বাংলাদেশে সীসার সংস্পর্শ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সীসা বিষক্রিয়ার পরিস্থিতি দিনের পর দিন আরও গুরুতর হচ্ছে। এটি সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। লেড-ক্রোমেট একটি সীসাযুক্ত রাসায়নিক রঙ্গক, যা রং, কোটিং, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন রঙিন পণ্যে উজ্জ্বল হলুদ, কমলা ও লাল রং তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সীসার সংস্পর্শে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ফলে আইকিউ হ্রাস, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।
মঙ্গলবার পরিবেশ অধিদপ্তরে “Report on Trade of Lead Chromates: Bangladesh” শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বিনিময় ও প্রচার বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ইন্টারন্যাশনাল পলুট্যান্টস এলিমিনেশন নেটওয়ার্ক-এর সহযোগিতায় এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আন্তর্জাতিক সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনের মূল ফলাফল তুলে ধরা, বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং লেড-ক্রোমেট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে অংশীজনদের সুপারিশ সংগ্রহ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
এতে বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে সীসার সংস্পর্শ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। লেড-ক্রোমেট একটি সীসাযুক্ত রাসায়নিক রঙ্গক, যা রং, কোটিং, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন রঙিন পণ্যে উজ্জ্বল হলুদ, কমলা ও লাল রং তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সীসার সংস্পর্শে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ফলে আইকিউ হ্রাস, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।
বৈঠকে এসডোর পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েট ড. ফয়জুন নাহার আইপিইএন-এর সহযোগিতায় প্রস্তুতকৃত “বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেটের বাণিজ্য” শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে দেশের লেড-ক্রোমেটের আমদানি ও রপ্তানির ধরন, বাণিজ্যিক চর্চা এবং রঙসহ অন্যান্য পণ্যে লেড-ক্রোমেট ব্যবহারের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বিদ্যমান নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি বুঝতে এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদারে করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হবে।
পর্যবেক্ষণগুলো হলো-
১. বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেট রঙ্গক উৎপাদনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে রঙে ব্যবহৃত লেড-ক্রোমেট আমদানি করা হয়। পর্যালোচিত কোনো ডেটাসেটে বাংলাদেশকে রপ্তানিকারক হিসেবেও দেখা যায়নি।
২. লেড-ক্রোমেটের জন্য বাংলাদেশে আলাদা কোনো এইচএস কোড নেই। এটি এইচএস ৩২০৬২০ (ক্রোমিয়াম যৌগভিত্তিক রঙ্গক ও প্রস্তুতি)-এর আওতায় বাণিজ্য হয়, যেখানে সীসাবিহীন রঙ্গকও অন্তর্ভুক্ত। তাই বাণিজ্য-পরিসংখ্যান থেকে আমদানিকৃত লেড-ক্রোমেটের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানা যায় না। কিছু লেড-ক্রোমেট অন্য কোডের আওতায় তৈরি রঙ বা পিগমেন্ট পেস্টের মাধ্যমেও দেশে ঢুকতে পারে।
৩. ইউএন কমট্রেড-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এইচএস ৩২০৬২০ আমদানি ৫১.১% বেড়েছে। এ সময়ে আমদানি ৪২৭,৪৮১ কেজি (১.৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) থেকে বেড়ে প্রায় ৬৪৫,৮০০ কেজিতে (২.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) দাঁড়িয়েছে।
৪. ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ওজনের হিসাবে এইচএস ৩২০৬২০ আমদানির ৮৯.৯%-৯৩.০% সরবরাহ করেছে ভারত। এরপর রয়েছে চীন (৫.৭%-৯.০%)। কোরিয়া প্রজাতন্ত্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
৫. আমদানিকৃত লেড-ক্রোমেটের প্রধান ব্যবহার সম্ভবত রঙ শিল্পে। প্লাস্টিক রঙিনকরণে উল্লেখযোগ্য কোনো দেশীয় উৎপাদক চিহ্নিত হয়নি। ছোট রঙ-উৎপাদকেরা সাধারণত রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রঙ্গক কেনেন, ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল শনাক্ত করা কঠিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, সীসা বিষক্রিয়ার পরিস্থিতি দিনের পর দিন আরও গুরুতর হচ্ছে। আমাদের এটি সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এই সংক্রান্ত গবেষণার দিকে উৎসাহ দিতে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা দরকার। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে রাসায়নিকভাবে সীসা আরও অনেক বিষাক্ত মৌলের সঙ্গে জড়িত। তাই এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান বলেন, লেড-ক্রোমেট-সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের একটি বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ আমাদের প্রয়োজন। আমরা যদি আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে চাই, তাহলে বর্তমানে এই পরিস্থিতিতে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই সীসামুক্ত পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন) মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে সংকটটি কতটা বড় এবং এর সঙ্গে স্বাস্থ্যের কী কী ঝুঁকি জড়িত। আমাদের দেশে খোলা বাজারের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই বাজারকে সরকারের নজরদারির আওতায় আনা জরুরি, আর এটাই একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, পুরো ব্যবস্থাকে বাজার তদারকির আওতায় আনতে হবে এবং বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নারী ও শিশুরা এসব ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে কীভাবে আসছে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। শুধু খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে নয়, খাওয়া, শ্বাস নেয়া এবং ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমেও এই ঝুঁকি তৈরি হয়।
এসডো-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব ড. মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সীসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ বিকল্পের দিকে যেতে উৎসাহিত করতে আমাদের গ্রিন ট্যাক্সেশন-এর মতো পদক্ষেপ খতিয়ে দেখতে হবে। আমাদের ২০২৫ সালের গবেষণায় একটি উৎসাহজনক তথ্য পাওয়া গিয়েছে। ৯০ শতাংশ রঙ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই সীসার সীমা মেনে চলছিল। এটা থেকেই বোঝা যায়, সীসার সীমা মেনে চলা সম্ভব। এর মানে বাকি ১০ শতাংশও এই পরিবর্তনের পথে যেতে পারে।
এসডো-এর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সীসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশের ইতিমধ্যে একটি জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষী কর্মপরিকল্পনা আছে। এখন আমাদের দরকার এর কার্যকর বাস্তবায়ন। সীসার সংস্পর্শে আসার অনেক উৎসের মধ্যে লেড-ক্রোমেট একটি মাত্র। একে মোকাবিলা করতে হবে সীসাদূষণ নির্মূলের একটি বৃহত্তর ও সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য সীসা যে ঝুঁকি তৈরি করে, তা আমরা লুকাতে পারি না। বিভিন্ন পণ্যে সীসা মেশানোকে সঠিক বলে প্রমাণ করার মতো কোনো জৈবিক প্রয়োজন নেই, আগেও ছিল না।
বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের চিফ আর অ্যান্ড ডি অফিসার ড. এ এস এম ওবায়দুল্লাহ (তায়েব) মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ সীসামুক্ত রঙ শিল্পের দিকে এগোচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) জোরদার করা গেলে এই রূপান্তর আরও মসৃণ ও কার্যকর হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগম তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, রাসায়নিক সংক্রান্ত বিধিমালা খসড়া করা হচ্ছে। এখানে সীসাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রটারডাম কনভেনশনকে অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। অনুমোদন হয়ে গেলে এর ধারাগুলো আমাদের জন্য আইনত বাধ্যতামূলক হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা-
সীসার সংস্পর্শ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগ
স্টাফ রিপোর্টার
অনলাইন
১ ঘন্টা আগে
৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৭ঃ০৭ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
