মেয়েদের শিক্ষার ওপর তালেবানের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন আলোচিত ভারতীয় ইসলামি বক্তা জাকির নায়েক। তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জাকির নায়েক দাবি করেন, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি গণমাধ্যমে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় না।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে যা কিছু আসে, তার সবই সত্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাউকে উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ পিছিয়ে রাখতে হলে তাতে কোনো সমস্যা নেই।’
তালেবান প্রশাসনের পক্ষ নিয়ে জাকির নায়েক বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কেবল পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তার দাবি, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে। তবে নিরাপদ পরিবেশের অভাব এবং নারী শিক্ষকের সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আফগান নারীরা ইসলামি শিক্ষা ও শরিয়াহ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করছেন।
‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’
জাকির নায়েকের এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের শিক্ষা অধিকারকর্মী ও নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের বাবা। তিনি এ বক্তব্যকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে পরিচিত একজন ইসলামি পণ্ডিত ড. জাকির নায়েক কীভাবে মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়ার তালেবানি নীতিকে যৌক্তিক প্রমাণের চেষ্টা করছেন, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞাকে সামান্য বিলম্ব হিসেবে উপস্থাপন করা এবং নারী শিক্ষকের সংকটের কথা বলে সেই সংকট কীভাবে দূর করা যায়, তা ব্যাখ্যা না করা কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি হতে পারে না।’
মালালার বাবা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের মন্তব্য নারীদের ওপর তালেবানের পরিকল্পিত নিপীড়নকে বৈধতা দেয়। তিনি একে গুরুতর অবিচার বলে অভিহিত করেন।
‘চমৎকার যুক্তি’
জাকির নায়েকের যুক্তিকে ব্যঙ্গ করে ‘চমৎকার যুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাসিত আফগান সংসদ সদস্য মারিয়াম সোলাইমানখিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেন, ‘জাকির নায়েকের মতে, আফগান মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়নি। তারা শুধু নারী শিক্ষকের অপেক্ষায় রয়েছে। অথচ সেই নারী শিক্ষকদেরই কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তালেবান!’ তিনি আরও লিখেন, ‘চমৎকার যুক্তি, ডাক্তার!’
‘গভীরভাবে অনৈতিক’
ভারতীয় ইতিহাসবিদ রুচিকা শর্মাও জাকির নায়েকের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। ধর্মীয় ব্যক্তিদের ‘গভীরভাবে অনৈতিক’ বলে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষার ওপর ভয়াবহ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় ব্যক্তিরা গভীরভাবে অনৈতিক। কল্পনা করুন, মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষার ওপর ভয়াবহ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে তারা কীভাবে নীরব থাকতে পারেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর একটি।’
‘মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ২৬ লাখ আফগান মেয়ে’
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ইউনিসেফের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আফগানিস্তান এখনো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ রয়েছে।’
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, ‘একটি দেশের ইতিহাসের হিসাবে পাঁচ বছর খুব বেশি সময় না হলেও একটি মেয়ের জীবনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।’
তিনি বলেন, এই সময়টুকু একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।
