মাসের পর মাস নির্বাচনী প্রচার এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে জনমত জরিপ সব সময় নির্ভুল হয় না। এবারের নির্বাচনেও অপ্রত্যাশিত ফল আসতে পারে। মোটাদাগে, ভোটারদের রায়ের পর তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কী হতে পারে সেই তিনটি পরিস্থিতি, ভোট গণনার সময় কোন প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখে তা বোঝা যাবে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা দেখে নেয়া যাক।
ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের জোয়ার
ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতার বাইরে থাকা দল সুবিধা পেয়ে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনমত জরিপে দেখা প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিকভাবে কম জনপ্রিয়তা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে সমর্থনের মতো বিতর্কিত নীতি। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বড় ধরনের নির্বাচনী জোয়ারের।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে-প্রেসিডেন্টের অনুমোদন রেটিংয়ের জরিপের গড়। এই প্রথম পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটদের পক্ষে বিশাল নির্বাচনী জোয়ারই বাস্তবে দেখা যেতে পারে।
ডেমোক্রেটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণই নিতে পারে না, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের চেয়ে অনেক বেশি আসনও পেতে পারে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, যেসব আসনে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি, সেগুলোর প্রায় এক ডজন জেতার পাশাপাশি তারা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও আসন ছিনিয়ে নিতে পারে ।
সিনেটের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হতে হলে ডেমোক্রেটদের বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর সবকটি বা অধিকাংশ জিততে হবে। এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রধান কিছু অঙ্গরাজ্যও থাকবে।
এমনকি টেক্সাসে, যেখানে এক প্রজন্ম ধরে কোনো ডেমোক্রেট নির্বাচিত হননি, কিংবা কানসাসে, যেখানে প্রায় এক শতাব্দী ধরে এমন ঘটনা ঘটেনি, সেখানেও বড় ধরনের জয় আসতে পারে।
এমনটি হলে ডেমোক্রেটরা শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণই নেবে না, এক বা দুটি আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পাবে।
এ ধরনের ফল ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য হবে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা। এর ফলে আগামী দুই বছর নতুন উদ্দীপনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা ডেমোক্রেটদের সঙ্গে সংঘাতের মুখে পড়বেন ট্রাম্প।
ডেমোক্র্যাটদের সীমিত অগ্রগতি
জনমত জরিপ হয়তো পুরোপুরি ভুল হবে না, আবার পুরোপুরি সঠিকও হবে না। এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদের অপেক্ষাকৃত সহজে জেতার মতো আসনগুলোতে জয় পেয়ে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। তবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে খুবই সীমিত।
এর অর্থ, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেট নেতাদের আইন পাস করার জন্য নিয়মিতভাবে দলের বামপন্থী ও মধ্যপন্থী অংশের সদস্যদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। পর্যাপ্ত ভোট নিশ্চিত করতে তাদের বেশ বেগ পেতে হতে পারে।
সিনেটের ক্ষেত্রে এই কাল্পনিক পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটরা হয়তো মাত্র একটি বা দুটি আসন ছিনিয়ে নেবে। নর্থ ক্যারোলাইনা আসনটি তাদের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। তবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতে জয় পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।
সম্ভবত মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারাতে ব্যর্থ হবে ডেমোক্রেটরা। অথবা বামপন্থী প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ মিশিগানকে ডেমোক্রেটদের দখলে রাখতে পারবেন না।
আলাস্কায় ড্যান সুলিভান নামের দুই প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্কের কারণে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলা পরাজিতও হতে পারেন। এই ‘ডেমোক্রেটদের সীমিত অগ্রগতি’ পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হতে হলে আগাম ভোটে ডেমোক্রেটদের ব্যাপক উপস্থিতির বিপরীতে নির্বাচনের দিন রিপাবলিকানদের ভোটার উপস্থিতিও বাড়তে হবে।
এর ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষ দুই দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর এমন পরিস্থিতি রাজনৈতিক অচলাবস্থার পথ তৈরি করবে।
রিপাবলিকানদের জন্য ভালো রাত
এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হবে। এমনটি হতে হলে জনমত জরিপগুলো ভুল প্রমাণিত হতে হবে। অতীতে জরিপে ট্রাম্পের সমর্থন কম দেখানো হয়েছে। এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর বেশির ভাগ রিপাবলিকানদের পক্ষে যেতে হবে।
রিপাবলিকান ভোটারদের অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও হিস্পানিক ভোটাররা, যারা ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই ভোট দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের জন্য নিশ্চিত বিষয় হয়ে থাকবে না। বরং ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকযোগে আসা ব্যালট গণনার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ওপর তা নির্ভর করতে পারে। সেখানে কয়েক দিন ধরে ভোট গণনা চলে।
শেষ পর্যন্ত টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেসের আসনগুলোর সীমানা নিজেদের অনুকূলে পুনর্র্নিধারণের প্রচেষ্টার কারণে রিপাবলিকানরা সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।
সিনেটেও রিপাবলিকানরা রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোর সব আসন ধরে রাখতে পারে। পাশাপাশি ভোটের আগে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা মিশিগানের একটি আসনও ছিনিয়ে নিতে পারে তারা।
নর্থ ক্যারোলাইনা ধরে রাখতে না পারলেও কিংবা ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মিনেসোটা ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে জয় না পেলেও রিপাবলিকানরা অন্তত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ঘাম ঝরাতে পারে। এসব আসন এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমান্তবর্তী এলাকায় রয়েছে।
এমনটি হলে বুধবার সকালে ট্রাম্প নতুন করে নির্বাচনী ম্যান্ডেট পাওয়ার দাবি করতে পারেন। রিপাবলিকান কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে তিনি তার অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন।
