যুদ্ধের মধ্যেও রেমিট্যান্সে জোয়ার, ২ সপ্তাহেই এলো ২২০ কোটি ডলার

যুদ্ধের মধ্যেও রেমিট্যান্সে জোয়ার, ২ সপ্তাহেই এলো ২২০ কোটি ডলার

ফন্ট সাইজ:

গত বছরের মার্চে ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। একক মাসের হিসাবে এখন পর্যন্ত যা সর্বোচ্চ। রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এবারের মার্চে সেই রেকর্ড ভাঙবে বলে আশা করা হচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; ঈদকে সামনে রেখে জোয়ার বইছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নবম মাস মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে (১৪ দিন, ১ থেকে ১৪ মার্চ) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা ২২০ কোটি ৫০ লাখ (২.২০ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এই অঙ্ক গত বছরের মার্চের একই সময়ের চেয়ে ৩৫.৬৭ শতাংশ বেশি। গত বছরের মার্চের এই ১৪ দিনে ১৬২ কোটি ৫০ লাখ (১.৬২ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন তারা।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ১৫ দিন হতে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।

আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি। প্রতিবারই দুই ঈদকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের বাড়তি খরচ মেটাতে বেশি বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। শঙ্কা ছিল, যুদ্ধের কারণে এবার সেই প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চলতি মার্চ মার্চের প্রথম সপ্তাহে (৭ দিন, ১ থেকে ৭ মার্চ) ১০৬ কোটি ৯২ লাখ (১.০৭ বিলিয়ন) পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। পরের সপ্তাহে অর্থাৎ ৮ থেকে ১৪ মার্চ এসেছে ১১৩ কোটি ৫৮ লাখ (১.১৩ বিলিয়ন) ডলার। সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আট মাস ১৪ দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ) ২ হাজার ৪৫৬ কোটি ৪০ লাখ (২৪.৫৬ বিলিয়ন) পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত বছরের মার্চের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও ঈদের আগে বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে প্রচুর পরিমাণে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতেই বাড়ছে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ। যুদ্ধের প্রভাব এখনও রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়েনি বলে জানান আরিফ খান। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭০ পয়সা) হিসাবে টাকার অঙ্কে মার্চের প্রথম ১৪ দিনে ২৭ হাজার ৬৬ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ১৫ কোটি ৭৫ লাখ ডলার; টাকায় ১ হজার ৯৩৩ কোটি টাকা। এর আগে কোনো মাসের প্রথম ১৪ দিনে এত রেমিট্যান্স দেশে আসেনি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) তেলসমৃদ্ধ ছয়টি দেশ-সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো থেকে। চলমান সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আটকে পড়েছেন বহু কর্মী। আবার কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের ভিসা, বিশেষ করে এন্ট্রি ভিসা শেষ হওয়ার পথে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে নতুন করে কর্মী পাঠানো কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছুটি বা জরুরি প্রয়োজনে দেশে এসে আটকে গেছেন, এমন কর্মীদের ফিরে যাওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে নতুন কর্মীর যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত হলেও ভিসা ও ফ্লাইটসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এরই মধ্যে কাতার এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য দেশগুলোও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।

টানা ৩ মাস ৩ বিলিয়নের বেশি এসেছে
ডিসেম্বর ও জানুয়ারির পর গত ফেব্রুয়ারির মাসেও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স এসেছে দেশে। এ নিয়ে টানা তিন মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স দেশে পাঠালেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা। বাংলাদেশের ইতিহসাসে এর আগে কখনও এমনটি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসীরা ৩০২ কোটি ১০ লাখ (৩.০২ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ছিল গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল ২৫২ কোটি ৭৬ লাখ (২.৫২ বিলিয়ন) ডলার। আর এই রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৮ মার্চ রিজার্ভ থেকে আকুর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের ১৩৫ কোটি ৮৭ (১.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করেছে। এরপর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আর গ্রস বা মোট নেমেছিল ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। গত এক সপ্তাহে তা বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ২৯ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। গ্রস হিসাবে দাঁড়য়েছে ৩৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। নিলামে ডলার কেনা রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি কারণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। গত আট মাসে সাড়ে ৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন