ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কয়েকটি এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকায় পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। এ ঘটনায় মিরপুরে ২৯ জন এবং গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে চলে এ সংঘর্ষ। এ পরিস্থিতিতে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় একদিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর ও আশুলিয়ায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, আটককৃতরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তারা সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার চেষ্টা করছিলেন।
সরজমিন দেখা যায়, সকাল ৮টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিরপুর- ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করেন। এতে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ পথচারীরা। বেলা ১১টার দিকে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যেতে অনুরোধ করে পুলিশ। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাল্টা ইটপাটকেল ও লাঠিসোটা নিক্ষেপ করলে উভয়পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশের ধাওয়ার মুখে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে মিরপুর-২, ১১, ১৩ ও শেওড়াপাড়ার দিকে ছড়িয়ে পড়েন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা আবারো সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এ সময় মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের ধাওয়া দেয়। বাধ্য হয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে জলকামান দিয়ে গাড়ির আগুন নেভানো হয়।
মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙচুর: এদিকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির পদ্মা ভবনে অবৈধভাবে প্রবেশ, ভাঙচুর এবং শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, আন্দোলনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে গেলে আন্দোলনকারীরা তাদের ওপর চড়াও হন। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস প্ল্যাটফরমের সেক্রেটারি আহমেদ মুকতাফি রোহান বলেন, মিরপুরের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত কয়েক মাসে সেখানে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আজকের হামলা শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, হামলার সময় পদ্মা ভবনে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
৩ মেট্রো স্টেশন বন্ধ: পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় মেট্রোরেলের তিনটি স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। বেলা ১২টার দিকে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ।
ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকি বিবেচনায় তিনটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে সবগুলো স্টেশনের গেট খুলে দেয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ হবে। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও তারা সড়ক ছাড়ছিলেন না। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে কোনো প্রকার লাঠিচার্জ ছাড়াই শুধু সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া এবং তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি’র এই কর্মকর্তা বলেন, সড়ক পরিষ্কারের সময় পুলিশ সেই এলাকায় মনোযোগ দিয়েছিল। কারও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মিরপুর-গাজীপুরে আটক ৪৯: সংঘর্ষে মিরপুর থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ছাড়া ডিএমপি’র মিরপুর বিভাগ আরও ১৮ জনকে আটক করার কথা জানায়। ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছেন ডিবি’র মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, এ ঘটনায় আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। মিরপুর ১০ ও এর আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতা। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন। ঢাকার পল্লবী ও রূপনগর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এ কার্যক্রমের ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে কাজ করছেন বলে দাবি করেন ডিবি কর্মকর্তা রাকিব খান।
ডিএমপি’র মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার বলেন, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত আরও ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। পরে তাদের নাম ও পরিচয় জানানো হবে। আটকৃতরা নাশকতার পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
অপরদিকে গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা: এদিকে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতা শনাক্ত হয়েছে। সাজবুল ইসলাম নামে ওই যুবক নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাজীপুরে এক যুবক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যাকে একনজর দেখেই অনেকে অনুমান করেছেন, তিনি সাধারণ শ্রমিক নন। পরে সাজবুল ইসলাম নামে ওই যুবকের ফেসবুক পেজ ঘেটে দেখা যায়, তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। সাজবুলের মতো আরও অনেকে শ্রমিক আন্দোলন উসকে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ডিএমপি’র যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম জানান, সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী অনেক গোষ্ঠী বা দুষ্কৃতিকারীরা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে অরাজকতা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ শান্তভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
গাজীপুরে রণক্ষেত্র, পুলিশ বক্সে হামলা, শতাধিক কারখানা ছুটি
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, একইদিন ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধের দাবিতে রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখ গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। এ পরিস্থিতিতে কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্য ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামানো হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে প্রায় সব পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ভোগড়া ও নাওজোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও তৎপরতার পর দুপুরের পর থেকে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে যেতে শুরু করে। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবির আন্দোলনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকার শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কের প্রতিটি পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, কারখানা এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
