মস্তিষ্কের ভূগোলে মনের ঠিকানা

মস্তিষ্কের ভূগোলে মনের ঠিকানা

ফন্ট সাইজ:

আপনি এখন ঠিক কোথায় আছেন? চারপাশে তাকালে হয়তো ঘরের দেয়াল, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া বিকালের আলো, কিংবা দূরের গাড়ির শব্দ বা কোনো ল্যান্ডমার্ক নিশ্চিত করে দেবেÑআপনি কোন শহরের কোন ঠিকানায় আছেন। জিপিএস লোকেশন দিয়ে আপনার অবস্থান সুনির্দিষ্ট করা তো এখন জলভাত। আসলে আপনার দৈহিক অবস্থান নিয়ে সন্দেহ নেই। সেটা জানতে চাই না। প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে আরেকটু গভীরে যাইÑআপনার আসল ‘আপনি’ কোথায় আছেন?
আসলে আপনার হাত-পা, বুক-পিঠÑএগুলো তো স্রেফ একটা হাড়-মাংসের খাঁচা। শরীরটা তো নশ্বর এক আধার মাত্র। এই আধারের ভেতরে যে সত্তাটি নিজেকে ‘আমি’ বলে দাবি করে, সে কোথায় থাকে? যে সত্তাটা অহোরাত্রি দিগি¦দিক ছুটে বেড়ায়, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ঘুরে আসতে পারে গোটা মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে, তার ঠিকানা কোথায়? যে সত্তা আশা করে, ভয় পায়, ভালোবাসে, অপছন্দ করে, সিদ্ধান্ত নেয়, ভুল করে, অনুতপ্ত হয়, দেহের কোন সীমানায় তার ঘর-বাড়ি? আপনার রুচি, বিশ্বাস, দ্বিধাÑসব মিলিয়ে যে ‘ব্যক্তিসত্তা’ আপনাকে মানুষ হিসেবে অনন্য করে তুলেছে, তার পোস্ট কোডটা কী?
উত্তরে হয়তো নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বলবেনÑ‘কেন? সব তো এখানেই! আমার মগজে।’
আপাতদৃষ্টিতে উত্তরটা সহজ মনে হলেও, এর পেছনের গল্পটা কিন্তু মোটেও সরলরৈখিক নয়। আবার উত্তরটাও পুরো নয়, আংশিক সত্যি। পুরোটা জানলে কিছুক্ষণ পর আপনিও সে কথা স্বীকার করবেন।
বিজ্ঞান বলে, মস্তিষ্কই আমাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। মস্তিষ্কই সেই কমান্ড মডিউল, সেই অদৃশ্য সিন্দুক, যেখানে জমা থাকে আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। আয়তনের দিক থেকে আপনার মস্তিষ্ক এক লিটারের একটা বোতলের সমান। মাত্র দেড় কেজি ওজনের এবং জেলির মতো থকথকে এই পদার্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি। অথচ এইটুকু জায়গার মধ্যেই ধরা আছে মহাবিশ্বের জটিলতম সব রহস্য সমাধানের চাবিকাঠি। এর ভেতরেই আছে ৮৬ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন। এই কোষগুলোই আমাদের ক্ষুদ্র প্রসেসিং ইউনিট। সেগুলোর প্রতিটিই জালিকার মতো যুক্ত থাকে হাজার হাজার সংযোগে। এই জটিল সংযোগের জালেই তৈরি হয় আমাদের স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা, আবেগ, সৃজনশীলতা। আবার এই বস্তুই মানুষকে শিখিয়েছে আগুন জ্বালাতে, প্রকৃতির জটিল সব রহস্য উদ্ঘাটনে, রকেট বানিয়ে চাঁদে বা মঙ্গলে পাঠাতে, কিংবা কবিতার ছন্দে প্রেম নিবেদন করতে। এ জটাজালই আমাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিত্বে, মননে অন্যদের চেয়ে অনন্য করে তোলে। কিন্তু কীভাবে? কোটি কোটি নিউরনের এক বৈদ্যুতিক ঝড়ের মধ্যে ‘আপনি’ নামক সত্তাটি ঠিক কীভাবে এনকোড হয়ে থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে মানুষকে পাড়ি দিতে হয়েছে হাজার বছরের এক দীর্ঘ পথ। সেই পথচলাকে বলা চলে এককথায় শ্বাসরুদ্ধকর। সেখানে ভুল সূত্র, ব্যর্থতা ও সফলতার টানাপড়েন এবং মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনাÑসবই ছিল। চলুন, সেই ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে আমরাও শরিক হই সেই রোমাঞ্চকর অভিযানে।

ইউরোপিয়ান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সব জ্ঞানের সুতিকাগার হলো প্রাচীন গ্রিস। টাইম মেশিনে চেপে যদি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিসে ফিরে যাই, তাহলে দেখবো এক অদ্ভুত দৃশ্য। সে যুগের প্রভাবশালী দার্শনিক এরিস্টটল এই রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন। তার সামনে হয়তো কোনো ব্যবচ্ছেদ করা প্রাণীদেহ। তিনিও মানুষের সত্তার উৎস খুঁজছেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, তিনি মস্তিষ্কের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না! অটল সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো ভঙ্গিতে তিনি তাকিয়ে আছে হৃদপিণ্ডের দিকে। তার যুক্তিটা ছিল একেবারে সরল। মানবদেহের দিকে তাকানÑ কোন অঙ্গটা থামলে সব শেষ? উত্তর হৃৎপিণ্ড। কোন অঙ্গ কখনো বিশ্রাম নেয় না? এবারো উত্তর হৃৎপিণ্ড। কোন অঙ্গ ঘিরে আমরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি? সেটাও ওই হৃৎপিণ্ডই।
অন্যদিকে, মাথার খুলির ভেতরে থাকা মগজটা দেখতে ধূসর, নিস্তেজ। স্পর্শ করলে কোনো অনুভূতিও জাগে না। তাই এমন মগজটাকে এরিস্টটলের মনে হয়েছিল অপ্রয়োজনীয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত আসেন, মগজ হলো শরীরের রেডিয়েটর বা কুলিং সিস্টেম। এর কাজ স্রেফ রক্ত ঠান্ডা করা এবং শরীর ও উত্তপ্ত হৃৎপিণ্ডকে শান্ত রাখা। তার মতে, মগজের ওই প্যাঁচানো, উঁচু-নিচু খাঁজগুলো তৈরিই হয়েছে তাপ বের করে দেয়ার জন্য। অনেকটা আজকের দিনের গাড়ির রেডিয়েটরের মতো।
বর্তমানে দাঁড়িয়ে এরিস্টটলকে বোকা ভাবাই যায়। কিন্তু আপনাকে যদি এরকম কোনো যন্ত্র ডিজাইন করতে বলা হতো, তাহলে কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশকে একদম ওপরের দিকে কিংবা একটা সরু ঘাড়ের মতো কোনো জায়গার ওপর বসাতেন? নাকি সেটা শরীরের মাঝখানে, শক্ত হাড়ের খাঁচায় সুরক্ষিত জায়গায় জুতসই করে বসিয়ে দিতেন?
যুক্তি কিন্তু হৃৎপিণ্ডের পক্ষেই কথা বলে। আজও আমরা আবেগের কথা বলতে গিয়ে বুকে হাত দিই, মাথায় নয়। আমরা বলি ‘হৃদয় ভেঙেছে’। কেউ বলে না ‘আমার ফ্রন্টাল কর্টেক্স ভেঙে গেছে’।
কিন্তু এরিস্টটল যতই বুদ্ধিমান হোন না কেন, তিনি মৌলিক ভুল করেছিলেন। তার এই ভুল ধারণা দীর্ঘদিন জোঁকের মতো লেগে ছিল বিজ্ঞানীদের মনে। মজার ব্যাপার হলো, এরিস্টটলের এই বিভ্রান্তির হাজার বছর আগেই, নীলনদের তীরে প্রাচীন মিশরীয়রা কিন্তু সত্যের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তাদের সে জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল এক মর্মান্তিক উপায়ে।
তখন চলছিল পিরামিড তৈরির যুগ। পিরামিড বানাতে বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই সরাতে হতো। চলতো ভারী যন্ত্রপাতির কাজ। তাই দুর্ঘটনা ছিল নিত্য ঘটনা। যুদ্ধক্ষেত্র বা নির্মাণস্থলের দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা করতে গিয়ে সেকালের মিশরীয় চিকিৎসকরা এক ভয়ানক সত্য আবিষ্কার করে। তারা লক্ষ্য করেন, মাথায় আঘাত লাগলে মানুষ আর আগের মতো থাকে না। হাত-পা ঠিক থাকলেও, মাথার আঘাতে মানুষ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। কিংবা স্রেফ পঙ্গু হয়ে যায়।
সুপ্রাচীন এই পর্যবেক্ষণের প্রমাণ মিলেছে এডউইন স্মিথ সার্জিক্যাল প্যাপিরাসে। আনুমানিক ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের এই নথিতে এক অজ্ঞাতনামা চিকিৎসক বেশ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ৪৮টি কেস স্টাডি লিপিবদ্ধ করেছেন। এই প্যাপিরাসকে গণ্য করা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হিসেবে। কারণ, এখানেই মানব ইতিহাসের প্রথমবারের মতো মস্তিষ্ক শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্যাপিরাসের ২০ নম্বর কেসটির বর্ণনা গায়ে কাঁটা দেয়ার মতো। সেখানে এক রোগীর কথা বলা হয়েছে। মস্তিষ্কে আঘাত লাগার পর সে আর কথা বলতে পারছিল না। প্রাচীন মিশরের সেই চিকিৎসক এর কোনো প্রতিকার জানতেন না, কিন্তু তিনি এই যোগসূত্রটি বুঝতে পারেনÑমাথার খুলির ভেতরের ওই মজ্জাটির সঙ্গে আমাদের কথা বলা বা চিন্তা করার গভীর সম্পর্ক আছে।
মিশরীদের কিছু পরে ভারতেও মস্তিষ্ক নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছিল। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগের কথা। গ্রিকদের অনেক আগেই শরীরের এই কমান্ড সেন্টার নিয়ে কাজ শুরু করেন ভারতের ঋষি ও চিকিৎসকরা। মাথার সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্রের গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন ভারতের সুশ্রুত (খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক)। তার লেখা সুশ্রুত সংহিতায় মাথার আঘাত এবং তার ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশের কার্যকারিতা হারানোর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানতেন, মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাত লাগলে দৃষ্টিশক্তি বা বাকশক্তি চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে চীন দেশের প্রাচীন বৈদ্যরা মস্তিষ্ককে বলতেন মজ্জার সাগর, যেখানে মানুষের জীবনীশক্তি সঞ্চিত থাকে। চীনারা শরীরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত জীবনশক্তি বা কি (ছর)-র পথের কথা বলতেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান দেখেছে, আকুপাংচারের প্রধান পয়েন্টগুলো আসলে স্নায়ু সংযোগস্থল বা নার্ভাল জাংশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি প্রমাণ করে, তারা মস্তিষ্ক ও শরীরের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক অদৃশ্য মানচিত্র কয়েক হাজার বছর আগেই তৈরি করেছিলেন। তারা হয়তো আজকের মতো নিউরনের নাম জানতেন না, কিন্তু শরীরের এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের স্নায়ুবিক যোগাযোগের পথগুলো ঠিকই চিনেছিলেন।
কিন্তু মিশরীয়দের সেই জ্ঞান কেন যেন হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। আবার ভারতীয় ও চীনাদের জ্ঞানও নানা কারণে হয়তো ইউরোপে পৌঁছেনি। তাই গ্রিক এবং রোমানরা পথ হারায় ভুলে ভরা তত্ত্বে। নতুন করে সেই সত্য খুঁজে পেতে মানবজাতিকে অপেক্ষা করতে হয় আরও বেশকিছু দিন।

মধ্যযুগÑপ্রাচীন আর আধুনিক যুগের সেতুবন্ধনের কাল। ইউরোপে চলছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্ধকার পর্ব। জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলছে আরব বিশ্বে, ভারতে এবং চীনে। অন্য জ্ঞান চর্চার পাশাপাশি মানবদেহও গুরুত্ব পায় আরব বিজ্ঞানীদের কাছে।
মানব মস্তিষ্ক নিয়ে আরব বিজ্ঞানীদের গবেষণা ছিল খুবই মৌলিক। এভাবে গ্রিক দার্শনিকদের ভুল ধারণাগুলো একে একে ভেঙে দিয়েছেন তারা। যেমন মস্তিষ্ক যে নিছক রেডিয়েটরÑএরিস্টটলের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় আরব বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে। মস্তিষ্কই যে মানুষের চিন্তা, বুদ্ধি এবং মনের প্রকৃত নিবাসÑএই বৈপ্লবিক ধারণাটি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন ইবনে সিনা। তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-কানুন ফি আল-তিব্ব-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, মানুষের আত্মিক ও মানসিক ক্ষমতাগুলো হৃদপিণ্ডে নয়, বরং মস্তিষ্কে অবস্থিত। তিনি মস্তিষ্ককে তিনটি প্রধান প্রকোষ্ঠে ভাগ করেছিলেন। তার মতে, প্রথম প্রকোষ্ঠে থাকে সাধারণ জ্ঞান ও কল্পনাশক্তি, দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠে থাকে বিচারবুদ্ধি ও অনুমান ক্ষমতা এবং তৃতীয় প্রকোষ্ঠে থাকে স্মৃতিশক্তি। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেন, মস্তিষ্কের সামনের অংশে আঘাত লাগলে মানুষের স্মৃতি ঠিক থাকলেও তার বিচারবুদ্ধি লোপ পেতে পারে। এর মানে, মনের ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অংশ দায়ী।
ইবনে সিনারও আগে চিকিৎসাগত প্রমাণের মাধ্যমে এ ইঙ্গিত দেন আরবের আরেক বিজ্ঞানী আল-রাজি। তিনি দেখান, মস্তিষ্কে আঘাত পেলে মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয় বা আচরণ বদলে যায়। এরিস্টটলের ধারণাটি বাতিলও করেন। আল-রাজি প্রমাণ করেন, হৃদপিণ্ড কেবল রক্ত পাম্প করে, কিন্তু অনুভূতি বা চেতনা নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক।
এক সময় ইউরোপে অন্ধকার যুগ পেরিয়ে প্রবেশ করে হয় রেনেসাঁ পর্বে। আসে বিজ্ঞানের নতুন ভোর। মধ্যযুগের চর্চিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে শুরু হলো নতুন কর্মযজ্ঞ। বিভিন্ন গবেষণার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলো, শরীর কোনো জাদুকরী আধার নয়, বরং হাড়-মাংসের তৈরি এক জটিল যন্ত্র। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেলÑএই যন্ত্র চলে কীসে? কী সেই শক্তি, যা আমাদের হাত নাড়ায়, আমাদের দিয়ে কবিতা লেখায়?
১৭০০-এর দশকে আইজ্যাক নিউটনও মগজের রহস্যের জালে আটকা পড়েন। ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত বই প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। এতে তিনি গতির তিনটি সূত্র এবং মহাকর্ষের সূত্র দিয়ে মহাবিশ্বের গতিবিধি ব্যাখ্যা করেন। এ বইতে গাণিতিক সমীকরণের ফাঁকে ফাঁকে মস্তিষ্ক নিয়েও লিখেছেন নিউটন। প্রিন্সিপিয়াতেই তিনি উল্লেখ করেন, এক ধরনের বৈদ্যুতিক ও স্থিতিস্থাপক স্পিরিট স্নায়ুর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। তবুও তিনি বুঝতে পেরেছিলেনÑমস্তিষ্ক এবং শরীরের যোগাযোগের ভাষাটা যান্ত্রিক নয়, বরং অদৃশ্য কোনো তরঙ্গ বা সংকেতের মতো। নিউটন নিজেই জানতেন এটা অনুমান মাত্র। তিনি লেখেন, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরীক্ষা নেই, তাই নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না।
কয়েক দশক পর নিউটনের সেই ‘অদৃশ্য স্পিরিট’-এর প্রমাণ দেন ইতালীয় চিকিৎসক লুইজি গ্যালভানি। সময়টা ১৭৯০-এর দশক। ল্যাবরেটরিতে মৃত ব্যাঙের পা নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন গ্যালভানি। হঠাৎ দেখেন, মৃত ব্যাঙের স্নায়ুতে বৈদ্যুতিক স্ফূলিঙ্গ বা স্পার্ক দিলে তার পা নড়ে ওঠছে! গ্যালভানি স্তব্ধ হয়ে গেলেনÑ যেন মৃত দেহে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে! তার মানে স্নায়ুতন্ত্র, চিন্তাশক্তি, নড়াচড়াÑএসবের পেছনে আছে বিদ্যুৎ! মস্তিষ্ক কী তাহলে একটা বৈদ্যুতিক যন্ত্র?
এ আবিষ্কার পুরো ইউরোপে তোলপাড় করে দিলো। ব্যাঙ-নাচানো প্রফেসর হিসেবে নাম কুড়ালেন গ্যালভানি। তিনি দাবি করলেন, মস্তিষ্ক হলো অ্যানিমেল ইলেকট্রিসিটি বা প্রাণী-বিদ্যুতের উৎস। শুরু হলো অদ্ভুত উন্মাদনা। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনী হতে লাগলো, যেখানে মৃতদেহে বিদ্যুৎ চালনা করে হাত-পা নাড়ানো হতো। এই দৃশ্য যেমন ছিল বীভৎস, তেমনই রোমাঞ্চকর। মেরি শেলি নামের এক তরুণী এই এসব শুনেই অনুপ্রাণিত হন। লেখেন তার কালজয়ী উপন্যাসÑফ্রাঙ্কেনস্টাইন। বিজ্ঞান এবং কল্পনার এই মিলনবিন্দু থেকে একটা প্রশ্ন জন্ম নিলোÑবিদ্যুৎ দিয়ে যদি মৃতকে জাগানো যায়, তাহলে কী জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ দিয়ে দেখা যায় কে কোথায় আছে? মানে ভাষা, বুদ্ধি, স্মৃতির জায়গা মস্তিষ্কের কোথায়?
তার আংশিক উত্তর মিললো ১৮৬১ সালে। সেবার প্যারিসের এক হাসপাতালে ভর্তি হলো এক অদ্ভুত রোগী। নাম লুই লিবোর্ন। লোকটা কথা বুঝতে পারতো, ইশারা করলে কাজও করতে পারতো। চিকিৎসক যদি বলেন- বাম হাত তোলো, সে বাম হাত তোলে। কেউ রসিকতা করলে তার মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু নিজে কথা বলতে গেলেই তার মুখ দিয়ে বের হতো কেবল একটিই শব্দÑট্যান। দিনের পর দিন সে শুধু ট্যান, ট্যান করেই কাটিয়েছে। তাই হাসপাতালের সবাই তাকে ডাকতো ট্যান নামে।
ফরাসি চিকিৎসক পল ব্রোকা এই রোগীর প্রতি আগ্রহী হন। লিবোর্ন মারা যাওয়ার পর তার মস্তিষ্ক ব্যবচ্ছেদ করে ব্রোকা আবিষ্কার করলেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। লিবোর্নের মস্তিষ্কের বামদিকের বাইরের স্তরের একটি ছোট্ট অংশ পচে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ব্রোকা বুঝতে পারলেন, তিনি সোনার খনির সন্ধান পেয়েছেন। তিনি ঘোষণা করলেন, মানুষের কথা বলার ক্ষমতা থাকে মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট বিন্দুতে। আজ সেই জায়গাটির নাম ব্রোকাস এরিয়া। ব্রোকার এই আবিষ্কার ছিল মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরির প্রথম পদক্ষেপ। প্রথমবারের একটা মানবিক ক্ষমতাকে মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট স্থানে চিহ্নিত করা গেল। সেটা আর অনুমান নয়, নিশ্চিত প্রমাণ।
কিছুদিন পরে এর উল্টো চিত্র দেখালেন জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল ভার্নিক। তার রোগীরা অনর্গল কথা বলতে পারতো। ব্যাকরণও ঠিক থাকত। কিন্তু সেসব কথার কোনো মাথামুণ্ডু থাকতো না। যেমনÑ‘আমি গতকাল নীল বেলুন খেয়ে আকাশে সাঁতার কেটেছি।’ কিংবা আরেক রোগী হয়তো বলছে, ‘বেলুনটার পরে আমি একটা উটপাখি বুলডোজার হাসলাম।’ অথবা কেউ কথা বললে তারা শুনতে পেতো ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারতো না কিছুই।
বিজ্ঞানী ভার্নিক পরীক্ষা করে দেখলেন, এদের মস্তিষ্কের অন্য একটি জায়গা (কানের ঠিক পেছনে) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রোকার রোগীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জায়গায়। মানে, ভাষা তৈরি করা আর ভাষা বোঝাÑএই দুটো কাজ মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি দপ্তর। আরও অবাক ব্যাপার, এই দুটো জায়গা সংযুক্ত একগুচ্ছ বিশেষ তন্তু দিয়ে, যাকে বলে আরকিয়েট ফ্যাসিকুলাস। যেন মস্তিষ্কের ভেতরে একটা ব্রডব্যান্ড কেবল টানা আছে, একটা ভাষা-কেন্দ্র থেকে আরেকটা ভাষা-কেন্দ্রে।
ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, মানুষের মন কোনো একক সত্তা নয়। এটি অনেক ছোট ছোট মডিউলের সমষ্টি। মস্তিষ্কের এক কোণায় থাকে রাগ, অন্য কোণায় গণিত করার ক্ষমতা, আরেক কোণায় লুকিয়ে আছে ছোটবেলার দোল খাওয়ার স্মৃতি।
ততদিনে মস্তিষ্কের মানচিত্র আঁকার নেশা বিজ্ঞানীদের পেয়ে বসেছে। ১৮৭০-এর দশকে স্কটিশ চিকিৎসক ডেভিড ফেরিয়ার ভাবলেন, কোনো মানুষ কখন আঘাত পাবে, তার জন্য বসে থাকলে চলবে না। অন্য কিছু করতে হবে। তাই ভেবে তিনি নিজেই মস্তিষ্কের রহস্য উদ্ঘাটনে নামলেন। বানরের মস্তিষ্কের ওপরের তলে বৈদ্যুতিক শকের প্রোব বা কাঠি ছোঁয়ালেন ফেরিয়ার। ফলাফল ছিল ম্যাজিকের মতো। মস্তিষ্কের এক বিন্দুতে শক দিলেনÑবানরের হাত নড়ে উঠলো। একটু ডানে শক দিলেনÑপা নড়ে উঠলো। ফেরিয়ার বুঝলেন, মস্তিষ্কের উপরিভাগে পুরো শরীরের একটা অদৃশ্য মানচিত্র আঁকা আছে।
এই পরীক্ষার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল মানুষের ওপর। ১৯৩০-এর দশকে বিখ্যাত নিউরোসার্জন ওয়াইল্ডার পেনফিল্ড মৃগীরোগীদের অপারেশনের সময় এক পরীক্ষা চালালেন। মস্তিষ্কে যেহেতু ব্যথার কোনো অনুভূতি নেই, তাই লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে মাথার খুলি খোলার পর রোগীকে জাগিয়ে রাখা হতো। পেনফিল্ড তখন জীবন্ত মানুষের উন্মুক্ত মস্তিষ্কে হালকা বৈদ্যুতিক শক দিতেন। রোগীকে জিজ্ঞেস করতেন, আপনি কী অনুভব করছেন?
রোগীদের উত্তরগুলো ছিল বিস্ময়কর। মস্তিষ্কের এক জায়গায় স্পর্শ করলে রোগী বলতো, ‘আমার হাতে কেউ চিমটি কাটছে!’ অন্য জায়গায় স্পর্শ করলে কেউ বলে উঠতো, ‘আরে! আমি পোড়া টোস্টের গন্ধ পাচ্ছি!’ আবার কখনো কখনো কোনো গভীর স্মৃতি হঠাৎ সিনেমার মতো ভেসে উঠতো চোখের সামনে।
এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পেনফিল্ড তৈরি করলেন মস্তিষ্কের অদ্ভুত এক মানচিত্র। একে বলা হয় হোমুনকুলাসÑমস্তিষ্কের ভূগোলে মানুষের শরীরের একটা বিকৃত প্রতিচ্ছবি। এই ভূগোলে দেখা যায়, মস্তিষ্কের কতোটা অংশ শরীরের কোন অঙ্গের জন্য বরাদ্দ। সেখানে দেখা যায়, আমাদের হাতের আঙুল আর ঠোঁটের জন্য মস্তিষ্কের বিশাল এলাকা বরাদ্দ, অথচ পিঠের জন্য খুব সামান্য জায়গা। কারণ, আমাদের আঙুল আর ঠোঁট দিয়ে আমরা যত সূক্ষ্ম কাজ করি বা অনুভব করি, পিঠ দিয়ে তা করি না। পেনফিল্ডের মানচিত্র প্রমাণ করলোÑআপনার অনুভূতি, স্মৃতি, নড়াচড়াÑসবকিছুরই সুনির্দিষ্ট ঠিকানা আছে এই ৩ পাউন্ডের জেলির মধ্যে।
কিন্তু ব্যক্তিত্ব? একজন মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা? তার নম্রতা বা উগ্রতা? এসব কি ম্যাপিং করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল ফিনিয়াস গেজের এক রোমহর্ষক দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে।
১৮৪৮ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্টে রেললাইন বসানোর কাজ চলছিল। ফিনিয়াস গেজ ছিলেন দক্ষ ফোরম্যান। বিশ্বস্ত, পরিশ্রমী, ভালো স্বভাবের মানুষ। সবাই তাকে পছন্দ করতো।
একদিন বিস্ফোরকের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলো। পাথর ভাঙার জন্য গর্তে বারুদ ঠাঁসা হচ্ছিল। হঠাৎ এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ! প্রায় ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি লম্বা এবং সোয়া এক ইঞ্চি মোটা একটি লোহার রড রকেটের গতিতে গেজের বাম গালের নিচ দিয়ে ঢুকে গেল। তার মাথার খুলি ভেদ করে সেটা উড়ে গিয়ে পড়লো ৮০ ফুট দূরে।
তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেন ফিনিয়াস গেজ। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কথাও বললেন। দৈহিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার সহকর্মীরা ফিসফিস করে বলতে শুরু করলোÑ‘ইনি আর আগের গেজ নন।’ আগে গেজ ছিলেন নম্র, দায়িত্ববান এবং দক্ষ কর্মী। অথচ দুর্ঘটনার পর তিনিই হয়ে উঠলেন খিটখিটে, অশালীন, অস্থির এবং অবিবেচক। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনাও করতে পারতেন না। তার মনের লাগাম যেন ছিঁড়ে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা পরে বুঝতে পারলেন, লোহার রডটি গেজের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব বা সামনের অংশটি উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই ফ্রন্টাল লোবই হলো আমাদের দেহের সিইও। সেটাই আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, পরিকল্পনা করতে শেখায় এবং আমাদের সামাজিক আচরণ ঠিক রাখে। ব্যক্তিত্ব, স্বভাব, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাÑএসবও মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত। গেজের ঘটনা প্রমাণ করলো, আমাদের নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব অশরীরী কিছু নয়, বরং এটিও মস্তিষ্কের টিস্যু আর নিউরনের খেলার ওপর নির্ভরশীল। আপনার ‘আমিত্ব’ মস্তিষ্কের এক বিশেষ স্থাপত্যের ফল। সেই স্থাপত্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আপনি আর আগের ‘আপনি’ থাকবেন না।
আসলে আপনার মস্তিষ্ক একটা বিশাল শহরের সঙ্গে তুলনা করা যায়Ñ৮৬ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন দিয়ে তৈরি এক জীবন্ত মহানগর। এই শহরের বিভিন্ন পাড়া বিভিন্ন কাজ সামলায়। ভাষা তৈরির পাড়া আলাদা, ভাষা বোঝার পাড়াও আলাদা। স্পর্শের ঠিকানা কিংবা নড়াচড়ার ঠিকানাও আলাদা। স্মৃতির জন্য থাকে এক ঠিকানায়, আবেগ থাকে আরেক ঠিকানায়। আপনার স্মৃতি আছে হিপ্পোক্যাম্পাসে, ভয় আছে অ্যামিগডালায় আর সিদ্ধান্ত আছে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সে। কিন্তু এই পাড়াগুলো একা একা কাজ করে না। প্রতিটি নিউরন হাজার হাজার অন্য নিউরনের সঙ্গে সংযুক্ত। নিউরনের এই সংযোগগুলোÑএই অভ্যন্তরীণ ওয়্যারিংÑপ্রতি মুহূর্তে বৈদ্যুতিক সংকেতের ঝড়ে কাঁপছে। এই সবকিছুর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যে কানেক্টোজোম বা নিউরনের মহাসড়ক। আর সেখানেই আপনার ‘আমি’-র অস্তিত্ব।
একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আমাদের হাতে আছে ঋগজও (ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং)-এর মতো জাদুকরী প্রযুক্তি। এখন আর খুলি খোলার প্রয়োজন হয় না। মেশিনের ভেতর শুয়ে আপনি যদি কোনো গান ভাবেন, বা কোনো ভয়ের দৃশ্য কল্পনা করেন, বিজ্ঞানীরা মনিটরে দেখতে পান, আপনার মস্তিষ্কের ঠিক কোন বাতিগুলো জ্বলে ওঠছে। সেখানে দেখা গেছে, মানুষে মানুষে মস্তিষ্কের মানচিত্র তো প্রায় একই। দুই মেরূর দু’জন মানুষের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ দিলে প্রায় একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। তাহলে প্রশ্ন আসে আপনার অনন্যতা কোথায়? একজনের সঙ্গে আরেকজনের মন বা ব্যক্তিত্বের তফাত কোথায়?
আসলে দু’জন ভিন্ন চরিত্রের মানুষের মগজ দেখতে এক হলেও, তাদের এই নিউরনের সংযোগ বা ‘ওয়্যারিং’ আলাদা। এই ওয়্যারিং তৈরি হয় দু’টো জিনিস থেকেÑআপনার জিন এবং অভিজ্ঞতা। জিন একটা ছাঁচ দেয়, কিন্তু সেই ছাঁচকে বদলে দেয় প্রতিটি অভিজ্ঞতা। প্রতিবার আপনি যখন নতুন কিছু শেখেন, তখন মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরি হয় কিংবা পুরনো সংযোগ শক্তিশালী হয়। আবার কোনো অভ্যাস বাদ দিলে দুর্বল হয়ে যায় পুরনো সংযোগ। এভাবেই অভিন্ন যমজদের ব্যক্তিত্বও আলাদা হয়ে যায়Ñএকই জিন, কিন্তু আলাদা অভিজ্ঞতা। তাই তারা আলাদা মানুষ। তাই একই পরিস্থিতিতে দু’জন মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখায় দুরকম।
এখানেই শেষ নয়, সাম্প্রতিক গবেষণা এক নতুন মোড় এনেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আপনার মন কেবল মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বিস্তার আরও গভীরে। তারা বলছেন, ‘আপনি’ শুধু মস্তিষ্কে নেই। আপনার পুরো স্নায়ুতন্ত্র, আপনার অন্ত্র, এমনকি আপনার পেটের ব্যাকটেরিয়াÑসবই ওই ‘আপনি’-র অংশ।
শুনতে অদ্ভুত লাগছে, তাই না? আপনার পেটের ভেতর, অন্ত্রে বা নাড়িভুঁড়িতে বাস করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া। এদের বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। গবেষণা বলছে, আপনার অন্ত্রে কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া আছে, তা সরাসরি প্রভাব ফেলে আপনার মেজাজে, উদ্বেগে, এমনকি বিষণ্নতায়। ভেগাস নার্ভ নামের এক বিশেষ স্নায়ু মস্তিষ্ক আর অন্ত্রের মধ্যে ক্রমাগত বার্তা বিনিময় করছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের অন্ত্রে প্রায় ১০০ মিলিয়ন নিউরন রয়েছে। এদের বলা হয় এন্টেরিক নার্ভাস সিস্টেম। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের শরীরের মোট সেরোটোনিনের (যাকে ‘ফিল-গুড’ হরমোন বলা হয় এবং যা আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে) প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি হয় অন্ত্রে। ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে এই হরমোনগুলোর সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। তাই পেটে গোলমাল থাকলে কেন আমাদের মন খারাপ হয় বা আমরা খিটখিটে হয়ে যাই, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখানেই। আবার অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ারা কিছু বিশেষ রাসায়নিক তৈরি করে, যা ভেগাস নার্ভকে উদ্দীপ্ত করে। এই ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য যদি নষ্ট হয়, তাহলে ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে ভুল সংকেত যায়। তাতে তৈরি হতে পারে বিষণ্নতা বা ক্রনিক অ্যাংজাইটি। সেজন্যই অন্ত্রকে বলা হয় দ্বিতীয় মস্তিষ্ক।
তাই আপনি কেবল আপনার খুলির ভেতরের ধূসর মজ্জাটুকু নন; আসলে আপনার মস্তিষ্ক থেকে উদর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল স্নায়ুবিক জালের সমষ্টি হলেন আপনি। আপনার ভেগাস নার্ভ যখন প্রতি সেকেন্ডে অন্ত্রের কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়ার বার্তা বয়ে নিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, তখনই আপনার মেজাজ, সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হয়। কাজেই আপনার মন কেবল আপনার মাথায় নয়, আপনার নাড়িভুঁড়ির স্পন্দনেও মিশে আছে।
তাহলে, সেই শুরুর প্রশ্নে ফিরে যাইÑআসল ‘আপনি’ কোথায়? আপনার মনের অবস্থান কোথায়?
উত্তরটা হলো, কয়েক হাজার বছরের ধারাবাহিক তদন্তে আমরা এখন জানিÑ‘আপনি’ মস্তিষ্কে আছেন, তেমনি আছেন নিজের পেটের ভেতরেও। তাই আপনার মনের অবস্থান কোনো একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে বা একক কোনো ঠিকানায় নয়। আপনি হলেন এক বিশাল, জটিল নেটওয়ার্কের সমষ্টি। সঙ্গে আছে পরিবেশ এবং সমাজের সঙ্গে তার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার। কোটি কোটি নিউরনের মধ্যদিয়ে প্রতি মুহূর্তে যে বৈদ্যুতিক সংকেতের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই ঝড়ের নামই মন।
মস্তিষ্কের কোনো একটি অংশ থেকে স্মৃতি মুছে গেলে, বা আবেগের কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আপনি বদলে যান। একটু একটু করে আপনার পুরনো ‘আমি’ হারিয়ে যায়। তাই আপনি কোনো স্থির বস্তু নন; একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি প্রবহমান নদী।
শরীর নামের এই অদ্ভুত যন্ত্রের ভেতরে, নিউরনের জটাজাল আর রাসায়নিক সংকেতের ঘূর্ণাবর্তের ঠিক মাঝখানেÑআপনার অস্তিত্বের বসবাস। মস্তিষ্ক নিয়ে সব রহস্য বিজ্ঞান এখনো উদ্ঘাটন করতে পারেনি। হয়তো ভবিষ্যতে তা পারবে। মানুষ হয়তো সেদিন প্রতিটি নিউরনের খবর জানা সম্ভব হবে। কিন্তু মহাবিশ্বের কোটি কোটি তারার মাঝখানে আপনার চেতনার জন্ম ঠিক কীভাবে হয়Ñসেই রহস্য হয়তো আজীবন এক সুন্দর ধাঁধাঁ হয়েই থাকবে। Í
সূত্র: আউট অব মাইন্ড/জর্জ চার্ম
দ্য ব্রেইন: দ্য স্টোরি অব ইউ/ডেভিড ইগলম্যান
দ্য বডি/ ব্রিল ব্রাইসন
উইকিপিডিয়া




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন