মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধবিষয়ক কালো তালিকা থেকে বাদ দিতে বৈশ্বিক নজরদারি সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ওপর চাপ দিচ্ছে জাপান। দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারির বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে টোকিও। জাপানের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের।
তাদের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকাতে এফএটিএফের সদস্য দেশগুলোর ওপর যে বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা তুলে নিতে চায় জাপান।
মিয়ানমারকে কালো তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলে দেশটির সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে নজরদারি ও যাচাই-বাছাই সহজ হবে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে প্রতারণাকেন্দ্র এবং অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বর্তমানে এফএটিএফের কালো তালিকায় মিয়ানমার ছাড়া অন্য দুটি দেশ হলো ইরান ও উত্তর কোরিয়া। ৪০ সদস্যের সংস্থাটির চলতি বছরের তৃতীয় ও শেষ পূর্ণাঙ্গ বৈঠক শুক্রবার প্যারিসে শেষ হওয়ার কথা।
তবে মিয়ানমারকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার বিষয়ে শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত আসছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্বিতীয় সূত্রটি জানিয়েছে, এশিয়ার অন্তত আরেকটি বড় দেশও মিয়ানমারকে কালো তালিকা থেকে বাদ দেয়ার পক্ষে চাপ দিচ্ছে।
এফএটিএফ সচিবালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, বৈঠক এখনো চলছে এবং আলোচনা গোপনীয়। শুক্রবার বৈঠক শেষ হওয়ার পর কালো তালিকায় কোনো পরিবর্তন এলে তা ঘোষণা করা হবে।
মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের এক মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে অস্থিরতা ও ব্যাপক গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে ২০২২ সালে মিয়ানমারকে কালো তালিকাভুক্ত করে এফএটিএফ।
দেশটির অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে অবৈধ মাদক উৎপাদন ও পাচার বেড়েছে। পাশাপাশি গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলে শিল্পমাত্রার প্রতারণাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব কেন্দ্রের কিছু সামরিক-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী পরিচালনা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মিয়ানমার সরকার বলেছে, প্রতারণাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে। মাদক জব্দের চেষ্টাও চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে তারা। দেশটির সরকারের ভাষ্য, মাদক উৎপাদন ও পাচারের সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জড়িত।
সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরান থেকে মিয়ানমার জেট জ্বালানি আমদানি করেছে। ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে এসব চালান আনা হয়েছে। ওই জ্বালানি প্রাণঘাতী বোমা হামলার অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিয়ানমার সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মিয়ানমার। সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে দেশটির সঙ্গে আবার যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে তোলার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে জাপানের এ উদ্যোগকে।
অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং এখনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া এবং পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থান দমনে ভূমিকার কারণে তার ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল নেপিদোতে মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ।
প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেলেও মিয়ানমারের বিপুল বিরল মৃত্তিকা সম্পদের নাগাল পাওয়ার বিষয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথও এতে তৈরি হতে পারে। ওই বৈঠকের পর চলতি মাসের শুরুতে টোকিওতে আরও কিছু গোপন আলোচনা হয়।
অভ্যুত্থানের পর অনেক বিদেশি কোম্পানি মিয়ানমার ছেড়ে গেলেও জাপানের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সেখানে তাদের বড় ব্যবসায়িক উপস্থিতি ধরে রেখেছে। জাপানের ওই সরকারি কর্মকর্তার মতে, মিয়ানমারকে এফএটিএফের কালো তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলে দেশটির সঙ্গে অন্যান্য দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা মিলবে বলে মনে করে টোকিও।
