সামুদ্রিক জলপথে চীনের ব্যাপক আনাগোনা, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র

এনডিটিভির রিপোর্ট

সামুদ্রিক জলপথে চীনের ব্যাপক আনাগোনা, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র

ফন্ট সাইজ:

সামুদ্রিক জলপথে বিচরণ বাড়িয়েছে চীন। দেশটির নৌবাহিনী এখন আর নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়ার ব্যস্ততম নৌপথগুলোতে প্রতিদিন তাদের প্রায় ১০০টি জাহাজ টহল দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে জাপান ও তাইওয়ানের কাছের জলসীমায় তাদের উপস্থিতি বেড়েছে। বেইজিংয়ের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের কাছে বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। তাদের নৌবহর এমন দ্রুতগতিতে বাড়ছে যে ওয়াশিংটনের পক্ষে তার সাথে পাল্লা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, চীনের নৌবাহিনীতে এখন ৪০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এটি মার্কিন নৌবহরের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। চীন বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করছে এবং চতুর্থটি নির্মাণ করছে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন এই রণতরিটি পারমাণবিক শক্তিচালিত হতে পারে। আধুনিক ইতিহাসে শান্তিকালীন সময়ে এটি অন্যতম বৃহৎ নৌ সম্প্রসারণ।

চীনের যুদ্ধজাহাজগুলো এখন বিশাল জলসীমায় টহল দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান, ফিলিপাইনের পূর্ব দিক এবং জাপানের দক্ষিণ উপকূলে তারা নিয়মিত টহল দেয়। এমনকি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং এডেন উপসাগরেও নিয়মিত চীনা জাহাজ টহল দেয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, তাইওয়ানের চারপাশে অন্তত ছয়টি চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ থাকে সর্বদা নিয়োজিত থাকে এবং সামরিক মহড়ার সময় এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের উপস্থিতি এর চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেশি। ওই অঞ্চলে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সাথে চীনের সীমানা বিরোধ রয়েছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য শুধু জাহাজ বাড়ানো নয়, বরং নিজেদের উপকূলীয় জলসীমা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে নিজেদের দাবি জোরালো করা। এছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে সেখানে মার্কিন বাহিনীর হস্তক্ষেপ ঠেকানোও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

সমুদ্রে চীনের এই উত্থানের পেছনে তাদের বিশাল জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বড় ভূমিকা রয়েছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ নির্মাণকারী দেশ। বর্তমানে দেশটি প্রতি বছর বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি করে। এখন সেই একই শিল্প সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তারা দ্রুতগতিতে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের মূল কারিগর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০১৩ সালে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের জানান, চীনকে একটি মহান সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হতে হবে। তিনি ১৫ শতকের চীনা নৌ-সেনাপতি ঝেং হে-এর সমুদ্রযাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যার নৌবহর হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। চীন একসময় সমুদ্রযাত্রা থেকে সরে এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। শি জিনপিং ১৯ শতকের আফিম যুদ্ধের কথাও স্মরণ করেন, যখন পশ্চিমা শক্তিগুলো সমুদ্রপথে চীনে হামলা চালিয়েছিল।

সবদিক বিবেচনায় চীনের নৌবাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে আছে। অর্থাৎ মার্কিন জাহাজগুলো গড়ে আকারে বড়। তবে বেইজিং এখন অনেক দ্রুত বড় জাহাজ তৈরি করছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত চীন ৭১টি বড় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৯টি যুক্ত হয়েছে শুধু গত বছরই। এই সম্প্রসারণের বড় অংশই দেখা যাচ্ছে সাংহাইয়ের কাছের চাংক্সিং দ্বীপে। সেখানকার দুটি জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ তৈরি হচ্ছে। গত মে মাসের স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ দেখা যায়। ২০২৩ সালে তারা সিচুয়ান নামের ৪০ হাজার টনের একটি বিশাল উভচর আক্রমণকারী জাহাজ তৈরি করে, যাকে ড্রোন ক্যারিয়ার বলা হচ্ছে। এছাড়া চলতি বছরের জুনে চাংক্সিং দ্বীপের জিয়াংনান শিপইয়ার্ডে একটি নতুন পারমাণবিক সাবমেরিন দেখা যায়। চীন এখন ডিজেল-ইলেকট্রিকের বদলে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০৪০ সালের মধ্যে চীনা সাবমেরিনগুলো ভারত মহাসাগর এবং আর্কটিক অঞ্চলে নিয়মিত টহল দেবে।

এই ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে পীত সাগর থেকে শুরু করে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত জলসীমা। চীন বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পাশাপাশি তারা তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কঠিন করে তোলার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায় এই অঞ্চলে চীনের সামরিক আধিপত্য ঠেকাতে। সামরিক কৌশলবিদদের মতে, জাপান, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনকে নিয়ে গঠিত ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ বা প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলা রক্ষা করা পেন্টাগনের প্রধান কৌশল। কিন্তু বেইজিং এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত বাড়াচ্ছে। তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো এখন বড় বড় দলে বিভক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যা তাদের প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করছে।