দেশের প্রধানমন্ত্রীর- দেশবাসীর উপকারে পুষ্টি ও আর্থিক উন্নয়নের কার্যক্রম হলো এই ২৫ কোটি বৃক্ষ চারা রোপণ প্রকল্প। কার্যক্রমটির প্রযুক্তি ও নীতিমালা প্রণয়ন করে সে অনুসারে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নার্সারি স্থাপন, চারা খরচ, পরিচর্যা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় শুরু হয়েছে, চলবে আরও প্রায় ৪.৫ বছর। আয় ও উপকার আসতে শুরু করবে প্রতিটি চারা রোপণের অন্তত ৪-৭ বছর পর, যদি উদ্দেশ্যভিত্তিক কাঙ্ক্ষিত বিশুদ্ধ জাতের ও সুষ্ঠুমানের চারা যথানিয়মে রোপণ ও পরিচর্যা করা হয়ে থাকে। বিশ্বে বৃক্ষরোপণের ঐতিহ্য অত্যন্ত সুপ্রাচীন। রাজা নেবুচাঁদনেজার রানী স্ত্রী আমাইটিসকে খুশি রাখতে বাড়িতে বন্য পরিবেশ তৈরির জন্য বৃক্ষরোপণ করেছিলেন, অবশ্য যার বাস্তবতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রকৃতিপ্রেমী মহাসম্রাট আকবর ১৫৮০ দশকে বিহারের দ্বারভাংগায় লক্ষ আম গাছের একটি লক্ষীবাগ বা লাখাবাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরই অনুপ্রেরণায় পশ্চিমবঙ্গের মালদাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচুর আম বাগান সৃজিত হয়। এরই অনুপ্রেরণায় রিলায়েন্স মালিক আম্বানি গুজরাটের জামনগরে ধীরুভাই আম্বানি নামে লক্ষীবাগ প্রতিষ্ঠা করেন। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অনুরূপ ৫ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ৩.৫৭ কোটি চারা রোপণের রিপোর্ট সংগ্রহ করা গেছে। সঙ্গে আছে স্কুলশিক্ষার্থী কার্যক্রমে রোপণ করা আরও আরও চারা। এই বৃক্ষরোপণ বিশেষ তাৎপর্যবহ বলে এই প্রবন্ধে প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য কৃষিবিদ হিসেবে কয়েকটি সুপারিশ উল্লেখ করলাম। এখানে উল্লেখ্য যে, দেশে জমির সীমাবদ্ধতার কারণে খাদ্য নিরাপত্তার অনুকূলে পুষ্টি সম্পুরক ফসল পদ্ধতি অগ্রাধিকারের দাবি রাখে।
প্রজাতির কৌলিক বিশুদ্ধতা যাচাই: যেমন গাছ তেমন ফল। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, যীশুখ্রিষ্টের বাণী- বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয়, সে দর্শন মানতে হবে। ফল দেখে গাছের পরিচয় জানতে হবে। শেখ সাদী বয়ান করেছেন- আক্কেবদ গোর্গ জাদেহ... পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
ভাবার্থ: “মানুষের সঙ্গে পালিত পশুটি বন্য-অজানা হলে তা সময়মতো ঠিকই নিজের রূপ গ্রহণ করবে যা মালিকের জন্য নেতিবাচকও হতে পারে। যেমন বারি ১৩ জাত বলে লাগানো চারা থেকে ৪-৫ বছর পর বেরিয়ে এলো আনলাকি টক কম লাভজনক হোংজো আম।
আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ রয়েছে যে ‘কাকের বাসায় কোকিল ছাও (বাচ্চা), জাত বুঝে করে রাও (বুলি)”। লাগানো হলো বারি ১১ আম আর সেই গাছ থেকে ৪-৫ বছর পর বেরিয়ে এলো নাবী ছোট টক রূপালী আম। অর্থাৎ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হলো। এমনটা আমরা কেউ না চাইলে অবশ্যই সঠিক জাতের চারা রোপণ করতে হবে।
১. তাই এখানে উদাহরণ হিসেবে আমের অতি জনপ্রিয় ৩০-৩৫টি জাতের সচিত্র বর্ণনা ও কাঙ্ক্ষিত চারার নকল সম্ভাব্য সুযোগ তুলে ধরা হলো; যা মানলে ক্রেতা সাধারণ উপকৃত হবেন। বর্তমানে দেশের ফল-মসলা-বৃক্ষের বাণিজ্যিক চারার জাত বিশুদ্ধতা ও ফলন ক্ষমতা নার্সারিভেদে ৩৫ ভাগের কম। নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশে বর্তমানে ইউটিউবে এআই প্রযুক্তির বিজ্ঞাপনে দেশি-বিদেশি উৎসের চারা ৬০-৭০% পর্যন্ত প্রতারণা চলছে, যা দূর করতে হবে।
২. ছাদ বাগান: ফল-মসলা জাত প্রাধান্য পাবে। ঢাকা শহরেই বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার একরের সমপরিমাণ বাগানোপযোগী ছাদ রয়েছে। এতে ছোট-বড় গড়েপ্রতি গাছে গড়ে ৪৫ বর্গফুট স্থান হিসেবে প্রায় ১ কোটির বেশি চারা তৈরি ও চারা রোপণ সম্ভব।
৩. কৃষি পরিবেশভেদে বৃক্ষ জাত নির্বাচন: বাংলাদেশে কৃষি পরিবেশ অঞ্চল বিবেচনা করে আগাম, মাঝারি, নাবী ও বারোমাসি ফল-মসলা বৃক্ষজাত নির্বাচন করা যায়।
৪. স্থানীয় ও মাল্টিপারপাস ফলজবৃক্ষের প্রাধান্য: এর অগ্রাধিকারে থাকতে পারে দেশের খাপ খাওয়া স্থানীয় উন্নত শতাধিক জাত।
আম ছাড়াও দেশে পেয়ারা, সাইট্রাস, লিচু, কাঁঠাল, আঙ্গুর, ড্রাগন ফ্রুট, নারিকেল, খেজুর, কুল, কমলা, লেবু, মাল্টা, সুপারি, জাম্বুরাসহ প্রায় ৩০টি ফলের ২-৩ শতটি আসল জাতের সঙ্গে কয়েকগুণ বেশি মেনিপুলেটেড জাত বিপণন করা হতে পারে, যে সুযোগ দূর করতে হবে।
৫. চারা-সার প্যাকেজ: সঠিক পরিচর্যা, প্রক্রিয়াকরণ, অর্থায়ন ও বিপণন: এত আছে বিশেষ করে সার প্রয়োগ, বালাইদমন, প্রণোদনা ও যৌথ বিপণন। এর সঙ্গে প্রতিটি হাইব্রিড গাছের জন্য উন্নতমানের জৈব সার ও সুষম এনপিকেসহ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সারের ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে ভুল জাতের চারা রোপণ করলে ৫-৬ বছর পর দেখা যাবে যে রোপণ করা গাছটি কাঙ্ক্ষিত নয় তখন গাছটি কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ কার্যক্রমটি বিফলে গেল। প্রযুক্তিটির প্রতি আস্থা বিনষ্ট হলো।
দেশের সবাই কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার আশায় থাকবে। তবে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে যত্নবান থাকার উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে এখানে কয়েকটি সুপারি উল্লেখ করা হলো।
১. দেশে কোয়ালিটি প্ল্যান্টিং ম্যাটেরিয়েল বিধিমালার সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে।
২. চারার উৎসসহ গ্যারেন্টেড নাম ট্র্যাগসহ কোম্পানির মেমো দিয়ে বিক্রি করতে হবে।
৩. উপকরণ ব্যবসায়ী হিসেবে প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাগণ নার্সারি স্থাপনে অগ্রাধিকার পাবেন।
৪. নার্সারির ল্যাবেরেটরি ও বেচাকেনার ডকুমেন্ট সংশ্লিষ্ট উপসহকারী/কৃষি কর্মকর্তাসহ পরিবেশক ডিলার নিয়মিত পরিদর্শন করে স্বাক্ষর করবেন।
৫. স্বাক্ষরিত প্রধান প্রধান গাছের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ছাপানো এলবাম ক্রেতার দেখার জন্য নার্সারিতে প্রদর্শন করতে হবে।
৬. প্রতিটি চারার মূল্যের সঙ্গে রোপণগর্তে প্রদেয় সার + প্রথম বছরের কিস্তি সার প্যাকেজ মূল্য যোগ করে দিতে হবে।
৭. কার্যক্রম বাস্তবায়নের সকল পর্যায়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি উপকরণ সমিতির পরামর্শ বিবেচনায় নিতে হবে।
লেখক: প্রফেসর ড. মো. সদরুল আমিন
