মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সামনে এসেছে এক নতুন বাস্তবতা। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ব্যবহার করছে ইরান। এতেই কঠিন চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। ইরানের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় এখন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও আর্থিক স্থাপনাগুলো বারবার টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই ড্রোন যুদ্ধ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক শক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকেই সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে কয়েক হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশই ইরানের তৈরি শাহেদ সিরিজের আক্রমণাত্মক ড্রোন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ড্রোনগুলো তুলনামূলক সস্তা, সহজে তৈরি করা যায় এবং ঝাঁক বেঁধে হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে। ফলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক সময় এগুলো ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইরানের লাগাতার ড্রোন হামলা মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর চাপ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি এখন এই ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। কুয়েতে একটি মার্কিন অপারেশন সেন্টারে ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং একাধিক সামরিক ঘাঁটিও টার্গেট করা হয়। সৌদি আরবেও ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস ও একটি গোয়েন্দা স্থাপনায় ড্রোন আঘাত হানে যুদ্ধের শুরুতেই। এখনো সৌদি আরবে ড্রোন পাঠাচ্ছে ইরান। প্রতিদিনই দেশটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করছে। একই সঙ্গে রাস তানুরা তেল শোধনাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরের কাছে মার্কিন বাহিনীর একটি অপারেশনাল সাইটেও একমুখী হামলাকারী ড্রোন আঘাত হানে, যাতে কয়েকজন নিহত ও বহুজন আহত হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি লজিস্টিক ও সহায়ক স্থাপনাগুলোও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শুধু সামরিক ঘাঁটিই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্থাপনাও হামলার আওতায় এসেছে। ওমানের বন্দর ও তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া ইরানপন্থি মিলিশিয়ারা ইরাকের এরবিলসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ও পশ্চিমা বাহিনীর ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষতি করা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তোলা।
মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও, ড্রোনের সংখ্যা এত বেশি যে সবগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কখনো ধ্বংসাবশেষ পড়ে শহরে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, আবার কখনো সরাসরি হামলার ঘটনাও ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত প্রমাণ করে দিয়েছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোনের সামনে প্রচলিত সামরিক শক্তি অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত তাই শুধু আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এটি একই সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতারও একটি বড় পরীক্ষা। যুদ্ধ কতোদিন চলবে বা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইরাকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত: ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন বিমান বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমান কেসি-১৩৫ বিধ্বস্তে চারজন ক্রু নিহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সেন্টকম জানায়, বৃহস্পতিবার বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্তের সময় বিমানে মোট ছয়জন ক্রু সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাকিদের উদ্ধারে এখনো তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে নিজেদের ১১ জন সৈন্য নিহতের কথা স্বীকার করলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির দাবি বিমানটি কোনো ধরনের আক্রমণের শিকার হয়নি। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। নিহতদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী স্বজনদের অবহিত করার ২৪ ঘণ্টা পর তাদের নাম জনসমক্ষে আনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র একে দুর্ঘটনা হিসেবে অভিহিত করলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিন্ন দাবি করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে সক্রিয় তাদের একটি মিত্র গোষ্ঠী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি ভূপাতিত করেছে। উল্লেখ্য, যে এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানে ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
দুবাইয়ের মার্কিন আর্থিক জোনে ড্রোন হামলা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার (ডিআইএফসি) এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। শুক্রবার শহরের কেন্দ্রস্থলে ঘন ধোঁয়া দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ডিআইএফসি এলাকার লিবার্টি হাউস ভবনের কাছাকাছি একটি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই এলাকা বহু মার্কিন ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কার্যালয়ের জন্য পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অঞ্চল। দুবাই সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোনটি সফলভাবে প্রতিহত করা হয়। তবে ড্রোন ধ্বংসের পর এর ধ্বংসাবশেষ শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি ভবনের সম্মুখভাগে পড়ে সামান্য ক্ষতির ঘটনা ঘটে। বিবৃতিতে বলা হয়, সফলভাবে প্রতিহত করা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি ভবনের সম্মুখভাগে পড়ে সামান্য ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
