১৩ বছরের কিশোর নীরব। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার স্থানীয় একটি স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তায় আসতেই বেপরোয়া গতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এই যন্ত্রদানবের নিচে পড়ে নীরব। পথচারীরা এসে উদ্ধার করলেও চাপ লেগে ভেঙে যায় নীরবের হাত। দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আনা হয় শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের জরুরি বিভাগে (পঙ্গু হাসপাতাল)। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নীরবের হাতের হাড় ভেঙে গেছে। অস্ত্রোপচার করতে হবে। আর ক’দিন পরই তার বার্ষিক পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষার আগে হাত ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এই কিশোর। নীরবের মতো অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই পঙ্গু হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১৫ই অক্টোবর থেকে ৫ই নভেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত ব্যাটারি-চালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪০৯ জন। শুধু বেপরোয়া এই বাহনটির দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৮ জনের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন এই হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে।
নীরবের চাচা মিলন মিয়া বলেন, ‘বাড়ি থেইকা বাইর হওয়ার একটু পর শুনি নীরবের এক্সিডেন্ট হইছে। হাতে ব্যাথা পাইছে দেইখা প্রথমে কাছের একটা হাসপাতালে নিয়া গেছি। এরপর এখানে (পঙ্গু হাসপাতালে) নিয়া আসলাম।’
নীরবের পাশে বসে কাঁদছিলেন তার মা। তিনি বলেন, কয়দিন আমার ছেলের ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠার পরীক্ষা। আজকে সকালে দোকানে গেছিল ও (নীরব)। বাড়ি থেকে বের হওয়ার একটু পর শুনি ওর (নীরবের) উপর একটা অটোরিকশা পইড়া গেছে। বাম হাত ভাইঙা গেছে। ডাক্তার বলছে অপারেশন করা লাগবো।‘
এদিন দুপুরে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন ২৯ বছর বয়সী বাসের হেল্পার নবী উল্লাহ। জরুরি বিভাগে বসে তিনি বলেন, নিচে নাইমা যাত্রী ডাকতাছিলাম। তহন উল্টা দিক থেইকা একটা অটোরিকশা আইসা আমারে ধাক্কা মারসে। উইঠা দেহি হাত-পাও থেইকা রক্ত বাইর হইতাসে।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে অহরহ ঘটতে থাকা দুর্ঘটনার কারণে রোগীদের বাড়তি চাপের কথা উল্লেখ করে, এই বাহনের লাগামহীন চলাচল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘পঙ্গু হাসপাতাল বাংলাদেশে ট্রমা, অর্থোপেডিকস, এক্সিডেন্টাল ইনজুরির জন্য সেন্টার অব এক্সিলেন্স। সারা দেশ থেকে এখানে রোগী আসতে থাকে। এ অবস্থায় অন্যান্য এক্সিডেন্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাটারি-চালিত অটোরিকশার এক্সিডেন্ট। এই এক্সিডেন্ট কমানো গেলে অন্তত ৮ থেকে ১০ শতাংশ পেশেন্ট কমে যাবে।’
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান আরও বলেন, ‘অটোরিকশার দুর্ঘটনা একটা বারডেন। আমাদের ভেবে দেখা দরকার এই বাহন আমাদের কতটা প্রয়োজন। লাগামহীনভাবে এই যান চলতে থাকলে এক্সিডেন্ট আরও বাড়বে। এতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পঙ্গু হাসপাতালের জন্য অতিরিক্ত চাপ বলে আমি মনে করি।’
