অভাব-অনটনে বেড়ে ওঠা। বাবা নির্মাণ শ্রমিক। মায়ের আয়ার কাজে কোনো রকম চলে সংসার। নেই আবাদি জমিটুকুও। তিন বেলার খাবার ঠিকঠাক জোটে না। আর সেই পরিবারেই জন্ম নেওয়া মোন্নাফ হোসেন মুন্না এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এই ফলাফলে খুশি সবাই। কিন্তু সে সাফল্যে যেন দুশ্চিন্তা জেঁকে বসেছে। মোন্নাফের স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। পরিবারের একটাই চিন্তা পড়াশোনার খরচ নিয়ে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সিমলা গ্রামের রফিকুল ইসলাম (৫০) ও মিরা খাতুনের (৪২) ছেলে মোন্নাফ। এখন তার চিন্তা একটাই-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন কীভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। কীভাবে আসবে এই পড়ার খরচ।
সরজমিন দেখা যায়, ছোট ঘরে মোন্নাফের পরিবারের বসবাস। দুটি চৌকি, একটি টেবিল ও হাঁড়ি-পাতিল ছাড়া ঘরের মধ্যে তেমন কিছুই নেই। বইপত্র সাজানো রয়েছে চৌকির ওপর। সেই ঘরের এক কোনে বসেই এতদিন পড়াশোনা করেছেন মোন্নাফ। বাবা নির্মাণ শ্রমিক হলেও নিয়মিত কাজ পান না। মা মিরা খাতুন স্থানীয় একটি এনজিও অফিসে ছয় হাজার টাকা মাসিক বেতনে পরিচারিকা (আয়া) হিসেবে কাজ করেন। মূলত এ কাজের ওপর নির্ভর করেই চলছে তাদের তিন সদস্যের সংসার।
শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবা রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক। সহায়সম্বল বলতে টিনের চাল ও বেড়া দিয়ে ঘেরা দু’টি ঘর। সেই ঘরেই তাদের বসবাস। কাজ পেলে খাবার জোটে, না হলে অনাহারেও দিন কাটে।
উচ্চশিক্ষা অর্জনে যে টাকার প্রয়োজন, দরিদ্র বাবা-মা তাকে সেই অর্থ যোগান দিতে পারবেনা এই ভাবনায় মোন্নাফের মুখে হাসি নেই। মোন্নাফ মানবজমিনকে বলেন, আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চাই, কিন্তু এই অভাবের সংসারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই এখন অনিশ্চিত। বাবা-মা দু’জনের পরিশ্রমে যে টাকা আসে সেটা দিয়ে দু’বেলা খাবার জুটলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। আমার বড় বোন রিশা খাতুনেরও স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের দুঃখ দূর করা। কিন্তু টাকার অভাবে মাধ্যমিক লেভেল পাস করার পরই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। চুরমার হয়ে যায় তার সেই স্বপ্ন। আমি অর্থের অভাবে ফাইনাল পরীক্ষার আগেও কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে পারিনি। অন্যের ফোনে ইউটিউব থেকে জটিল ক্লাসগুলো ডাউনলোড দিয়ে বাসায় দেখেছি। আমার কপালে কী আছে তা আল্লাহ ভালো জানেন। জানি না ভবিষ্যতে কী হবে।
পরিবার জানায়, ২০২৪ সালে উপজেলার ধানগড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পায় মোন্নাফ। স্থানীয় সরকারি বেগম নূরুন্নাহার তর্কবাগীশ কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এবার সেখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন জিপিএ-৫।
মোন্নাফের বাবা রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ছাওয়াটার (ছেলে) অনেক আশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, চাকরি করবে। কিন্তু আমি তো ঠিক মতো ভাতই দিতে পারি না। ভাতের টাকাও ঠিকমতো জোটে না, ওরে ঢাকা পড়াব কেমনে বলেন?
মোন্নাফের মা মিরা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েটা বড়, ছোট মোন্নাফ। মেয়েটাও মেট্রিক(এসএসসি) পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল। লেখাপড়ার প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। কিন্তু আমরা তো গরিব মানুষ। তাই আর না পড়িয়ে, বিয়ে দেই। আর ছেলেটাকে এতদিন কষ্ট করে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। ওর স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। সেখানে পড়াশোনা করাতে তো অনেক খরচ হবে, সেটা আমরা কি পারব, আমাদের কি সেই সামর্থ্য আছে?
প্রতিবেশী ফরহাদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, মোন্নাফ অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। সে তার কষ্টের ফল পেয়েছে। আগামীতে তার উচ্চ শিক্ষার স্বপ্নপূরণে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
সরকারি বেগম নূরুন্নাহার তর্কবাগীশ কলেজের প্রভাষক ময়নুল হক মানবজমিনকে বলেন, মোন্নাফ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিলেও অত্যন্ত মেধাবী। তার বাবা একজন নির্মাণ শ্রমিক। মা স্থানীয় একটি এনজিওতে কাজ করে। তার সামনের পড়াশোনা নিয়ে সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস।
জিপিএ-৫ পেয়েও পিছু ছাড়ছে না দুশ্চিন্তা, মোন্নাফের স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার
এম এ মালেক, সিরাজগঞ্জ
অনলাইন
১ ঘন্টা আগে
১ নভেম্বর (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ৩৩ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
