ব্যবসায়ী-বিত্তশালীদের কাছে জিম্মি রাজনীতি

ফন্ট সাইজ:

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহির ঘাটতি প্রকট। নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে, দলগুলোর আয়-ব্যয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাবের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের রয়েছে বড় ধরনের ফারাক। এ সুযোগে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের প্রভাব বাড়ছে। অর্থ ও পেশিশক্তির কাছে অনেক ক্ষেত্রে জিম্মি হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। দেশের ৩২টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে গবেষণাটি তৈরি করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। দল পরিচালনার বিপুল ব্যয় মেটাতে আনুষ্ঠানিক আয়ের বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা দলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে।

টিআইবি’র গবেষণা অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধনের ন্যূনতম শর্ত পূরণে ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ সদস্যদের চাঁদা ও ঘোষিত আয়ের উৎস থেকে এ ধরনের দলের সর্বোচ্চ আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা। দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সদস্যদের চাঁদা থেকে সর্বোচ্চ আয় ৩৮ কোটি টাকা। আর যেসব বড় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত, তাদের বার্ষিক ব্যয় ১ হাজার ৫৩২ কোটি থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অথচ সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় মাত্র ১১৬ কোটি টাকা। আনুষ্ঠানিক আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান কীভাবে পূরণ হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গবেষণায়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বিপুল অর্থের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কারণে রাজনীতিতে বিত্তশালী ও ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হচ্ছে। এটি সুশাসনের পথে প্রধান অন্তরায়। রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার একধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও কর্তৃত্বপরায়ণতার প্রভাব বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় ১০টি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পারিবারিক পর্যায় থেকে উঠে এসেছে।

ফলে তৃণমূল থেকে যোগ্য নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। কোথাও কোথাও গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করে এডহক বা বিশেষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় দল পরিচালিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা ও আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। অধিকাংশ দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় নারীদের অবস্থান এখনো নামমাত্র বা প্রতীকী বলে জানিয়েছে টিআইবি। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব পড়ছে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সম্পর্কেও। বাড়ছে দলীয় কোন্দল ও সহিংসতা। টিআইবি’র প্রতিবেদনে গত ৯ মাসের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অন্তর্কলহে বহু নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও সহিংসতার বিস্তার ঘটছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো সমন্বিত ও শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে বলে মনে করে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের কিছু বিধান অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক। এসব বিধান আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে রাজনীতিতে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য কমানো কঠিন হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে টিআইবি। এ লক্ষ্যে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।

জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করতে হবে। সংস্কারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। টিআইবি’র মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা, নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং তৃণমূলের যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে দল পরিচালনায় গঠনতন্ত্রের প্রয়োগ ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায়, রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব এবং পরিবারতন্ত্রের আধিপত্য কমানো কঠিন হবে।