নিজ দেশে নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা প্রাণনাশের আশঙ্কা থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। চেয়েছিলেন একটু নিরাপদ জীবন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাতেও এবার গুনতে হবে প্রায় ২ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার। ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিল করতে আবেদন জমা দেওয়ার সময়ই পরিশোধ করতে হবে ১ হাজার ৮৬৩ ডলার ৫০ সেন্ট।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রোটেকশন ভিসা বা সুরক্ষা ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান কিংবা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইবুনাল-এ পর্যালোচনার আবেদনে নতুন এই ফি ব্যবস্থা গত ১ নভেম্বর কার্যকর করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। এর আগে সাধারণত আপিলের ফল আবেদনকারীর বিপক্ষে গেলে ফি পরিশোধ করতে হতো। নতুন নিয়মে আবেদন জমা দেওয়ার সময়ই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতোমধ্যে নিজেদের ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শরণার্থী সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান—অ্যাসাইলাম সিকার রিসোর্স সেন্টার, রেফিউজি অ্যাডভাইস অ্যান্ড কেইসওয়ার্ক সার্ভিস এবং রেফিউজি কাউন্সিল অফ অস্ট্রেলিয়া । অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল আশ্রয়প্রার্থীরা শুধু অর্থের অভাবেই নিজেদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগ হারাতে পারেন বলে তাদের বক্তব্যে উঠে আসে।
নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে তাদের ওপর, যাদের অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী কোনো আয় নেই, পর্যাপ্ত সঞ্চয় নেই কিংবা পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। অনেক আশ্রয়প্রার্থী নিজ দেশে রাজনৈতিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন। তাদের কারও কারও জীবন ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুতি, মানসিক ট্রমা ও আর্থিক অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সাধারণত ২৮ দিনের আপিলসীমার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮৬৪ ডলার জোগাড় করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে আইনজীবী নিয়োগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ এবং জটিল আইনি আবেদন প্রস্তুতের ব্যয়।
নিরাপত্তা চাওয়ার পথে নতুন বাধা তৈরি হচ্ছে
রেফিউজি কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়া ১ নভেম্বর নিজেদের ওয়েবসাইটে ‘নতুন সুরক্ষা ভিসা-সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো নিরাপত্তার আশায় থাকা মানুষের জন্য আরও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার ঝুঁকি তৈরি করছে’ শিরোনামে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করে।
সংস্থাটি নতুন প্রোটেকশন ভিসা ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, এসব পদক্ষেপ নিরাপত্তার সন্ধানে থাকা মানুষের জন্য আরও বাধা তৈরি করতে পারে।
সংস্থাটির কো-সিইও আদামা কামারার বক্তব্যের মূল উদ্বেগ, অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য না থাকার কারণে কাউকে স্বাধীনভাবে আপিল করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
সংস্থাটি আরও বলেছে, অনেক আশ্রয়প্রার্থী ইতোমধ্যে খাদ্য, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছ থেকে আপিলের শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হলে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
সংস্থাটির মতে, গত বছর এআরটি-তে পর্যালোচনার পর ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এটি দেখায়, স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত ও কার্যকর আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
