বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ না হওয়ায় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি: ট্রাইব্যুনালে সালমান এফ রহমান

বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ না হওয়ায় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি: ট্রাইব্যুনালে সালমান এফ রহমান

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় ১৩তম প্রসিকিউশন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এদিন ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে আবেদনের প্রসঙ্গটি নিজেই তুলে ধরেন সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে আবেদন করলেও ট্রাইব্যুনাল এখনও কোনো সিদ্ধান্ত না জানানোয় তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার উপস্থিত না থাকায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি ট্রাইব্যুনাল। তবে আবেদনটি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হবে এবং তিনি চেম্বারে অথবা পরবর্তী তারিখে এ বিষয়ে আদেশ দেবেন বলে জানায় ট্রাইব্যুনাল।

সালমান এফ রহমানের আইনজীবী ব্যারিস্টার আরিফুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আমরা সালমান এফ রহমানের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য গত সেপ্টেম্বরে বার কাউন্সিলে আবেদন করেছি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও আবেদন করেছি। কিন্তু গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, বার কাউন্সিলের গত বৃহস্পতিবারের মিটিংয়ে আমাদের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদনটি খারিজ করে দেওয়া হয়েছে; যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।

আরিফুর রহমান আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের অনুমতি চেয়েও আমরা আরেকটি আবেদন করেছি। কিন্তু মামলাটি আজ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারিত থাকলেও আমাদের আবেদনের বিষয়টি কার্যতালিকায় (কজ লিস্ট) আনা হয়নি। ফলে সালমান এফ রহমান নিজেই ট্রাইব্যুনালের সামনে বিষয়টি উত্থাপন করেন। সালমান এফ রহমান ট্রাইব্যুনালে বলেন, মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, কিন্তু বিদেশি আইনজীবী নিয়োগসংক্রান্ত আবেদনের বিষয়ে এখনও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। পরে ট্রাইব্যুনাল জানায়, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার উপস্থিত নেই, তাই ট্রাইব্যুনাল তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না। তবে বিষয়টি চেয়ারম্যানের কাছে উপস্থাপন করা হবে। তিনি চাইলে সংশ্লিষ্ট আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী চেম্বারেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন অথবা মামলার পরবর্তী তারিখে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারেন বলে জানান আরিফুর রহমান।

এদিকে, শুনানির বিস্তারিত তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিম জানান, নির্ধারিত দিনে ট্রাইব্যুনালে এই সাক্ষ্যগ্রহণ ও উপস্থাপনের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। মামলার ১৩ নম্বর সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পুরো দিনলিপি তুলে ধরেছেন। কীভাবে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কী ছিল, আন্দোলন কীভাবে ধাপে ধাপে সরকার পতনের দিকে এগিয়ে যায় এবং তৎকালীন সরকার চলাকালে ছাত্র-জনতাকে কীভাবে বিভিন্ন উপায়ে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়েছিলÑতার বিস্তারিত বিবরণ দেন সাক্ষী। এছাড়া আন্দোলনকারীদের কী দাবি ছিল এবং কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়, তাও তিনি তুলে ধরেন। জবানবন্দি শেষে সাক্ষী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত ও দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে বিচার প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে তিনি সাক্ষীদের সুরক্ষাও প্রার্থনা করেন; কারণ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে সাক্ষীদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

প্রসিকিউটর তামিম আরও জানান, এ দিন সাক্ষ্য প্রদানের শুরুতে একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযুক্ত সালমান এফ রহমান ট্রাইব্যুনালের কাছে কথা বলার অনুমতি চান। পরবর্তীতে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তিনি আইনজীবীদের ডায়াসে এসে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সালমান এফ রহমান ট্রাইব্যুনালকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিদেশি আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনার যে বিধান রয়েছে, তিনি তা কার্যকর করতে চান। তিনি দাবি করেন, এই আবেদন অনেক আগেই করা হলেও বার কাউন্সিল কোনো জবাব দিচ্ছে না। এ বিষয়ে যেন ট্রাইব্যুনাল একটি আদেশ প্রদান করে। পাশাপাশি সালমান এফ রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগ আনা হয়েছে; তিনি নিজে মাঠে যাননি বা কাউকে সরাসরি হত্যা করেননি এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। এছাড়া সাক্ষীরা তার বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি বিদেশি আইনজীবীর মাধ্যমে সেই সাক্ষীকে জেরা করতে চান বলেও দাবি জানান।

সালমান এফ রহমানের এই বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে প্রসিকিউশনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিম প্রসিকিউশনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি শুনানিতে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিদেশি আইনজীবী দিয়ে প্র্যাকটিস করার সুযোগ থাকলেও শর্ত হলো বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন। বার কাউন্সিল তাদের অনুমতি দেবে কি না, তা একান্তই বার কাউন্সিলের বিষয়।

প্রসিকিউটর প্রশ্ন তুলে ট্রাইব্যুনালে বলেন, তাদের আদৌ বিদেশি আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনার আন্তরিক ইচ্ছা আছে কি না। সত্যি ইচ্ছা থাকলে তারা এতদিনে বিদেশি আইনজীবী নিয়ে আসতে পারতেন। ট্রাইব্যুনালে কোনো আইনজীবীকে উপস্থিত বা সাথে রেখে মামলা পরিচালনা করতে কোনো বাধা নেই; পর্যবেক্ষক হিসেবে পৃথিবীর যেকোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেন। কেবল ওকালতনামায় স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রেই বার কাউন্সিলের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মামলার শুরু থেকেই তারা যদি কোনো বিদেশি আইনজীবীর টিম সাথে রাখতেন, তবে সেই বিদেশি আইনজীবীরা স্থানীয় বাংলাদেশি আইনজীবীকে পরামর্শ, নোট এবং সহায়তা দিতে পারতেন। ফলে বিদেশি আইনজীবীর পূর্ণ সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তাদের ছিল। কিন্তু তা না করে ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের এই শেষ পর্যায়ে এসে তারা এমন দাবি তুলছেন। মূলত মামলা বিলম্বিত করাই তাদের আসল উদ্দেশ্য।
তখন আসামিপক্ষ থেকে বলা হয়, বিদেশি আইনজীবী ডায়াসে দাঁড়িয়ে সরাসরি সাক্ষীকে প্রশ্ন করতে চান; স্থানীয় আইনজীবীকে সহায়তা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়।

এর জবাবে প্রসিকিউটর তামিম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, এই মামলায় যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন তারা সবাই বাংলাদেশি এবং বাংলা ভাষাভাষী। কোনো বিদেশি আইনজীবী এসে ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে তা বাংলাদেশি আইনজীবীর মাধ্যমে বাংলায় অনুবাদ করে সাক্ষীকে বলতে হবে। ফলে সরাসরি বিদেশি আইনজীবী জেরা করতে পারছেন না; কার্যত মাঝখানে বাংলাদেশি আইনজীবীকেই জেরা পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই ধরনের সহায়তার জন্য তো বার কাউন্সিলের অনুমতির প্রয়োজন নেই। বিদেশি আইনজীবীরা পাশে থেকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতেই পারেন এবং সেই সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশি আইনজীবী জেরা করতে পারেন। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল জানান, আসামিপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় বিদেশি আইনজীবী আনতে পারবেন এবং তাদের সহায়তা নিতে পারবেন। তবে ওকালতনামায় স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে আইনে যেভাবে স্পষ্ট করা আছে, সে অনুযায়ী বার কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া ট্রাইব্যুনাল কোনো অনুমতি দেবে না।