জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের দুর্দশা আরও বেড়েছে

জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের দুর্দশা আরও বেড়েছে

ফন্ট সাইজ:

ওসামা নাজ্জার একজন ফিলিস্তিনি শরণার্থী। লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ত্রিপোলির বেদ্দাউই শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেন তিনি। একসময় সেখানে অ্যালুমিনিয়ামের সামগ্রী বিক্রির একটি দোকান ছিল তার। লেবাননে ফিলিস্তিনিদের নির্দিষ্ট কিছু পেশায় কাজ করার অনুমতি নেই। এসব পেশার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা, আইন, প্রকৌশল ও ফার্মেসি। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা যা-ই হোক, অনেক ফিলিস্তিনির জন্য দোকান চালানোই জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু নাজ্জার বলছেন, লেবাননে বসবাসরত অন্য ফিলিস্তিনিদের মতো তার জীবনও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির বাড়তি দাম দেশটির সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম ফিলিস্তিনিদের ওপর বিশেষভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায় মন্দা এবং খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দোকানটি বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। এরপর থেকে কাজ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য।

তিনি বলেন, শরণার্থী শিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনিদের সামগ্রিক পরিস্থিতি করুণ। সাম্প্রতিক উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তিনি নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও বিদ্যুতের বাড়তি বিলের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় ফিলিস্তিনিরা প্রথম লেবাননে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন। ওই সময় ইহুদিবাদী বাহিনী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রক্রিয়ায় তারা ৫০০টির বেশি ফিলিস্তিনি শহর ও জনপদ ধ্বংস করে, প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। এসব মানুষ অধিকৃত পশ্চিম তীর ও প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের মধ্যে প্রায় এক লাখ উত্তর দিকে লেবাননে চলে যান। তাদের অনেকেই একদিন নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশা নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শুরুতে তাদের অনেককে অস্থায়ী বসতি ও তাঁবুতে থাকতে হয়। কিন্তু বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজ শহর ও গ্রামে দ্রুত ফিরে যাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় তাঁবুর জায়গা দখল করে অনানুষ্ঠানিক এবং প্রায়ই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নির্মিত হয় কংক্রিটের স্থাপনা।

১৯৬৪ সালে লেবানন বিদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে একটি ডিক্রি জারি করে। এতে দেশটির নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের কাজের অনুমতিপত্র নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাপকভাবে সংঘাতে অংশ নেয়। এর ফলে লেবাননের জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। ২০১০ সালে লেবাননের শ্রম আইনে সংশোধনী আনা হয়। এতে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের কিছু অনুমতিপত্রের ফি কমানো এবং কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের বাস্তবায়ন ছিল সীমিত। ২০২১ সালে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয় একটি ডিক্রি জারি করে। এর উদ্দেশ্য ছিল কিছু পেশায় ফিলিস্তিনিদের কাজের বিধিনিষেধ শিথিল করা। তবে এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেবানন সরকার একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করে। এর আওতায় ফিলিস্তিনি নার্সিং শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্য স্পনসরশিপের আবেদন করতে পারবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনে এসব পরিবর্তন আনা হলেও লেবাননের শ্রমবাজারে ফিলিস্তিনিদের কাঠামোগত বঞ্চনার অবসান ঘটেনি। বর্তমানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ লেবাননে ১২টি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংস্থাটির লেবানন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ফিলিস্তিনি বসবাস করছিলেন।

বৃটেনভিত্তিক ফিলিস্তিনি-লেবানিজ গবেষক ও পডকাস্টার এলিয়া আইয়ুব আলজাজিরাকে বলেন, লেবাননে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ও ভিন্নধর্মী আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, লেবাননে ফিলিস্তিনিরা অনেক উচ্চপর্যায়ের পেশায় পড়াশোনা করতে পারলেও সেসব পেশায় কাজ করার অনুমতি পান না। তাদের জমির মালিক হওয়ার অধিকার নেই। এমনকি দেশটির পার্লামেন্টেও তাদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নেই। তিনি বলেন, লেবাননে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়ভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা সেই ব্যবস্থার স্বীকৃত কোনো অংশ নন।

দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লেবাননে ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকট থেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশটি। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ফিলিস্তিনিদের ওপর বিশেষভাবে আঘাত হেনেছে। লেবানন সরকার প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ফলে অধিকাংশ বাসিন্দাকে বেসরকারি জেনারেটর কিংবা বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এদিকে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে লেবাননে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন কঠিন সময়ে অনেক ফিলিস্তিনি সহায়তার জন্য ইউএনআরডব্লিউএর দ্বারস্থ হন। কিন্তু ২০২৪ সালে ইসরাইল অভিযোগ করে, সংস্থাটির কর্মীরা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করলেও এর পর বিভিন্ন দেশ সংস্থাটির অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়।

ইউএনআরডব্লিউএ জোরালোভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশ আবার সংস্থাটির জন্য অর্থায়ন শুরু করেছে। তা সত্ত্বেও গত জুলাইয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, সংস্থাটির প্রায় ১০ কোটি ডলারের তহবিল ঘাটতি রয়েছে। সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি জানায়, ২০২৬ সালের শেষ থেকে ২০২৭ সালের শুরুর মধ্যবর্তী সময়ে তাদের অন্তত ২০ কোটি ডলারের আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়তে হতে পারে। নিজ দেশে সম্মানজনক জীবনযাপনের কোনো সুযোগ না থাকায় অনেক ফিলিস্তিনি সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

এ পথে তারা জীবন বাজি রাখছেন। ২০২২ সালে লেবানন থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা সিরিয়ার উপকূলে ডুবে যায়। এতে অন্তত ৮৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের অনেকেই ছিলেন শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত ফিলিস্তিনি।

২০১৯ সালের পরের বছরগুলোতে লেবাননের উপকূল থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করা নৌযানের সংখ্যা বেড়েছে। এসব নৌযানে অনেক ফিলিস্তিনিও ছিলেন। ফ্রিডরিখ নাউমান ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করা নৌযানের সংখ্যা ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছিল। পরের বছর তা আরও ১২১ শতাংশ বেড়ে যায়। লেবাননে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ফিলিস্তিনি ও দেশটির অন্যান্য অসহায় জনগোষ্ঠীর আরও বেশি মানুষ নিয়মিতভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। অক্টোবরের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন লেবাননে একটি সহায়তা মিশন অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করা হবে। এর মধ্যে ‘সমুদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সহায়তা’ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নাজ্জার বলেন, বর্তমানে শরণার্থী শিবিরগুলোতে নৌকায় করে তুরস্কে এবং সেখান থেকে গ্রিসে যাওয়ার আলোচনা চলছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা সামনে না থাকায় ঝুঁকি যতই থাকুক, ফিলিস্তিনিরা মুক্তির পথ খুঁজতে থাকবেন। তিনি বলেন, এসব কিছুর পেছনে এখনো একটাই কারণ- লেবাননে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ।