মঙ্গলবার দুপুর ২টা। ঢাকার এয়ারপোর্টের সামনে যাত্রী তুলতে ডাকাডাকি করছিল ভিআইপি সিটি পরিবহনের একটি বাসের সহকারী লিটন। বাসে বেশ কয়েকটি আসনই ফাঁকা দেখা গেছে। পেছনে চেকার বাসের আসন চেক করে একটু সামনে এসেই বাস থামিয়ে যাত্রীদের জন্য হাঁকডাক করছিল লিটন। সরকার ভিআইপি পরিবহনকে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’র আওতায় আনলেও কেন এমন ডাকাডাকি করে যাত্রী তুলছে জানতে চাইলে লিটন বলেন, ‘ঘোষণা দিলেও টিকিটিং সিস্টেম চালু হয়নি এখনো। তবে ওয়েবিল সিস্টেম চালু করা হয়েছে। জায়গায় জায়গায় আমাদের লাইনম্যান আছে এসব ওয়েবিল নিয়ন্ত্রণের জন্য।’
শুধু ভিআইপি সিটি পরিবহন নয়, ঢাকার সড়কে এমন সাত রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি’র আওতায় আসা পরিবহনগুলোর মধ্যে এখনো আগের নিয়মেই যাত্রী তুলতে চালক-সহকারীদের দৌড়ঝাঁপ দেখা গেছে। জায়গায় জায়গা থামিয়ে তুলছিলেন যাত্রী। বাসে অবৈধ ওয়েবিল সিস্টেম চালু রাখা হয়েছে। টিকিটিং সিস্টেমও দেখা যায়নি। বাসগুলো যাত্রীতে ঠাসা ছিল। কোম্পানিভিত্তিক দুই রুটের বাস- পিপিবি সিটি সার্ভিস ও ভিআইপি সিটি পরিবহনের বাসগুলোতে এইসব চিত্র দেখা গেছে।
গত রোববার ছয়টি রুটে নতুন পদ্ধতিতে এই বাস সেবা চালু করা হয়। যদিও আগে থেকে চলা পুরনো বাস দিয়ে কোম্পানিভিত্তিক এই পদ্ধতি চালু করা হয়। ঢাকার বিশৃঙ্খল বাস রুট সুশৃঙ্খল করতে ২০১৫ সালে রেশনালাইজেশন বা রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির উদ্যোগ নেয়া হয়। ১১ বছরেও তা চালু করা যায়নি পরিবহন মালিক শ্রমিকদের বিরোধিতায়। ২০২১ সালে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে যাত্রাবাড়ীর সাইনবোর্ড পর্যন্ত রুটে কোম্পানিভিত্তিক চালু হলেও, তা বন্ধ হয়ে যায় লোকসানে। ঢাকায় অনুমোদিত রুটের সংখ্যা ৪১৮। এরমধ্যে ৯৮টি সক্রিয় রয়েছে। একই রুটে ৮-১০টি কোম্পানির বাস চলে। ফলে বাসে বাসে প্রতিযোগিতায় যানজট, সড়ক দখল এবং বিশৃঙ্খলা হয়। তাই রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে রুটের সংখ্যা কমিয়ে ৩২টি করা হচ্ছে। গত ৮ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা থেকে নির্দেশনা দেয়া হয় ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালু করতে হবে।
ঢাকার বিভিন্ন পরিবহনের হাব বিমানবন্দর এলাকা। পুরো রাজধানীসহ আন্তঃজেলার বাসগুলো যাত্রী নেয়ার জন্য অপেক্ষা করে এই এলাকায়। মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকায় সরজমিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পিপিবি সিটি সার্ভিস ও ভিআইপি সিটি পরিবহনের সবগুলো বাসই এখান থেকে যাত্রী তোলার জন্য ডাকাডাকি করছে। বিমানবন্দরের সামনের সড়কে অন্তত ৫ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষা করছে বাসগুলো।
বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভিআইপি সিটি পরিবহনের একটি বাসে চড়ে ফার্মগেট আসতে আসতে দেখা যায়, বাসটি বিমানবন্দরের একাধিক জায়গায় থেমেছে যাত্রী তুলতে। ইতিমধ্যেই বাসের সব আসন ভর্তি হয়ে গেছে। এর বাইরেও যাত্রীদের ভিড়ে দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না বাসে। বাসটি ফার্মগেট এলাকায় আসতেই দেখা যায় ৭/৮ জন যাত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গে আরও আন্তত ১৫ জন যাত্রী উঠলো বাসে। ওই বাসের চালক বলেন, ‘আমরা নিজেরাও চাচ্ছি বাসে টিকিট সিস্টেম চালু হোক। এটা করলে ভাড়া নিয়ে আমাদের বাকবিতণ্ডায় জড়াতে হয় না। অথচ মালিকরা এটা করছে না। কারণ এটা করলে তাদের খরচ বাড়বে। লোকবল বেশি লাগবে। এটা করেনি বলে আমাদের অনেক গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। গাড়ি কম এখন। আরও কিছু গাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে।’
এদিকে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের মালিক-সহকারীরা বলেন, আপাতত ওয়েবিল সিস্টেমেই চলবে। টিকিটিং ও কাউন্টারভিত্তিক যাত্রী তোলার সিস্টেমে আসতে সময়ে লাগবে। মালিক পক্ষ থেকেও তেমন জোর করা হচ্ছে না নিয়মনীতি নিয়ে। ফলে যত্রতত্র যাত্রী তোলা থেকে শুরু করে আগের কায়দায়ই চলছে গণপরিবহন।
বিমানবন্দর এলাকায় পিপিবি সিটি সার্ভিসের একটি বাসের হেল্পার মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, কোম্পানির আওতায় ঠিক আছে। কিন্তু চালু হয়নি এখনো। আমাদের কিছু এখনো বলেনি। বিমানবন্দর এলাকায় ভিআইপি সিটি পরিবহনের চেকার শামিম বলেন, সব জায়গায় আপাতত ওয়েবিল সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। দশ টাকা থেকে ৫০ টাকা প্রতি চেকের মাঝে। এরপর ধীরে ধীরে টিকিটিং সিস্টেমে যাবে হয়তো। এভাবে সব কোম্পানির বাসই ওয়েবিলের আওতায় আসবে। রুবেল নামের পিপিবি সিটির আরেক সহকারী বলেন, আপাতত ওয়েবিল সিস্টেমে চলছে। টিকিটিং সিস্টেম চালু করলে তো সব জায়গা থেকে যাত্রী নেয়া সম্ভব হবে না।
রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যক্রমের তদারক প্রতিষ্ঠান ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ)। নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান (বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত) বলেন, চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হিসেবে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস চালু হয়েছে। নতুন উদ্যোগের বিরোধিতায় যারা সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান বিশ্বাস শিমুল বলেন, বাকি ২৬টি রুটে এই সময়ের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা হবে। প্রত্যেক রুটের বাসের রং হবে আলাদ। কায়েমি শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়ায় অতীতের সরকারগুলো চাইলেও কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা যায়নি।
কোন রুটে কোন বাস?
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিববাড়ী-গাজীপুর থেকে আজিমপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির (ভায়া টঙ্গী-উত্তরা-এয়ারপোর্ট-মহাখালী-সায়েন্সল্যাব-নিউ মার্কেট) রুটে চলবে ভিআইপি সিটি পরিবহনের ২৫৩টি বাস। টঙ্গী থেকে আজিমপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির (ভায়া উত্তরা-এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেসওয়ে-ফার্মগেট-সায়েন্সল্যাব) রুটের ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে চলবে ঢাকা চাকা (এসি বাস) সিটি পরিবহন। মিরপুর-চিড়িয়াখানা থেকে চুনকুটিয়া-কেরানীগঞ্জ (ভায়া টেকনিক্যাল-শ্যামলী-সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ-প্রেস ক্লাব-বাবুবাজার ব্রিজ) রুটের ২৩ কিলোমিটার দূরত্বে চলবে চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহন (দিশারী, তানজিল, মেট্রো লিংক)। এই রুটের বাস সংখ্যা ১৩৩টি। ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার (ভায়া সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ-মালিবাগ-রামপুরা ব্রিজ-বনশ্রী) রুটে চলবে রমজান আলী সিটি পরিবহন (রমজান পরিবহন)। ঘাটারচর থেকে চিটাগাং রোড-কাঁচপুর (ভায়া সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ-প্রেস ক্লাব-গুলিস্তান-হানিফ ফ্লাইওভার-সাইনবোর্ড) রুটে চলবে থ্রি স্টার সিটি পরিবহন (রজনীগন্ধ্যা, মালঞ্চ, সময়)। ঘাটারচর থেকে আব্দুল্লাহপুর ধউর (ভায়া আসাদগেট-শ্যামলী-মিরপুর-১০-কালশী-কুড়িল বিশ্বরোড-এয়ারপোর্ট) রুটে পিপিবি সিটি পরিবহন (প্রজাপতি, পরিস্থান, বিকাশ) এবং মিরপুর-১ আনসার ক্যাম্প থেকে কাকলী-বনানী (সার্কুলার, ভায়া মিরপুর-১০, কচুক্ষেত, মহাখালী, আগারগাঁও, শ্যামলী) অংশে ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস (এসি বাস) চলবে।
