দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিশাল জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, তার কাছে ধর্মের চেয়ে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের কণ্ঠস্বর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের প্রতি তার কোনো ঘৃণা নেই। তবে তিনি তাদের বিরুদ্ধে দেশের আত্মায় আঘাত হানার অভিযোগ এনেছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম মুছে ফেলার অভিযোগকে একটি দেশবিরোধী কাজ এবং রাষ্ট্রদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত বিরল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে জেলে যেতে হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে। গতকাল দিল্লির রামলীলা ময়দান ভোট চুরি ও ভারতের নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে জনারণ্যে পরিণত হয়। ইন্ডিয়াজোটের সব দলের কর্মী ও সমর্থকরা এই সমবেশে যোগ দেন। নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে প্রতিবাদকারীরা দিল্লির রামলীলা ময়দানে সমবেত হন।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন- কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ওমর আবদুল্লাহ। আইসা নেত্রী নেহা বোরাও উপস্থিত ছিলেন। তেলাপোকা জনতা পার্টি এই কর্মসূচিতে সমর্থন জানালেও তারা নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে এদিনের সমাবেশে যোগ দেয়নি। এদিনের সমাবেশকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করে দিল্লি পুলিশ। মধ্য দিল্লিতে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ডিসিপি রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, ওই এলাকায় ২০০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়। এছাড়া পুরো সমাবেশস্থল জুড়ে এবং বিভিন্ন ঘেরাটোপের ভেতরে পুলিশ কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে।
‘ইন্ডিয়া’ জোটের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির শুরুতে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধী নেতারা মিন্টো রোড-কনট প্লেস সংযোগস্থল থেকে রামলীলা ময়দানের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যান। আগের দিন শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে বিরোধীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি পালন করেন। অন্যদিকে, বিরোধীদের এই আন্দোলনের সময়কে লক্ষ্য করে বিজেপি হরি নগর এলাকায় ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার প্রতিবাদে একটি মিছিল বের করে। সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরদীপ সিং পুরীর নেতৃত্বে এই মিছিলে বিভিন্ন শিখ সংগঠনও অংশ নেয়।
কংগ্রেস সাংসদ রণদীপ সুরজেওয়ালা রামলীলা ময়দানের সমাবেশকে একটি গণ-বিপ্লবের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধানের ওপর আক্রমণ চালানো এবং নির্বাচনী অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, রাহুল গান্ধী ও অন্যান্য বিরোধী নেতাদের নেতৃত্বে রামলীলা ময়দান থেকে যে বার্তা দেয়া হয়েছে, তা সারা দেশে প্রতিধ্বনিত হবে। কংগ্রেস নেতার মতে, দেশে একটি গণবিপ্লব শুরু হয়েছে। ‘সম্রাটের’ সিংহাসন কাঁপছে। এ দেশের মানুষ একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- সংবিধানের ওপর আক্রমণ কিংবা ভোট চুরির ঘটনা কোনোটিই আর সহ্য করা হবে না। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, রামলীলা ময়দান এখন গণতন্ত্রের হলদিঘাট হয়ে উঠেছে, নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে; যেকোনো মুহূর্তে ‘পরিবর্তন’ আসতে পারে। অখিলেশ যাদব আরও বলেন, যুবসমাজ অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবে। আগামী প্রজন্ম তাদের ওপর চালানো প্রতিটি লাঠিচার্জ ও আঘাতের প্রতিশোধ নেবে; বিজেপি নিজেদের বাঁচাতে পারবে না।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলা ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর)-এর শিকার হয়েছে এবং তিনি এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। মমতার কথায়, ‘‘ভ্যানিশ কুমার, আপনি ভোট ভ্যানিশ করে দিয়েছেন। মানুষের চাকরি, ভোটাধিকার, জীবন সব লুট করেছেন। আমাদের একটাই কথা, আগে ভ্যানিশ হটাও, তারপর অন্য কাজ।” কেন্দ্রবিরোধী প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিতে মমতা যুব প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন।
দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী দাবি করেন যে, ইভিএম’র মাধ্যমে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে বা নতুন নাম যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় ভোট চুরি করা হয়েছে। রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সতর্ক করে বলেছেন, মোদি কোথাও যেতে পারবেন না। রাহুল গান্ধী বলেছেন যে, বিরোধী দল দুই নেতাকে ছাড়বে না। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর ভারতের ১৫ শতাংশ ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। রাহুল গান্ধী দাবি করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে এবং জেলে পাঠানো হবে। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় গান্ধী বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ- কেউই তাদের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কৃষক, যুবসমাজ ও শ্রমিকদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ দেশের সম্পদ দুই-তিনজন ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে। গান্ধী বলেছেন, বিরোধী দল এমন এক ভারতকে মেনে নেবে না।
