ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া এক ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে জ্বালানি তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শতশত পেট্রোল স্টেশন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর সমন্বিত হামলা শুরু করার পর থেকে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী। ফলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল প্রবাহিত হয়।
সিডনি ও মেলবোর্নের কিছু পেট্রোল স্টেশনে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি প্রায় ৩ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। যেখানে আনলোডেড ৯১ অকটেনের গড় দাম বর্তমানে প্রায় ২.৫০ ডলার।
সহকারী পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েটকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেন যে অস্ট্রেলীয়দের শীঘ্রই পেট্রোল পাম্পে লিটার প্রতি ৪ ডলার দিতে হতে পারে কিনা। তখন তিনি কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
তিনি স্কাই নিউজকে বলেন, দাম নিয়ে কী হতে চলেছে তা নিয়ে আমি অনুমান করতে পারি না। তবে এটা স্পষ্ট যে, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং দাম বাড়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। এই সংঘাত প্রভাব ফেলছে এবং এটি যত দীর্ঘস্থায়ী হবে পরিস্থিতি তত বেশি অস্থিতিশীল হতে পারে। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের সরকার ট্রাম্প প্রশাসন ও নেতানিয়াহু প্রশাসনকে যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনার চেষ্টা করতে আহ্বান জানিয়ে আসছে। সহকারী পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার সম্ভাব্য সবকিছুই করছে। অস্ট্রেলিয়ায় উপলব্ধ জ্বালানির পরিমাণ সর্বোচ্চ করার চেষ্টায় প্রধানমন্ত্রী আমাদের এশীয় প্রতিবেশী ও সমকক্ষদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে মানুষের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নেওয়া উচিত। এর বেশি নয়, এবং আমরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ চালিয়ে যাব।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র প্রধান ড. ফাতিহ বিরোল ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে সভায় বলেছেন, পেট্রোলের মূল্য, সংকট সমাধানের জন্য অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি আরো বলেন, আমি প্রতিদিন উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের মজুত তেল ছাড়ার বিষয়টি বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু এটি কোনো প্রকৃত সমাধান নয়। এটি শুধুমাত্র অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
সোমবার ক্যানবেরা জাতীয় প্রেসক্লাবে ফাতিহ বিরোল আরো বলেন, ১৯৭০-এর দশকের দুটি তেল সংকটের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বিশ্ব প্রতিদিন বেশি ব্যারেল তেল হারাচ্ছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিকে 'অত্যন্ত গুরুতর' এবং ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের দুটি তেল সংকটের চেয়েও খারাপ বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সময়ে প্রতিটি সংকটে বিশ্ব প্রতিদিন প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল তেল হারায়। দুটি সংকট মিলিয়ে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেল। এবং এরপর আমরা সবাই জানি যে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এবং আজ আমরা প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল হারাচ্ছি। সুতরাং, দুটি বড় তেল সংকটের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি।
ড. ফাতিহ বিরোল আরও সতর্ক করে বলেন, কৌশলগত এই নৌপথ দিয়ে আসা জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতার কারণে অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো এই সংকটের একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কাছে বর্তমানে প্রায় ৩০ দিনের ডিজেল ও জেট ফুয়েল এবং প্রায় ৩৮ দিনের পেট্রোলের মজুদ রয়েছে, যা আইইএ-র সুপারিশকৃত সর্বনিম্ন ৯০ দিনের চেয়ে অনেক কম। যুদ্ধ অবিলম্বে শেষ হয়ে গেলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে এবং নয়টি দেশের অন্তত ৪০টি প্রধান জ্বালানি সম্পদ ইতোমধ্যেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে সোমবার প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদের বিরোধী দল সঠিক পরিসংখ্যান জানতে চাপ দিলে জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন জানান, অস্ট্রেলিয়া জুড়ে প্রায় দুই শতাধিক সার্ভিস স্টেশনে জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। যে নিউ সাউথ ওয়েলস সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে নিউ সাউথ ওয়েলসে মোট ২৪৪৪টি সার্ভিস স্টেশনের মধ্যে ৩৭টিতে জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, কুইন্সল্যান্ডে ঘাটতি ছিল আরও গুরুতর। ‘কুইন্সল্যান্ডে ১৮০০-র কিছু বেশি পেট্রোল স্টেশনের মধ্যে ৪৭টিতে ডিজেল নেই এবং ৩২টিতে সাধারণ আনলোডেড পেট্রোল নেই। গত সপ্তাহের শেষের দিকে ভিক্টোরিয়ায় ব্যাপক ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে। এবং ১০৯টি আউটলেটে জ্বালানি তেল ছিল না।এবং আজ প্রায় ৫০টি স্টেশনে ডিজেল শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। অন্তত ১৯৩টি সার্ভিস স্টেশনে পেট্রোল নেই। জ্বালানি মন্ত্রী স্বীকার করেন যে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, নর্দার্ন টেরিটরি, সাউথ অস্ট্রেলিয়া বা তাসমানিয়ায় কোন কোন স্টেশনে জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। সে সম্পর্কে তার কাছে কোনো নিশ্চিত পরিসংখ্যান নেই।
তবে তিনি বলেছেন যে পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানির দামের তীব্রতম উল্লম্ফন অব্যাহত থাকায় তিনি সরাসরি ডব্লিউএ কোয়ালিশন এমপিদের হালনাগাদ তথ্য দিয়ে আসছিলেন।
এ বিষয়ে আমি বিরোধী দলের কিছু পশ্চিম অস্ট্রেলীয় সদস্যের সাথেও কথা বলেছি। যে আমরা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানির প্রবাহ বাড়তে দেখছি এবং পেট্রোল স্টেশনের সংখ্যাগুলোও কমে আসছে। চলমান সরবরাহ উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে আয়োজিত একটি সরকারি জ্বালানি গোলটেবিল বৈঠকের অংশ হিসেবে বোয়েন আজ পরে তাসমানিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী নিক ডুয়িগানের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।
জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শতশত পেট্রোল স্টেশন
আলমগীর হোসেন রুহেল ( অস্ট্রেলিয়া ) সিডনি থেকে
অনলাইন
২ মাস আগে
২৩ মার্চ (সোমবার), ২০২৬, ৬ঃ৩৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
