ইত্তেফাক
২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশ: ‘সহানুভূতির নম্বর’ বন্ধে প্রকৃত মেধার প্রতিফলন—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, খাতা মূল্যায়নে ‘সহানুভূতির নম্বর’ নীতির অবসান হওয়ায় গতবারের মতো এবারও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে। ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য। ভিত দুর্বল হওয়ায় ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়েই ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। একই কারণে হিসাববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত বিষয়েও অনেক শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। বিভাগ বিচারে বিজ্ঞানে ২৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বাণিজ্যে ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ও মানবিকে ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এসবের প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর থেকে প্রতিবছর পাশের হার বেড়েছে বা সামান্য কমবেশি হয়েছে। কিন্তু এবার তাতে বড় ধস নামল। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। এবার ৪০ হাজার ৮৪ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৬ শিক্ষার্থী। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমল ৩২ হাজার ৯২ বা ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
টানা দুই বছর ধরে এইচএসসি ও সমমানের ফল বিপর্যয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত বছর পাশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমার পর এবার তা আরো কমেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে কোনো পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সহানুভূতির নম্বর’ বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হচ্ছে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরীক্ষার্থীদের খাতায় ২৮ পেলে ৩৩ করে পাশ করানো বা গ্রেড পরিবর্তনের জন্য ২ থেকে ৫ নম্বর পর্যন্ত ‘সহানুভূতির’ নম্বর দেওয়ার যে অলিখিত নিয়ম চালু ছিল, তা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থান ঘিরে সার্বিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বতী সরকারের প্রশাসনের অধীনে খাতা দেখার ধরন বদলে যাওয়ায় গতবার মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিকেও পাশের হারে ধস নামে। এবার এসএসসিতে পাশের হার আরো কমে হয় ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আর এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল এলো। ফলাফলে এমন ধসের পেছনে নির্মোহভাবে খাতা দেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখার কথা বলছে সরকার। ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত সরকারের আয়োজিত প্রথম এই এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় আমরা নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছি। প্রত্যেকের খাতায় যে পরীক্ষা যেভাবে দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাইছি এবং এই প্রথম বারের মতো থাকছে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষা।’ এদিকে এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বারবার এমন ফল বিপর্যয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বিষয়টিও উঠে আসছে। এর নেপথ্যে কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকট রয়েছে বলেও মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাবিদরা বলেন, ক্লাসে শেখানো ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। এতে পরীক্ষায় একটু ভিন্ন কাঠামোর প্রশ্ন এলেই তারা গুলিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ যে বিষয় তারা পড়ছে, তাতে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে পরীক্ষায় খারাপ করছে তারা। শিক্ষাব্যবস্থার এ ত্রুটি ও দুর্বলতার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকতারা। বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের শিক্ষক সংকট প্রকট। এ কারণে এ দুই বিষয়ে ফেলও বেশি। কলেজ-মাদ্রাসায় সশরীরে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকরাও শিক্ষকসংকটের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে শিক্ষার মানের সঙ্গে ভালো ফলাফলও নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অভিভাবকরা।
এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএম)—সব মিলিয়ে ১১ বোর্ডের পরীক্ষার ফল গতকাল শনিবার প্রকাশিত হয়। ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। বাকি ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯৩ জন পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৫ হাজার ৫৯২ জন, যা ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর আগের বছর, অর্থাত্ ২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সেই হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে পাশের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। এবার ছাত্রদের ৫২.২৫ শতাংশ অকৃতকার্য, ছাত্রীদের ৪৩.৬৯ শতাংশ ফেল। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা টানা দুই বছর ধরে কমছে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৮২৭ জন। বর্তমানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৭২ শতাংশ কম। ধারাবাহিক এই ফল পতন শিক্ষা ব্যবস্থার মান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এবার অনেক অগ্রসর শিক্ষার্থী ভালো করতে পারেননি, পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ফল আরো নাজুক। গ্রাম ও শহরে সাফল্যের বৈষম্য অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে প্রকট হয়েছে।
কোন বোর্ডের পাশের হার কত: এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডে পাশের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৬১.৮০ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাশের হার ৪৫.০৬ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৮.০৪ শতাংশ। যশোর শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৪.৯২ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫২.০৭ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে পাশের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ। সিলেট বিভাগে পাশের হার ৫০.৯০ শতাংশ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫১.৪৪ শতাংশ। এছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৬১.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৯.৪৩ শতাংশ।
দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থীর এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা :শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বরাবরের মতই শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইলে এসএমএস করেও উচ্চমাধ্যমিকের ফল জানা যাচ্ছে। এদিকে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে কেবল অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে এক বছর পর (পরের বছরের পরীক্ষায়) আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সেক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়গুলোয় অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে এক জন শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে আবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ফল প্রকাশের পর এক মাস পুনর্নিরীক্ষণের কাজ চলবে। পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে। এরপর পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে ফল প্রকাশ করা হবে।
কোন বোর্ডে কতজন জিপিএ-৫ পেলেন: এবার দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে বরাবরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পেয়েছে বরিশাল বোর্ড। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে দেখা গেছে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২০ জন। এছাড়া যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ২২৮ জন, দিনাজপুরে ২ হাজার ৯৫৩ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯২৯ জন এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ২ হাজার ১৩৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। অন্যদিকে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ৩১৩ জন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ২০৫ জন এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৯৫০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন জিপিএ-৫ পাওয়ার তালিকায় রয়েছে বরিশাল বোর্ড। এদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ২৫০ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলক ভালো ফল: বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলক ভালো ফল করেছেন শিক্ষার্থীরা। শুধু ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এ দুই বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এটা পুরো ফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। বাংলা বিষয়ে কুমিল্লা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৯৫ দশমিক ০১ শতাংশ। যুক্তিবিদ্যায় রাজশাহী বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ পাশের হার পাওয়া গেছে। বিপরীতে ইংরেজি ও হিসাববিজ্ঞানে বোর্ডগুলোর পাশের হার তুলনামূলক কম। ইংরেজিতে বরিশাল বোর্ডে সর্বনিম্ন ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং হিসাববিজ্ঞানে একই বোর্ডে ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। আইসিটি বিষয়ে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং বরিশালে সর্বনিম্ন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটাতে বিশেষ কোর্স কারিকুলাম হাতে নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ফলাফলে পাশের হার কমার পেছনে ইংরেজি ও আইসিটির খারাপ ফল বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাশ করেননি একজনও, শতভাগ পাশ ১৩৯ : এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক জন শিক্ষার্থীও পাশ করেননি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ২০২। অর্থাত্ গত বছরের চেয়ে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাশ করেননি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে শতভাগ পাশ করেছে ১৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গত বছর শতভাগ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৫৪টি। আর তার আগের বছর অর্থাত্ ২০২৪ সালের শতভাগ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ১ হাজার ৩৮৮টি।
পাশের হারে মেয়েরা এগিয়ে, জিপিএ-৫ এ ঘুরে দাঁড়াল ছেলেরা: উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও পাশের হারে এগিয়ে আছেন ছাত্রীরা। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর মেয়েদের পেছনে ফেলতে পেরেছেন ছেলেরা। এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছিলেন ছাত্রী। তাদের মধ্যে পাশ করেছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। সেই হিসাবে ছাত্রীদের পাশের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে, ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তাদের পাশের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাত্ পাশের হারে ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন। অর্থাত্ মেয়েদের চেয়ে ৬৪২ জন বেশি ছেলে পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ২০২৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের হার ও জিপিএ-৫, দুই দিক দিয়েই এগিয়ে ছিলেন মেয়েরা।
সর্বোচ্চ পাশের হার ঢাকা বোর্ড, সর্বনিম্নে বরিশাল: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাশের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অন্যদিকে সব বোর্ডের নিচে অবস্থান নিয়ে পাশের হারে তলানিতে নেমেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। ফলের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা বোর্ডে পাশের হার সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই বোর্ডে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ জন শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে বরিশাল বোর্ড। এই বোর্ডে ৫৭ হাজার ৯১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছেন মাত্র ২৫ হাজার ৯৭০ জন। জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এই বোর্ড থেকে রেকর্ড ১৬ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা ৯টি সাধারণ বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫২০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন রাজশাহী বোর্ডে। বরিশাল বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন সবচেয়ে কম—মাত্র ৯৫০ জন পরীক্ষার্থী।
৯ সাধারণ বোর্ডের বিজ্ঞান শাখা থেকেই এসেছে সিংহভাগ জিপিএ-৫: এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখায় ৯ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে ঢাকা বোর্ড। অন্যদিকে, মানবিকে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রাজশাহী ও যশোর অঞ্চল। ঢাকা বোর্ডে বিজ্ঞানের ৮১ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ শাখায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাশের হার ময়মনসিংহে ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে, বিজ্ঞানে পাশের হার সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে; সেখানে ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। বিজ্ঞান শাখায় সাফল্য থাকলেও মানবিক শাখায় চরম বিপর্যয় দেখা গেছে। এ শাখায় সবচেয়ে কম পাশ করেছেন রাজশাহী বোর্ডে—মাত্র ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যশোর বোর্ডে মানবিকে পাশের হার ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ শাখায় সর্বোচ্চ পাশের হার দেখা গেছে ঢাকা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা শাখাতেও এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এখানে ব্যবসায় শিক্ষায় পাশের হার ৬০ দশমিক ০৬ শতাংশ, এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ড, ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ শাখায় সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রাজশাহী বোর্ড, সেখানে পাশ করেছেন মাত্র ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী। শাখাভিত্তিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির চিত্রেও দেখা গেছে বড় ব্যবধান। ৯ সাধারণ বোর্ডের বিজ্ঞান শাখা থেকেই এসেছে সিংহভাগ জিপিএ-৫। এ শাখা থেকে মোট ২৬ হাজার ৭০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। মানবিক শাখা থেকে ৫ হাজার ৯৭৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষার্থী।
প্রথম আলো
‘২২ বছরের মধ্যে বড় অবনতি’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ২২ বছরের মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে কম। ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ২৭ হাজারের বেশি। কেউ পাস করেনি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। আবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। এই চিত্র দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের। সব মিলিয়ে ফলাফলে বড় ধরনের অবনতির চিত্র সামনে এসেছে।
এবার ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া প্রায় সব বোর্ডেই ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার কম। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে তুলনামূলক খারাপ ফলও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘কড়াকড়ি’, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়া, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি ও কঠিন প্রশ্নপত্রের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
গত বছরের মতো এবারও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। এবার নয়টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরে পাসের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
শুধু পাসের হার নয়; কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার নয়টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার ২১৯। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭ হাজার ২৭১।
অর্ধেক পরীক্ষার্থীই ফেল
গতকাল শনিবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি ভোকেশনাল ও এইচএসসি ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়।
এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। ৫ লাখ ৭ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। অবশ্য এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
ফলাফলের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ছাত্রদের ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা সামান্য এগিয়ে। জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ১৮ হাজার ১৫৫ জন এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৭৯৩ জন।
নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হারে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর পাসের হারে পিছিয়ে আছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড—পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, কুমিল্লা ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, যশোর ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, চট্টগ্রাম ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, সিলেট ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, দিনাজপুর ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এবার সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছিল। উত্তরপত্র মূল্যায়নে একটি মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল।
অবনতির শুরু গত বছর থেকে
২০০৫ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে বড় অবনতি হয় গত বছর। ২০২৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৭৫ শতাংশের বেশি। গত বছর তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশের ঘরে। এবার তা আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে।
এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ শতাংশের বেশি। এরপর ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। এ সময়ে পাসের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। তবে বেশির ভাগ বছরেই তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ওপরে ছিল। করোনা শুরুর বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই বছর সব পরীক্ষার্থী পাস করেছিলেন।
ইংরেজিতে দুর্বলতা স্পষ্ট
এবারের ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশ পৌঁছায়নি। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্য বোর্ডগুলোতে এ হার ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে। বরিশাল বোর্ডে গড় পাসের হার কম, আবার ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৫৪ শতাংশের মতো। বাধ্যতামূলক আইসিটি বিষয়েও পাসের হার তুলনামূলক কম। সব বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে।
ইংরেজি ও আইসিটি বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এসব বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সামগ্রিক ফলেও পড়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এবার এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা।
প্রশ্নপত্র বিতরণেও কিছু গরমিল হয়। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখায় যে ঘাটতি ছিল, তা পরিলক্ষিত হয়েছে। আগামী দিনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গতকাল সচিবালয়ে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ফলাফলে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা পুনর্মূল্যায়নের পর বোঝা যাবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘আঞ্চলিক গ্রিড চায় বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল বাংলাদেশকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সস্তা জলবিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই বিপুল বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আঞ্চলিক সঞ্চালন লাইন (গ্রিড) নির্মাণের জন্য ভারতকে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ সচিবদের ১৯তম সম্মেলনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, বৈঠকে নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (সেভেন সিস্টার্স) বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কেভির হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইনের (করিডর) অনুমোদন চেয়েছে ভারত। তবে সমান সুযোগ ও আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ছাড়া ভারতকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একক কোনো লাইন না দেওয়ার বিষয়ে শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে ঢাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
৯-১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে বিদ্যুৎ সচিবদের ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে এতে মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে ভারত তাদের সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার করিডর ব্যবহারের অনুমতি চায়। ভারত জানায়, এই লাইন দিয়ে বাংলাদেশও চাইলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।
তবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সমান সুযোগ ছাড়া বাংলাদেশ এই করিডরের অনুমতি দেবে না। বাংলাদেশ মনে করে নেপাল, ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আলাদা গ্রিড লাইন থাকা দরকার। এই লাইন আঞ্চলিক গ্রিড লাইনও হতে পারে। তিনি বলেন, এই গ্রিড লাইন ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ বা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো দ্বিপাক্ষিক নয়, বাংলাদেশ চাইছে আঞ্চলিক গ্রিড লাইন।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশও আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণের পক্ষে বলে জানা গেছে। বৈঠকের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে জমা দেবে। আগামী বছর বিদ্যুৎ সচিবদের আঞ্চলিক বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে নেপাল বাংলাদেশকে ৩ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দেয়। গ্রীষ্মে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও শীতে তা ১০ হাজারের নিচে নেমে যায়। এ কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তাই বাংলাদেশ শীতে নেপালে বিদ্যুৎ রপ্তানির চিন্তাও জানিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ নেপাল থেকে দিনে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ নিচ্ছে, যার প্রতি ইউনিটের দাম মাত্র ৮ টাকা ১৭ পয়সা। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে গড়ে ১৩ টাকার বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির পরিচালক অমসু কিরণ শাহী ২৬ অক্টোবর এক ফেসবুক পোস্টে জানান, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সচিবদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বিনিময়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক গ্রিড থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তা গড়ে ওঠেনি। এই অবিশ্বাস দূর করতে না পারলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের বিপুল সস্তা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে ১৯-২০ জুলাই দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। ওই নথিপত্রে ২০২৫ সালে লাইনের নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৮ সালে শেষ করার তাগিদ ছিল। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি।
৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে মন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেভাবে আমরা চিন্তা করছি না।
কালের কণ্ঠ
‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ, ছুটি ৮০ কারখানা, আজ মজুরি বোর্ড গঠন’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর মিরপুর ও সাভার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করা হয়েছে।
এ সময় ব্যস্ত সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়; বাড়ে জনভোগান্তি। এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আবারও বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রবিবার (আজ) মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।
গতকাল রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রী।
ওই বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ কথা বলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিক্ষোভের কারণে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকার অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। মিরপুরে শ্রমিকরা বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সব সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ঢাকার আশুলিয়ায় অন্তত ৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর ট্রাফিক বিভাগ তাদের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানায়, পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও প্রশিকা মোড় এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, সকাল পৌনে ১১টা থেকে মিরপুরের কয়েকটি জায়গায় সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। আশপাশের কারখানা থেকে কয়েক শ শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওসি বলেন, দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকরা চলে যান।
এতে প্রায় চার ঘণ্টা পর ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বিকেল ৩টার দিকেও মিরপুর সাড়ে ১১ ও কালশী রোডে পোশাক শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ অব্যাহত রেখেছিলেন।
আশুলিয়ায় ৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা: আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণে কাঠগড়া ও আশপাশের অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল থেকে আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার কয়েক শ শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে তাঁরা সড়ক অবরোধ করলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা।
পুলিশ জানায়, আশুলিয়া থেকে তিনটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে শ্রমিকদের উসকে দিতে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়।
গাজীপুরে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি: বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রায় বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ ঘটনায় গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকার অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে শিল্প পুলিশের দাবি, ১৫ থেকে ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও দু-একটি ছাড়া বাকি সব ছোট ছোট কারখানা।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ইনানীতে গ্যাসের আগুন: সম্ভাবনার আড়ালে বড় প্রশ্ন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসে সৃষ্ট আগুন চার দিন ধরে জ্বলছে। গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও মজুতের পরিমাণ এখনো নিশ্চিত না হলেও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসের সাথে তেলজাতীয় পদার্থ থাকার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ও পেট্রোবাংলা। গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে বিকল্প কূপ বা রিলিফ ওয়েল খননের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ইনানীর এই ঘটনা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন গ্যাসসম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এর কাছাকাছি মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে শ্বে, শ্বে ফিউ ও মায়া গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আবার ২০২৬ সালের জুনে মিয়ানমারের সরকারি তথ্যে আয়েয়াওয়াদি ও তানিনথারি সমুদ্রাঞ্চলে আরো বড় গ্যাসসম্পদের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। এসব গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ এবং ইনানীর ভূগর্ভস্থ গ্যাসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে, যদিও এখনো সেটি কারিগরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনানীতে গ্যাস নির্গমনের ঘটনাকে সম্ভাব্য অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার কিংবা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদের প্রমাণ বলতে নমুনা পরীক্ষা, ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধানী কূপের মাধ্যমে আরো তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
চার দিন ধরে জ্বলছে আগুন, ২০০ মিটারে নিষেধাজ্ঞা
গত ২৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইনানী ছোটখাল সেতুসংলগ্ন একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে খননকাজের সময় গ্যাস বেরিয়ে আসে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা গ্যাস নির্গমনের ধরন, অগ্নিশিখার বৈশিষ্ট্য এবং আশপাশের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রাথমিকভাবে গ্যাসের উৎস অগভীর কোনো ভূগর্ভস্থ স্তরে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উৎসের গভীরতা, বিস্তৃতি ও মজুদ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জননিরাপত্তার স্বার্থে ২৯ অক্টোবর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জরুরি সভার পর ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা জারি করে উপজেলা প্রশাসন। ধূমপান, আগুন জ্বালানো, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু আগুন দেখতে প্রতিদিনই মানুষের ভিড় জমছে। এতে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় সম্ভাব্য বিস্ফোরণ, নতুন স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়া এবং আশপাশের বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গ্যাসের সাথে তেলের উপস্থিতি কী?
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মোহাম্মদ শোয়েব জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসটি থার্মোজেনিক অথবা বায়োজেনিক উৎসের হতে পারে। অগ্নিশিখার রং ও বৈশিষ্ট্য দেখে গ্যাসের সাথে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
থার্মোজেনিক গ্যাস সাধারণত ভূগর্ভের গভীর স্তরে তাপ ও চাপের প্রভাবে জৈব পদার্থ থেকে তৈরি হয়। অন্য দিকে বায়োজেনিক গ্যাস অপেক্ষাকৃত অগভীর স্তরে অণুজীবের কার্যক্রমের মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে। এই দুই ধরনের গ্যাসের উৎপত্তি, ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ ও সম্ভাব্য মজুদের বৈশিষ্ট্য আলাদা।
তবে ইনানীর গ্যাস কোন ধরনের, তা শুধু আগুনের রঙ দেখে নিশ্চিত করা যাবে না। এর জন্য গ্যাসের রাসায়নিক গঠন ও আইসোটোপ বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দরকার। একইভাবে, গ্যাসের সাথে তেলজাতীয় পদার্থ থাকার সম্ভাবনা দেখা দিলেও সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুদ রয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাপেক্সের ভূতত্ত্ব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। তবে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কেন ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, আপাতত গ্যাসের নির্গমনপথ জোর করে বন্ধ করা বা আগুন নিভিয়ে ফেলার চেষ্টা না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশঙ্কা রয়েছে, গ্যাসের প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ করে দিলে ভূগর্ভে চাপ তৈরি হতে পারে এবং অন্য কোনো দুর্বল স্তর দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ, অগ্নিশিখার উচ্চতা এবং আশপাশের স্তর থেকে নতুন করে গ্যাস নির্গত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর প্রবাহ অব্যাহত থাকলে বিকল্প কূপ খননের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হতে পারে।
রিলিফ ওয়েল পদ্ধতিতে মূল নির্গমনস্থলের কাছাকাছি আরেকটি কূপ খনন করে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজনে সাইড-ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ স্তরে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও নেয়া যেতে পারে। তবে ইনানীতে ঠিক কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বণিক বার্তা
‘৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত ও উচ্চ ঋণমান নিয়ে আস্থায় এগিয়ে আট বেসরকারি ব্যাংক’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, অতীতে যেসব ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের মধ্য দিয়ে ঋণ বিতরণ হয়েছে, সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে পড়েছে। বিপরীতে নিয়মনীতি অনুসরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমানত সংগ্রহ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সক্ষম হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক ক্রেডিট রেটিং বা সর্বোচ্চ ঋণমান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে আমানত সংগ্রহ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিসরও বাড়াচ্ছে এসব ব্যাংক। এ তালিকায় ব্যাংক খাতের প্রথম প্রজন্মের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকও রয়েছে। সর্বোচ্চ ঋণমানের পাশাপাশি ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে—এমন বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা এখন আট। এর মধ্যে ছয়টির ঋণমান ‘এএএ’ (ট্রিপল এ) এবং দুটির ‘এএ’ (ডাবল এ)।
‘এএএ’ ঋণমান পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংক। অন্যদিকে ‘এএ’ ঋণমান নিয়ে এ তালিকায় রয়েছে ট্রাস্ট ও ব্যাংক এশিয়া। আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এ উচ্চ ঋণমানকে আমানতকারীদের আস্থা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
ঋণমান নির্ধারণের আন্তর্জাতিক শ্রেণীবিন্যাসে ‘এএএ’ সর্বোচ্চ এবং ‘এএ’ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে। স্বনামধন্য ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ দুই শ্রেণীর ঋণমান পাওয়ার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ঋণের গুণগত মান উচ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাদের ঋণ ঝুঁকিও থাকে তুলনামূলকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণে মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণমান, তারল্য পরিস্থিতি, আয় ও মুনাফা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, করপোরেট সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাসহ বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা ঋণপত্রে বিনিয়োগের আগে এসব সূচকের পাশাপাশি ক্রেডিট রেটিংকেও গুরুত্ব দেন। একইভাবে ব্যাংকে আমানত রাখার ক্ষেত্রেও ঋণমান প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও দায় পরিশোধের সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।
তবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আমানত রাখার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ক্রেডিট রেটিংয়ের গুরুত্ব তেমনভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যাংক নির্বাহীরা। তাদের ভাষ্য, অতীতে আমানতকারীরা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন কিংবা ঋণমান যাচাই না করেই সঞ্চয়ের অর্থ জমা রাখতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতের সংকট ও কয়েকটি ব্যাংকের বিপর্যয় আমানতকারীদের সে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে। এখন অর্থ গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিংয়ের পাশাপাশি করপোরেট সুশাসন, ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও সামগ্রিক ভাবমূর্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, অতীতে যেসব ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের মধ্য দিয়ে ঋণ বিতরণ হয়েছে, সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে পড়েছে। বিপরীতে নিয়মনীতি অনুসরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমানত সংগ্রহ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সক্ষম হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক সমৃদ্ধির পথে হাঁটা ব্যাংকগুলোর একটি ব্র্যাক। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকায়। কেবল চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) আমানত ১৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বেড়েছে। আর ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকায়। অর্থনৈতিক নানা সংকট ও ব্যাংক খাতের বিপর্যয় সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ ২ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছে ব্র্যাক ব্যাংক, যেখানে দেশের ব্যাংক খাতে গড় খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৩ শতাংশ।
দেশের ঋণমান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ (সিআরএবি) থেকে দীর্ঘমেয়াদি রেটিংয়ে সর্বোচ্চ মান ‘এএএ’ পেয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির ঋণমান ‘এসটি-১’। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংক এমন সময়ে তার সাফল্যের শিখরে অবস্থান করছে, যখন দেশের ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতিও নানা সংকটে জর্জরিত। আমাদের ব্যাংক গত আড়াই দশকে গড়ে ওঠা ব্র্যান্ড ভ্যালু, উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ও আস্থার প্রতিদান পাচ্ছে।’
ব্যাংক আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি রাতারাতি তৈরি হয় না। এজন্য দীর্ঘ শ্রম ও সাধনার প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্র্যাক ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এটি করে গেছে। আমরা এখন সেই কাজেরই প্রতিদান পাচ্ছি। আমাদের প্রবৃদ্ধির মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। সেপ্টেম্বর শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, ব্র্যান্ডিং ও সর্বোচ্চ ঋণমানের সুফল।’
সিআরএবি থেকে ব্র্যাকের মতোই সর্বোচ্চ রেটিং ‘এএএ’ ও ‘এসটি-১’ পেয়েছে সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংক। আর ট্রাস্ট ব্যাংক পেয়েছে ‘এএ১’। বেসরকারি খাতের এ পাঁচটি ব্যাংকেরই আমানত স্থিতি এখন ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বর শেষে সিটি ব্যাংকে আমানত ছিল ৭৭ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ডাচ্-বাংলায় ৭৩ হাজার ২৮২ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকে ৬৩ হাজার ৩০ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। আর ট্রাস্ট ব্যাংকের আমানত ৫৮ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি খাতের ব্যাংক ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে গ্রাহকরা আমানত রাখার জন্য ক্রেডিট রেটিংয়ের খবর নিতেন না। কিন্তু এখন নিচ্ছেন। কারণ কিছু ব্যাংকে আমানত রেখে গ্রাহকরা প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন আমরা করপোরেট সুশাসন মেনে চলা ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রতিদান পাচ্ছি। কেবল চলতি বছরের নয় মাসে ট্রাস্ট ব্যাংকের আমানত প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘এইচএসসির ফল: ইংরেজি-আইসিটিতেই বিপর্যয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় গত ২২ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম পাসের হার। শিক্ষা বোর্ডগুলোর গড় পাসের হার ও সর্বোচ্চ ফলের সূচক জিপিএ-৫ দুটিই কমেছে। এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক অকৃতকার্য হয়েছেন। কমেছে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। অন্যদিকে বেড়েছে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
গতকাল শনিবার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর পাশাপাশি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের খারাপ ফল, পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতাও সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে এমন ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয় বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, নানা সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। ফলে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনও সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এবারের ফলাফলেও প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি। কারণ, প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা, যা আমাদের নেই। ইংরেজি ও আইসিটিতে খারাপ করার অন্যতম কারণ দক্ষ শিক্ষকের অভাব। এদিকে নজর দিতে হবে।’
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৪ সালের পর চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার সবচেয়ে কম। ২০০৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২০ সালে অটোপাসের মাধ্যমে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল রেকর্ড ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
ইংরেজি-আইসিটিতে বেশি অকৃতকার্য
চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন অকৃতকার্য হয়েছেন।
ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ছাড়া বাকি আটটি বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের নিচে। এ বিষয়ে গড় পাসের হার ৬১ দশমিক ১৪ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী বোর্ডে ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৪ দশমিক ৮৩, যশোরে ৫৪ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৬৫ দশমিক ৭৭, বরিশালে ৫৪ দশমিক ০৮, সিলেটে ৬৫ দশমিক ৮৪, দিনাজপুরে ৫৬ দশমিক ৫ এবং ময়মনসিংহে ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছেন।
আইসিটিতে গড় পাসের হার ৭১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৪ দশমিক ৭৪, কুমিল্লায় ৭৩ দশমিক ০১, যশোরে ৬৭ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭৩ দশমিক ৩৬, বরিশালে ৬৬ দশমিক ৪২, সিলেটে ৭৪ দশমিক ২০, দিনাজপুরে ৭২ দশমিক ৬৪ এবং ময়মনসিংহে ৭১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে দক্ষ শিক্ষকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিভীতিও আছে। আর আইসিটি পড়ানোর জন্য যে মানের শিক্ষক প্রয়োজন, সেই মানের শিক্ষক নেই। অনেক অধ্যায় আছে, যা অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পড়ানো সম্ভব নয়। তাই দ্রুত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।’
মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ শতাংশ
বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে রয়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বিভাগে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৩৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩১১ জন। বিভাগটিতে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও তুলনামূলক খারাপ ফল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে চারটি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে। বোর্ডগুলো হলো রাজশাহী (৫২ দশমিক ৮৪ শতাংশ), বরিশাল (৫২ দশমিক ২০ শতাংশ), দিনাজপুর (৫৩ দশমিক ২ শতাংশ) এবং ময়মনসিংহ (৫৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ)। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
কড়াকড়ির প্রভাবও আছে
পরীক্ষার সময় কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি এবারের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকাও খারাপ ফলের অন্যতম কারণ।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এতে শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়ন ও পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবও পড়েছে ফলাফলে।
দেশ রূপান্তর
‘বিমানের প্রকৌশল বিভাগে শাস্তির ঘণ্টা’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এ কারণে দেশটির নারিতা বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফিরতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগের দক্ষতা, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
এর আগেও এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে বিমানে। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে এ ঘটনায় প্রকৌশল বিভাগে শাস্তির খড়গ নেমে আসছে বলে বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি বিমানের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাও তদন্তের জালে আটকা পড়ছেন।
বিমানসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে আরও ‘ভালো আস্থায়’ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে সব সরকারেরই। দায়িত্ব নেওয়ার পর সবাই প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার ঘোষণা দেন। কিন্তু ‘লাভের আলো’ দেখছেন না কেউ। আওয়ামী লীগ আমলেও লাভজনক হয়নি সংস্থাটিতে। উল্টো সমস্যায় কাবু হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন সরকার আসার পর ‘অনেকটা ঢেলে সাজানো’ হয়েছে কর্তাদের চেয়ার। চুক্তি করা হয়েছে ২৪টি বোয়িং ও এয়ারবাস কেনার। নতুন নিয়োগ হয়েছে প্রধান নির্বাহী ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন গড়ে ১৮৭ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু লাভের মুখ না দেখলেও আগের চেয়ে চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহীসহ কয়েকজন বড় কর্তার বেতন দ্বিগুণও হয়েছে। এ নিয়ে অন্য কর্তারাও নাখোশ। প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রায় ৪২ কোটি টাকা। এতকিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটি ধরা পড়ায় নানা রহস্যর সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্তের জালে একাধিক কর্মকর্তা: প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট ত্রুটির ঘটনায় গত শুক্রবার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কমিটিতে বিমানের চিফকে (প্ল্যানিং অ্যান্ড সিডিউলিং) সভাপতি এবং ব্যবস্থাপককে (আইনবিষয়ক) সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) এবং ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি)। চার কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। কমিটি ত্রুটির আসল কারণ শনাক্তকরণ ও নিরসন প্রক্রিয়া, উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ, আর্থিক ক্ষতি এবং দায়িত্বে অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কিনা সেসব বিষয়ে খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি ফ্লাইট বিলম্ব, যাত্রীদের ভোগান্তি এবং বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাবের পর্যালোচনাও করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিমানের এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের জালে একাধিক কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়েছে। কেবল একটি তদন্ত কমিটি গঠন বা দায়সারা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিমানের প্রকৌশল ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগে কঠোর প্রশাসনিক সংস্কার আনা জরুরি। যেসব প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দুর্নীতির কারণে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভিভিআইপি প্রটোকলকে হুমকির মুখে ফেলছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
আলোচনা প্রকৌশল বিভাগ: ঘটনার পর বিমানের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, উড্ডয়নের আগে কারিগরি পরীক্ষা এবং ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত সমাধানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের একটি ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উড়োজাহাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা, হাইড্রোলিক ব্যবস্থা, ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ককপিটের সতর্কসংকেত যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে তা নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। তবে উড়োজাহাজে ত্রুটি দেখা দেওয়া মানেই প্রকৌশলীদের গাফিলতি বলা যাবে না। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় প্রকৌশল বিভাগের কেউ না কেউ শাস্তি পাবেই। অনেককে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। এর আগেও বিমানে একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
পেশাদারত্বের মধ্যে কাজ করতে হবে: সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানে পেশাদারত্বের অভাব আছে। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে পুরো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। উড্ডয়নের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, সব সরকারই বিমানে ‘নিজেদের লোক’ বড় পদে বসিয়ে দিচ্ছে। বিমানের আয়ের তুলনায় খরচ বেশি। তবে বড় পদগুলোতে অ্যাভিয়েশনের লোকজন না থাকলে কখনো উন্নতি হবে না। রাজনৈতিক বাহিরেই রাখলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে।
ফ্লাইট চলার পরও ছিল বিঘ্নিত হওয়ার শংকা: বিমান সূত্র জানায়, ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে জাপানের নারিতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটটির উড্ডয়নের কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে উড়োজাহাজটি পুশব্যাক করে রানওয়ের দিকে ট্যাক্সি করার সময় ককপিটে স্পয়লার-সংক্রান্ত লাল সংকেত দেখা দেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে পাইলট ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পরে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর তোলপাড় শুরু হয়। ত্রুটি নিরসনে প্রকৌশলী সাদেকুল সাড়ে চার ঘণ্টায়ও স্পয়লারের ত্রুটি পুরোপুরি দূর করতে পারেননি। এমইএলের আওতায় উড়োজাহাজটিকে ঢাকায় ফেরার উপযোগী করা হয়। এ কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করতে হয়েছে। অন্য স্পয়লারেও সমস্যা দেখা দিলে উড়োজাহাজটির নিরাপদ পরিচালনা বিঘ্নিত হওয়ার শংকাও ছিল।
বিমানের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মতো ভিভিআইপির ফ্লাইটে আরও যত্নশীল হওয়া উচিত ছিল। এর আগেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কারও কোনো ধরনের জবাবদিহি নেই। যে যেভাবে পারছে অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো আমাদের বিবেচনায় আনতেই হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতার খবর ‘পোশাক খাতে অস্থিরতা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি ঘিরে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গতকালও রাজধানীর মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কালিয়াকৈরে ১২ কারখানা বন্ধ ও আশুলিয়ায় ৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোশাকশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, ইউরোপে আন্দোলন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপের সঙ্গে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে রপ্তানি ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের দাবি মজুরি বাড়ানো, মজুরি বোর্ড গঠন হলে আন্দোলন কমে যাবে। সরকার বলছে, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠন করা হচ্ছে আজ।
গতকালও রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক আন্দোলন দেখা গেছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মিরপুর এলাকা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে সরে যাওয়ার পর মিরপুর-১ নম্বরের মাজার সংলগ্ন বাজার ও মার্কেট এলাকায় ভাঙচুর চালিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় হিমালয় গার্মেন্টস ও বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষের পাশাপাশি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, যারা এসব ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলাধীন পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। এ সময় মহাসড়কের ওপর মাটি ভর্তি বস্তা ও কাঠ বাঁশ ফেলে আগুন ধরিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সড়কের কয়েক কিলোমিটার অংশ যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিক বিক্ষোভে ১২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন এসব তথ্য জানান।
সাভার প্রতিনিধি জানান, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল আশুলিয়ার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করে। আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার, আমতলা, নয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সকালে নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকরা প্রথমে কারখানার ভিতরে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আশপাশের কয়েকটি কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টস, এআর জিন্স ও সিডব্লিউএসহ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশের এক সদস্য আহত হয়েছেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ৩০ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সাল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের আন্দোলনের মাঝে ঘটনাস্থল থেকে হাতবোমা সদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। কে বা কারা এই বস্তুগুলো সেখানে বহন করে এনেছে বা রেখে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আজ নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দও শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি মেনে নিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। গতকাল রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
