মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচন এবার, ব্যয় কত?

মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচন এবার, ব্যয় কত?

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হিসেবে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। এবারে নির্বাচনী প্রচারণায় মোট ব্যয় ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছে নির্বাচনী অর্থায়ন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ওপেন সিক্রেটস।
দেশটির স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা থেকে ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে ভোটগ্রহণ চলছে, চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এ নির্বাচন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে বিপুল অর্থ ঢেলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে বাইরের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো থেকে। এসব সংগঠন সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাক নামে পরিচিত। তারা ব্যক্তি, করপোরেশন, শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কমিটির কাছ থেকে সীমাহীন অনুদান সংগ্রহ করতে পারে। যদিও এসব অর্থ সরাসরি কোনো প্রার্থীকে দেয়া যায় না, তবে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোসহ বিভিন্ন পরোক্ষ কাজে ব্যয় করা যায়।
শীর্ষ ব্যক্তিগত দাতাদের তালিকায় রয়েছেন ধনকুবের ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক। রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে তিনি প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। বিশেষ করে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য। টেক্সাসে মাস্কের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর রয়েছে।
নির্বাচনে কত অর্থ ব্যয়, কারা দিয়েছেন এবং কোথায় তা খরচ হয়েছে-এসব বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছে বিবিসি ভেরিফাই।

নির্বাচনী প্রচারণায় কত অর্থ ব্যয়?
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল ও পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির (প্যাক) প্রার্থীদের সরাসরি অর্থ দেয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তবে সুপার প্যাকগুলোর ক্ষেত্রে অনুদান গ্রহণে এমন কোনো সীমা নেই। ব্যক্তি থেকে শুরু করে করপোরেশন, শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কমিটি-সবাই এসব সংগঠনকে বিপুল অর্থ দিতে পারে।
ফেডারেল নির্বাচন কমিশন (এফইসি)-এর অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত জমা পড়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিমধ্যে ৯৫০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০ কোটি ডলারের মতো এসেছে প্যাক ও সুপার প্যাকগুলোর মাধ্যমে। গত কয়েক মাসে এসব সংগঠনের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও বাইরের সংগঠনগুলোকে এফইসির কাছে ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। তবে নির্বাচনের আগে এসব ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
এ কারণে অতীতের নির্বাচনী ব্যয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ওপেন সিক্রেটস ধারণা করছে, এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলার। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার তুলনায় এবার ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছেন?
উদারপন্থি গবেষণা সংস্থা ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত শীর্ষ ৪০ জন দাতা এবারের নির্বাচনে ২৪০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এ পর্যায়ে এটি একটি রেকর্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকেল বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয়ের ক্ষেত্রে একের পর এক রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। আর এই অর্থের বড় অংশ আসছে সবচেয়ে ধনী দাতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে। ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও প্যাক ও সুপার প্যাকে অনুদান দিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ধনকুবের বিনিয়োগকারী জর্জ সোরোসের প্রতিষ্ঠিত জিওসর কর্প ও ফান্ড ফর পলিসি রিফর্ম উদারপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার দিয়েছে।

সোরোসের বাইরে ডেমোক্রেটদের সবচেয়ে বড় দাতাদের একজন নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র ও ব্যবসায়ী মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি ৬ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জেফ ইয়াস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক রিচার্ড ও এলিজাবেথ উইলাইনসহ বেশ কয়েকজন ধনকুবের রিপাবলিকানদের বিভিন্ন খাতে ১০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। এফইসিতে জমা দেয়া নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তবে ব্যক্তিগত দাতাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছেন ইলন মাস্ক। অক্টোবর পর্যন্ত তার অনুদানের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

মাস্কের অর্থের বড় অংশ গেছে ২০২৪ সালে তার প্রতিষ্ঠিত সুপার প্যাক ‘আমেরিকা প্যাক’-এ। পাশাপাশি রিপাবলিকানদের সমর্থনে গঠিত ‘সিনেট লিডারশিপ ফান্ড’-এও অর্থ দিয়েছেন তিনি।
মাস্কের অর্থায়নের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে। সেখানে ডেমোক্রেট প্রার্থী জেমস টালারিকোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্যাক্সটন। টেক্সাসের নির্বাচনে আমেরিকা প্যাকের বিনিয়োগ ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া মিশিগান ও ওহাইওর সিনেট নির্বাচনেও প্রায় ১ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ করেছে সংগঠনটি।
ওপেন সিক্রেটসের ব্রেন্ডান জে গ্লাভিন বলেন, এবারের নির্বাচনী অর্থায়নে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলোরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তার ভাষ্য, রিপল ও কয়েনবেস সম্মিলিতভাবে ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিয়েছে। এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে ক্রিপ্টো শিল্পের স্বার্থ তুলে ধরা সুপার প্যাকগুলোর প্রচারণায়।

নির্বাচনী অর্থ কোথায় ব্যয় হলো?
ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ ব্যয় করে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলো। মাঠপর্যায়ে প্রচারণার জন্য কর্মী নিয়োগ, সমাবেশ ও অন্যান্য প্রচারমূলক আয়োজন, এমনকি অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপ পরিচালনাতেও অর্থ খরচ হয়।
তবে নির্বাচনী তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হয়েছে বিজ্ঞাপনে, বিশেষ করে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে। বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনী চক্রে বিজ্ঞাপনের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার।
মাইকেল বেকেল বলেন, প্রচলিত সম্প্রচার টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ পাচ্ছে। তবে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের পেছনে ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

অ্যাডইমপ্যাক্টের পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হয়েছে মিশিগান, টেক্সাস ও ওহাইওর সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এরপর রয়েছে আইওয়া ও মেইন অঙ্গরাজ্য।
এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর অর্থের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।