প্যারিস, এমিলি ও আমি

প্যারিস, এমিলি ও আমি

ফন্ট সাইজ:

১৯৭২। অর্লি এয়ারপোর্টে ট্রানজিট ডেস্কের সামনে লম্বা লাইন দেখে মনে হলো সবাই আমার মতো কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার যাত্রী। সকালে এত যাত্রী কোথা থেকে এসে পরবর্তী ফ্লাইট ধরার জন্য লাইন দিয়েছে ভেবে আমি কিছুটা অবাক হই। আমি ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার নই। দূরপাল্লার যাত্রা ১৯৬৪-এর পর আমার এই প্রথম। তখন এয়ারপোর্টে এত যাত্রী দেখিনি। সেই সময় যাত্রীদের প্লেনে তোলার জন্য গ্রাউন্ড স্টাফের তৎপরতা কাশির পান্ডাদের চেয়ে কিছু কম ছিল না। মনে আছে লন্ডন থেকে স্টকহোম দেরিতে পৌঁছানোর পর এস এ এসের গ্রাউন্ড স্টাফ টারমাকে প্লেনের পাইলটকে দরজা বন্ধ করতে নিষেধ করে আমাকে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে প্লেনের পিছন দিকের খোলা দরজা দিয়ে বমাল ভিতরে ঢুকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল, হ্যাভ এ নাইস ফ্লাইট।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের করভেয়ার প্লেন পেছনের দরজা বন্ধ করে আমাকে নিয়ে উড্ডীন হলে সিটে বসে আমি শুনেছিলাম বিলি ভনের যন্ত্রে পরিবেশিত ‘সামার প্লেসে’র থিম সিং। সেই যন্ত্র সংগীতে নস্টালজিয়ার মেলানকলির সঙ্গে মেশানো রোমান্স ছাত্র জীবনের সেন্টিমেন্টের সঙ্গে যুগলবন্দি হয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। ফরাসিরা সংগীত প্রিয় হলেও অর্লি এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে ট্রানজিট হলে পাইপ মিউজিক নেই, আছে কিছুক্ষণ পর পর যে ফ্লাইটে বোর্ডিং শুরু হবে এবং কোন গেটে কোন ফ্লাইটের যাত্রীদের যাওয়ার কথা, তার ঘোষণা। বেশ নৈর্ব্যক্তিক এখানকার পরিবেশ, প্লেনের টেক অফ বন্ধ করে একজন যাত্রীকে নিয়ে গ্রাউন্ড স্টাফের দৌড়ানোর প্রশ্ন ওঠে না এই ভিড়াক্রান্ত যতুগৃহে।
আমি ট্রানজিট ডেস্কে মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আমার টিকিট দেয়ার পর সে দেখে বললো, ইওর ফ্লাইট ইজ ক্যানসেল্ড।
আমি বললাম, টিকিটে লেখা আছে এক ঘণ্টা পর আমার ফ্লাইট। দিল্লি এয়ারপোর্টে কনফার্ম করেছিল এয়ার ইন্ডিয়া।
মেয়েটির বুকের নেমপ্লেট বলছে তার নাম এমেলিয়া। আমি তার সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নাম ধরে বলি, এমেলিয়া হেল্প মি। আই হ্যাভ বিন ফ্লাইং ফ্রম কলম্বো সিন্স ইয়েস্টারডে।
নিজের নাম শুনে সে আমার দিকে তাকালো। বুঝলাম নাম ধরে ডাকায় কাজ দিয়েছে। সে আমার আপাদমস্তক দেখে বললো, আর ইউ এ সিলোনিজ অর ইন্ডিয়ান?
আমি বললাম, বাংলাদেশি।
বাংলাদেশি শুনে সে আমাকে অবাক হয়ে দেখলো। দেখারই কথা। মাত্র ছয় মাস হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের এখনো নিয়মিত পাসপোর্ট হয়নি। বিদেশ ভ্রমণের জন্য দেয়া হয়েছে এ ফোর সাইজের কাগজে ফটোসহ সিল-ছাপ্পর। সেটা ভাঁজ খুলে এমিলিয়াকে দেখাই আমি। সে উৎসাহের সঙ্গে বলে, ইউ আর মাই ফার্স্ট বাংলাদেশি প্যাসেঞ্জার। দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি। তুমি লাউঞ্জের চেয়ারে গিয়ে বসো। আমি তোমার নেক্সট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে পারলে জানাবো।
শুনে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে গিয়ে বসি। ব্যাগ থেকে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডের ম্যাপ খুলে দেখি। আট বছর পর যাচ্ছি আমার ছাত্রজীবনের শহরে। আন্ডারগ্রাউন্ডে যাতায়াত ঝালাই করে নিচ্ছি, যদিও জানি একটা ছাড়া এই ক’বছরে নতুন কোনো লাইন যোগ হয় নি।
এখন এগারোটা বাজে। প্লেন অবতরণের আগে ব্রেকফাস্ট দিয়েছে। ইন্ডিয়ান মেনু: তিনটা লুচি, সবজি, ডিম, চা। সেই খাবারে পেট ভরে আছে। লাঞ্চ না করলেও ক্ষুধায় কাতর হবো না। অবশ্য ক্ষুধা পেলে এখানে নিশ্চয় তা নিবৃত্ত করার খাবার জায়গা আছে। আশা করি তার দরকার হবে না। আমার আমেরিকান বন্ধু স্কট এখনো প্যারিসে আছে। চিঠিপত্র লিখে যোগাযোগ রেখেছি আমরা। সে এখন ব্যবসা করছে। আমি একাডেমিক ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে সিভিল সার্ভিসে ঢুকেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে অভিনন্দন জানিয়ে একটা কার্ড পাঠিয়েছিল। কার্ডের ছবিতে ছিল আর্ক দি ট্রায়াম্ফ। আমি রেঙ্গুন, কলম্বো, হয়ে লন্ডন যাবো ফ্রাস্ট্রেটেড কার্গো ছাড়াবার জন্য। লাস্ট লেগে লন্ডন যাচ্ছি, ফেরার পথে প্যারিসে যাত্রা বিরতি করতে পারি বলে জানিয়েছিলাম তাকে। সে আমার অফিসে টেলেক্স পাঠিয়ে জানিয়েছে তখন সে আমেরিকায় থাকিবে। তবে আমি তার অবর্তমানে তার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে থাকতে পারি। সে তার কনসিয়ের্জকে বলে রাখবে। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে জানিয়েছি একা একা প্যারিস আমার ভালো লাগবে না। পরের বার বলে নিশ্চয় একটা কিছু আছে। তখন যাবো প্যারিস।
আমি বসে আছি তো বসেই আছি। লন্ডন আন্ডারডারগ্রাউন্ডের আগা-পাস্তলা সব মুখস্থ হয়ে গেল। এমিলিয়ার কাছ থেকে সবুজ সংকেত কিছু পাচ্ছি না। সে মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে আমার দিকে হাত তুলে জানাচ্ছে আমার কথা সে ভোলে নি। এই করে প্রায় দু’ঘণ্টা চলে যাওয়ার পর সে ইশারায় আমাকে তার কাছে যেতে বললো। যাওয়ার পর সে বললো, সরি চেষ্টা করেও তোমার জন্য দিনের কোনো লন্ডন ফ্লাইট পেলাম না। রাত আটটায় আলিটালিয়ার ফ্লাইটে একটা সিট আছে। নেবে?
আমি হতাশ হয়ে বলি, আই ডোন্ট হ্যাভ এ চয়েস। নেয়া ছাড়া উপায় কি?
এমিলিয়া আমাকে সাহায্য করতে পেরে বললো, ভেরি গুড। কিন্তু এখন একটা বাজে। এই সাত ঘণ্টা কি করে কাটাবে তুমি?
এখানেই বসে থাকবো।
শহরে যেতে পারো। সুটকেস লেফট লাগেজে রেখে বাসে করে প্যারিস ঘুরে আসতে পারো।
আমি বলি, একা ঘুরতে ভালো লাগবে না। কোথায় যাবো তার ঠিক নেই। প্যারিস আমি চিনি না। ভাষার অজ্ঞতার জন্য পথ হারিয়ে শেষটায় আটটার ফ্লাইটও মিস করবো।
শুনে এমিলিয়া বলে, বসো গিয়ে। বিশ মিনিট পর আমার ডিউটি শেষ। দেখা যাক কি করা যায় তোমার জন্য। তারপর সে বলে, ট্যুরিস্ট ব্যুরোর এয়ারপোর্টে অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখি তাদের কোনো শাটল সার্ভিস আছে কিনা।
শাটল সার্ভিস?
শাটল সার্ভিস মানে বাসে করে ঘুরিয়ে এয়ারপোর্টে নিয়ে আসবে। শুনেছি এমন একটা ট্যুরের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে তারা। করেছে কিনা দেখতে হবে।
শুনে আমি উৎফুল্ল হয়ে বলি, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। বাস থেকে না নেমেই প্যারিস ঘুরে আসা যাবে।
আমি ফিরে এসে প্লাস্টিক চেয়ারে বসি। অপেক্ষা করি কখন এমিলিয়ার ডিউটি শেষ হবে আর সে এসে খুশির খবর দেবে আমাকে। আমি ট্রানজিট হলে যাত্রীদের দেখে তাদের পেশা বোঝার চেষ্টা করি। এটা সময় কাটানোর একটা উপায়। ঠিক বিশ মিনিট পর এমিলিয়া এসে বললো, সরি। শাটল সার্ভিস এখনো শুরু হয়নি। কি করবে?
আমি হতাশ হয়ে বলি, বসে থাকবো। এছাড়া আর করার কি আছে? তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি আমাকে সাহায্য করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছো।
এমিলিয়া কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, চলো। আমি তোমাকে প্যারিস বেড়াতে নিয়ে যাই। মানে সাত ঘণ্টায় প্যারিসের যা দেখা যায়।
আমি অভিভূত হয়ে বলি, আমার জন্য তুমি কেন কষ্ট করবে? তোমার নিজের কাজ থাকতে পারে।
এমিলিয়া বলে, বাংলাদেশের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে। সেই জন্য আমি আমার একবেলা তোমার জন্য দিতে পারি।
আমি অবাক হয়ে বলি, তোমার বাবা কি ইন্ডিয়ায় কাজ করেছেন? চন্দননগর?
এমিলিয়া হেসে বলে, সম্পর্ক সম্বন্ধে তোমাকে পরে বলবো। এখন ওঠো। আর আমাকে সংক্ষেপে এমিলি বলে ডাকবে। এমিলিয়া বলার দরকার নেই।
তারপর ট্রানজিট হল থেকে বের হতে হতে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, প্যারিসে বিশেষ কোনো জায়গা দেখতে চাও তুমি?
আমি একটু চিন্তা করে বলি, সাজেঁ-লিজেঁঁর একটা কফি শপে যেতে চাই। কাফে জর্জ দি ফিফথ।
বেশ সেখানে নিয়ে যাবো তোমাকে। তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক ঐ কফিশপে কেন যেতে চাও? সাজেঁ- লিজেঁতে আরো নামকরা কাফে- ব্রাসারি আছে।
আমি লাজুক ভঙ্গিতে বলি, দশ বছর আগে যখন প্রথম প্যারিস আসি, কাফে জর্জ দি ফিফথে বসেছিলাম।
এমিলি হেসে বলে, নস্টালজিয়া?
তা বলতে পারো। কিন্তু সব কাফের মধ্যে আমার কিন্তু ওটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছিল। কেননা ওটা ছিল আর্ক দি ট্রায়াম্ফের খুব কাছে।
এমিলি বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে বললো, এখান থেকে বাসে আর্ক দি ট্রায়াম্ফ যেতে আধ ঘণ্টা লাগবে। তারপর হেসে বললো, ইফ ট্রাফিক ইজ নট এগেইনস্ট আস।
আমাদের বাস ঠিক আধ ঘণ্টাতেই আর্ক দি ট্রায়াম্ফের কাছে নামিয়ে দিলো। আমি দেখলাম সাজেঁ-লিজেঁর দু’পাশে চেস্টনাট গাছগুলো নিষ্পত্র- নিরাভরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হেমন্তের শেষ, কবলস্টনে পা ফেলে শীত এগিয়ে আসছে।
কাফে জর্জ দি ফিফথের দিকে যেতে যেতে এমিলি বলে, দশ বছরে কি চেঞ্জ দেখছো?
আমি বলি, অনেক মানুষ। কাফে টেরেসে বসার জায়গা নেই।
এমিলি বলে, ইয়েস। ট্যুরিস্ট বেড়েছে বহুগুণ। তারপর ডানদিকের দোকান দেখিয়ে বলে, অনেক নতুন দোকান হয়েছে। কেবল ফরাসি ব্র্যান্ড না, জাপানি মিজো আয়াকো, আমেরিকান সিয়ার্স, স্পেনের জারা, সুইডেনের এম এন্ড এস। গাড়ির শো রুম দেখো। জাপানি ব্র্যান্ডের জয়জয়কার।
আমি গোলাকার বিজ্ঞাপনের পিলারগুলো দেখে বলি, রাজনৈতিক সেøাগান দেখতে পাচ্ছি।
এমিলি বলে, শুরু হয়েছে ১৯৬৮- এর প্রোটেস্ট মুভমেন্টের সময়। ছাত্র-শ্রমিকেরা সাজেঁ-লিজেঁ দখল করে নিয়েছিল, কেননা তারা মনে করেছিল এই এলাকা বুর্জোয়াদের প্রমোদ কেন্দ্র। তারপর থেকে ট্রড ইউনিয়ন, পলিটিকাল পার্টি সাজেঁ-লিজেঁ বেছে নিয়েছে তাদের মেসেজ দেয়ার জায়গা হিসেবে। মাঝে মাঝে তারা প্রসেশন করে যায় এখানে। এখন অবশ্য সাজেঁ-লিজেঁ অনেক গণতান্ত্রিক হয়েছে। এখানে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরাও আসতে অস্বস্তি বোধ করে না, যেমন করেছে আগে।
আমি হেঁটে যেতে যেতে বলি, যারা টেরেসে বসেছে তাদের পোশাক বলে দিচ্ছে সাজেঁ- লিজেঁ এখন সর্বজনীন।
এমিলি বলে, এই সর্বজনীনতা ফরাসি বিপ্লবেরও কিন্তু আসে নি।
তার কারণ কি ছিল?
কারণ ছিল বিপ্লব সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন করতে পারে নি। ষষ্ঠ লুই আর তার স্ত্রী মারি আন্তোয়নেতকে গিলোটিনে চড়িয়ে মুন্ডুপাত করেছিল কিন্তু সেই বুর্ব রাজবংশ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। এমনকি সেনা কমান্ডার নেপোলিয়ন ক্ষমতা দখল করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। এমিলি হাঁটতে হাঁটতে বলে।
সমাজের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কি করা দরকার ছিল? আমি জিজ্ঞাসা করি।
এমিলি বলে, সম্পদের পুনর্বণ্টন। ফরাসি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন করেছিল, তাও সাময়িকভাবে যার জন্য আবার ফিরে আসে রাজতন্ত্র।
১৯৬৮ এর গণ-অভ্যুত্থান পেরেছে সম্পদের পুনর্বণ্টন করতে? আমি জিজ্ঞাসা করি।
হ্যাঁ, অনেকটা। মে-জুন বিপ্লবে যোগ দিয়েছিল সারা দেশের শ্রমিক। অনেক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিল তারা। দ্য গল তার কমান্ডারদের সঙ্গে জার্মানিতে গিয়ে পরামর্শ করে ফিরে এসে দুটো কাজ করেন। প্রথমত তিনি সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন। জুন মাসের নির্বাচনে অবশ্য গলিস্টরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। কিন্তু তাদের দল আগের মত স্বৈরাচারী মনোভাব রাখতে পারে নি। যে পরিবর্তন সম্পদের পুনর্বণ্টনে ভূমিকা রাখে তা হলো এগ্রিমেন জেনারেল। ট্রেড ইউনিয়ন, কারখানার মালিক আর সরকার এই চুক্তি করে যার ফলশ্রুতিতে সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ানো হয় শতকরা ৩৫ ভাগ। এর পাশাপাশি শতকরা ১০ ভাগ সব মজুরি বাড়ানো হয়। সম্পদের এত বিশাল পুনর্বণ্টন ফ্রান্সে আর কখনো হয় নি।
আমি বলি, যারা ১৯৬৮- এর বিপ্লব শুরু করেছিল সেই ছাত্ররা কি পেল?
কথা বলতে বলতে আমরা কাফে জর্জ দি ফিফথে পৌঁছে যাই। দুটো ফাঁকা চেয়ার দেখে বসার পর এমিলি বলে, এটা খুব ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন। ছাত্ররা আন্দোলন করেছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কিন্তু তারা সোভিয়েত কমিউনিজম চায়নি। আন্দোলনের সময় কেউ কেউ কমিউনিস্ট পার্টির ইন্টারন্যাশনাল গেয়েছে কিন্তু সোভিয়েত- সমর্থিত কমিন্টার্ন চায়নি।
তার মানে ছাত্রদের আন্দোলন ছিল এস্টাব্লিশমেন্ট বিরোধী। তারা বাকস্বাধীনতা চেয়েছে, একাডেমিক ফ্রিডম চেয়েছে, ভিড়াক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ চেয়েছে। সমাজের কিংবা অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন চায়নি। আমি বলি।
একজাক্টলি। কিন্তু তুমি এত সব জানলে কি করে?
আমি বলি, লন্ডনে তারেক আলি নামে এক ছাত্র নেতা সেই সময় ফ্রান্সের ছাত্রদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্দোলন করে। তার বই পড়ে জেনেছি আমি।
এমিলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দ্যাট ইজ দি ট্র্যাজেডি অফ অল ফ্রেঞ্চ রেভল্যুশন। আমরা কি চাই না, সেটা জোর দিয়ে বলেছি। কিন্তু কি চাই সে সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ১৭৮৯ সালের বিপ্লবে ছিল না, ১৮৩০- এর বিপ্লবে ছিল না। ১৯৬৮ সালে আমাদের প্রজন্মেরও ছিল না।
আমি বলি, তুমি ১৯৬৮ সালে কোথায় ছিলে?
এমিলি বলে, ইন দ্য আই অফ দ্য স্টর্ম। সরবোঁতে প্রথমবর্ষের ছাত্র।
আমি বলি, ইনভলভ হয়েছিলে?
সে সময় কে হয় নি? যদি শুনতে চাও বলবো। তার আগে লাঞ্চের অর্ডার দিই। তুমি কি খাবে?
আমি বলি, মাদাম স্যান্ডুইচ। ব্যাগুয়েট, বিফ, চিজ উইথ এগ।
আরে তুমি দেখি ফ্রেঞ্চ ফাস্টফুড খেতে অভিজ্ঞ। কি করে রপ্ত করলে?
আমি বললাম দশ বছর আগে যখন এখানে আসি আমার সঙ্গিনী এই খাবারের অর্ডার দিয়েছিল।
শুনে এমিলি চোখ কপালে তুলে বলে, সঙ্গিনী? বলেছো এর আগে একদিন এক রাতের জন্য এসেছিলে প্যারিস। তার মধ্যে সঙ্গিনী জুটিয়ে ফেলেছিলে?
আমি হেসে বলি, আমার মেয়ে ভাগ্য খুব ভালো। এই যে দেখো না তোমার সঙ্গে সামান্য আলাপ। তাতেই তুমি আমার বন্ধু হয়ে গেলে। এত কষ্ট স্বীকার করলে।
হ্যাঁ। তোমাকে দেখে খুব ভালনারেবল মনে হয়। মনে হয় অসহায়।
আমি হেসে বলি, এবং নিরাপদ।
এমিলি হেসে বলে, এত তাড়াতাড়ি সেই সার্টিফিকেট দেয়া যাবে না। ফর দ্যাট উই নিড টাইম। আনফরচুনেটলি তুমি সেই সুযোগ না দিয়ে আজই চলে যাচ্ছো।
ওয়েটার সেই আগের বার যেমন দেখেছি, দুই হাতে ট্রে নিয়ে শরীর আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে টেবিলে খাবার আর পানীয় দিয়ে গেল। তারপর এক প্রৌড় একোর্ডিওনিস্ট আমাদের কাছে এসে খুব ফূর্তিতে বাজাতে থাকলো যেন আমাদের সেরেনেদ করছে।
আমি স্যান্ডুউইচ হাতে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলি, আই লাইক একোর্ডিওন সং। শুনলেই মনে হয় হলিডের দিন আজ। আর সেইসঙ্গে এ-ও মনে হয় এই গান যাকে বলে কুইন্টেএসেন্সিয়ালি, মৌলিক ভাবে ফ্রেঞ্চ। ঠিক যেমন ব্যাগুয়েট রুটি। পুরুষের মাথায় বেরেট। ফ্রান্সোয়াঁজ বলে মেয়ের নাম।
শুনে অবাক হয়ে এমিলি বলে, আর ইউ এ পোয়েট? কি সুন্দর করে বললে।
আমি হাতের স্যান্ডুউইচ প্লেটে রেখে বলি, পরিবেশ আর সাহচর্য্য আমাকে কেন, অনেককেই কবি করে তোলে।
এমিলি আমাকে নতুন করে দেখার মতো করে বলে, ইউ আর ইন্টারেস্টিং। হোয়াট এ পিটি তোমাকে জানার সময় পাবো না। তারপর উঠে গিয়ে একোর্ডিওন প্লেয়ারের কাছ থেকে একটা গানের সিডি কিনে আমাকে দিয়ে বলে, হিয়ার ইজ এ স্যুভেনির ফর ইউ ফ্রম প্যারিস। এটা শুনে তুমি চোখ বুঁজে কল্পনা করতে পারবে ফ্রান্সে আছো।
আমি হাতে নিয়ে বলি, মেসি বকুঁ।
তারপর সিডির পেছনে গানের লিস্ট পড়ি। একটা নাম দেখে আমি বিলি, এডিথ পিয়াফের গান রয়েছে দেখছি।
শুনে এমিলি অবাক হয়ে বলে, তুমি তার নাম জানলে কি করে?
আমি বললাম, লন্ডনে ষাটের দশকে পড়ার সময় রেডিও লাক্সেমবুর্গ শুনতাম। অনেক ফরাসি গায়কের গান শুনেছি তখন। ইভ মন্তাঁ। চারর্লস আজনাভুঁ, নজুলিয়েটে গ্রেকো, ফ্রান্সোয়াঁ হার্ডি।
শুনে এমিলির মুখের হা বন্ধ হয় না। বলে, ইউ আর ফ্যান্টাস্টিক। আহা যদি তুমি আর ক’দিন থাকতে।
তাহলে আমার প্রেমে পড়ে যেতে?
বলে আমি দুষ্টুমির হাসি হাসি।
এমিলি বলে, দ্যাট ওয়াজ এ পসিবিলিটি কিন্তু আমি ভাবছি তোমাকে আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে কি যে ভালো হতো।
আমি হেসে বলি, আবার দশ বছর পর আসবো আমি। তখন। পরিচয় করিয়ে দিও। এখন ১৯৬৮- এর মুভমেন্টে তোমার ভূমিকার কথা বলো শুনি।
এমিলি হাতের ঘড়ি দেখে বলে, সেটা বলার জন্য তোমাকে অকুস্থানে নিয়ে যেতে হবে। যাবে?
কোথায়?
ল্যাটিন কোয়ার্টার হোয়ার ইট অল হ্যাপেন্ড।
আমি বললাম, লেটস গো।
আমরা সাজে- লিজেঁর পারফিউমের দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে মেট্রো স্টেশনের দিকে যাই। একটা দোকানের জানালায় ব্রুট মেন্স কলোন দেখে এমিলিকে বলি, আই ওয়ান্ট টু বাই দ্যাট।
এমিলি আমাকে নিয়ে দোকানে ঢোকে। আমি তাড়াতাড়ি ব্রুটের সবচেয়ে বড় বোতল আর পিয়ের কার্দার টাই কিনি।
কাউন্টারে টাকা দেয়ার সময় এমিলি বলে, দে আর এক্সপেন্সিভ। তুমি কি সব সময় ব্যবহার করো?
আমি বলি, আগে করতাম। এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এসব লাক্সারি আইটেম পাওয়া যায় না। এসেন্সিয়াল কমোডিটিজেরও অভাব।
এমিলি বলে, সাধারণ মানুষ কীভাবে চলছে?
আমি বলি, তারাই জানে কীভাবে বেঁচে আছে।
স্বাধীনতার পর একটা দুর্ভিক্ষ হয়েছে তোমাদের দেশে। বেশ কিছু মানুষ মারা গিয়েছে। নিশ্চয় গরিব মানুষ।
আমি অবাক হয়ে বলি, তুমি সে কথা জানো?
হ্যাঁ। কাগজে পড়েছি। বললাম না বাংলাদেশের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আছে।
হ্যাঁ বলেছো। কিন্তু সম্পর্কটা কি তা বলো নি।
বলবো তুমি তো এখনই চলে যাচ্ছো না। যাওয়ার আগে বলবো।
আমি বলি, তুমি খুব রহস্যময়ী।
হ্যাঁ সব মেয়েই তাই। না হলে ভবসসব ভধঃধষব এই খ্যাতি জুটবে কি করে? এখন বলো এসবের দাম দেয়ার মতো ফ্রাঙ্ক আছে তোমার?
আমি বলি আছে। না হলে কিনছি কি করে? বলে ওয়ালেট থেকে কড়কড়া ডলার বের করি আমি।
বিল পরিশোধ করার পর আমি আর এমিলি সাজেঁঁ-লিজেঁর মেট্রো স্টেশনে যাই। প্যারিসে আমার এই প্রথম মেট্রো চড়া। বেশ পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। দেয়ালে বিজ্ঞাপন আছে। বেশির ভাগই মেয়ে মডেল, কিন্তু শিল্পিত ভঙ্গির। ফরাসিতে শিক বলতে যা বোঝায়। রেলকারগুলির ভেতর একই পরিচ্ছন্নতা এবং নির্জনতা। কোথাও গ্রাফিতি নেই। যান্ত্রিক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছে যে প্রেমিক-প্রেমিকা তারাও নির্বাক। আমি আর এমিলি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর খালি সিট পেয়ে বসলাম। এমিলি ফিসফিস করে বললো, লাঞ্চ হাওয়ার, রাশ হাওয়ার। অনেকেই বাইরে লাঞ্চ করে।
আধ ঘণ্টা পর আমরা ওদিওঁ মেট্রো স্টেশনে নামলাম। ট্রেন থেকে নেমে এমিলি বললো, এটাই ল্যাটিন কোয়ার্টারের স্টেশন।
আমরা উপরে ওঠার পর দাঁড়িয়ে যায় এমিলি। চারিদিকের রাস্তা, বুলেভার, রেস্তরাঁ আর ভবন দেখিয়ে বললে, এটাই সরবোঁ ক্যাম্পাস এরিয়া। ঐ যে দেখছো গির্জার চূড়ো, ওটা সরবোঁ ইউনিভার্সিটির চ্যাপেল। ধর্মীয় আর একাডেমিক, দুই ধরনের অনুষ্ঠানেই ভূমিকা নিয়েছে তিনশ বছর থেকে। আর ১৯৬৮-এর মুভমেন্টে ঐ চ্যাপেলের ছিল অনন্য ভূমিকা।
কি ধরনের?
বলছি। বলার পর এমিলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে যেন দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপর সামনে তাকিয়ে বললো, আমি মে মাসের এক সকালে ওদিওঁ মেট্রো স্টেশনের উপরে এসে দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা বুলেভার সেন্ট মিশেলের কবলস্টোন তুলে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারছে। বর্ম পরা পুলিশ তাদের ব্যাটন দিয়ে শিল্ডের ওপর আঘাত করছে। যেন যুদ্ধে যাওয়ার দামামা বাজাচ্ছে। অর্ডার পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে ছাত্রদের ওপর। ছাত্ররা পুলিশি হামলা প্রতিহত করার জন্য রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছে। সেøাগান উঠছে মুহুর্মুহু। কর্তৃপক্ষ নিপাত যাক।
আমি বললাম, কর্তৃপক্ষ মানে সরকার?
এমিলি বললো, সব ধরনের কর্তৃপক্ষ। সরকার। ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। এম্পলোয়ার, এমন কি ফ্যামিলি।
আমি বলি, ফ্যামিলি?
হ্যাঁ। বাবা- মার কড়া শাসনের বিরুদ্ধেও ছিল সেই মুভমেন্ট। সব রকমের বাধা, বিধিনিষেধ যা ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থি, ৬৮- এর মুভমেন্ট হয়ে যায় তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
আমি বলি, তুমি দেখার পর কি করলে?
এমিলি বলে, চারিদিকের উত্তেজনা আমাকেও আচ্ছন্ন করলো। নিজের অজান্তেই কবলস্টোন তুলে ছুড়ে মারতে থাকলাম পুলিশের দিকে। সেøাগান দিলাম: ংড়ঁং ষবং ঢ়ধৎবং, ষধ ঢ়ষধমব মানে নবহবধঃয ঃযব ংঃড়হবং, ষরব ঃযব নবধপয. আর একটা সেøাগান শোনা গেল সেই সময়: ওঃ রং ভড়ৎনরফফবহ ঃড় ভড়ৎনরফ.
আমি বললাম, কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল সেই মুভমেন্টে?
কোনো সেন্ট্রাল কমান্ড ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটাই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্যারিসের পশ্চিম সাবার্বে নাতেঁ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা একাডেমিক সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ ও দাবি করার পর কর্তৃপক্ষ ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেয়। তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে সরবোঁ ইউনিভার্সিটি। সেটাও বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু ছাত্ররা ততদিনে রাস্তায় নেমে পড়েছে। তারা ইউনিভার্সিটি দখল করে নিলো। রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের হামলা প্রতিহত করলো।
আমি বললাম, সেই সময় রুডি কন বেনডিক্ট নামে এক ছাত্রনেতার নাম শোনা গিয়েছিল।
এমিলি বললো, হ্যাঁ অনেক ছাত্র নেতার মধ্যে তার খ্যাতি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই একমাত্র নেতা ছিল না। বললাম না, ৬৮- এর মুভমেন্ট ছিল ডিসেন্ট্রালাইজড। অনেক পক্ষ ছিল। কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট, এনার্কিস্ট, ফিলোসফার, থিঙ্কার। তাদের মধ্যে কোনো কো-অর্ডিনেশন ছিল না।
ইন্টেলেকচুয়ালদের কি ভূমিকা ছিল?
সাত্রে, বুভুয়াঁ নিয়মিত আসতেন ক্যাম্পাসে। ছাত্রদের মুভমেন্টের সঙ্গে তারা একাত্মতা প্রকাশ করেন। সাত্রে রুডি কন বেন্ডেক্টেরে ইন্টারভিউ নিয়ে কাগজে ছাপার পর সে ফেমাস হয়ে যায়। সিমন বুভুয়াঁ অন্যদিকে ছাত্রদের মুভমেন্টকে ফেমিনিস্ট মুভমেন্টের অংশ বলে দাবি করেন। ফুকোঁ, দেরিদা নামে দুই বুদ্ধিজীবী খুব আগ্রহ দেখান ছাত্রদের মুভমেন্টের প্রতি। সেই সময় তারা কিছু না লিখলেও পরে তাদের পরের লেখায় এই মুভমেন্টের প্রভাব দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার ব্যখ্যায়। অনেকের মতে ৬৮- এর মুভমেন্ট সার্ত্রের একজিস্টেনশিয়ালিস্ট দর্শন থেকে ফুকোঁ, দেরিদার থিওরির দিকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। একজিসস্টেন্টসিয়ালিজমের গ্র্যান্ড আইডিওলজির গুরুত্ব হ্রাস পেয়ে ক্ষমতার ইস্যু বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
আমি বলি, চ্যাপেলের ভূমিকার কথা বলবে বলেছিলে।
এমিলি বলে, হ্যাঁ। যখন পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে ব্যাটন হাতে হামলে পড়লো তখন হঠাৎ শোনা গেল চ্যাপেলের ঘণ্টাধ্বনি। কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নেই। একাডেমিক কোনো সেরিমিনি নেই। তবু ঘণ্টা বেজে উঠলো। থামার লক্ষণ নেই। সেই শব্দ ছাত্রদের যেন অভয় দিলো। সতর্কতার, বিপদের এবং বিজয়ের প্রতীক হয়ে গেল চ্যাপেলের ঘণ্টাধ্বনি। সেই শব্দ শুনে ভরসা পেয়েছে ছাত্ররা। পিছপা হয়নি পুলিশি হামলার মুখে।
তাদের সঙ্গে তুমিও ছিলে?
হ্যাঁ। বললাম না, অদিও মেট্রো স্টেশনের উপরে এসেই দেখি ল্যাটিন কোয়ার্টার যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গিয়েছে। ছাত্ররা রাস্তার কবলস্টোন খুলে ব্যারিকেড তৈরি করছে, পাথর ছুড়ে মারছে অদূরে দাঁড়ানো পুলিশের দিকে। যানবাহন চলাচল বন্ধ। দোকান-পাটের ঝাপি নামিয়ে দিয়েছে। কেবল ল্যাটিন কোয়ার্টারের কয়েকটি কাফে খোলা। ছাত্ররা হাফ দামে কফি, স্যান্ডুউইচ খাচ্ছে। চারদিকে ধুলো উড়ছে, গলউসের গন্ধে বাতাস ভারি।
গলউস?
গলউস হলো কড়া সিগারেট। সবচেয়ে সস্তা। সাধারণ মানুষের তামাক। ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে গলউস টানছে। যারা আগে খায়নি তারাও খাচ্ছে। কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে পেভমেন্টে শুয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়েই সেøাগান দিচ্ছে। আর্ট ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা পোস্টার, ব্যানার তৈরি করে আনছে। ল্যাটিন কোয়ার্টারে মে-জুন মাসের সেই কটা তারিখে দিন রাতের পার্থক্য ছিল না।
পুলিশের হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ছাত্ররা?
প্রথমে হলো। তারপর রিগ্রুপ করে পুলিশের মুখোমুখি হলো তারা। এম্বুলেন্স এলো সাইরেন বাজিয়ে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপর খবর এলো, শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছে। তারা স্ট্রাইক করেছে। তাদের ক্ষোভ আর দাবি ছিল ভিন্ন। কিন্তু ছাত্রদের দেখে তারাও রাস্তায় নামলো। ছাত্রদের আর তাদের আন্দোলন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এক হয়ে গেল।
এমিলি বলে বুলেভার সেঁ মিশেঁলের উল্টো দিকে এক কাফের দিকে হাঁটতে থাকলো। আমি তার পাশাপাশি হেঁটে বললাম, আন্দোলনে শ্রমিকদেরই লাভ হলো, বলেছো তুমি। ছাত্রদের কি হলো? তারা কি পেলো?
এমিলি কাফের ভেতর ঢুকে বললো, ছাত্রদের কিছু দাবি যে মেটানো হলো সে কথা বলেছি আগে। তাদের দাবি ছিল ক্লাসের ওভারক্রাউডিং কমাতে হবে। প্যারিস ইউনিভার্সিটির দুটো ক্যাম্পাস করে সেই দাবি মেটানো হলো। তাদের আর একটা দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ছাত্রদের ভূমিকা থাকতে হবে। সে দাবিও মানা হয়েছে। অন্য অ্যাচিভমেন্টের মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের ওপর বিধি-নিষেধ শিথিল করা, মেয়েদের অধিকার মেনে নেয়া। সব চেয়ে বড় সাফল্য হলো ক্ষমতা, অথরিটি প্রশ্নাতীত না থাকা। একাউন্টেবিলিটি মেনে নেয়া। খ’রসধমরহধঃরড়হ ধঁ ঢ়ড়াঁধরৎ মানে রসধমরহধঃরড়হ ঃড় ঢ়ড়বিৎ. এটাও জুন মুভমেন্টের একটা সেøাগান।
কফি খেতে খেতে আমি এমিলিকে বলি, জুন মুভমেন্ট ল্যাটিন কোয়ার্টারে হয়েছিল। সেখানে আমাকে নিয়ে এসে যে গ্রাফিক বর্ণনা দিলে তাতে মনে হলো আমিও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলাম। এখন বলো বাংলাদেশের সঙ্গে তোমার বিশেষ সম্পর্কের কথা। পরে বলবে বলেছিলে। আমার তো যাওয়ার সময় হয়ে এলো।
এমিলি বলে, একাত্তরে মার্চ মাস এবং তারপর বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আমরা ছাত্ররা ল্যাটিন কোয়ার্টারে তার প্রতিবাদ করেছি। মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য চাঁদা তুলেছি। আমি, আমার বন্ধুরা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে রিলিফ ফান্ডে জমা দিয়েছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার ঐভাবে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তুমিই প্রথম বাংলাদেশি যাকে আমি সামনা-সামনি দেখলাম।
এমিলির কথা শুনে আমি ম্রিয়মাণ হয়ে যাই। আমার হাতে ধরে রাখা দামি ব্রুটের বোতল ভারি হয়ে ওঠে। ভেতরে একটা অপরাধবোধ জেগে ওঠে হঠাৎ। এমিলির দিকে আমি ভালো করে তাকাতে পারি না।
উঠবার আগে আমি এমিলিকে বলি, তুমি যদি কিছু মনে না করো এই কোলোন তোমাকে উপহার দিতে চাই।
শুনে এমিলি আমাকে তীক্ষè দৃষ্টিতে দেখে। তারপর হেসে বলে, ফ্যাবার্জের ঐ কোলোন পুরুষের। আমাকে দিতে চাও কেন?
আমি বলি, তুমি বাংলাদেশের জন্য চাঁদা তুলেছো, টিফিন না খেয়ে রিলিফ ফান্ডে ডোনেট করেছো। তোমাকে আমার কিছু দেয়া উচিত।
এমিলি গম্ভীর হয়ে বলে, তোমার মনের প্রতিক্রিয়া আমি বুঝতে পারছি। ইউ আর ভেরি সিন্সেয়ার। কিন্তু তোমার বিবেকের বোঝা আমি বইতে পারবো না। যিশুকে ক্যালগারিতে নিজের ক্রস নিজেকেই বইতে হয়েছিল। উই অল হ্যাভ টু ক্যারি আওয়ার ওন ক্রস মাই ফ্রেন্ড।
বলে সে আমার কাঁধে হাত রেখে মৃদু চাপড়ায়। তারপর কাঁধে হাত রেখেই আমাকে নিয়ে কাফে থেকে বের হয়।
কাফের বাইরে ল্যাটিন কোয়ার্টারের মুক্ত পরিবেশ। বাতাসে আসন্ন শীতের স্পর্শ। আমার হঠাৎ ঠান্ডা লাগতে থাকে। হাতে ব্রুট রাখা ব্যাগটা খুব ভারি মনে হয়। Í



rumi

২ মাস আগে

খুবই সুন্দর অভিজ্ঞতা। ভবিষ্যতে আপনার লেখা আরো পড়তে পারবো আশা করি

আনোয়ার হোসেন শাহীন

২ মাস আগে

৬৮ র সাথে আমাদের ২৪ এর গনআন্দোলনের বহু মিল আছে যে কোন ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন এ ভাবেই সংগঠিত হয় এবং সফলতা অর্জন করা যায়।

মন্তব্য করুন