ঈদুল আজহার পরের দিন ফ্লোরিডা থেকে আমার ছেলে ঐশ্বর্য চলে এসেছে লস অ্যানজেলেসে, আমার মেয়ের বাসায় আমাদের কাছে। ছেলে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডাতে পিএইচডি করছে। তো ছেলে আমাদের ঘোরাতে নিয়ে যাবে, তাই তিনদিনের জন্য রেন্ট-এ-কার ভাড়া করেছে। আমাদের গন্তব্য লস অ্যানজেলেস থেকে তিনশ’-সাড়ে তিনশ’ মাইল দূরে মিলারে কাউন্টির বিখ্যাত ‘শিকোইয়া ন্যাশনাল পার্ক’র বিখ্যাত ইউসেমাইট ও এর আশপাশ দেখা। এই দীর্ঘপথে আমরা অনেক কিছুই দেখতে দেখতে যাবো।
সকাল ১০টায় আমরা চাষী ফ্যামিলি লস অ্যানজেলেসের মারিপোছা এভিনিউ থেকে বের হয়ে পড়ি। লস অ্যানজেলেস কাউন্টি পার হতেই শুরু হলো ক্ষেত খামারির দিগন্ত উন্মোচিত প্রান্তর। কোথাও মাঠের পর মাঠ ফসলি জমি, কোথাও রাস্তার দু’ধারে সারি সারি কমলার বিস্তৃত বাগান। অফ সিজনেও অনেক গাছে কমলা ঝুলে আছে। কোথাও আবার সোনালি ছোট ছোট পাহাড়। রুক্ষ ও সবুজাভ পাহাড়ও চোখে পড়লো। কখনো তার পাশ দিয়ে, কখনো দু’পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আমরা ছুটে চলেছি। দুপুরের দিকে শিকোইয়া ন্যাশনাল পার্কে প্রবেশ করে পিকনিক করার মতো একটা স্পটে লাঞ্চ করে নিলাম।
গাড়ি ড্রাইভ করছে ছেলে। ওর পাশের সিটে বসে আছে আমার মেয়ের জামাতা শোয়েবুর রহমান। পেছনের দু’সিটে আমি, স্ত্রী বীণা, মেয়ে বুশরা ও নাতনি সাইরিশ নভেরা। ছেলে এচঝ দেখে গাড়ি হাঁকিয়ে ক্রমশ পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছে। পথটা দার্জিলিংয়ের মতো চড়াই-উতরাই, ভয়ের! উপরে আসার পর সমতল ভূমির মধ্যে বিশাল গাছগাছালি পরিবেষ্টিত এলাকা। রাস্তার দু’ধারে বিশাল বিশাল সুউচ্চ উচ্চ গাছ। গাছগুলো অনেক মোটা মোটা। এত উঁচু ও এত মোটা মোটা গাছ আমি আগে দেখিনি! গাড়িতে বসেই তা অবাক নয়নে দেখছিলাম। এত বড় বড় এবং মোটা মোটা গাছ হতে পারে তা বিস্ময়ের বাইরে ছিল!
ইউসেমাইট এলাকার ভেতর দিয়ে যেতে যেতেই ছেলে একটা সমতল প্রান্তরে গাড়ি পার্ক করলো। সেখানে বিশাল মোটা ও লম্বা একটা গাছ পড়ে আছে। তার ছালবাকল উঠে গেছে। আর তার কাণ্ডটা এখনো পাথরের মতোই শক্ত হয়ে শুয়ে আছে পথের ওপর! গাছের গোড়ার দিকে খোদাই করে তার ভেতর দিয়ে রাস্তার এদিক-ওদিক যাওয়ার জন্য টানেল করে নিয়েছে। তার ভেতর দিয়ে মানুষ চলাচল করে। গাছটার গোড়ার দিকটা এতটাই চওড়া যে, ওর ভেতর দিয়ে বড় একটা গাড়িকে আসতে দেখলাম। এ যেন একটা টানেল! গাছটার ওপর পর্যটকরা হেঁটে বেড়াচ্ছে। বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। আমার মেয়ে, মেয়ের জামাই ওর উপর উঠে হাঁটলো, বসে থাকলো কিছুক্ষণ। আমি ছবি তুলে দিলাম ওদের। ওই গাছের পাদদেশে একটা ফলকে লেখা, এ গাছটা ১৯৪৩ সাল থেকে এখানে পড়ে আছে। হিসাব করে দেখলাম ৮১ বছর ধরে গাছটি পড়ে আছে এখানে। গাছটি অক্ষত আছে। এখনো এর কোনো অংশে পচন ধরেনি। আর মনুষ্যকুলকে তা আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। টুরিস্টরা ভিড় করে দেখছে পতিত এবং সংরক্ষিত বিশাল এই গাছটা। আমরাও বিস্ময়ে তা দেখলাম! ছবি তুললাম।
এখান থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এগিয়ে ছেলে একটা ফলসের (ঝরনা) কাছে গাড়ি পার্কিং এলাকায় গাড়ি রাখলো। বিস্তৃত সমতল জায়গা নিয়ে এলাকাটা গঠিত। চারিদিকে প্রচুর গাছগাছালি। তার মধ্যে ওয়াকওয়ে। আসলে এটা একটা বিস্তৃত পাহাড়ের পাদদেশ। কিছুটা পথ হেঁটে আমরা ব্রাইডেল নামক ফলসের কাছে এসে দাঁড়ালাম। দূর থেকেই ওপর থেকে শোঁ শোঁ বেগে পানি পড়ার শব্দ কানে ভেসে আসছে। কাছে আসতেই দেখলাম মানুষের খুব হৈচৈ। পানি, নদী, সমুদ্র দেখলে মানুষ খলখলিয়ে ওঠে। এখানে এসে তা আবার দেখলাম। ফলসের (ঝরনা) নিচে শান বাঁধানো চত্বরে সে কি আনন্দ, সে কি উল্লাস! বড়রাও শিশুদের মতো উচ্ছ্বাস করছে! এই ব্রাইডেল ফলস ক্যালিফোর্নিয়ার সর্বোচ্চ উঁচু ফলস বা ঝরনা। এত সুউচ্চ ঝরনা আমি সিকিম কিংবা দার্জিলিংয়েও দেখিনি।
ফলস থেকে হেঁটে হেঁটে এবার আমরা এসে দাঁড়ালাম পৃথিবীর বৃহত্তর একক গাছের নিচে।
এটা শিকোইয়া ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত ‘জেনারেল শেরম্যান ট্রি’; যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাছ। এই এলাকাটা যা নির্মল ট্রেইল এবং প্রাচীন বন দ্বারা বেষ্টিত। অপূর্ব গাছগাছালি পরিবেশিত এলাকা। ইতিপূর্বে এমন মনকাড়া স্থান আমি আগে কখনো দেখিনি!
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ‘টুলারে কাউন্টি’র শিকোইয়া জাতীয় উদ্যানের জায়ান্ট ফরেস্টে অবস্থিত এই বিশাল শিকোইয়া গাছের নাম ‘জেনারেল শেরম্যান (এবহবৎধষ ঝযবৎসধহ)’।
এই গাছটি বিশ্বের বৃহত্তম একক কাণ্ড গাছ।
গাছটির উচ্চতা ৮৩.৮ মিটার বা ২৭৫ ফুট।
কাণ্ডের ব্যাস ১১ মিটার বা ৩৬ ফুট।
কাণ্ডের আয়তন ১,৪৮৭ মিটার বা ৫২,৫০০ ঘনফুট।
গাছটির রোপণকাল ৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব হতে ৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব। আয়তন অনুসারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবিত একক-কাণ্ড গাছ। এটি আনুমানিক ২,৩০০ থেকে ২,৭০০ বছর বয়সী।
আমি কী ভেবেছি ২,৩০০ থেকে ২,৭০০ বছর বয়সী পৃথিবীর বৃহত্তম ‘জেনারেল শেরম্যান গাছের নিচে এসে পদধূলি দেবো! এর পাদদেশে এসে দাঁড়াবো। হ্যাঁ ২০২৪ সালের ২৫শে জুন বিকালে সপরিবারে সুদূর লস অ্যানজেলেস থেকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিলাম নিচ থেকে এর উপর পর্যন্ত। দেখছিলাম এর পুরুত্ব এবং এর বিশালত্ব! গাছটির নিচে একটি ফলকে ইংরেজিতে লিখা ‘এবহবৎধষ ঝযবৎসধহ’।
দূর থেকে কিউ দিয়ে কাছে গিয়ে এই বিস্ময় গাছের ছবি তুলতে হয়। কিউ থেকে এক একটা ফ্যামিলি সুশৃঙ্খলভাবে এই বৃহত্তম গাছের পাদদেশে গিয়ে ছবি তুলছে। ‘ঠ’ চিহ্ন দেখাচ্ছে। ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে, ভিডিও করছে স্মৃতিস্মারক বহন করে নিয়ে যাবে বলে।
আমরা চাষী ফ্যামিলিও লাইন দিয়ে সিরিয়াল মতো পাদদেশে গিয়ে সিঙ্গেল ও গ্রুপ ছবি তুললাম। পর্যটকরা এসে আমাদের ছবি তুলে দিলেন। আমরাও তুলে দিলাম ওদের ছবি। এটা ছিল দুর্লভ একটা মুহূর্ত! একটা ক্ষণ! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাছ দেখা সৌভাগ্যের বৈকি! মহান আল্লাহ্তায়ালা আমাদের দেখালেন!
জানা যায়, ২০২১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর শিকোইয়া জাতীয় উদ্যানের কঘচ কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডে গাছটি হুমকির মুখে পড়েছিল। উদ্যান ও দমকল কর্মীরা গাছের গোড়াটিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক ফয়েলে মুড়ে ফেলেন। সে সময় দাবানল জেনারেল শেরম্যান গাছের কাছাকাছি চলে এসেছিল, যা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায় এবং এখনো অক্ষত আছে। অক্ষত আছে বলেই হাজার হাজার মানুষ বিস্ময়ে তা দেখছে। আমরাও দেখলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গাছকে!
সন্ধ্যার আগে আগে গাড়িতে চড়ে বসলাম। ছেলে ঐশ্বর্য গাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফ্রেসনো শহরের দিকে। রাতটা আমরা সেখানেই কাটাবো। পরের দিন ফের বের হবো বাকি পর্যটক স্পটগুলো দেখবো বলে। Í
দেখে এলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৃক্ষ
চাষী সিরাজুল ইসলাম
২৩ মার্চ (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

আফসোস রইলো
২ মাস আগেঅনেক দেখার ইচ্ছা আছে,
কিন্তু স্বাদ আছে সাধ্য নাই।