চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরনের কাহিনী বা মিথ। যা সমৃদ্ধ করেছে তাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে। পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে নৃতাত্ত্বিক জাতিগুলোর ভেতর প্রচলিত কাহিনীগুলোতে বৈসাদৃশ্য থাকলেও ভাবগত দিকে মিল রয়েছে অনেক। আবার আধুনিক বিজ্ঞানের যুক্তিতে পৃথিবীর আদি পর্যায়ে যে প্রভূত জলের ব্যাপ্তির কথা বলা হয়েছে তারও প্রমাণ মিলে এ কাহিনীগুলোতে। এছাড়া আদি বিশ্বাসের মানুষদের কাছে চন্দ্র ও সূর্য দেবতার আসনে আসীন। কোনো কোনো জাতির কাছে এরা ভাইবোন, কেউ বলছে স্বামী-স্ত্রী, কিংবা কেউ বলছে এরা দুই ভাই। ফলে এদের জন্ম বৃত্তান্ত সম্পর্কেও রয়েছে নানা কাহিনী। কাহিনীর ভিন্নতা থাকলেও প্রায় সকল নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পূজা-পার্বণ ও নানা আচার আবর্তিত হয় মূলত চন্দ্র ও সূর্যকে ঘিরেই। চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবী নিয়ে কয়েকটি জাতির কিছু কাহিনী তুলে ধরতেই এ লেখার অবতারণা।
গারো বিশ্বাসÑভেজা পৃথিবীকে শুকাতে চন্দ্র ও সূর্যের জন্ম
পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হলো? মান্দি বা গারো আদিবাসীদের বিশ্বাস শুরুতে চারদিকে ছিল পানি আর পানি। কোথাও স্থলের চিহ্ন নেই। সবকিছু অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
এমন অবস্থা দেখে ভগবান তাতারা রাবুগা পৃথিবী সৃষ্টির চিন্তা করলেন। তিনি নস্ত নুপাস্তকে স্ত্রীলোকের আকার দিয়ে পাঠালেন। সঙ্গে দিলেন কিছু বালি।
নস্ত নুপাস্ত প্রথমে মাকড়সার জালে আশ্রয় নিয়ে সমস্ত জলরাশির ওপর সে জাল বিস্তার করলেন।
তারপর তিনি সঙ্গে আনা বালি মুষ্টিবদ্ধ করে পানিতে নিক্ষেপ করে বললেন, অনন্ত জলরাশির নিচ থেকে মাটি নিয়ে এসো।
যথা সময়ে মাটি আসলো এবং নস্ত নুপাস্ত সে মাটি দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। গারো ভাষায় একে বলে ‘মেন পিলটি’।
পৃথিবী সৃষ্টির পর ভগবান তাতারা রাবুগার কাছে তা ভিজে মনে হলো। তাই তিনি তা শুকাতে আসিমা দিংগাসীমার পুত্র ও কন্যাকে স্থাপন করলেন পৃথিবীতে। এরাই সূর্য (রেঙ্গরা বলসা) ও চন্দ্র (বীরে জিতজে)। তাই মান্দি বা গারোদের কাছে চন্দ্র ও সূর্য ভাই-বোন।
কিন্তু চন্দ্র কেন কম আলো দেয়?
চন্দ্র ছিল খুবই সুন্দরী। ভাই সূর্য থেকে ছিল অনেক বেশি উজ্জ্বল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই তৈরি হতো মনোমালিন্য। সূর্য বোনের রূপ-লাবণ্যে হিংসা করতো। দুই ভাইবোনে ঝগড়া চলে হরহামেশাই। তাদের মা তা থামাতেন।
একদিন তাদের বাড়িতে রেখে জরুরি কাজে মা গেলেন বাইরে। সে সুযোগে ভাই-বোনে শুরু হয় তুমুুল ঝগড়া। সে ঝগড়া রূপ নেয় হাতাহাতিতে। ক্ষেপে যায় সূর্য। মুঠি ভরা কাদা নিয়ে বোন চন্দ্রের মুখে তা লেপ্টে দেয় সে। এতে বোনও রেগে যায়। ভাই সূর্যকে শায়েস্তা করতে হবে। তাই মুখের কাদা না ধুয়ে অপেক্ষা করে মায়ের জন্য।
মা বাড়িতে আসতেই চন্দ্র কাদামাখা মুখ দেখিয়ে জানায় ভাইয়ের কুকীর্তির কথা। মা এতে খুশি হন না। বরং চন্দ্রের এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণে ক্ষেপে গিয়ে মেয়ে চন্দ্রকে অভিশাপ দিয়ে বলেন, ‘চিরকালই তোমার মুখ যেন এমনি কর্দমাক্ত থাকে। গারোদের বিশ্বাস সে থেকেই সূর্যের চেয়ে কম আলোর অধিকারিণী হয়েছে চন্দ্র।
সাঁওতাল বিশ্বাসÑ কেঁচোর তুলে আনা মাটিতে পৃথিবীর সৃষ্টি
পৃথিবী সৃষ্টিরও আগের কথা। তখন চারদিকে ছিল শুধু পানি আর পানি। সেই পানির গহীনে ছিল মাটি। ঠাকুর জিয়ো পৃথিবী সৃষ্টির ইচ্ছা নিয়ে পানির মধ্যে কাঁকড়া, কুমির, বোয়াল, কাছিম, কেঁচোর মতো জীবের আবির্ভাব ঘটালেন। কিন্তু এসব সৃষ্টি করে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন পৃথিবীতে মানবজাতির আবির্ভাব না ঘটালে সব ব্যর্থ হয়ে যাবে।
অতঃপর তিনি মাটি থেকে একজোড়া মানব-মানবী সৃষ্টি করলেন। কিন্তু যখনই তাদের ভেতর জীবন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখনই আকাশ থেকে আজব এক ঘোড়া এসে মানব-মানবীর মূর্তিযুগল খেয়ে ফেলে। ঠাকুর জিয়ো এতে কষ্ট পান। তাই তিনি মানব সৃষ্টি করার আগে পাখি সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন। অতঃপর নিজের বুকের অংশ থেকে সৃষ্টি করলেন একজোড়া পাতিহাঁস। তাদের ভেতর আত্মা দিলেন। পাতিহাঁস দুটো মনের আনন্দে পানির উপরে ভেসে বেড়াতে থাকলো।
একদিন হঠাৎ ওই আজব ঘোড়াটি এসে তাদেরও গ্রাস করার চেষ্টা করলো। এবার ঠাকুর জিয়ো সতর্ক ছিলেন। তিনি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ফেনায় পরিণত করলেন। সেই ফেনার পানিতে পাতিহাঁস দু’টি মনের আনন্দে ভেসে বেড়াতে থাকলো।
কিন্তু এভাবে আর কত দিন! তাদের আশ্রয়ের জন্য মাটি চাই, বাঁচার জন্য চাই খাদ্য। এর জন্য তারা ঠাকুর জিয়োর কাছে প্রার্থনা করলো। ঠাকুর জিয়ো তখন কাছিমকে নির্দেশ করলেন পানির নিচ থেকে মাটি তুলে আনতে। কাছিম চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। চিংড়িকে বললে সে-ও চেষ্টা করে সফল হলো না। এভাবে বোয়াল, কাঁকড়া একে একে সবাই ব্যর্থ। রাগান্বিত হয়ে ঠাকুর জিয়ো এবার হুকুম করলেন কেঁচোকে। কেঁচো পানির অতল থেকে মাটি তুলে আনল। এবার মহাপ্রভু ঠাকুর জিয়ো আনন্দের সঙ্গে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। পৃথিবীতে স্থাপন করলেন পাহাড়, অরণ্য সবকিছু। সেখানে পাতিহাঁস দু’টি বাসা বাঁধে এবং প্রকৃতির নিয়মেই ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটলে ভেতরে দেখা মিলল দু’টি মানবসন্তান। একটি ছেলে, অন্যটি মেয়ে। ছেলেটির নাম পিলচু হড়ম ও মেয়েটির নাম পিলচু বুড়ি। এরাই সাঁওতালদের আদি পিতা-মাতা।
খাসীয়া বিশ্বাসÑ সূর্যের দেয়া ছাইয়েই চন্দ্র দীপ্ত জ্যোতি হারায় আদিকালের কথা। এক রমণীর ছিল চার সন্তান। তিন মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের নামÑসূর্য, জল, অগ্নি। সবার ছোট সন্তান ছেলে, নাম চন্দ্র। বোনেরা কোলেপিঠে করে মানুষ করে তাকে। তখন চন্দ্র ছিল সূর্যের মতোই আলোক দীপ্ত।
বড় হয়ে চন্দ্র মনে মনে প্রেমে পড়ে বড় বোন সূর্যের। সূর্য প্রথমে তা টের পেলেও গুরুত্ব দেন না। কিন্তু কোনোভাবেই চন্দ্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং এক সময় সে বোনকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে।
কিন্তু সূর্য তার ছোট ভাই চন্দ্রের প্রেম ও বিয়ের বিষয়টি জানতে পেরে ভীষণ ক্ষেপে যায়। মুষ্টিবদ্ধ করে সে কিছু ছাই এনে চন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বলেÑ ‘আমি তোমার বড় বোন। মায়ের মতোই তোমাকে কোলেপিঠে করে লালন-পালন করেছি অথচ তুমি কিনা আমাকে বিয়ে করতে চাও। নির্লজ্জ কোথাকার? দূর হও এখান থেকে।’ বলেই মুঠিবদ্ধ ছাই সে ভাই চন্দ্রের মুখে নিক্ষেপ করে।
চন্দ্র তখন ভয়ে ও লজ্জায় পালিয়ে যায়। সেদিন থেকেই চন্দ্র তার দীপ্ত জ্যোতি হারিয়ে ফেলে। আর পূর্ণিমার সময় চন্দ্রের গায়ে যে কলঙ্কচিহ্ন দেখা যায় তা সূর্যের দেওয়া সেই ছাইয়েরই প্রকাশ। চন্দ্র চলে গেলে তিনবোনÑসূর্য, জল ও অগ্নি রয়ে যায়। তারাই তার মা’কে দেখাশোনা করতে থাকে।
ওরাওঁ বিশ্বাসÑ মনুষ্য রক্তে জীবন পায় চন্দ্র-সূর্য।
চন্দ্র ও সূর্য। ওরাওঁ ভাষায় বিড়ি নাদ ও চান্দু নাদ। পৃথিবীর পরে কীভাবে সৃষ্টি হলো এ দু’টি?
সে অনেক কাল আগের কথা। ধরমেশ তখন ওরাওঁ জাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করলেন একেবারেই নিজের পছন্দ মতো। সে পৃথিবীতে সবকিছু আছে। নেই শুধু চন্দ্র, সূর্য আর তারকা।
মানুষের আকার তখন ছিল অনেক ছোট। এতো ছোট যে, চাষাবাদের জন্য জমিতে লাঙ্গল দেওয়া হতো ইঁদুর দিয়ে। পৃথিবীতে তখন আকাশ আর মাটি থাকতো খুব কাছাকাছি। এতো কাছাকাছি যে, চলতে গেলে লম্বা মানুষের মাথা ঠেকতো আকাশে।
একবার মানুষ কী এক অপরাধ করে বসলো। অমনি মানুষের ওপর ধরমেশও গেলেন ক্ষেপে। তার নির্দেশে আকাশ উঠে গেল অনেক উপরে। তাতে মানুষের অসুবিধা হলো না। চলাফেরায় বরং সুবিধা হলো। কিন্তু চারপাশ তখনও অন্ধকার। সূর্য নেই। নেই চন্দ্র আর তারকা। ফলে মানুষেরও সুখ নেই। আলো চাই মানুষের। অনেক আলো।
বনের মধ্যে ছিল আজব একটি গাছ। তখন আলোর জন্য মানুষেরা ওই গাছটির দিকেই তাকিয়ে থাকত। গাছে যখন ফুল ফুটত পৃথিবী তখন আলোকিত হতো। তখন দিন। ফুল শুকিয়ে গেলেই পৃথিবী আবার অন্ধকার। তখন রাত্রি।
আবার আজব গাছটির ফুলও নিয়মিত ফুটত না। তখন পৃথিবী থাকত অন্ধকারে। কিন্তু আলো ছাড়া তো জীবন চলে না! মানুষকে তাই পড়তে হতো নানা অসুবিধায়।
সবাই ভাবলো, আজব গাছটিই যত অন্ধকারের কারণ। ওটাকে কাটা হোক। তাহলেই আলো মিলবে অবিরত। যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। সবাই লেগে গেল গাছ কাটতে।
চল্লিশ দিনে শেষ হলো কাটা। গাছ কেটে সবাই তো অবাক! গোড়া কাটা, তবুও গাছ মাটিতে পড়ছে না। এ নিয়ে সবাই মহা চিন্তিত! এমন সময় দৈববাণী এলো। আজব গাছের আগায় আছে চিলের বাসা। ওই চিলকে মারতে হবে। তবেই গাছ পড়বে মাটিতে।
চিল মারতে সবাই উঠেপড়ে লাগল। কয়েক দিন কেটে যায় সে চেষ্টায়। একদিন মানুষের কুঠারের আঘাতে মারা পড়ল চিলটি। ওমনি ‘ধপাস’ শব্দ। পৃথিবী কাঁপিয়ে আজব গাছটি পড়লো মাটিতে।
পৃথিবীতে তখন এক রাজা ছিলেন। গাছ পড়ার শব্দে তিনি দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লেন। ভাবলেন- শত্রুরা বুঝি রাজ্য আক্রমণ করেছে। সৈন্য সামন্ত নিয়ে তিনি ছুটে আসেন ওই বনে। আজব গাছটি তখন পড়ে আছে মাটিতে। গাছকাটা দেখে রাজা ক্ষিপ্ত হলেন। বললেন, ‘এতো বড় গাছ কাটার সাহস তোমরা কোথায় পেলে? এর জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হবে তোমাদের।’
রাজা সৈন্যদের আদেশ করলেন, ‘ধরে নিয়ে আসো সব কয়টাকে। শূলে চড়াও ওদের। আর গাছটিকেও নিয়ে আসো।’
রাজার হুংকারে সবাই ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু এগিয়ে এলেন মানুষেরই এক সর্দার। সর্দার যেমন ছিলেন বুদ্ধিমান তেমনি সাহসী। তার কথা সবাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতো।
রাজাকে সর্দার সব কথা খুলে বললেন। কিন্তু রাজার রাগ কমে না। সর্দারও তখন সাহস করে বললেন, ‘রাজা মশাই, আমরা গাছটি কেটেছি পৃথিবীতে আলো আনার জন্য। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। তাই এই গাছটি আমাদেরই। গাছ আপনি নিতে পারবেন না।’
সর্দারের কথা ও সাহস দেখে রাজা হুংকার দিলেন। অমনি দু’দলে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মানুষের দল গাছটি আগলে রাখলেন রক্ত দিয়ে। সৈন্যদল সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলো গাছটিকে ছিনিয়ে নিতে।
যুদ্ধ চলল কয়েক মাস। শেষে মানুষের মনোবল ও সাহসের কাছে পরাস্ত হলো রাজার সৈন্যরা। গাছের যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন অহঙ্কারী রাজা।
যুদ্ধ তখন শেষ। আলোর আশায় সবাই গাছটাকে কেটে দুই ভাগ করা হলো। গাছের নিচের বড় অংশটিতে তারা খুঁজে পেলো সূর্যকে। উপরের ছোট অংশে পেলো চন্দ্রকে।
তখনও তাদের আলো নেই। চন্দ্র-সূর্যের জীবন দান করলে তবেই মিলবে আলো। কিন্তু জীবনদান হবে কীভাবে? ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত মানুষেরা গভীর চিন্তার মধ্যে পড়লো!
সেসময় আবারও দৈববাণী এলো। মনুষ্য রক্ত না হলে চন্দ্র-সূর্য জীবন পাবে না! সত্যবাদী চাষির একমাত্র সন্তানের রক্ত লাগবে তাতে। সবাই আবারও চিন্তিত। কোথায় মিলবে এমন রক্ত? চন্দ্র-সূর্য জীবন না পেলে সব চেষ্টাই যে ব্যর্থ হয়ে যাবে। পৃথিবীতেও তাহলে আলো আসবে না।
অনেকদিন পর এক দেশে খোঁজ মিলল এক সত্যবাদী চাষির। তার ছিল একটি মাত্র সন্তান। চাষী গেছে মাঠে কাজ করতে। তার স্ত্রী-ও গেছে নদীতে জল আনতে। ওই সময় ছেলেটি বাড়িতে একা।
মানুষের সর্দার সুযোগ বুঝে ছেলেটিকে চুরি করে নিয়ে এলো। আলোর জন্য তাকে হত্যা করে রক্ত দিলো গাছের দুই অংশে। অমনি চন্দ্র-সূর্য জীবন পেলো। তারা উঠে গেল আকাশে। সূর্যের আলোয় আলোকিত হলো পৃথিবী। শুরু হলো দিন। সূর্য বেশি রক্ত পান করেছিল। তাই সে লাল ও তেজি। সিগ্ধ আলো নিয়ে চন্দ্র উঠলো রাতে। সে কম রক্ত পেয়েছিল। তাই সে সাদা। ওরাওঁরা বিশ্বাস করে চন্দ্র-সূর্য জীবন পেয়ে এভাবেই আলোকিত করেছে পৃথিবীকে।
এরপর সূর্য তার সন্তান-সন্ততি নিয়ে আকাশে বিচরণ করতো। সূর্যের ছিল প্রখর তাপ। তার সন্তানদের তাপও কম ছিল না। এক একজন ছিল সূর্যের মতোই তেজোদ্দীপ্ত। পিতা আর পূত্রদের তাপে পৃথিবীর সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। নিজেদের বাঁচাতে সবাই ছুটে গেল সূর্যের বোন চন্দ্রের কাছে। সবার কথা শুনে চন্দ্র এক বুদ্ধি আঁটলো। চন্দ্র জানতো তার ভাই কি কি খেতে পছন্দ করে। সে একদিন খরগোশের মাংস রান্না করে ভাই সূর্যকে দাওয়াত করলো। সূর্য বোনের বাড়িতে খরগোশের মাংস খেয়ে তো আত্মহারা। এমন সুস্বাদু মাংস সে আর কখনো খায়নি।
সে বোনকে আড়ালে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘এ কিসের মাংস’।
চন্দ্র বললো, ‘তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, এ আমার সন্তানদের মাংস’।
খানিকটা গম্ভীর হয়ে সে সূর্যকে আরো বললো, ‘তোমার সন্তানদের মাংস এর চেয়েও সুস্বাদু হবে’।
প্রিয় বোন চন্দ্রের কথা শুনে সূর্য বাড়ি ফিরে একে একে তার সব সন্তানকে খেয়ে ফেলল। ফলে পৃথিবীতে তাপ গেল কমে। এভাবে চন্দ্রের বুদ্ধিতে রক্ষা পায় পৃথিবী। শুধু পালিয়ে গিয়ে বেঁচে রইলো একটিÑ ‘শুকতারা’।
মনে করা হয় আদি বিশ্বাসের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরাই পৃথিবীর নানা ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক। ফলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য আমাদের অমূল্য সম্পদ। কালের বিবর্তনে এদেশে বসবাসরত নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা আজ সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরুদের প্রভাব এবং নিপীড়নে তাদের অস্তিত্বও সঙ্কটাপন্ন। ফলে লুপ্ত হচ্ছে তারা, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। একইসঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের বিশ্বাসের লোককথা বা মিথগুলো। Í
আদিবাসী কাহিনি চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবী সৃষ্টি
সালেক খোকন
২৩ মার্চ (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
