ইয়াজিদি নারী ও শিশুর ওপর চালানোর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ফ্রান্সের এক নাগরিক। তার নাম জিহাদি সাবরি এসিদ। গত ২০ মার্চ তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে প্যারিসের ফৌজদারি আদালত। গণহত্যার দায়ে এই প্রথম কোনো দৃষ্টান্তমূলক রায় দিলো দেশটি। যা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দোষীর অনুপস্থিতিতেই এই বিচারিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ধারণা করা হয়, ২০১৮ সালে এসিদ সিরিয়ায় নিহত হয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে তাকে জীবিত পাওয়া গেলে এই রায় কার্যকরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধীকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।
প্রায় ১২ বছর আগে ইরাক ও সিরিয়ায় ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর উগ্রপন্থীরা। এই রায় সেই নৃশংসতার আনুষ্ঠানিক বিচারিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের আগস্টে সিনজার (শিংগাল) অঞ্চলে চালানো হামলাকে ইয়াজিদি ইতিহাসের একটি ট্র্যাজিক মোড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের রায়ে বলা হয়, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সাবরি এসিদ দুইজন ইয়াজিদি নারী ও তাদের শিশুদের ওপর দাসত্ব, অবৈধ আটক, নির্যাতন, ধর্ষণ, নিপীড়নসহ একাধিক অমানবিক সহিংসতা চালায়। তদন্তে প্রমাণিত হয়, তিনি ২০১৫ সালে এক ইয়াজিদি নারী ও তার সন্তানদের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যা একটি সুসংগঠিত দাসত্ব ব্যবস্থার অংশ ছিল।
আইনগতভাবে আদালত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করেছে। প্রথমত, আইএস পরিকল্পিতভাবে ইয়াজিদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিছে। দ্বিতীয়ত, সাবরি এসিদ এসব অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং সহযোগী হিসেবে দায়ী।
এই মামলার সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে, যখন মানবাধিকার সংস্থা ও বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে। ২০২৪ সালে তদন্তকারী বিচারকরা মামলাটি ফৌজদারি আদালতে পাঠান। বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফিদাহ, ইয়াজদাহ, এবং ফ্রি ইয়াজিদি ফাউন্ডেশনসহ একাধিক সংগঠন ভুক্তভোগীদের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছে।
কিনিয়াত সংগঠনের সভাপতি বাহজাদ ফারহান বলেন, এই রায় ফরাসি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর আইএসের চালানো নৃশংসতার একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি। তার মতে, সাহসিকতার সঙ্গে সাক্ষ্য দেয়া ভুক্তভোগীদের জন্য এটি ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মানবাধিকার আইনজীবী ক্লেমঁস বেকতার্ত বলেন, ইয়াজিদি বেঁচে থাকা মানুষের সাহস ও দৃঢ়তার কারণেই এই রায় সম্ভব হয়েছে এবং এটি আইএস সদস্যদের বিচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির স্থাপন করেছে।
ইয়াজদা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাটিয়া নাভরুজভ বলেন, এই রায় আইএস চরমপন্থীদের দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, এই বিচার ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের দুর্ভোগের শেষ নয়। অনেক ভুক্তভোগী এখনো ইরাকের শরণার্থী শিবিরে মানবিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে।
ফ্রি ইয়াজিদি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারি ইব্রাহিম বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেও ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর বর্তমান সংকট উপেক্ষা করা যায় না। তিনি সতর্ক করে বলেন, অঞ্চলে আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কা এখনো তাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ইউরোপীয় আদালতগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত অভিযোগের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ যেমন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
