নিজ ভুলেই কুপোকাত ট্রাম্প

নিজ ভুলেই কুপোকাত ট্রাম্প

ফন্ট সাইজ:

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পুরো বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের মিত্রদেশগুলোকে শত্রুতে পরিণত করেছেন। বিশ্বের ডজন ডজন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী কানাডাকে বারবার দখলের হুমকি দিয়েছেন। নিজেদের স্বার্থ হাসিল না হলে অন্য দেশের নেতাদের অপদস্থ করতেও পিছপা হননি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বকে ভুগিয়েছে ইরান যুদ্ধ।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে শুধু নিজ দেশের নাগরিকদের জ্বালানি ব্যয়ই বাড়াননি, বিশ্বের বহু দেশকেও এর খেসারত দিতে বাধ্য করেছেন। গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির পর ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, এই পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা রয়েছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্পের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, আমেরিকাকে বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না। কিন্তু ইরান যুদ্ধ তার প্রশাসনের নীতির অংশ হয়ে ওঠার পর এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনে। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। বিরোধী ডেমোক্রেটদের অভাবনীয় নীল জোয়ারে যেন ভেসে গেছে রিপাবলিকানরা।

কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ-উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ট্রাম্পকে তার মেয়াদের শেষ দুই বছরে নতুন এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে ডেমোক্রেটরা। দ্য গার্ডিয়ান এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের এই বিপুল বিজয়ের কৃতিত্ব দলের কোনো নির্দিষ্ট অংশের নয়, বরং পুরো দলের। প্রতিবেদনের ভাষায়, এবারের নির্বাচনে জয়ের জন্য ডেমোক্রেটদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা ছিল একটাই-তারা রিপাবলিকান নয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শপথ নেয়ার পর থেকে ট্রাম্পের একের পর এক সিদ্ধান্ত বিশ্বকে কাঁপিয়েছে। বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে নেমেছে ধস। সময় যত গড়িয়েছে, ততই তার ওপর অসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে বিশ্বের বহু দেশসহ নিজ দলের সমর্থকদের মধ্যেও। এবারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজেই ডেমোক্রেটদের হাতে রাজনৈতিক সুযোগ তুলে দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত অজনপ্রিয় যুদ্ধ, যার প্রভাবে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এ ছাড়া তার বিশৃঙ্খল শুল্কনীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের বিপাকে ফেলেছে।

রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন ভোটারদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখেছেন। তাদের অনেকেই মনে করেছেন, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পের নীতিই দায়ী। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট, অভিবাসীদের বিতাড়নের কঠোর পরিকল্পনা, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, দুর্নীতি এবং হোয়াইট হাউসের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার নিয়েও বিতর্ক ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপে ফেলেছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় ডেমোক্রেটরা। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের প্রতি ভোটারদের ব্যাপক প্রত্যাখ্যানের প্রতিফলন ছিল এই ফলাফল।

গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভোটাররা যে ‘ট্রাম্পবাদ’ আর সহ্য করতে পারছেন না, এবারের নির্বাচনী ফলাফল তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। এ ছাড়া বার্তা সংস্থা এপি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস ও জর্জিয়ার মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রভাবিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ডেমোক্রেটদের জয় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতিনির্ধারণী কর্মসূচির বিরুদ্ধে ভোটারদের বড় ধরনের প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এই বিজয় ডেমোক্রেটদের সামনে শুধু ক্ষমতার নতুন সুযোগই তৈরি করেনি, বরং ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষার মুখেও দাঁড় করিয়েছে। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক র‌্যাচেল লেইনগ্যাংয়ের মতে, এবার ভোটারদের একটি বড় অংশ হয়তো ডেমোক্রেটদের সব নীতির সঙ্গে একমত হয়ে ভোট দেননি। বরং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর ভোটারদের সমর্থন এক জায়গায় জড়ো করতে পারা। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, লাতিনো এবং তরুণ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সাফল্যে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বলছে, রিপাবলিকান শিবিরের সেই ঐক্যে ফাটল তৈরি হয়েছে।

ডেমোক্রেটদের সামনে চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে বড় জয় পেলেও ডেমোক্রেদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের রাজনৈতিক ও শাসনগত সক্ষমতা প্রমাণ করা। কারণ, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া আর ডেমোক্রেদের শাসনক্ষমতার ওপর আস্থা রাখা এক বিষয় নয়।

অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, করনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দলটির বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মধ্যপন্থিরা মধ্যবিত্ত ও স্বতন্ত্র ভোটারদের আকৃষ্ট করতে অপেক্ষাকৃত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চান। অন্যদিকে প্রগতিশীল অংশ আরও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে। নির্বাচনে দলের বিভিন্ন ধারার প্রার্থীদের জয় ইতিবাচক হলেও কংগ্রেসে নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ভোটারদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। ডেমোক্রেটরা ক্ষমতা ফিরে পেয়েও যদি জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে কিংবা প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে এই বিজয়ের রাজনৈতিক সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া ডেমোক্রেটদের জন্য দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তার দায় তাদের ওপরও বর্তাতে পারে।

অর্থনীতির দুরবস্থার জন্য ডেমোক্রেটদের দায়ী করার সুযোগও পাবেন ট্রাম্প। অর্থাৎ, এখন থেকে শুধু বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলেই চলবে না, বিকল্প নীতির কার্যকারিতাও প্রমাণ করতে হবে ডেমোক্রেটদের।
বিজয়ের উচ্ছ্বাস কাটলেই দলটির সামনে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা হাজির হবে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ভোটারদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার মতো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে না। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে থাকবে কংগ্রেসে পাস হওয়া বিল আটকে দেয়ার ভেটো ক্ষমতা।

বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে ডেমোক্রেটদেরও বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে উদাহরণ হয়ে থাকবেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

দুজনের আমলেই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে। ডেমোক্রেটরা এই সমস্যার সমাধান করতে না পারলে মাত্র দুই বছর পর পরবর্তী নির্বাচনে তারাও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন।