয়ে। অফুরাণ সেই ভালোবাসা আমি কোনোদিনও ভুলতে পারবো না।
কাভারাত্তিতে এসে হোটেলে চেকইন করে একটু ফ্রেশ হয়ে সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়েছিলাম আশপাশটা ঘুরে দেখতে। একটা বেশ গ্রাম্য গ্রাম্য পরিবেশ। হোটেলটি মূল শহরের একটু বাইরে নিরিবিলিতে। হোটেলের অন্যদিকে ছোট রাস্তা এঁকে বেকে চলে গিয়েছে শহরের দিকে।
কাভারাত্তিতে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম বিকালের দিকে। প্রথমেই দেখে নিলাম এখানকার মেরিন একুরিয়াম অ্যান্ড মিউজিয়াম। নানা ধরনের অচেনা অদেখা রঙচঙে মাছের আশ্চর্য ছুটোছুটি। পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রাণী জগতের ফসিলের দুর্দান্ত সংগ্রহ। আছে সমুদ্র জগতের প্রচুর তথ্য। দেখে মন ভরে গিয়েছিল। পরে জেনেছিলাম, এই অঞ্চলে ৬০০ প্রজাতির বেশি সামুদ্রিক মাছ, ৭৮ প্রজাতির প্রবাল, ৮২ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ৫২ প্রজাতির কাঁকড়া, ২ প্রজাতির গলদা চিংড়ি, ৪৮ প্রজাতির গ্যাস্ট্রোপড এবং ১২ প্রজাতির বাইভালভের উপস্থিতি রয়েছে। এরপর আমরা গিয়েছিলাম যে সৈকতটিতে সেটি পরিচিত শিপ-রেক বিচ হিসেবে। আসলে সেখানে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আটকে রয়েছে। কোনো এক সময়ে ভীষণ এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে জাহাজটি তীরের কাছে এসে আটকা পড়ে গিয়েছিল। এখন সেটিই দর্শনীয় একটি স্পট। পশ্চিমে শেষ বিকালের সূর্যাস্তের দৃশ্যটি সেই জাহাজের ব্যাকড্রপে ভালোই লাগছিল। ওখান থেকে অন্য একটি বীচে গিয়ে শেষ বিকালে সূর্যাস্তের বিচ্ছুরণ দেখে ধীরে সুস্থে হোটেলে ফিরে এসেছিলাম।
আবার সেই আরশাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। জানতে চাইলাম, এখানকার ভাষা কি? রাস্তাঘাটে, দোকানে কারও কথা কিছু উঠতে পারছিলাম না। সে জানলো, এখানকার মানুষের প্রাথমিক ভাষা মালায়ালাম। তবে কথ্য ভাষা হলো জেসারি বা জেসরি। এর কোনো লিপি নেই। ইংরেজি সরকারি যোগাযোগের ভাষা হলেও সাধারণ মানুষ এই ভাষায় তেমন সড়গড় নয়। হিন্দিও প্রায় অপরিচিত ভাষা। আরশাদ আরও জানালো, এখানকার খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতে কেরলের মালয়ালি প্রভাব বেশি। একমাত্র মিনিকয়ে মালদ্বীপের প্রভাব রয়েছে। আর সংগীত ও নৃত্যে রয়েছে জীবন সংগ্রামের গল্প, সম্মিলিত পরিবেশনার ছাপ। লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জের প্রধান উৎসব হলো ঈদ। আরশাদ বলছিলেন, ঈদ উদ্যাপনের সময় গোটা দ্বীপ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে চারদিক। পরিবারগুলো মাস রোশি (টুনা ভর্তি রুটি), নারকেল-ভিত্তিক তরকারি এবং গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি খাবার সহ ভোজের আয়োজন করে। এই উৎসবের একটি ঐতিহ্য হলো প্রবীণদের দ্বারা উপহ্রদে ফেলে দেয়া মুদ্রার জন্য তরুণদের ডুব দেয়া। যা একটি খেলাধুলাপূর্ণ প্রতিযোগিতা, যা ভিড় আকর্ষণ করে। উৎসব উপলক্ষে লাভা লোকনৃত্য এবং কোলকালি (লাঠিসহ একটি সম্মিলিত পরিবেশনা)- এর মতো ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতকে অঞ্চলটিতে মানব বসতির পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেলেও আশ্চর্যের বিষয় লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জে কোনো আদিবাসী নেই। দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ মানুষের পূর্বসূরিরা দক্ষিণ এশিয়া থেকে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়।
দ্বীপের লোককাহিনী অনুসারে, প্রথম নারকেল গাছ ছিল এক ভ্রমণপিয়াসী সাধুর উপহার। যাকে এক দয়ালু বিধবা আশ্রয় দিয়েছিলেন। তার আশীর্বাদে ছোট্ট জমিতে রাতারাতি নারকেল গাছ গজিয়ে উঠেছিল। গাছগুলো দ্বীপবাসীদের প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করে, খাদ্য, জল, আশ্রয়, এবং দড়ির জন্য তন্তু। এই কারণেই নারকেল গাছকে পবিত্র মনে করা হয়। প্রতিটি অংশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বীপপুঞ্জগুলো কমপক্ষে প্রথম শতাব্দী থেকে নাবিকদের কাছে পরিচিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের বৌদ্ধ জাতকের কাহিনীতে এই দ্বীপপুঞ্জটির কথা উল্লেখ আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে, সম্রাট অশোকের কন্যা সংঘমিত্রার সময়কালে দ্বীপগুলোতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটেছিল। ঐতিহাসিক নথি এবং মৌখিক ঐতিহ্য অনুসারে, সপ্তম শতাব্দীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে দ্বীপগুলোতে ইসলাম ধর্মের প্রবেশ ঘটেছিল।
মধ্যযুগে এই অঞ্চলটি চোল সাম্রাজ্য এবং কান্নুরের রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত বাণিজ্য পথের একটি অংশ ছিল। খ্রিষ্টীয় পনেরো শতকের শেষের দিকে এই অঞ্চলে পর্তুগিজদের আগমন ঘটেছিল। এর পর অঞ্চলটি প্রথমে আরাক্কালের মুসলিম হাউজ এবং তারপর মহিশূরের টিপু সুলতান দ্বারা শাসিত হয়। ১৭৯৯ সালে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এই অঞ্চলটির অধিকাংশ বৃটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় এটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৬ সালে দ্বীপপুঞ্জটি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেয়েছে। ভারতের ক্ষুদ্রতম কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এটি। বর্তমানে লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জ একটি মাত্র জেলা। দশটি প্রশাসনিক মহকুমায় বিভক্ত। সব দ্বীপে চালু পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। একটিই সংসদীয় আসন। সংরক্ষিত সেটি। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ রয়েছে।
কাভারাত্তি দ্বীপে দু’রাত্রি কাটিয়ে এবার আমাদের ফিরে যাওয়ার পালা সেই আগাত্তি দ্বীপে। আবার সেই জাহাজে করে দু’ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ফের পা রেখেছিলাম আগাত্তিতে। তবে এবার আমাদের জাহাজটি ছিল বেশ আধুনিক। ফলে যাত্রা ছিল বেশ সুখকর।
আগাত্তিতে আমরা উঠেছিলাম একেবারে তটভূমির উপরে ‘চেডিয়ার’ বিচ রিসোর্টে। রিসোর্টের একধারে সৈকত বরাবর ছোট ছোট কটেজ। পাশেই একটি দোতলা বাড়িতে ছিলাম আমরা। সামনে দাঁড়ালেই বিস্তৃত নীল সমুদ্র। ঘুরছে ফিরছে নানা রঙের বোট। দূরের নীল আকাশ হারিয়ে গিয়েছে সমুদ্রের জলরাশিতে। আর সমুদ্রের ঢেউ এসে নিরন্তর আছড়ে পড়ছে তটভূমিতে। অনুভব করা যায় অব্যক্ত সংগীতের মূর্ছনা। অপরূপ এই দৃশ্যপট আমাদের দু’ দিনের সঙ্গী। সৈকতের সাদা বালুর উপরেই খাওয়ার জায়গা। আর বসে আড্ডা মারার জন্য চারদিক খোলা কিন্তু মাথা ঢাকা একটি উন্মুক্ত পরিসর। সেখানেই বসতো আমাদের সান্ধ্য আড্ডা। চলতো নানারকম মনোরঞ্জনের অনুষ্ঠান আর মজার খেলা। সঙ্গে গানের আসর।
চারদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি দড়ির তৈরি দোলনা। সেখানে বসে দোল খেতে খেতে সুদূরের পিয়াসী হয়ে সময় কেটে যায় কতো সহজে।
আগাত্তি খুবই ছোট্ট একটি দ্বীপ। লম্বাটে ভূখণ্ড। লম্বায় ৭, ৬ কিলোমিটার হলেও চওড়া এক কিলোমিটারেও কম। কোথাও কোথাও চওড়া কমে হয়েছে ৩০০-৪০০ মিটার। আমাদের রিসোর্টটির দু’ধারেই সমুদ্র। বেশ অবাক হয়ে দেখছিলাম। দু’দিকের সমুদ্রের জলের রঙ দু’ রকম। রিসোর্টের গা ঘেঁষে পাকা রাস্তা নারকেল গাছের সারিকে সঙ্গী করে চলে গিয়েছে দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা বিকালের দিকে চলে গেলাম দ্বীপের এক প্রান্তের একটি সী বিচে, যার নাম সাউথ বিচ। এখান থেকে সূর্যাস্তের মায়াবি দৃশ্য দেখাই ছিল উদ্দেশ্য। সৈকতে ভিড় করেছে অনেক পর্যটক। এলাকাটি বেশ জমজমাট। বেশ কয়েকটা রিসোর্ট আর ছোটখাট রেস্তোরাঁ রয়েছে। সূর্য দিকচক্রবালে নামতেই শুরু হলো মোবাইলে ফটো তোলা। একটু দূরেই দেখে নিলাম ওয়েস্টার্ন জেটি। এরপর অন্য একটি বিচে হাজির হয়েছিলাম। এ বিচের পোশাকি নাম আন্ধাম লেগুন বিচ। কিন্তু সে বিচে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছিল। সুতরাং এই বিচে ফের আগামীকাল সকালে আসা হবে ঠিক করে আমরা বিচের ধারে একটি কফিশপে কফি খেয়ে রিসোর্টে ফিরে এলাম।
লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণের চতুর্থ দিন সকালে যখন আমরা আগের দিনের অসম্পূর্ণ দেখা লেগুন বিচে পৌঁছে আরেক জগতের মুখোমুখি হলাম। নিরালা জায়গা, চওড়া বালুতট, তটপ্রান্তে সারি সারি নারকেল গাছ। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য। ট্যুরিস্টদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে মাঝে মধ্যে ছায়াঢাকা বসার জায়গা। সমুদ্রের জলের রং আশ্চর্য রকমের নীলচে সবুজ। তাতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে মাছধরা ট্রলার। সমুদ্রের জলে অবগাহন করছেন অনেকে। এক দম্পতিকে দেখলাম কায়াক নিয়ে সমুদ্রের গভীরে চলে যেতে। সমুদ্রে বিনোদনের নানা মজা নিচ্ছে অনেকে। বেশ খানিকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা একটা শপিং এরিয়া ঘুরে রিসোর্টে ফিরলাম লাঞ্চের ঠিক আগে আগে।
লাঞ্চের পরে আমাদের গন্তব্য ছিল বোটে করে কালপিট্টি দ্বীপ। এই জনমানবহীন দ্বীপটি আগাত্তি দ্বীপের দক্ষিণে প্রায় গায়ে গা ঘেঁষা। এই যাত্রা পথে আমাদের দেখার কথা সমুদ্র তলের প্রবাল উপত্যকা ও সমুদ্র শৈবালের বিচিত্র জগৎ। এজন্য আমরা সওয়ার হয়েছিলাম তিনটি গ্লাসবটম বোটে। দু’পাশে সারি করে বসেছি আমরা আটজন করে। মাঝখানে বোটের কাঁচের ফ্লোর। দেখা যাচ্ছে সমুদ্র তল। কিছুটা যেতেই সামনে উপস্থিত সমুদ্রের নিচের প্রবাল উপত্যকা। আমরা ওপর থেকে নিচের নানা প্রজাতির জীবন্ত প্রবাল দেখে মোহিত। বোটের নিচে ধরা দিলো নানা বর্ণের, নানা আকারের সামুদ্রিক মাছ। সকলেই বেশ মোহিত সমুদ্রতলের এই রহস্যময় রঙিন জগৎ দেখে। সকলেরই চোখে মুখে অজানা জগতের মুখোমুখি হওয়ার এক অদ্ভুত তৃপ্তি। দেখলাম বিশাল আকৃতির রঙচঙে কয়েকটি কচ্ছপ। আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি তো আমাদের বোটের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। সমুদ্রের এই অংশে নাকি একটি বিরল প্রজাতির কচ্ছপের বসতি। সব দেখে চোখ সার্থক। মনও তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ।
এরই মধ্যে এসে পৌঁছে গিয়েছিলাম কাল পিট্টি দ্বীপে। এই দ্বীপে কোনো জনবসতি নেই। তাই এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আদিম, অকৃত্রিম। লম্বায় চারশ’ আর প্রস্থে আড়াইশ’ মিটারের ছোট্ট একটি দ্বীপখণ্ড। সামনে নীল সমুদ্র, শ্বেতশুভ্র প্রবাল প্রাচীর আর সবুজ বনানীর অপূর্ব মেলবন্ধন। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক সৌন্দর্য়ের রূপকথা। রয়েছে একটি স্মারক, যাতে রয়েছে রূপার তৈরি একটি অশোকস্তম্ভ। তোলা হলো নানা প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের ছবি। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার সেই একই পথে বোটে করে ফিলে এলাম আমাদের রিসোটের সামনের সৈকতে।
পরের দিনই আমরা রওনা হয়েছিলাম মূল ভূখণ্ডের দিকে। সকলের কথায় বার বার ফিরে আসছিল অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রহস্যময় নির্জনতার কথা। মুগ্ধতা দিয়ে শেষ হয়েছিল আমাদের লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ। কাভারাত্তির মিউজিয়াম, সৈকতের সূর্যাস্ত, আগাত্তির স্নিগ্ধ সৌন্দর্য, সমুদ্রতলের বিস্ময়কর জগৎ আর সন্ধ্যার আড্ডা, সব মিলিয়ে এই সফর ছিল অবিস্মরণীয়।
সবচেয়ে ভালো লাগলো, দ্বীপবাসীরা তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ এবং আধুনিকীকরণের সুবিধা গ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আর তরুণ প্রজন্ম বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাদের ঐতিহ্যকে সম্মান দিয়ে লাক্ষাদ্বীপের ভবিষ্যতের গল্প লিখছে। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, টেকসই পর্যটন উদ্ভাবন করছে এবং বিশ্বের সঙ্গে তাদের সংস্কৃতিকে ভাগ করে নিচ্ছে।
কৃতজ্ঞতা: সুদীপ রায়, আরশাদ হাসান

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন